Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতা: কীভাবে টিকে থাকবে?

সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতা: কীভাবে টিকে থাকবে?
ছবি: বার্তা২৪.কম
মাহমুদ মেনন


  • Font increase
  • Font Decrease

মিডিয়া নিয়ে আজকাল বেশ গালগপ্প চলছে। মিডিয়া বিপাকে আছে (!) সে কথা সবাই বলছে। আর মিডিয়া কিছুই পারছে না (!) সে কথাও বলা হচ্ছে আকছার। সর্বোপরি মিডিয়াকে বেশ গালমন্দও করা হচ্ছে। মিডিয়ার ওপর দোষ চাপানো অনেকটা অভ্যাসেই পরিণত হয়েছে অনেকের। এরই মধ্যে কথা উঠেছে মিডিয়ার টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে। এত্ত দোষ-ত্রুটি, চাপ-বিদ্বেষের মুখে কীভাবেই টিকে থাকবে মিডিয়া? সম্প্রতি জার্মানির বনে হয়ে যাওয়া গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে বিষয়গুলো নিয়েই খুব আলোচনা হলো।


ডয়েচে ভেলে’র উদ্যোগে এই বাৎসরিক আয়োজনে সারা বিশ্বের বাঘা বাঘা সাংবাদিকরাই জমায়েত হয়েছিলেন। আর তাদের আলোচনায় মিডিয়ার টিকে থাকার বিষয়টিই প্রাধান্য পেলো। সেখানেই শুনে এলাম মিডিয়ার ভুত-ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা শঙ্কা ও সম্ভাবনার কথা। কিভাবে এই টিকে থাকার সংগ্রামে মিডিয়া গোটা বিশ্বে তার শক্ত হাল ধরে থাকবে সে নিয়েও কথা হলো ফোরামের বিভিন্ন আলোচনায়। তাতে একটি কথা স্পষ্ট করেই বলা হলো-


কোনও মিডিয়া আউটলেটের টিকে থাকার সামর্থ পুরোপুরিই নির্ভর করবে সেই মিডিয়ার মানসম্মত সাংবাদিকতা চর্চার টেকসই সক্ষমতার ওপর।


পাঠক, দর্শক কিংবা শ্রোতা যদি নির্ভরযোগ্য তথ্য পায় তাহলেই মিডিয়াটির ওপর তাদের আস্থা থাকবে। আর পাঠক আস্থা পেলে মিডিয়াটি টিকে যাবে। কথাগুলো কেবল একক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার জন্যই প্রযোজ্য নয়, সার্বিকভাবে মিডিয়া নেটওয়ার্কের পরিবেশটিকেই এই আস্থার জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।

বোদ্ধারা বলছিলেন, এই মানসম্পন্ন সাংবাদিকতা চর্চার বিষয়টি এখন অর্থ কিংবা অর্থের উৎসের চেয়েও বড় গুরুত্বপূর্ণ। তবে পাশাপাশি আরও কিছু বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে সামনে আনা হয়েছে। বলা হয়েছে- আইনি কাঠামো, প্রযুক্তিগত সুবিধা, কার্যকর নেটওয়ার্ক আর সর্বোপরি যথার্থ সম্পাদকীয় নীতি কৌশলের কথাও। যার মাধ্যমে গণমাধ্যমের উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে।

তাহলে মূল প্রশ্নতো গিয়ে দাঁড়ালো সেখানেই- গণমাধ্যমের উন্নয়ন কীভাবে মানসম্মত সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে? মূল চ্যালেঞ্জগুলোও সেখানেই।

মিডিয়া মার্কেটে এখন মৌলিক কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে যেগুলো হয়তো আগে ততটা ছিলো না। প্রধানত মিডিয়ার ডিজিটালে পাল্টে যাওয়া আর মিডিয়া ব্যবহার কিংবা ভোগ করায় এসেছে নতুন কিছু ধরন-ধারন।

এর বাইরে এসেছে অনলাইনে বিনামূল্যে খবর বিতরণের ধাক্কা। সংবাদকর্মীরা গায়ে খেটে, মালিকরা বড় অংকের অর্থ লগ্নি করে খবর সংগ্রহ করছেন। আর পাঠক তা মুফতে পেয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া আগে বাজারে তথ্য যেটুকু মিলতো এখন মিলছে তার চেয়ে অনেক বেশি । বলা চলে তথ্যের জোয়ার বইছে। খবরের উৎস নিজেই খবরের প্রকাশক হয়ে বসে আছে।

এর বাইরে ওয়েব জগতে চলে এসেছে শ্রেণিভুক্ত (ক্ল্যাসিফায়েড) বিজ্ঞাপন। আর সর্বোপরি টেকজায়ান্টদের উদ্ভব ও বিস্তার ঘটেছে ভীষণভাবে। সব কিছুই তারা নিজেদের করায়ত্তে নিয়ে একাই ভোগ করার পায়তারাই কেবল নয়, রীতিমতো সফলভাবে সেটাই করছে।

এর বাইরেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যার অন্যতম হচ্ছে- মিডিয়ার ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ। যা ক্রমেই বাড়ছে আর বাড়ছে। এতে করে মিডিয়া আর নিজের মতো চলতে পারছে না। তাকে হয় সরকারের নয়তো গোষ্ঠী স্বার্থের কাছে নত হয়ে থাকতে হচ্ছে। গোষ্ঠী স্বার্থগুলো স্রেফ স্বার্থের বশবর্তী হয়েই হয় মিডিয়া কিনে নিচ্ছে নয়তো বিজ্ঞাপনি সহায়তা দিয়ে মিডিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।

এর বাইরে সংবাদমাধ্যমের ওপর রয়েছে সেন্সরশিপ, নিয়ন্ত্রণ ও সার্বক্ষণিক নজরদারির খাড়া।


কিন্তু এসব কিছুর মাঝেও মূল শক্তিটি থেকে যাচ্ছে পাঠকের ওপর। যারা আসলে দিনশেষে মানসম্মত সাংবাদিকতাই দেখতে চায়। এখন প্রশ্ন উঠেছে বিজ্ঞাপন নির্ভরতা দিয়ে মানসম্পন্ন সাংবাদিকতা কতটুকু করা সম্ভব? আর যদি তা সম্ভব হয়ও তাও হবে খুব সীমিত আকারে।


গণমাধ্যম বোদ্ধারা এসব চ্যালেঞ্জের কথা বলে জোর দিলেন রিসোর্স মডেলের ওপর। বললেন, আসলে পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে এই যোগ্য সংবাদকর্মীরাই আমাদের সুরক্ষা দিতে পারবে। তবে তাদের চাই নতুন ধরনের দক্ষতা। আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর সাংবাদিকতায় তাদের দক্ষ পরিপক্ক হয়ে উঠতে হবে। এছাড়াও নিতে হবে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত উদ্যোগ। আর থাকতে হবে একটি সক্রিয় তথ্য ও গণমাধ্যম ব্যবস্থা।

কিন্তু মানসম্পন্ন মিডিয়া বা সাংবাদিকতা কিভাবে সম্ভব? গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে যে আলোচনা হলো- তাতে বলা হলো এ সবকিছুর কেন্দ্রে থাকতে হবে একটি বিষয়- তা হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এই শর্তটি মানলে মিডিয়ার পক্ষে সরকার তথা অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে জটিল সব প্রতিবেদন প্রকাশ করা সম্ভব। আর তার মধ্য দিয়েই সাধারণ নাগরিকের কাছে নিরপেক্ষ তথ্যভিত্তিক খবরাখবর পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।


কিন্তু শুধুই কি মিডিয়ার সক্ষমতা? মানসম্মত সাংবাদিকতা? পাঠকের কি কোনও ভূমিকা নেই?

আছে। সে নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আমরা পই পই করে একটি কথা বলছি। আপনি যতই মানসম্মত সাংবাদিকতার চর্চা করুন না কেনো, পাঠক/দর্শক/শ্রোতার রুচি যদি তৈরি না হয়, পাঠকের যদি না থাকে মিডিয়া লিটরেসি (গণমাধ্যম সংক্রান্ত স্বাক্ষরজ্ঞান) তা হলে একা মানসম্মত সাংবাদিকতা দিয়ে এই পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে মিডিয়া খুব একটা এগুতে পারবে না। সুতরং মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটেরেসি নিয়েও জিএমএফ-এ আলোচনা হলো।


অনেকেই বলবেন এই গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা বিষয়টা আবার কী?

এটি হচ্ছে এক ধরনের দক্ষতা যা থাকলে সাধারণ মানুষ মিডিয়া তথা তথ্যসূত্রকে সঠিকভাবে বুঝতে ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবে।

একটি খবর- তা ভূয়া নাকি সঠিক? খবরটি যিনি কিংবা যারা দিচ্ছেন তিনি কিংবা তারা কোন মাধ্যম থেকে পাচ্ছেন, এবং কোন পদ্ধতিতে ছড়াচ্ছেন সেটিও জানতে ও বুঝতে পারা জরুরি। অসংখ্য মিডিয়ার যুগে কাটপেস্ট-এর মতো চৌর্যবৃত্তির সাংবাদিকতাও চলছে ধুন্ধুমার। সুতরাং সকলকে বুঝতে হবে কে এই কনটেন্টের মূল প্রস্তুতকারক? আর কারা একে বিনা শ্রমশক্তি ও মেধা ব্যয় করে স্রেফ ঘরে বসে কাটপেস্ট করে ছড়াচ্ছে।

এই মিডিয়া ইনফরমেশন লিটরেসি থাকলে কিন্তু গণমানুষের নিজের সক্ষমতাও বাড়ে। এর মধ্য দিয়ে তাদের তথ্য ভান্ডারে প্রবেশাধিকার যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি তারা নিজেরাও নিজেদের মত প্রকাশের যোগ্যতা অর্জন করেন। যে দুটোই মানুষের মৌলিক অধিকার।

আজকালের এই ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে সাধারণের এই গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা বিশেষ করে গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মোবাইল ফোনের ব্যবহার যে হারে বাড়ছে তাতে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত গোপণীয়তা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এই মিডিয়া লিটরেসি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

একই সঙ্গে কথা বলতে হবে নিউজ লিটরেসি নিয়েও। কোনটা সংবাদ, কোনটা সংবাদ নয়, কোনটা সঠিক কোনটা ভূয়া খবর এগুলো মানুষকে বুঝতেই হবে। তার জন্যই চাই সংবাদ বিষয়ক স্বাক্ষরজ্ঞান।

ভূয়া খবর যারা ছড়ায় তারা তো রয়েছেই, একটি মূলধারার সংবাদ মাধ্যম নিজেও কিন্তু তার পাঠক, দর্শককে নানাভাবে ঠকায়। সেলফ সেন্সরশিপ, দলকানা সাংবাদিকতার চর্চা- এসবও চলছে। তাতে সঠিক মিডিয়াটিকে বেছে নিতেও সাধারণের চাই নিউজ লিটেরেসি। তবে মূল কথা কী- এর জন্য কোনও বিশেষ একক কোনও কৌশল নেই। একটি কৌশলে সবাইকে স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করে তোলা যাবে এমন কোনো পথও নেই। কারণ বিশ্বের দেশে দেশে এই সমস্যাটির ধরণ ভিন্ন ভিন্ন। অনেক দেশেই সাধারণ শিক্ষার হারটাই কম, সাধারণ স্বাক্ষরতা জ্ঞান সম্পন্ন মানুষের সংখ্যাই যেখানে কম, সেখানে মিডিয়া স্বাক্ষরতা আর কতটুকুই সম্ভব। আবার যেখানে স্বাক্ষরজ্ঞান হয়তো রয়েছে, কিন্তু কোনও বিষয়কে স্বাধীন, নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা, তার জটিল দিকগুলো চিন্তায় নিয়ে বিবেচনা করার জন্য যে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মানুষকে যেতে হয়, তা এখনো অধিকাংশ দেশেই অবর্তমান।

ডয়েচে ভেলেতে শুনে এলাম, জার্মানি এখন এই মিডিয়া লিটেরেসিকে তাদের স্কুল পাঠ্যসূচিতে নিয়ে এসেছে। অর্থাৎ স্কুলের ছেলেমেয়েরাই শিখে নেবে মিডিয়া কি? খবর কী এবং কোনটা। এতে তাদের গভীর চিন্তাবোধ তৈরি হবে। কোনও বিষয়কে জটিলভাবে ভাবতে পারবে। তাতে সুসাংবাদিকতার চর্চার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে জন্য টিকে থাকবে যেসব মিডিয়া তাদের পাঠের কিংবা ব্যবহারের জন্য পাঠক/দর্শক শ্রেণিটিও তৈরি হবে নিউজ ও মিডিয়া লিটরেসি নিয়ে।

বাংলাদেশের জন্য দিনটি কীভাবে আসবে? কবে আসবে?


***সারাবাংলা.নেট- এর নির্বাহী সম্পাদক মাহমুদ মেননের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া। 

আপনার মতামত লিখুন :

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র