ভয় ভয়ংকর!

তুষার আবদুল্লাহ
তুষার আবদুল্লাহ/ ছবি: বার্তা২৪.কম

তুষার আবদুল্লাহ/ ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত যখন রামদা’র কোপের নিচে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, তখন আমি কচা নদীর বুকে। মোড়েলগঞ্জ থেকে ফিরছি। মসহুদ এর ডেকে দাঁড়িয়ে দেখছি উত্তাল ঢেউয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে একটি ছোট দেড়তলা লঞ্চ। সকাল দশটার আকাশে মেঘ রোদ্দুরের খেলা চলছে। সহযাত্রীদের কাছে বলছিলাম বলেশ্বরের বুকে লঞ্চ ডুবির রিপোর্ট করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা। বরগুনার পাথরঘাটার জেলেদের সঙ্গে উত্তাল সমুদ্রে যাওয়া। মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যাওয়ার ভয়ে কেমন আতঙ্কিত ছিলাম।

আমার সেই গাল-গপ্প শুনে এম.ভি. মসহুদের মাস্টার বললেন-এখন কি ভেসে আছেন নাকি, ডুবে যাওয়ার বাকি আছে? তিনি এই নৌরুটে নিয়মিত রকেট নিয়ে আসা যাওয়া করেন। দেখে চলছেন দুই কূলের মানুষের জোয়ার ভাটা। এখন আর চোখ সইয়ে নিতে পারছেন না। রাজনীতির গর্জনতো কম শোনেননি তিনি। ঘাটের কতো সামান্য যাত্রীকে এক সময় ভিআইপি কেবিনে নিয়ে বসাতে হয়েছে। তাদের মধ্যে দাম্ভিকতা শ্যাওলা পড়েছিল ঠিক, কিন্তু উচ্ছৃঙ্খলতা দেখিয়েছেন কমই।

কিন্তু এখন? নদীর চেয়ে উত্তাল তারা। এই উত্তালের উর্মি হচ্ছে উঠতি তরুণরা। কৈশোর পার হবার আগেই কোনো না কোনো নেতার ঘূর্ণির বিষাক্ত ধূলি হয়ে উঠছে। গ্রামের সাধারণ এক কিশোরও যেন ক্ষমতার তন্দুরে সারাক্ষণ তেঁতে আছে। নেমে পড়েছে সব ধ্বংস করে দেবার জন্য ঢাল তলোয়ার নিয়ে। পেছনে তাদের ‘ভগবান’দের প্রশ্রয়। রকেটের মাস্টারের দেখার চোখের সঙ্গে নিজের চোখও কেমন যেন মিলে গেল। তিনি দেখছেন দুই তীরের বদলে যাওয়া। সেই দেখার সঙ্গে আমার মহল্লা-শহরের বদলে যাওয়ার কত মিল!

কত সহজে বন্ধুর বুকে গুলি ছুঁড়তে পারে, বুকে গেঁথে দিতে পারছে রামদা। প্রিয়তমার ‘অসুন্দর’ ছবি তুলে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেয়ালে। বিষয়গুলো অপ্রকাশ্য থাকছে। তারা শক্তির প্রশ্রয়ে পরোয়া করছে না কিছুই। কারণ তাদের মস্তিষ্কে একটি বিশ্বাসের বালুচর তৈরি হয়েছে, যেখানে বোনা আছে সামাজিক, রাজনৈতিক মহিরুহ, যা সকল অপরাধ থেকে রক্ষা করবে। তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বজিৎ থেকে রিফাত শরিফ। মাঝে আরও কত নাম হারিয়ে গেছে। মনে রাখিনি আমরা। আমাদের এই ভুলে যাওয়ার মুদ্রাদোষে নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজীরা দানব হয়ে উঠছে। শুধু বরগুনাতে নয়, রাজধানীতেও চলছে এই দানবদের ভয়ংকর তাণ্ডব।

বরগুনার ঘটনার নারকীয়তা দেখার চোখে ভিন্ন রঙ দিতে রিফাত শরীফের স্ত্রীর সঙ্গে রতন বন্ডের প্রেমের সম্পর্ককে সামনে আনা হয়েছে। ঘটনার আড়ালে প্রেম-পরকীয়া যাই থাকুক, সেটির সামাজিক ও আইনগত সমাধান আছে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে মারায় কোনো বীরত্ব নেই। নেই সমাধান। এ কথা অপরাধীও জানে। কিন্তু ঐ যে সমাজ ও রাজনীতিক শক্তি এদের সকল বোধকে ধবংস করে দিয়েছে। এখন প্রকাশ্য হত্যাকে তারা উদযাপন করে। এই উদযাপনের আরেকটি দিক হচ্ছে ভয়ের সংস্কৃতিকে আরও জোড়ালো করা। তাদের সমাজ ভয় পাবে। সমাজ, জনপদে এই দানবদের দাপট বাড়বে চক্রবৃদ্ধি হারে।

আমরা বলছি যে, হত্যা-হামলার সময় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি না। দূরে দাঁড়িয়ে থাকছি। ভিডিও করছি মুঠোফোনে। ছবি তুলে রাখছি। যদি আমরা এগিয়ে যেতাম তাহলে হয়তো মানুষটি হামলা থেকে রক্ষা পেত, বেঁচে যেত জীবনটা। এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিছু ভিডিও এবং ছবির বদৌলতে আমরা আসামিদের ধরতে পারছি। মামলা বেগবান হচ্ছে। ঠিক এমন অংসখ্য অপরাধ আড়ালে রয়ে যাচ্ছে প্রমাণের অভাবে।

মানুষ জড় পদার্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, এ কথাও সত্য। দুর্ঘটনায় রোগীর প্রাণ যাচ্ছে। তাকে হাসপাতালে না নিয়ে আমরা ছবি তুলছি। কোথাও কেউ ছিনতাইকারীর কবলে পড়লেও এগিয়ে যাচ্ছি না। হত্যার ঘটনাতো আরও ভয়ের বিষয়। কেন যাচ্ছি না? আমরা কি মানবিকতা শূন্য হয়ে পড়েছি? অন্যের বিপদে বুক হু হু করে উঠে না, আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছে শক্তি মরে গেছে? না আমাদের মাঝে মানবিক গুনাবলির কোনো কিছুরই ঘাটতি নেই। আমরা শুধু জড়িয়ে পড়েছি ভয়ের জালে।

ছিনতাইকারীর কবল থেকে কাউকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তোপের মুখে পড়ছি। হত্যার মতো ঘটনায় মামলা ও কারাবাসের শাস্তিও ভোগ করতে হচ্ছে। সঙ্গে আছে স্থানীয় রাজনীতির শোষণ।

অপরাধীকে মোকাবিলা করার প্রাণশক্তি আমাদের আছে। কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভয়ের সংস্কৃতিকে মোকাবিলা করার শক্তি সত্যি হারিয়ে ফেলেছি আমরা। তাই গণমানুষকে দায়ী না করে, আসুন যেমন করে যেখান থেকে পাল্টে গেলাম আমরা, সেখানে আবার ফিরে যাওয়া যায় কিনা। তাহলে অন্তত একজন বিশ্বজিৎ, রিফাতের পাশে দাঁড়ানো শুরু করতে পারব আমরা। সেই শুরুটাই দরকার। তারপর দেখবেন অপরাধীরা আবারো আঁধারে গা ঢাকা দেবে। দেবেই।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

আপনার মতামত লিখুন :