Barta24

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

রিফাত হত্যাকাণ্ড

“সমাজটা কোথায় যাচ্ছে?”

“সমাজটা কোথায় যাচ্ছে?”
ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪
ফরিদুল আলম


  • Font increase
  • Font Decrease

গত বুধবার (২৬ জুন) বরগুনা শহরে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয় রিফাত শরীফকে। পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। শত শত লোকের সামনে ঘটতে থাকা এই ঘটনা প্রতিরোধে একমাত্র রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি ছাড়া আর কেউ প্রতিবাদ করেনি। মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সবাই দাঁড়িয়ে দেখল, অথচ প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের চেষ্টা করা হলে এমন দুঃখজনক মৃত্যু এড়ানো যেত। মহামান্য হাইকোর্টকেও ঘটনার পরদিন স্বতঃপ্রণোদিত এক অভিব্যক্তিতে বলতে শোনা যায়, “সমাজটা কোথায় যাচ্ছে!”

অবশ্য জনৈক আইনজীবী খবরের কাগজের শিরোনামটি আদালতের নজরে এনে এই ঘটনায় ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেফতার না হওয়ার বিষয়টি জানালে আদালত তাৎক্ষণিক এক আদেশে দুপুর ২টার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার বিষয়ে এক প্রতিবেদন তলব করেন। প্রধানমন্ত্রীও যেকোনো মূল্যে অপরাধীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়টি বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে, এর থেকে আমরা এইটুকু আশাবাদ করতেই পারি যে আইনের ফাঁক দিয়ে আসামির বের হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে দুঃখজনক বিষয় এই যে দেশে প্রচলিত আইন থাকলেও নিরীহ মানুষকে আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।

বরগুনার ঘটনাটি চাঞ্চল্যকর, এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, তাই এই ঘটনা বিচারহীনতার সংস্কৃতির চক্রে ঘুরপাক খাবে না ঠিক, তবে সারাদেশে প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকা এ ধরনের অসংখ্য ঘটনার কটিইবা এমনভাবে উচ্চ আদালতের নজরে আসবে, আর উচ্চ আদালতই বা আর কত নিজেদের রুটিন দায়িত্বের বাইরে গিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদেশ দিতে থাকবেন?

এর আগে আমরা দেখেছি গ্রীনলাইন পরিবহনের বাসচাপায় রাসেল নামক এক ড্রাইভারের পা হারানোর ক্ষতিপূরণ নিয়ে উচ্চ আদালতের তৎপর ভূমিকার পরও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তকে ক্ষতিপূরণে গরিমসি করতে। কথিত রয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানটি দৈনিক এক কোটি টাকা আয় করে, অথচ উচ্চ আদালতকে তারা প্রতিনিয়ত ‘হাইকোর্ট’ দেখিয়ে বেড়াচ্ছে।

রিফাত শরীফের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের ঘুনে ধরা গোটা সমাজ ব্যবস্থার এক খণ্ডিত চিত্রকেই আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। সাম্প্রতিক সময়ে খবরের কাগজে এমনও শিরোনাম হতে দেখেছি রাজধানীর গেন্ডারিয়ার দুই বছর বয়সের শিশু আয়েশাকে ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তিনতলার জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হত্যা করতে, মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে নিজ শিক্ষকের যৌন লালসার শিকার হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে, ডেমরা এলাকার দোলা নামক শিশুকে হত্যা করতে। তারও আগে কারখানার মালিক কর্তৃক পায়ুপথ দিয়ে গ্যাস ঢুকিয়ে শিশু রাকিব এবং চুরির অপরাধে পিটিয়ে রাজনকে হত্যা করতে। আরও কত!

এভাবে ঘটতে থাকা একের পর এক ঘটনায় মানুষ হিসেবে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠত্ব পশুর কাছে সমর্পিত হচ্ছে। আমরা কেবল তাকিয়ে আছি, কিছুই দেখছি না। হয়ত তাকিয়ে থাকার নাম দেখা না। আর তাইতো ঘটনা প্রতিরোধের চেয়ে ভিডিও চিত্র ধারণ করে দুর্লভ এই ঘটনা ছড়িয়ে দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করি। এটাই বোধ হয় এখনকার সময়ের মূল্যবোধ। আসলে আমাদের মূল্যবোধ সময়ের সাথে সাথে আমাদের যে অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে, এ ধরনের সমাজ-ব্যবস্থায় যদি আমাদের টিকে থাকতে হয়, তবে আমি বলব- নিজেদের মানুষ হিসেবে দাবি না করাই যৌক্তিক।

আমরা কেবল বিচার না হওয়া কিংবা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই দায়ী করে যাচ্ছি। এভাবে এক একটি ঘটনা ঘটবে আর একের পর এক বিচার করে আমরা যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নিশ্চয়তা বিধান করি তাহলে কি আমরা এই দাবি করতে পারব যে, সমাজ অপরাধমুক্ত হবে? যদি এমনটাই ভাবি তবে এই ঘুনে ধরা সমাজের সাথে আমাদের চিন্তাধারাকে আমরা সমার্থক করে ফেলব। এর বিপরীতে আমাদের বিচারিহীনতার সংস্কৃতির বিলোপ ঘটিয়ে সমাজকেও যে মেরামতের চিন্তা করতে হবে। সমাজ যদি আমরা মেরামত করতে না পারি, তবে কেবল বিচারের মধ্য দিয়ে যদি একের পর এক শাস্তির কথা ভাবি তাহলে এই শাস্তি দেওয়ার মত সামাজিক মানুষও যে একদিন হেরিকেন জ্বালিয়ে খুঁজতে হবে।

অপরাধ এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, বিচারহীনতা এবং প্রযুক্তির প্রসারের ফলে একের পর এক বেড়ে চলছে এই অপরাধ প্রবণতা। এর মধ্যে সামাজিক অস্থিরতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই বোধোদয়টি অধিক মনযোগের দাবি রাখে। একটি সমাজে কী কারণে এবং কীভাবে এ ধরনের অস্থিরতা বাড়তে থাকে, এর থেকে কীভাবে আমাদের মূল্যবোধগুলো ক্ষয় হতে থাকে, এর কারণ এবং প্রতিকার বিধান করতে না পারলে কেবল নির্দিষ্ট অপরাধের শাস্তির প্রতি মনযোগ দিলে হবে না।

মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যেমন সমাধান নয়, তেমনি নির্দিষ্ট একটি ঘটনার বিচার এই ঘটনার পুনর্জন্ম রোধ করতে পারবে না। সর্বাগ্রে প্রয়োজন সামাজিক অস্থিরতাজনিত এসব ঘটনার স্বরূপ উদঘাটন করে যথাযথ মেরামত প্রক্রিয়া হাতে নেওয়া।

এখানে আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, সামাজিক এ সব অপরাধ প্রবণতার সাথে অসুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতারও ঘনিষ্ট একটি যোগসূত্র রয়েছে। এর আগে আমরা দেখেছি, কীভাবে দর্জ্জি শ্রমিক বিশ্বজিতকে প্রকাশ্যে দিবালোকে ছাত্র নামধারী ক্যাডাররা কুপিয়ে হত্যা করেছে।

সুতরাং একদিকে যেমন কেবল সরকারের বিষয় নয়, আবার সরকারসহ রাজনৈতিক সব দলকে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়ে সামাজিক সহিংসতা রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সেই সাথে আমাদের একথাও মনে রাখতে হবে যে, বিচ্ছিন্ন পারিবারিক সহিংসতাও সামাজিক এই সব অপরাধ প্রবণাতাগুলোতে বাড়তি রসদ জোগাচ্ছে।

সবশেষে, অনেকের কাছে অপ্রিয় হলেও একটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই, নিমতলী, চকবাজার আর বনানীর অগ্নিকাণ্ডে যে সাধারণ মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল অসহার মানবতার উদ্ধারে, রানা প্লাজা ধসে অজস্র তরুণ যেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে গিয়েছে মানুষের জীবন বাঁচাতে, যুদ্ধাপরাধের বিচারে আপামর মানুষ যখন ছুটে যায় শাহবাগের রাস্তায় – এই সব কিছুই মানুষ হিসেবে আমাদের বিশ্বের কাছে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করে। আবার এই আমরাই প্রকাশ্যে বিশ্বজিতকে কুপিয়ে হত্যা, বদরুলের চাপাতির আঘাতে খাদিজার আর্তচিৎকার আর স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে মারার প্রতিবাদ করতে ভয় পাই। বোধ করি, এ বিষয়টি আর পরিষ্কার করে বলার অবকাশ নেই।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

জিএম কাদের কি পারবেন?

জিএম কাদের কি পারবেন?
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান থেকে দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের। দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জিএম কাদেরের উপস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) এ ঘোষণা দেন। এখন অপেক্ষা, জাপা জিএম কাদেরের নেতৃত্বকে কতটা সহজভাবে মেনে নেয়, সেটি দেখার।

জিএম কাদের প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারলে সেটা তার নিজের ও দলের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে আসবে বলেই মনে হয়। তবে জিএম কাদের আপাতত সফল হোন বা না হোন, জাপার জন্য আগামী দিনের রাজনীতিতে একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বহাল থাকার লড়াইটা খুব সহজ হবে না। নিশ্চিতভাবেই দলের ভেতর ও বাইরে থেকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আসবেই। তবে, সামগ্রীকভাবে দেশের রাজনীতির চালচিত্র কেমন যাবে, তার ওপর এটি অনেকটাই নির্ভর করে।

জাপায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়েই দলের নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন দেখা গেছে। এমন টানাপোড়েন শুধু জাপায় নয়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেও ছিল, এখনও আছে। যেকোনো বড় দলেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ‘পন্থী’রা শক্তিশালী থাকে। শক্তিহীনরা হয় টিকে থাকার চেষ্টা করেন, ধৈর্য ধরেন, না হয় এক সময় ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে ঝড়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা আজ দলে নেই। অনেকে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ পারেননি। বের হয়ে নতুন দল বা জোটে যোগ দিয়েছেন। বিএনপিতেও এমন নজিরের অভাব নেই। বড় দলে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে দলের ঐক্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। এতে দল ও নেতা উভয়ই লাভবান হয়। তা না হলে দলতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ই, দলের নেতারাও একসময় হারিয়ে যান। ১/১১ এর বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিতে অনেকেই তথাকথিত সংস্কারপন্থী হয়েছেন। এতে না দলের, না নিজের লাভ হয়েছে। দুঃসময়ে লড়াইটা চালিয়ে যাওয়াই রাজনীতিকের আসল পরীক্ষা। সুসময়ে সবাই মিছিলের সামনেই থাকে।

স্বাধীনতার পরে দেশের বড় তিনটি দলের ভাঙা-গড়াই আমরা দেখেছি। এর মধ্যে বিএনপি, ও জাপার জন্মই স্বাধীনতার পরে। তবে স্বাধীনতার পরে দলের ভাঙা-গড়ার সবচেয়ে বড় নজির জাসদের। এক সময় দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটি শ্রেণী বিশেষ করে ছাত্র সমাজের একটি অংশের কাছে কয়েকটি শব্দ খুব পরিচিত ছিল-পুঁজিবাদ, বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, সর্বহারা, বিচ্যুতি, বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, হঠকারিতা, বস্তুবাদ, লুটেরা, দ্বন্দ্ব, ধনিক-শ্রেণি, কায়েমী-স্বার্থবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেতো কথাই নেই। মুখে মুখে এসব বুলি। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ শব্দগুলো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই দেশের মেধাবী ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বামপন্থী হয়ে যায়। এরা রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের ছাতার নীচে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে আবার মস্কো, পিকিং আরো নানা পন্থী ছিল। জাসদ শুরুর সে ইতিহাসও অর্ন্তদ্বন্দ্বেরই ইতিহাস, ছাত্রলীগের মধ্যে মেরুকরণের ইতিহাস। এরই মধ্যে নতুন আরেকটি শব্দ চালু হলো রাজনীতিতে। সেটি হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নেই ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ জাসদ গঠন করে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানা ঘটনার পরম্পরায় জাসদ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। এরপর জিয়া ও এরশাদ আমলে জাসদের ভাঙ্গনের খতিয়ান আরও দীর্ঘ। মেজর জলীল, কাজী আরেফ আহমদ, মনিরুল ইসলাম, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ইনু, রব হয়ে জাসদ এখন বর্তমান সুরতে বহাল আছে। বর্তমানে এক দল এক নেতার দল জাসদ। এর মাঝে আছে একাধিক পন্থী। দলের মাঝে ঐক্য ধরে রাখার জন্য জাসদ নেতারা কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু পারেননি। কারণ তারা নিজেরাই স্বার্থের দ্বন্দ্বে মরিয়া ছিলেন।

ছোট দলের জন্য দলের ঐক্য ধরে রাখা সব সময়ই কঠিন। সেটা জাসদ হোক বা জাপা। কারণ, রাজনীতিতে ঐক্যের মূল শক্তি ক্ষমতা অথবা আদর্শ। কিন্তু আমাদের এখানে আদর্শের ভীত বড় নড়বড়ে। আর নিজ শক্তিবলে এসব দলের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটও রচনা হয়নি। ফলে, দলের নেতারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য ক্ষমতায় দৌড়ে অধিকতর কাছাকাকাছি থাকা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য করেছেন। এখানেই ছোট দলের ভাঙনের মূল কারণ নিহিত। এছাড়া অপরের নেতৃত্ব মেনে না নেয়ার সহজাত প্রবণতা মানুষের থাকেই। সেই সাথে আরেকটি বিষয় হলো এসব দলের বড় নেতা ও পরবর্তী ধাপের নেতাদের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের মাঝে দৃশ্যমান তেমন বড় কোনো পার্থক্য নেই। ফলের ঐক্যের মূল ভিত্তি খুবই দূর্বল থাকে। রাজনৈতিক আদর্শ বাদ দিলেও, আওয়ামীর লীগের ঐক্যের ভিত্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার একথা অস্বীকার করা যাবে না। এখানে ঐক্যের একটি ‘পারিবারিক’ ভিত্তিও আছে।

জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের
জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের

 

বিএনপির ক্ষেত্রেও নেতাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি কখনো ক্ষমতায়া যাওয়ার আশা, সেই সাথে জিয়া পরিবার। এর বাইরে একটি রাজনৈতিক আদর্শতো কাজ করেই। এটি শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, নয় শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ভারতের কংগ্রেসের বর্তমান হাল হকিকত দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাহুল গান্ধী পদত্যাগ করেছেন দুই সপ্তাহ, কিন্তু দল এখনও নতুন নেতা নির্ধারণ করতে পারেনি। ব্যক্তি ও পারিবারিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে দলে পরবর্তী নেতৃত্বের পথ রচনা করার কাজটি এখনও শুরু হয়নি।

জাতীয় পার্টিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যারা বের হয়ে গেছেন তারা নিজেরাই নেতা হয়ে একনেতা নির্ভর দল গঠন করেছেন। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) (জেপি) ইত্যাদি নানা উপদলে ভাগ হয়েছে। আসলে এসব বিভক্তি ও ভাঙনের পেছনে কোনো আদর্শ কাজ করেনি। কাজ করেছে ক্ষমতা ও নগদ প্রাপ্তি।

গত এক দশকে জাপা বহুবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে জাপায় কোন্দল চরমে পৌঁছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে বিরাজ করে তীব্র ক্ষোভ ও দ্বন্দ্ব। একপক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছে আরেক পক্ষ চায়নি। এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডও হয়ে গেছে বহুবার। এর পেছনে শুধু দলের অর্ন্তকোন্দলই ছিল নাকি এর পেছনে আরও কারণ ছিল তা নিয়ে কথা হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের ভেতরের দ্বন্দ্ব বাইরে আসেনি, মানে দলে ভাঙন হয়নি।

তারপরও দলে আপাতত দুইটি গ্রুপ আছে। রওশন ও জিএম কাদেরপন্থী এ দু’টো গ্রুপ দলে বহুদিন ধরেই দৃশ্যমান। এনিয়ে এরশাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশনা ও আদেশ জারি করেছেন। পরে আবার সেই আদেশ প্রত্যাখ্যানও করেছেন, করতে বাধ্য হয়েছেন।

গত নির্বাচনের আগে থেকেই এরশাদ অসুস্থ। বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন। দলের ঐক্য বজায় রাখতে বা তার অবর্তমানে দল টিকিয়ে রাখতে কে হবেন জাপার পরবর্তী কর্ণধার, তা নিয়েও তার শঙ্কা ছিল। দলের একটি পক্ষ চেয়েছে রওশনকে সামনে নিয়ে আসতে, আরেক পক্ষ চেয়েছে জিএম কাদেরকে। এছাড়া আগে পরে অন্য পক্ষও সক্রিয় ছিল। তবে সর্বশেষ এই দুটি গ্রপই দৃশ্যমান ছিল। এরশাদ জানতেন হয়তো এ বিরোধ সহজে মিটবে না। তাই তিনি নিজের সম্পত্তি ওসিয়ত করে যাওয়ার পাশাপাশি দলের নেতৃত্বের বিষয়টিও ওসিয়তও করে গেছেন। এরশাদ জাপার গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে তার অবর্তমানে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদেশে থাকাকালে ছোট ভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

এর আগে তিনি কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেছেন আবার সে আদেশ বাতিলও করেছেন। গত ১৪ জুন তার মৃত্যুর পাঁচদিনের মাথায় তার সেই ওসিয়তই পুরণ হলো। কারণ এরশাদ আজ অবর্তমান। তার অবর্তমানে আপাতত জিএম কাদের বর্তমান। দেখা যাক, এই বর্তমানকে জিএম কাদের ভবিষ্যতের কাছে নিয়ে যেতে পারেন কি-না। এই দিনকে তিনি সেই দিনের কাছে তিনি নিয়ে যেতে পারেন কিনা এটাই তার জন্য বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তিনি পাস করলে ফেল করার হাত থেকে হয়তো বেঁচে যেতে পারে জাপা।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আরও পড়ুন: রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র