“সমাজটা কোথায় যাচ্ছে?”

ফরিদুল আলম
ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪

ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

গত বুধবার (২৬ জুন) বরগুনা শহরে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয় রিফাত শরীফকে। পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। শত শত লোকের সামনে ঘটতে থাকা এই ঘটনা প্রতিরোধে একমাত্র রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি ছাড়া আর কেউ প্রতিবাদ করেনি। মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সবাই দাঁড়িয়ে দেখল, অথচ প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের চেষ্টা করা হলে এমন দুঃখজনক মৃত্যু এড়ানো যেত। মহামান্য হাইকোর্টকেও ঘটনার পরদিন স্বতঃপ্রণোদিত এক অভিব্যক্তিতে বলতে শোনা যায়, “সমাজটা কোথায় যাচ্ছে!”

অবশ্য জনৈক আইনজীবী খবরের কাগজের শিরোনামটি আদালতের নজরে এনে এই ঘটনায় ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেফতার না হওয়ার বিষয়টি জানালে আদালত তাৎক্ষণিক এক আদেশে দুপুর ২টার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার বিষয়ে এক প্রতিবেদন তলব করেন। প্রধানমন্ত্রীও যেকোনো মূল্যে অপরাধীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়টি বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে, এর থেকে আমরা এইটুকু আশাবাদ করতেই পারি যে আইনের ফাঁক দিয়ে আসামির বের হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে দুঃখজনক বিষয় এই যে দেশে প্রচলিত আইন থাকলেও নিরীহ মানুষকে আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।

বরগুনার ঘটনাটি চাঞ্চল্যকর, এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, তাই এই ঘটনা বিচারহীনতার সংস্কৃতির চক্রে ঘুরপাক খাবে না ঠিক, তবে সারাদেশে প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকা এ ধরনের অসংখ্য ঘটনার কটিইবা এমনভাবে উচ্চ আদালতের নজরে আসবে, আর উচ্চ আদালতই বা আর কত নিজেদের রুটিন দায়িত্বের বাইরে গিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদেশ দিতে থাকবেন?

এর আগে আমরা দেখেছি গ্রীনলাইন পরিবহনের বাসচাপায় রাসেল নামক এক ড্রাইভারের পা হারানোর ক্ষতিপূরণ নিয়ে উচ্চ আদালতের তৎপর ভূমিকার পরও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তকে ক্ষতিপূরণে গরিমসি করতে। কথিত রয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানটি দৈনিক এক কোটি টাকা আয় করে, অথচ উচ্চ আদালতকে তারা প্রতিনিয়ত ‘হাইকোর্ট’ দেখিয়ে বেড়াচ্ছে।

রিফাত শরীফের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের ঘুনে ধরা গোটা সমাজ ব্যবস্থার এক খণ্ডিত চিত্রকেই আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। সাম্প্রতিক সময়ে খবরের কাগজে এমনও শিরোনাম হতে দেখেছি রাজধানীর গেন্ডারিয়ার দুই বছর বয়সের শিশু আয়েশাকে ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তিনতলার জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হত্যা করতে, মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে নিজ শিক্ষকের যৌন লালসার শিকার হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে, ডেমরা এলাকার দোলা নামক শিশুকে হত্যা করতে। তারও আগে কারখানার মালিক কর্তৃক পায়ুপথ দিয়ে গ্যাস ঢুকিয়ে শিশু রাকিব এবং চুরির অপরাধে পিটিয়ে রাজনকে হত্যা করতে। আরও কত!

এভাবে ঘটতে থাকা একের পর এক ঘটনায় মানুষ হিসেবে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠত্ব পশুর কাছে সমর্পিত হচ্ছে। আমরা কেবল তাকিয়ে আছি, কিছুই দেখছি না। হয়ত তাকিয়ে থাকার নাম দেখা না। আর তাইতো ঘটনা প্রতিরোধের চেয়ে ভিডিও চিত্র ধারণ করে দুর্লভ এই ঘটনা ছড়িয়ে দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করি। এটাই বোধ হয় এখনকার সময়ের মূল্যবোধ। আসলে আমাদের মূল্যবোধ সময়ের সাথে সাথে আমাদের যে অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে, এ ধরনের সমাজ-ব্যবস্থায় যদি আমাদের টিকে থাকতে হয়, তবে আমি বলব- নিজেদের মানুষ হিসেবে দাবি না করাই যৌক্তিক।

আমরা কেবল বিচার না হওয়া কিংবা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই দায়ী করে যাচ্ছি। এভাবে এক একটি ঘটনা ঘটবে আর একের পর এক বিচার করে আমরা যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নিশ্চয়তা বিধান করি তাহলে কি আমরা এই দাবি করতে পারব যে, সমাজ অপরাধমুক্ত হবে? যদি এমনটাই ভাবি তবে এই ঘুনে ধরা সমাজের সাথে আমাদের চিন্তাধারাকে আমরা সমার্থক করে ফেলব। এর বিপরীতে আমাদের বিচারিহীনতার সংস্কৃতির বিলোপ ঘটিয়ে সমাজকেও যে মেরামতের চিন্তা করতে হবে। সমাজ যদি আমরা মেরামত করতে না পারি, তবে কেবল বিচারের মধ্য দিয়ে যদি একের পর এক শাস্তির কথা ভাবি তাহলে এই শাস্তি দেওয়ার মত সামাজিক মানুষও যে একদিন হেরিকেন জ্বালিয়ে খুঁজতে হবে।

অপরাধ এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, বিচারহীনতা এবং প্রযুক্তির প্রসারের ফলে একের পর এক বেড়ে চলছে এই অপরাধ প্রবণতা। এর মধ্যে সামাজিক অস্থিরতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই বোধোদয়টি অধিক মনযোগের দাবি রাখে। একটি সমাজে কী কারণে এবং কীভাবে এ ধরনের অস্থিরতা বাড়তে থাকে, এর থেকে কীভাবে আমাদের মূল্যবোধগুলো ক্ষয় হতে থাকে, এর কারণ এবং প্রতিকার বিধান করতে না পারলে কেবল নির্দিষ্ট অপরাধের শাস্তির প্রতি মনযোগ দিলে হবে না।

মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যেমন সমাধান নয়, তেমনি নির্দিষ্ট একটি ঘটনার বিচার এই ঘটনার পুনর্জন্ম রোধ করতে পারবে না। সর্বাগ্রে প্রয়োজন সামাজিক অস্থিরতাজনিত এসব ঘটনার স্বরূপ উদঘাটন করে যথাযথ মেরামত প্রক্রিয়া হাতে নেওয়া।

এখানে আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, সামাজিক এ সব অপরাধ প্রবণতার সাথে অসুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতারও ঘনিষ্ট একটি যোগসূত্র রয়েছে। এর আগে আমরা দেখেছি, কীভাবে দর্জ্জি শ্রমিক বিশ্বজিতকে প্রকাশ্যে দিবালোকে ছাত্র নামধারী ক্যাডাররা কুপিয়ে হত্যা করেছে।

সুতরাং একদিকে যেমন কেবল সরকারের বিষয় নয়, আবার সরকারসহ রাজনৈতিক সব দলকে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়ে সামাজিক সহিংসতা রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সেই সাথে আমাদের একথাও মনে রাখতে হবে যে, বিচ্ছিন্ন পারিবারিক সহিংসতাও সামাজিক এই সব অপরাধ প্রবণাতাগুলোতে বাড়তি রসদ জোগাচ্ছে।

সবশেষে, অনেকের কাছে অপ্রিয় হলেও একটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই, নিমতলী, চকবাজার আর বনানীর অগ্নিকাণ্ডে যে সাধারণ মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল অসহার মানবতার উদ্ধারে, রানা প্লাজা ধসে অজস্র তরুণ যেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে গিয়েছে মানুষের জীবন বাঁচাতে, যুদ্ধাপরাধের বিচারে আপামর মানুষ যখন ছুটে যায় শাহবাগের রাস্তায় – এই সব কিছুই মানুষ হিসেবে আমাদের বিশ্বের কাছে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করে। আবার এই আমরাই প্রকাশ্যে বিশ্বজিতকে কুপিয়ে হত্যা, বদরুলের চাপাতির আঘাতে খাদিজার আর্তচিৎকার আর স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে মারার প্রতিবাদ করতে ভয় পাই। বোধ করি, এ বিষয়টি আর পরিষ্কার করে বলার অবকাশ নেই।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :