Barta24

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

ভিডিও না থাকলে প্রতিবাদ হবে না!

ভিডিও না থাকলে প্রতিবাদ হবে না!
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তা২৪
প্রভাষ আমিন


  • Font increase
  • Font Decrease

এসএসসি পাশের সালের হিসাব করলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম আমার সমবয়সী। তিনি রাজশাহী থেকে ঢাকা এসেছেন, একই সময়ে আমি এসেছিলাম কুমিল্লা থেকে। শুরুর দিনগুলোতে ঢাকায় তার জীবন সংগ্রামের সাথে মিলে যায় আমারটাও। তার ফেসবুকে পড়ে চমকে উঠেছিলাম, একই গল্প। শাহরিয়ার আলম পরে রাজনীতি করেছেন, ব্যবসা করেছেন। তিনি জনপ্রতিনিধি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন; কিন্তু অন্য অনেকের মত জনবিচ্ছিন্ন হননি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাকে নানা দেশে যেতে হয়। কিন্তু তার যোগাযোগ এখনও মাটির সাথে, শেকড়ের সাথে। মানুষের আবেগটা ধরতে পারেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় এই প্রতিমন্ত্রী ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে অনেক ব্যবস্থা নেন। সমবয়সী বলেই কি-না জানি না, তার অনেক ভাবনার সাথে আমার মিলে যায়। যেমন বরগুনায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে এক তরুণকে হত্যার প্রতিবাদ করে তিনি বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) যে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, তাতে হত্যার বিচার চাওয়ার পাশাপাশি তুলে ধরেছেন একটি প্রশ্নও। তার স্ট্যাটাসটি উদ্ধৃত করি, 'বরগুনার হত্যার গ্রেফতার এবং বিচার হবে, হতেই হবে।’

ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে বলে সবাই এটা নিয়ে কথা বলছেন। অবশ্যই ভালো। কিন্তু অন্য সবকিছু বাদ দিলাম। গতকাল মোটামুটি একই সময়ে রাজশাহীর তানোরে বাজারে আম বিক্রি করতে গিয়ে একইভাবে নিহত হয়েছে আর একজন তরুণ, প্রকাশ্যেই দিবালোকেই হত্যা করেছে পাশের আর এক দোকানদারের ছেলে। নিহতের একটা রাজনৈতিক পরিচয়ও আছে, সে সেখানকার একটি ওয়ার্ডের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। না কোনো টেন্ডার নিয়ে বা বান্ধবী নিয়ে ফ্যাসাদ নয়। সংসার চালাতে নিজেই বাগানের আম বিক্রি করতে গিয়েছিল সেই হতভাগা তরুণ।

সব মৃত্যুই আমাকে নাড়া দেয়। তরুণ-তরুণীর মৃত্যু একটু বেশি নাড়া দেয়। শিশুর মৃত্যু আরও বেশি নাড়া দেয়।

আমরা বরগুনার মত সবগুলোর ভিডিও দেখতে পাই না। গতকাল হয়তো এই দুইয়ের বাইরেও মানুষ খুন হয়েছে বা অপমৃত্যু হয়েছে। আমরা সবগুলোর খোঁজ রাখি না। তবে সচেতনতা সামাজিক সমস্যাগুলোকে কমিয়ে আনবে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যারা দেখছিলেন তারা মনে হয় না সাধারণ পথচারী বা ছাত্র। অবশ্যই তাদেরকেও আইনের আওতায় আনতে হবে।

আমরা নিশ্চিত করবো প্রথমে গ্রেফতার তারপর ন্যায় বিচার। এব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।'

এই পয়েন্টটি আমাকে অনেকদিন ধরে ভাবাচ্ছে। প্রতিবাদ করতে হলে বা বিচার চাইতে হলে আমাদের প্রমাণ লাগে, ভিডিও হলে সবচেয়ে ভালো, নিদেনপক্ষে অডিও হলেও চলে।

বিএনপি আমলে অপারেশন ক্লিনহার্টের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যাত্রা শুরু। আর র‍্যাব প্রতিষ্ঠার পর শুরু হয় ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত্যা। বিএনপির অনেক উদ্যোগ আওয়ামী লীগ বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু ক্রসফায়ারটা চালু রেখেছে। বিএনপি, তত্ত্বাববধায়ক, আওয়ামী লীগ মিলে ক্রসফায়ারের নামে কতো মানুষকে হত্যা করেছে তার ইয়ত্তা নেই। আমি বরাবরই ক্রসফায়ারের বিপক্ষে। আমি মনে করি, ক্রসফায়ার মানে ঠাণ্ডা মাথার খুন। কিন্তু সাধারণভাবে ক্রসফায়ার বেশ জনপ্রিয়, নিজের ঘাড়ে না আসা পর্যন্ত সবাই ক্রসফায়ারের পক্ষে। কিন্তু গত বছর টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হকের ক্রসফায়ারের পর একটি টেলিফোন কথোপকথন ফাঁস হয়। একরামুলের মেয়ে তার বাবাকে বলছে, 'আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে।' আমাদের সবার হৃদয় ছুয়ে গেল। আমি যতবার এটা ভাবি, আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। কিন্তু একবার ভাবুন তো, একরামের যেমন পরিবার আছে, ক্রসফায়ারের নিহত অন্য সবারও কিন্তু আছে। আসলে ওইটুকু অডিও না থাকলে আমাদের হৃদয় তা স্পর্শ করতো না। এটা অবশ্য স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি।

ডিআইজি মিজান দুদকের পরিচালককে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন, টেলিসংলাপ ফাঁস না হলে এটা কেউ বিশ্বাস করতো না। তারাও অস্বীকার করে পার পেয়ে যেতেন। এখন দু’জনই সাময়িক বরখাস্ত।

আমি খালি ভাবি যদি সবার হাতে ক্যামেরা না থাকতো, যদি ফেসবুক না থাকতো তাহলে আমাদের প্রতিবাদের কী হতো, বিচারের কী হতো। ভিডিও থাকা না থাকার সাথে অপরাধের বিশাল পার্থক্য। ফেসবুক যুগের আগের কথা ভাবুন। চোর সন্দেহে একটি শিশু বা তরুণকে পিটিয়ে মারার খবর আগে হলে ভেতরের পাতায় সিঙ্গেল কলাম ছাপা হতো। কিন্তু ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় সিলেটের রাজনের খুনিরা দ্রুত ধরা পড়ে। মূল আসামিকে সৌদি আরব থেকে ধরে আনা হয়। ভিডিও না থাকলে বা ফেসবুক না থাকলে রাজন হত্যার বিচারই হতো না হয়তো।

ফেসবুকপূর্ব যুগে চোর সন্দেহে পিটিয়ে মারার খবর হয়তো ভেতরের পাতায় ছাপা হতো। কিন্তু 'বখাটের কোপে কলেজছাত্রী আহত', এই নিউজের কী ট্রিটমেন্ট হতো? আমার মনে হয়, বেশিরভাগ পত্রিকা ছাপতোই না। আহত আবার কোনো নিউজ হলো নাকি। কিন্তু সিলেটে ছাত্রলীগ নেতা বদরুলের এলোপাতাড়ি কোপে আহত খাদিজা দিনের পর দিন পত্রিকার প্রথম পাতাজুড়ে ছিলেন। ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা হয়েছে। 'ছাত্রলীগ নেতার এলোপাতাড়ি কোপে কলেজছাত্রী আহত' এই নিউজের কোনো আবেদন নেই আমাদের কাছে। কিন্তু সাথে যদি ভিডিও থাকে, শিরোনাম যদি হয় 'এ কী করলেন ছাত্রলীগ নেতা (ভিডিওসহ)' তাহলে তা মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যাবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন গণমাধ্যমকে ডিকটেট করে। ফেসবুকে জনমত গড়ে ওঠে, ভিডিও ভাইরাল হয়; তারপর গণমাধ্যম তার পিছু ধাওয়া করে। আমার কাছে অবশ্য বিষয়টা খারাপ লাগে না। প্রতিবাদহীনতার এই সময়ে তবুওতো ফেসবুকে ভার্চুয়াল প্রতিবাদ হয়।

ফেসবুকই এখন বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল। তবে সব ঘটনা ফেসবুকের নজর পায় না। সব ঘটনায় ভিডিও বা অডিও থাকে না। অবস্থা এমন, বিচার পেতে হলে সারাদেশে সিসিটিভি লাগিয়ে রাখতে হবে, যাতে সব ঘটনার ভিডিও পাওয়া যায়।

আমরা বরগুনা রিফাত হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করার সাহস না পায়। পাশপাশি যেন একইদিনে তানোরে নিহত আম ব্যবসায়ী তরুণ হত্যারও বিচার হয়।

বাংলাদেশে যেন আইনের শাসন থাকে, সবাই যেন আইনের সুরক্ষা পায়। আমরা সাধারণ মানুষ, অডিও-ভিডিও ছাড়া আমরা বিশ্বাস করি না, প্রতিবাদ করি না। কিন্তু পুলিশ বা আদালত তো ভিডিও দেখে না, শোনে না; তারা সবার জন্য সমান। আইন সবার জন্য সমান হোক। আইনের শাসনে সবাই নিশ্চিন্তে থাকুক।

তবে পাশাপাশি সিটিজেন জার্নালিজমটাও চলুক। সবাই যেন ভয়ে থাকে। কোথায় কে, কী ভিডিও করে ছড়িয়ে দেয়। আরেকটা কথা। শেষ কথা, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, আমরা যেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করি। শুধু ভিডিও করা নয়, সবাই মিলে যেন অপরাধী নিবৃত্ত করার চেষ্টা করি।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

আপনার মতামত লিখুন :

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

জিএম কাদের কি পারবেন?

জিএম কাদের কি পারবেন?
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান থেকে দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের। দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জিএম কাদেরের উপস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) এ ঘোষণা দেন। এখন অপেক্ষা, জাপা জিএম কাদেরের নেতৃত্বকে কতটা সহজভাবে মেনে নেয়, সেটি দেখার।

জিএম কাদের প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারলে সেটা তার নিজের ও দলের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে আসবে বলেই মনে হয়। তবে জিএম কাদের আপাতত সফল হোন বা না হোন, জাপার জন্য আগামী দিনের রাজনীতিতে একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বহাল থাকার লড়াইটা খুব সহজ হবে না। নিশ্চিতভাবেই দলের ভেতর ও বাইরে থেকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আসবেই। তবে, সামগ্রীকভাবে দেশের রাজনীতির চালচিত্র কেমন যাবে, তার ওপর এটি অনেকটাই নির্ভর করে।

জাপায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়েই দলের নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন দেখা গেছে। এমন টানাপোড়েন শুধু জাপায় নয়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেও ছিল, এখনও আছে। যেকোনো বড় দলেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ‘পন্থী’রা শক্তিশালী থাকে। শক্তিহীনরা হয় টিকে থাকার চেষ্টা করেন, ধৈর্য ধরেন, না হয় এক সময় ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে ঝড়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা আজ দলে নেই। অনেকে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ পারেননি। বের হয়ে নতুন দল বা জোটে যোগ দিয়েছেন। বিএনপিতেও এমন নজিরের অভাব নেই। বড় দলে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে দলের ঐক্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। এতে দল ও নেতা উভয়ই লাভবান হয়। তা না হলে দলতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ই, দলের নেতারাও একসময় হারিয়ে যান। ১/১১ এর বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিতে অনেকেই তথাকথিত সংস্কারপন্থী হয়েছেন। এতে না দলের, না নিজের লাভ হয়েছে। দুঃসময়ে লড়াইটা চালিয়ে যাওয়াই রাজনীতিকের আসল পরীক্ষা। সুসময়ে সবাই মিছিলের সামনেই থাকে।

স্বাধীনতার পরে দেশের বড় তিনটি দলের ভাঙা-গড়াই আমরা দেখেছি। এর মধ্যে বিএনপি, ও জাপার জন্মই স্বাধীনতার পরে। তবে স্বাধীনতার পরে দলের ভাঙা-গড়ার সবচেয়ে বড় নজির জাসদের। এক সময় দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটি শ্রেণী বিশেষ করে ছাত্র সমাজের একটি অংশের কাছে কয়েকটি শব্দ খুব পরিচিত ছিল-পুঁজিবাদ, বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, সর্বহারা, বিচ্যুতি, বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, হঠকারিতা, বস্তুবাদ, লুটেরা, দ্বন্দ্ব, ধনিক-শ্রেণি, কায়েমী-স্বার্থবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেতো কথাই নেই। মুখে মুখে এসব বুলি। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ শব্দগুলো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই দেশের মেধাবী ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বামপন্থী হয়ে যায়। এরা রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের ছাতার নীচে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে আবার মস্কো, পিকিং আরো নানা পন্থী ছিল। জাসদ শুরুর সে ইতিহাসও অর্ন্তদ্বন্দ্বেরই ইতিহাস, ছাত্রলীগের মধ্যে মেরুকরণের ইতিহাস। এরই মধ্যে নতুন আরেকটি শব্দ চালু হলো রাজনীতিতে। সেটি হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নেই ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ জাসদ গঠন করে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানা ঘটনার পরম্পরায় জাসদ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। এরপর জিয়া ও এরশাদ আমলে জাসদের ভাঙ্গনের খতিয়ান আরও দীর্ঘ। মেজর জলীল, কাজী আরেফ আহমদ, মনিরুল ইসলাম, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ইনু, রব হয়ে জাসদ এখন বর্তমান সুরতে বহাল আছে। বর্তমানে এক দল এক নেতার দল জাসদ। এর মাঝে আছে একাধিক পন্থী। দলের মাঝে ঐক্য ধরে রাখার জন্য জাসদ নেতারা কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু পারেননি। কারণ তারা নিজেরাই স্বার্থের দ্বন্দ্বে মরিয়া ছিলেন।

ছোট দলের জন্য দলের ঐক্য ধরে রাখা সব সময়ই কঠিন। সেটা জাসদ হোক বা জাপা। কারণ, রাজনীতিতে ঐক্যের মূল শক্তি ক্ষমতা অথবা আদর্শ। কিন্তু আমাদের এখানে আদর্শের ভীত বড় নড়বড়ে। আর নিজ শক্তিবলে এসব দলের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটও রচনা হয়নি। ফলে, দলের নেতারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য ক্ষমতায় দৌড়ে অধিকতর কাছাকাকাছি থাকা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য করেছেন। এখানেই ছোট দলের ভাঙনের মূল কারণ নিহিত। এছাড়া অপরের নেতৃত্ব মেনে না নেয়ার সহজাত প্রবণতা মানুষের থাকেই। সেই সাথে আরেকটি বিষয় হলো এসব দলের বড় নেতা ও পরবর্তী ধাপের নেতাদের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের মাঝে দৃশ্যমান তেমন বড় কোনো পার্থক্য নেই। ফলের ঐক্যের মূল ভিত্তি খুবই দূর্বল থাকে। রাজনৈতিক আদর্শ বাদ দিলেও, আওয়ামীর লীগের ঐক্যের ভিত্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার একথা অস্বীকার করা যাবে না। এখানে ঐক্যের একটি ‘পারিবারিক’ ভিত্তিও আছে।

জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের
জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের

 

বিএনপির ক্ষেত্রেও নেতাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি কখনো ক্ষমতায়া যাওয়ার আশা, সেই সাথে জিয়া পরিবার। এর বাইরে একটি রাজনৈতিক আদর্শতো কাজ করেই। এটি শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, নয় শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ভারতের কংগ্রেসের বর্তমান হাল হকিকত দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাহুল গান্ধী পদত্যাগ করেছেন দুই সপ্তাহ, কিন্তু দল এখনও নতুন নেতা নির্ধারণ করতে পারেনি। ব্যক্তি ও পারিবারিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে দলে পরবর্তী নেতৃত্বের পথ রচনা করার কাজটি এখনও শুরু হয়নি।

জাতীয় পার্টিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যারা বের হয়ে গেছেন তারা নিজেরাই নেতা হয়ে একনেতা নির্ভর দল গঠন করেছেন। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) (জেপি) ইত্যাদি নানা উপদলে ভাগ হয়েছে। আসলে এসব বিভক্তি ও ভাঙনের পেছনে কোনো আদর্শ কাজ করেনি। কাজ করেছে ক্ষমতা ও নগদ প্রাপ্তি।

গত এক দশকে জাপা বহুবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে জাপায় কোন্দল চরমে পৌঁছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে বিরাজ করে তীব্র ক্ষোভ ও দ্বন্দ্ব। একপক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছে আরেক পক্ষ চায়নি। এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডও হয়ে গেছে বহুবার। এর পেছনে শুধু দলের অর্ন্তকোন্দলই ছিল নাকি এর পেছনে আরও কারণ ছিল তা নিয়ে কথা হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের ভেতরের দ্বন্দ্ব বাইরে আসেনি, মানে দলে ভাঙন হয়নি।

তারপরও দলে আপাতত দুইটি গ্রুপ আছে। রওশন ও জিএম কাদেরপন্থী এ দু’টো গ্রুপ দলে বহুদিন ধরেই দৃশ্যমান। এনিয়ে এরশাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশনা ও আদেশ জারি করেছেন। পরে আবার সেই আদেশ প্রত্যাখ্যানও করেছেন, করতে বাধ্য হয়েছেন।

গত নির্বাচনের আগে থেকেই এরশাদ অসুস্থ। বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন। দলের ঐক্য বজায় রাখতে বা তার অবর্তমানে দল টিকিয়ে রাখতে কে হবেন জাপার পরবর্তী কর্ণধার, তা নিয়েও তার শঙ্কা ছিল। দলের একটি পক্ষ চেয়েছে রওশনকে সামনে নিয়ে আসতে, আরেক পক্ষ চেয়েছে জিএম কাদেরকে। এছাড়া আগে পরে অন্য পক্ষও সক্রিয় ছিল। তবে সর্বশেষ এই দুটি গ্রপই দৃশ্যমান ছিল। এরশাদ জানতেন হয়তো এ বিরোধ সহজে মিটবে না। তাই তিনি নিজের সম্পত্তি ওসিয়ত করে যাওয়ার পাশাপাশি দলের নেতৃত্বের বিষয়টিও ওসিয়তও করে গেছেন। এরশাদ জাপার গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে তার অবর্তমানে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদেশে থাকাকালে ছোট ভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

এর আগে তিনি কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেছেন আবার সে আদেশ বাতিলও করেছেন। গত ১৪ জুন তার মৃত্যুর পাঁচদিনের মাথায় তার সেই ওসিয়তই পুরণ হলো। কারণ এরশাদ আজ অবর্তমান। তার অবর্তমানে আপাতত জিএম কাদের বর্তমান। দেখা যাক, এই বর্তমানকে জিএম কাদের ভবিষ্যতের কাছে নিয়ে যেতে পারেন কি-না। এই দিনকে তিনি সেই দিনের কাছে তিনি নিয়ে যেতে পারেন কিনা এটাই তার জন্য বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তিনি পাস করলে ফেল করার হাত থেকে হয়তো বেঁচে যেতে পারে জাপা।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আরও পড়ুন: রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র