Barta24

সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে তামাকের বিজ্ঞাপন বন্ধ করা জরুরি

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে তামাকের বিজ্ঞাপন বন্ধ করা জরুরি
ছবি: বার্তা২৪.কম
এস এম নাজের হোসাইন


  • Font increase
  • Font Decrease

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) এর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী তামাকের বিজ্ঞাপন, প্রচারণা ও প্রদর্শন এবং পৃষ্ঠপোষকতা নিষিদ্ধ হলেও তামাক কোম্পানিগুলি এই আইনকে তোয়াক্কা না করে নানা উপায়ে বিজ্ঞাপন, প্রচারণা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে যাচ্ছে।

আইনে বলা হয়েছে, প্রিন্ট বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায়, বাংলাদেশে প্রকাশিত কোন বই, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, পোস্টার, ছাপানো কাগজ, বিলবোর্ড বা সাইনবোর্ডে বা অন্য কোনভাবে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করা যবে না। তামাকজাত দ্রব্য ক্রয়ে প্রলুব্ধ করার জন্য এর কোন নমুনা, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে, জনসাধারণকে প্রদান বা প্রদানের প্রস্তাব করা যাবে না। তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার বা এর ব্যবহার উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোন দান, পুরষ্কার, বৃত্তি প্রদান বা কোন অনুষ্ঠানের ব্যয়ভার বহন করা যাবে না। কোন প্রেক্ষাগৃহে, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় বা ওয়েব পেজে তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য সম্পর্কিত কোন বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না।

বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত বা লভ্য ও প্রচারিত, বিদেশে প্রস্তুতকৃত কোন সিনেমা, নাটক বা প্রমান্যচিত্রে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট, মঞ্চ অনুষ্ঠান বা অন্য কোন গণমাধ্যমে প্রচার, প্রদর্শন বা বর্ণনা করা যাবে না। তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়স্থলে যে কোন উপায়ে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না। কোন ব্যক্তি সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করলে বা উক্ত কর্মকাণ্ড বাবদ ব্যয়িত অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো তামাক বা তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, সাইন, ট্রেডমার্ক, প্রতীক ব্যবহার করা যাবে না।

কিন্তু এই আইনের বিধানগুলি লঙ্ঘন করে সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাপান ভ্রমণ ইতিহাস নিয়ে তারকা শিল্পী তাহসান খানের একটি অনুষ্ঠান দেশের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে। সাধারণ চোখে দেখলে ভালো লাগার মতো অনুষ্ঠান বটে। কিন্তু অভিযোগ আছে এর পিছনে রয়েছে জাপান টোব্যাকোর বিজ্ঞাপন। এটা গুরুতর এবং ন্যক্কারজনক ব্যাপার। শেষপর্যন্ত তামাকজাত কোম্পানিগুলো বাঙালির আবেগ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ব্যবহার করছে তামাকের প্রমোশনাল বিজ্ঞাপনে। অভিযোগ হচ্ছে প্রমোশনাল বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়েছে জাপান টোব্যাকোর (জেটিআই) ব্রান্ড কালার এবং স্লোগান জাপানিজ কোয়ালিটি। জাপান টোব্যাকো তাদের ব্রান্ড প্রমোশনের ক্ষেত্রে একই কালার এবং স্লোগান ব্যবহার করে থাকে। এই অভিযোগ একেবারে ফেলনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, বরং অভিযোগটি খতিয়ে দেখলে এর সত্যতা পাওয়া যায়।

কোনো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এমন প্রচারণা নজিরবিহীন এবং আইনের প্রতি সরাসরি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের সামিল। আর লজ্জাজনক বিষয় তামাক কোম্পানিগুলো নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে রবীন্দ্রনাথকেও ব্যবহার করতে দ্বিধা করছে না।

ভারতের আরেকটি ঘটনা সম্প্রতি আলোড়ন তুলেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বলিউড অভিনেতা অজয় দেবগনের প্রতি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন রাজস্থানের ক্যান্সার আক্রান্ত ৪০ বছর বয়সী নানাক্রম। একসময়ে অজয় দেবগনের ভক্ত নানাক্রম অজয়ের তামাক বিজ্ঞাপনে অনুপ্রাণিত হয়ে তামাক গ্রহণ শুরু করে। কিন্তু ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর ভুল ভাঙে তার। অবশ্য ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। নানাক্রমের প্রশ্ন অজয়ের কাছে—আপনি নিজে দৈনিক কতটুকু তামাক খান? তার অনুরোধ ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বার্থে, জনস্বার্থে ও সমাজের স্বার্থে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন যেন আর না করেন। সচেতনতা বাড়াতে শহরের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুস্তিকা বিলি করে বেড়াচ্ছেন তিনি।

উপরের দুটো ঘটনার মধ্যে একটা মিল আছে, দুটো ঘটনায় দুজন তারকা শিল্পীর প্রতি অভিযোগ তামাকের বিজ্ঞাপন করার৷ তারকা শিল্পীদের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করে। একজন তারকার দায়িত্বজ্ঞান প্রখর হওয়া উচিত, কারণ তাদের আচরণ সর্বসাধারণের জীবনে প্রভাব রাখে। এখানে একটা শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে, বাংলাদেশের তারকা শিল্পীরা চাইলে নানাক্রম থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। নয়তো কোন একদিন এমন অভিযোগের আঙুল তাদের দিকেও উঠবে।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে এবং এর বিজ্ঞাপন বন্ধে আইন থাকা সত্ত্বেও কেন এর লাগাম টানা যাচ্ছে না? কীভাবে তারা এখনো বহালতবিয়তে নিজেদের ব্যবসা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করছেন। তবে কি বলা যায় তাদের হাত আইনের হাতের চেয়েও শক্তিশালী?

আইন থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র প্রয়োগের অভাবের সুযোগ নিচ্ছে তামাকজাত কোম্পানিগুলো। প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্থানেই তামাক পণ্যের বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে গ্রাহকদের তামাকপণ্য সেবনে আকৃষ্ট করতে ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো কোম্পানি, জাপান টোবাকো (পূবের্র ঢাকা টোবাকো কোম্পানি) এবং আবুল খায়ের টোবাকো কোম্পানি কতৃর্ক বিজ্ঞাপন সংবলিত শোকেস, ফেস্টুন, চায়ের কাপ, ছাতা ইত্যাদি দেয়া হয়েছে। এছাড়া টিভি, ফ্রিজ, ডিনার সেট, বালতি, মগ ইত্যাদি পুরস্কার ঘোষণা করে গত অক্টোবর থেকে প্রচারণা চালাচ্ছে আবুল খায়ের টোবাকো কোম্পানি।

অথচ আইনে স্পষ্ট বলা আছে, স্বল্পমূল্যে, জনসাধারণকে দেয়া বা এর প্রস্তাব করা, তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার বা তা ব্যবহার, উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কোনো পুরস্কার, বৃত্তি প্রদান বা কোনো অনুষ্ঠানের ব্যয়ভার বহন করা আইন বহির্ভূত এবং দণ্ডনীয়।

অভিযোগ আছে তামাক কোম্পানিগুলো তাদের প্রচারণার জন্য বেছে নিচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চল। নগরে কিছু ক্ষেত্রে রয়েসয়ে বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা চালালেও গ্রাম, পাহাড়ে অনেকটা প্রকাশ্যেই সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে তাদের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তামাকে উৎসাহ নয়, অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে সহজ সরল এসব মানুষকে তামাক চাষেও উদ্বুদ্ধ করছে কোম্পানিগুলো।

অন্যদিকে ঘানা, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, ইরিত্রিয়া এবং পানামা পৃথিবীতে তামাকসেবনের পরিমাণের দিকে থেকে সর্বনিম্ন। বিশ্বজুড়ে গড়ে ২২ শতাংশ মানুষ ধূমপান করলেও আফ্রিকায় প্রায় ১৪ শতাংশ মানুষ ধূমপান করে। এসব দেশের দিকে তাকালে দেখা যায় তামাকের বিজ্ঞাপন প্রচারে এসব দেশের কঠোর অবস্থান। সাথে সাথে তামাক গ্রহণকে একটি নেতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় এখানে। এসব দেশে তুলনায় বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ধূমপান করা ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি।

বর্তমানে সারা বিশ্বে ১৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ১১০ কোটি ধূমপান করছে। এ ধূমপায়ীদের প্রায় ৮০ শতাংশ হলো নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪ কোটি ১৩ লাখ (৪৩.৩%) তামাক সেবন করে। পুরুষদের মধ্যে তামাক সেবনের হার ৫৮% এবং নারীদের মধ্যে ২৮.৭%। এই হার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আগামী ২৫ বছরে তামাকিজনিত কারণে বিশ্বে ২৫ কোটি শিশু-কিশোরের মৃত্যু হবে। বর্তমানে সারা বিশ্বে ১৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ১১০ কোটি ধূমপান করছে। এসব ভয়ংকর তথ্য উঠে এসেছে গ্লোবাল টোব্যাকো সার্ভে রিপোর্টে। আরো হতাশ হওয়ার মতো তথ্য হলো, ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন (আইএইচএমই) ২০১৩ গবেষণা অনুসারে তামাক ব্যবহারজনিত রোগে দেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লক্ষ ৬১ হাজার মানুষ অকালমৃত্যু বরণ করে। তামাকখাত থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পায় তামাক ব্যবহারের কারণে অসুস্থ রোগীর চিকিৎসায় সরকারকে স্বাস্থ্যখাতে তার দ্বিগুণ ব্যয় করতে হয়। আইন থাকলেও প্রয়োগের অভাব, কিংবা যৎসামান্য প্রয়োগ হলেও তা এতটাই সামান্য যে এতে রাঘববোয়াল কোম্পানি গুলোর কিছুই যায় আসে না। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে কোন প্রকার জবাবদিহির মধ্যে যেতে হচ্ছে না। বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো যেভাবে অভিনব কৌশলী ভূমিকা গ্রহণ করছে, সুদুরপ্রসারি চিন্তাভাবনা করছে সে অনুসারে আইনের প্রয়োগ কোন অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারছে না।

শক্তিশালী আইন থাকার পরও মূলত বাস্তবায়নের অভাব এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের কারণে তামাক পণ্যের প্রচার প্রচারণা বেড়েই চলেছে। তামাকের বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণ বন্ধ করা গেলে তামাক সেবনের পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এক্ষেত্রে নিমোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ এর বিজ্ঞাপন প্রচারণা অথবা পৃষ্ঠপোষকতা সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করতে হবে। বিক্রয় কেন্দ্রে তামাক পণ্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করতে হবে এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক পণ্যের বিজ্ঞাপন, প্রচারণা ও পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধে শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃষ্ঠপোষকতা নিষিদ্ধ করা হলেও তামাক কোম্পানিগেুলোকে সিএসআর কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ফলে তামাক কোম্পানিগুলো আইনের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাই অবশ্যই তামাক কোম্পানির সকল সিএসআর কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। এছাড়া তামাক পণ্য বিক্রেতার জন্য আইন প্রতিপালনের শর্তসহ লাইন্সেস প্রথা প্রচলন করতে হবে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বৃদ্ধি করা।আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর, গণমাধ্যম, ভোক্তা অধিকার সংগঠন, নাগরিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তামাক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। না হয়, বিষাক্ত এই মরণ থাবায় ধুকে ধুকে মরবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

এস এম নাজের হোসাইন: ভাইস প্রেসিডেন্ট, কেন্দ্রিয় কার্যকরী পর্ষদ, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

আপনার মতামত লিখুন :

কেন এই ছন্দপতন

কেন এই ছন্দপতন
তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সমাজ স্বাভাবিক জায়গায় নেই। অস্বাভাবিক আচরণ করছে। এই আচরণ নতুন নয়। তবে এবার অস্বাভাবিকতার চূড়ান্ত মাত্রায় বুঝি পৌঁছে গেল। সমাজ যাদের নিয়ে তৈরি, সেই মানুষেরা এখন তার গুণশূন্য। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এখন আর মানবিক উপকরণ চোখে পড়ছে না। মানুষ এমন আচরণ করছে, যা পশুর মধ্যেও অনুপস্থিত। তাহলে মানুষ এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?

আপনি বাড়ি থেকে বের হলেন। পথের কোথাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে দিয়ে চলাচল করা কারো দিকে তাকাচ্ছেন। এমনিতেই তাকাচ্ছেন। কোনো শিশুকে দেখে তাকাতে পারেন। আপনার এই তাকানো দেখে এক দল হত্যাকারী আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। যারা ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাদের অনেকেই হয়তো এতোক্ষণ আপনার আশপাশেই ছিল। একজন বা দুইজন আপনার ওপর ঝাঁপ দিল তো ব্যস অন্য পথচারীদের একটি অংশ আপনাকে না বাঁচিয়ে ‘গণ’তে যোগ দিল। আপনি হয়ে গেলেন ছেলেধরা। কিংবা কোনো মেয়েকে উত্ত্যক্তকারী। আপনাকে কেউ বাঁচাতে আসবে না। দূরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে থাকবে।

পথের কথা বাদ দিন। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের ঘর থেকে একজন মাকে নামিয়ে এনে হত্যা করে ফেলল। প্রতিবন্ধী একজনকেও মেরে ফেলা হলো ছেলেধরা সন্দেহে। সেই হত্যাকাণ্ড সমাজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে উপভোগ করল। ঢাকাই চলচ্চিত্রের মন্দা বাজারে এই দৃশ্য বেশ উপভোগ্য এখন সমাজের কাছে।

সমাজটাকে দেখলে আপনার মনে হবে হতাশায় ডুবে আছে। ব্যক্তিগতভাবে হয়তো আপনি এবং আমিও তাই। কেন এই হতাশা? দুর্নীতির সরলীকরণ এর একটি কারণ অবশ্যই। প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে মৃদু বা ভয়াবহ দুর্নীতির সঙ্গে পেঁচিয়ে আছি। নিজে দুর্নীতি করছি অথবা সয়ে যাচ্ছি। দুর্নীতি সামাল দেওয়া, ভোগ করাও সহজ নয়। নানা দিক সামাল দিয়ে চলতে হয়। যখন নকশা মতো হচ্ছে না, তখন হাজার কোটি টাকার মালিকের মধ্যেও হতাশা দেখা দেয়। আবার আপনি নিজে দুর্নীতি করছেন না, কিন্তু দুর্নীতির শিকার। নীরবে সয়ে যেতে যেতে আপনি হতাশার ব্যাধিতে আক্রান্ত। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বাণিজ্যের ‘কড়ি’। কড়ি দিয়ে তারা সনদ কিনছে ঠিকই কিন্তু যুৎসই চাকরি পাচ্ছে না। সাধারণ কৃষক, উৎপাদক তার ফসল ও পণ্যের দাম থেকে বঞ্চিত। তারপরও সমাজের আকাশে টাকা উড়ছে। ওই টাকা ধরতে না পেরে কেউ হতাশ। আবার কেউ ধরতে পেরে সেই টাকা ভোগ করতে করতেও এক ধরনের হতাশা এসে তাদের ঘিরে ধরেছে।

বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা আছে। অপরাধের তদন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দ্রুত আদালতে পৌঁছে না। হিমঘরে জমতে থাকে। অপরাধের কারণ ও অপরাধীদের সঙ্গে রাজনীতির এখন প্রবল আত্মীয়তা। ফলে অপরাধের স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়া সচল না দেখে সাধারণের মধ্যে এক ধরনের হতাশার নিম্নচাপ তৈরি হয়। আমরা বুঝি এখন সেই নিম্নচাপের ঘূর্ণি দেখতে পাচ্ছি। এই ঘূর্ণিই নিজেকে প্রকাশের জন্য গুজবের ধুলি খুঁজে বের করছে। ফলাফল গণপিটুনি, হত্যা ও ধর্ষণ। এই ঘূর্ণি থেকে সমাজ, রাষ্ট্র পরিত্রাণ পাবে কোন উপায়ে? একবারেই যে ঘূর্ণি মোকাবেলার সাধ্য নেই আমাদের, তা নয়। আছে। যে স্বাভাবিক রাজনৈতিক অনুশীলন দেখে আমরা অভ্যস্ত, তা যদি আবার ফিরে আসে, তবেই দেখা যাবে হতাশার নিম্নচাপ কাটতে শুরু করেছে। মানুষ, সমাজ স্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করেছে। অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াও তখন স্বাভাবিক ছন্দে চলতে শুরু করবে।

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র