'উহাদের চোখে বিলাই মুতিয়া দিয়াছে'

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তা২৪.কম

ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পাকিস্তান আমলে একটি স্বাধীন দেশের অংশ হলেও পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশ পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেনি। পশ্চিম অংশের শাসনে-শোষণে বাংলাদেশ ছিল জর্জরিত।

নব্য মার্কসবাদী তাত্ত্বিক নামে পরিচিত পণ্ডিত হামজা আলাভি, তারিক আলি প্রমুখ বাংলাদেশের চরম দুরবস্থারর নাম দিয়েছিলেন 'ইন্টারন্যাল কলোনি'।

সত্যিই, আমরা একই দেশের অংশ হয়েও ছিলাম 'অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ' সদৃশ্য। আমাদের অর্থ, বিত্ত, সম্পদ, উৎপাদন লুটে নিয়ে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চল ফুলে-ফেঁপে মোটা-তাজা হচ্ছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সারা জীবন পাকিস্তানের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রতিবাদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ সফলতা লাভ করে।

সে সময় সংবাদপত্রে শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সাপ্তাহিক কলামে জ্বালাময়ী ভাষায় পাকিস্তানের শোষণ ও অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ করেন তিনি।

মানিক মিয়া প্রমিত বাংলা ভাষার পাশাপাশি নিজের জন্মস্থান বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় চমৎকার ভাবে পাকিস্তানি অনাচারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে শ্লেষ ও বিদ্রূপাত্মক উপমা দিতেন। পাকিস্তানিদের একচক্ষু নীতি ও পূর্ব বাংলার দুর্দশা না দেখে উপেক্ষা করার সময় তিনি বলতেন, 'উহাদের চোখে বিলাই মুতিয়া দিয়াছে'। অর্থাৎ পাকিস্তানি শাসকদের চোখে বিড়াল প্রস্রাব করে দিয়েছে বিধায় তারা বাংলার মানুষের যৌক্তিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট  বিষয়গুলো দেখতে পারছে না।

আশির দশকের শেষে মানিক মিয়ার ভাষণ  ও কলাম গ্রন্থাকারে প্রকাশের কাজে জড়িত থেকে এমন আরও অনেক উপমা ও উদাহরণ তার লেখায় দেখতে পেয়েছি। এখন যদিও অতীতের নিবর্তনমূলক পরিস্থিতি নেই, তথাপি সরকারের কিছু কিছু সংস্থা ও কতিপয় কর্মকর্তার আচরণ দেখে সেসব কথা মনে পড়ছে। নিজের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ও জাতীয় বা জনস্বার্থ না দেখার মানসিকতাসম্পন্ন লোকগুলোকে সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায়, এই শ্রেণিটিকে  মানিক মিয়ার ভাষায় বলতে হয়, 'উহাদের চোখে বিলাই মুতিয়া দিয়াছে'।

এই শ্রেণিটি সরকারি ও বেসরকারি, উভয় সেক্টরে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। এরা নাট-বল্টুহীন বাঁশ দিয়ে ঠেকা-মারা বিপজ্জনক রেল ব্রিজগুলো দেখতে পায় না। সংশ্লিষ্ট সংস্থায় চাকরি করেও এরা জনদুর্ভোগের বিষয়ে চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করেন।

আরও পড়ুন: রেললাইনের নাট কাপড়ে বাঁধা, ঝুঁকি নিয়ে চলছে ট্রেন

এরা ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধের খবর রাখেন না। খাদ্যদ্রব্য ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে চরম অনিয়ম ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সম্পর্কে নিরবতা পালন করেন। শিক্ষাক্ষেত্র, আইনশৃঙ্খলা,  সড়ক যোগাযোগ ইত্যাদি সকল সেক্টরেই এমন অনেক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আছেন, যারা কাজের সময় অন্ধ সেজে থাকেন। দেখেও না দেখার বাহানা করেন।

রাষ্ট্র ও সরকার সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে হলে সকল সংস্থাকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সকলের সম্মিলিত উদ্যোগে অন্যায়,অনিয়ম, দুর্নীতি, জনদুর্ভোগ লাঘব হয়। এটাই স্ব স্ব সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মৌলিক দায়িত্ব।  

সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব সঠিকভাবে প্রতিপালিত না হলে সব ব্যাপারে এবং সব ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ-শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দিতে হয়। এটা সব সময় সম্ভব হয় না। আর এটা কাম্যও নয়। স্ব স্ব বিভাগ ও সংস্থা তাহলে কোন কাজ করবে, সবই যদি সর্বোচ্চ-শীর্ষ পর্যায় থেকে বলে দিতে হয়!

স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিকের স্বার্থে নিয়োজিত সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গকে জনস্বার্থ ও জননিরাপত্তায় উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। স্ব স্ব সেক্টরের সঠিক খোঁজ-খবর ও পরিস্থিতি জানতে ও দেখতে হবে। 'চোখে বিলাই মুতিয়া দিয়াছে' ধরনের স্বপ্রণোদিত অন্ধত্ব ও উদাসীনতা নিয়ে দায়িত্ব ও কর্তব্যের গাফিলতি করে চলার অবসান ঘটাতে হবে।    

আপনার মতামত লিখুন :