Barta24

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

গুজবের এই মৃত্যু উপত্যকায়

গুজবের এই মৃত্যু উপত্যকায়
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তা২৪
এরশাদুল আলম প্রিন্স


  • Font increase
  • Font Decrease

জন্ম-মৃত্যু সবই আল্লাহর হাতে। মানুষ জীবন দিতেও পারে না, নিতেও পারে না। জন্মিলে মরিতে হবে, অমর সে কোথা কবে? পবিত্র কোরআনের সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ পাক বলেছেন, “সমস্ত প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’’ (আয়াত: ১৮৫)

মানুষ একবারই মরে, জন্মেও একবার। আগে জন্ম-মৃত্যু নিয়ে কানাঘুষা হয়নি। গ্রামে কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করলে সে বাড়িতে আযান দেয়া হতো। কেউ মারা গেলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিত। মানুষ দু’ক্ষেত্রেই দোয়া করতো। আনন্দ-বেদনায় শামিল হতো। এখনও এসব আছে, কিন্তু এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গুজব নামের এক মহামারি।

সম্প্রতি দেশে মানুষের মৃত্যু নিয়ে এক গুজবের সংস্কৃতি চালু হয়েছে। আগে এই দেশে কত বড় বড় মানুষ মারা গেছেন কোনোদিন তাদের মৃত্যু সংবাদ নিয়ে গুজব হয়নি। এখন কবি, টকশোজীবী, সেলিব্রিটি, নেতা, বুদ্ধিজীবী- সবার মৃত্যু নিয়েই দেশে এক মহাগুজবের সংস্কৃতি চালু হয়েছে। এর মূলে আছে ফেসবুক নামক এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এটি একটি শোঅফ মাধ্যম। এই মাধ্যমে যে যা করছেন, যে যাই জানেন, সঙ্গে সঙ্গেই আপলোড করে দেন তার অগনিত ভক্ত-অনুসারীদের জন্য। নিজেকে জাহির করার এক অদ্ভুত মানসিকতা দেখা যায় ফেসবুকে। ফেসবুকে মানুষের কর্মকাণ্ড নিয়ে আরেকদিন লিখব। কিন্তু, মানুষের মৃত্যু নিয়ে ফেসবুকীয় কাণ্ড-কীর্তির একটা সুরাহা হওয়া দরকার।

Status

হালে, দেশে কোনো সেলিব্রিটি গুরুতর অসুস্থ হলে বা হাসপাতালে নেওয়া হলে ফেসবুকে শুরু হয়ে যায় তার মৃত্যুর দিনক্ষণ গণনা। আইসিইউতে থাকলেতো কথাই নেই। তার মরণ না হওয়া পর্যন্ত যেন অতি উৎসাহী ফেসবুক ব্যবহারকারীদের শান্তি নেই। আসলে এটাও এক ধরনের শান্তি। আমরা সব সময় সেনসেশন পছন্দ করি। সবকিছুর মাঝেই একটি উত্তেজনা। এর মাঝে লুকায়িত আছে এক বিকৃত সুখানুভূতি। এটাই বাস্তবতা। সবকিছুতেই আমাদের রয়েছে এক অস্থিরতা। সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার-সব জায়গাতেই এক অস্থিরতা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার বৃত্তে আমরা বন্দী হয়ে আছি। কেন আমাদের এমন অস্থিরতা ও সেনসেশনের সন্ধান তা হয়তো সমাজ ও মনস্তত্ত্ববিদরাই ভালো বলতে পারবেন।

এভাবেই আমরা একের পর এক গুজব ছড়াতে থাকি। আমি যা জানি তা সবাইকে জানাতে চাই। সবার আগে সর্বশেষ নিয়ে আমরা হাজির হই আমাদের অগণিত ভক্ত অনুসারীদের কাছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সময় যে আমাদের নেই। কেউ মারা যাওয়ার আগেই তার দাফন-কাফন সারা। মৃতের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাইতেও ভুলেন না এসব গুজবকারীরা। এই মাত্র চলে গেলেন, একটি নক্ষত্রের পতন-ইত্যাদি ইত্যাদি...। এভাবেই চলছে আমাদের গুজব চর্চা।

এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই বিশ্ব দরবারে আমরা একটি গুজব সৃষ্টিকারী জাতি হিসেবে পরিচিতি পাব। তাই এর একটি ফুলস্টপ দরকার।

Status

গত এক দশকে গুজব নিয়ে অনেক গুজব হয়েছে। কিন্তু আজ গুজব এক বাস্তবতা। দেশে গুজব নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড হয়ে গেছে। রাজপথ রক্তাক্ত হয়েছে, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, ধর্ষণ-নির্যাতনও হয়েছে। গুজব দমনে সরকারকে হিমশিম খেতে হয়েছে। এমনকি গুজব বন্ধ করতে সরকারকে গুজবের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নও করতে হয়েছে। আইনানুযায়ী অনেক গুজবকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গুজব সৃষ্টিকারী অনেক ফেসবুক আইডি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আখেড়ে গুজব বন্ধ হয়নি।

ফেসবুকের এই গুজব মহড়ায় কোনটা আসল গুজব আর কোনটা নকল গুজব সেটা ধরাও আরেক মুশকিল। কিন্তু গুজব মহড়ার মধ্য থেকে সত্য প্রকাশের দায়িত্ব কার? গুজবের বিরুদ্ধে পাল্টা গুজব ছড়ানোও হয় এখানে। সরকার নিজেও মাঝে মাঝে এসব গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। গুজবের ঘটনায় এমন এমন সব সূত্র উল্লেখ করা হয় যাকে গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীও গুজবের লেজে পা দেন। তাদের দেখে বাকি পাতি গুজবকারীরা দ্বিগুন উৎসাহে গুজবের খেলায় মেতে ওঠেন। অনেক সময় গুজবকে পাকা-পোক্ত করার জন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নামে ফেক ফেসবুক আইডিও খোলা হয়। যাতে করে গুজব বিশ্বাসযোগ্য হয়।

গুজব বন্ধ করার দায়িত্ব কার? আইনানুযায়ী সরকার গুজবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। আমরা পাবলিক কী করতে পারি? গুজবে কান না দিতে পারি। কিন্তু গুজব শুনে পাবলিক মানসে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় তার অবদমন কীভাবে সম্ভব? গুজবের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিকার কী? যাকে নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে তার জন্য কি কোনো প্রতিকার আছে? আইনে এসব নিয়ে কোনো কথা নেই। তবে, সবকিছু আইন দিয়ে সম্ভবও না। সরকারকে এর বিরুদ্ধে কিছু প্রোঅ্যাক্টিভ ব্যবস্থা নিতেই হবে। সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। একটি ম্যাচুরড ডিজিটাল জেনারেশন তৈরি হতেও সময় লাগবে বৈকি।

Status

গুজবের ভেতর থেকে সত্য তুলে আনতে পারে পুলিশ ও সাংবাদিক। আমাদের পুলিশ ঔপনিবেশিক পুলিশিং পদ্ধতিই অনুসরণ করছে। কিন্তু দেশে গণমাধ্যমও যে এসব গুজবের বলি তার কী হবে? গণমাধ্যম শুধু গুজবে কানই দেয় না, গুজবের ওপর ভিত্তি করে সংবাদও প্রচার করে। গুজবে কান দিয়ে ব্রেকিং নিউজ দিয়েছে দেশের অনেক টিভি ও অনলাইন গণমাধ্যম। এ এক অস্থির প্রতিযোগিতা। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে কী অর্জন তা বোঝা কঠিন। স্বল্পমেয়াদে আছে শুধু উত্তেজনা। কোয়ালিটির ওপর গুরুত্ব না দিয়ে কেবল স্পিড ও কোয়ান্টিটির ওপর গুরুত্ব দেওয়া এসব গণমাধ্যম আখেড়ে সুবিধা করতে পারেনি।

দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পর্যায়ে গুজবের যাত্রা শুরু হয়েছে প্রায় ৭-৮ বছর হবে। তাই এটি একটি পুরোনো ইস্যু। কিন্তু আজ যে কারণে প্রসঙ্গের অবতারণা, গতকাল বিকেল থেকেই সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যু নিয়ে ফেসবুকে একের পর গুজব ছড়াতে থাকে। গুজব একটাই- এরশাদ মারা গেছেন। ফেসবুকে বিশ্বস্তসূত্রের বরাত দিয়ে এসব গুজব ছড়ানো হয়েছে। হয়তো এসব স্ট্যাটাসকারীর উদ্দেশ্য গুজব ছড়ানো নয়। কিন্তু বিষয়বস্তুর সংবেদনশীলতা এসব স্ট্যাটাসকে গুজবের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য যথেষ্ট। অতি নিকটস্ত আত্মীয় স্বজনের বরাত দিয়েও কেউ কেউ এসব গুজব মার্কা কথা ছড়িয়েছেন।

Status

এরশাদের মৃত্যু নিয়ে জাতীয় পার্টি, রওশন এরশাদ, জিএম কাদের, শাদ এরশাদ বা বিদিশা যতোটা না উদ্বিগ্ন তার চেয়েও ঢের বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলেন এসব গুজবকারীরা। গণমাধ্যমকর্মীরাও এসব গুজবের জন্য শান্তিতে ঘুমাতে পারেননি; কখন না গুজব সত্য হয়ে যায়! যদি ব্রেকিং দিতে দেরি হয়?

তবে, গণমাধ্যম এখন আগের চেয়ে অনেকটাই ধীরে চলো নীতিতে চলছে। এমন গুজবের পরও তারা এরকম কোনো সংবাদ প্রচার করেনি। কিছুদিন আগে সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর মৃত্যু বিষয়ক গুজবজাত সংবাদ থেকেই হয়তো তারা কিছুটা সচেতন হয়েছেন। গণমাধ্যমগুলো এসব গুজব থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। আশা করি, এক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইউজাররাও গুজব ছড়ানো বন্ধ করবেন। অনুরোধ, কোনো স্ট্যাটাস দেওয়ার আগে তার ইমপ্যাক্ট বা প্রভাব সম্পর্কে একবার ভাবুন।

আপনার মতামত লিখুন :

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

জিএম কাদের কি পারবেন?

জিএম কাদের কি পারবেন?
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান থেকে দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের। দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জিএম কাদেরের উপস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) এ ঘোষণা দেন। এখন অপেক্ষা, জাপা জিএম কাদেরের নেতৃত্বকে কতটা সহজভাবে মেনে নেয়, সেটি দেখার।

জিএম কাদের প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারলে সেটা তার নিজের ও দলের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে আসবে বলেই মনে হয়। তবে জিএম কাদের আপাতত সফল হোন বা না হোন, জাপার জন্য আগামী দিনের রাজনীতিতে একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বহাল থাকার লড়াইটা খুব সহজ হবে না। নিশ্চিতভাবেই দলের ভেতর ও বাইরে থেকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আসবেই। তবে, সামগ্রীকভাবে দেশের রাজনীতির চালচিত্র কেমন যাবে, তার ওপর এটি অনেকটাই নির্ভর করে।

জাপায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়েই দলের নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন দেখা গেছে। এমন টানাপোড়েন শুধু জাপায় নয়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেও ছিল, এখনও আছে। যেকোনো বড় দলেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ‘পন্থী’রা শক্তিশালী থাকে। শক্তিহীনরা হয় টিকে থাকার চেষ্টা করেন, ধৈর্য ধরেন, না হয় এক সময় ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে ঝড়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা আজ দলে নেই। অনেকে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ পারেননি। বের হয়ে নতুন দল বা জোটে যোগ দিয়েছেন। বিএনপিতেও এমন নজিরের অভাব নেই। বড় দলে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে দলের ঐক্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। এতে দল ও নেতা উভয়ই লাভবান হয়। তা না হলে দলতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ই, দলের নেতারাও একসময় হারিয়ে যান। ১/১১ এর বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিতে অনেকেই তথাকথিত সংস্কারপন্থী হয়েছেন। এতে না দলের, না নিজের লাভ হয়েছে। দুঃসময়ে লড়াইটা চালিয়ে যাওয়াই রাজনীতিকের আসল পরীক্ষা। সুসময়ে সবাই মিছিলের সামনেই থাকে।

স্বাধীনতার পরে দেশের বড় তিনটি দলের ভাঙা-গড়াই আমরা দেখেছি। এর মধ্যে বিএনপি, ও জাপার জন্মই স্বাধীনতার পরে। তবে স্বাধীনতার পরে দলের ভাঙা-গড়ার সবচেয়ে বড় নজির জাসদের। এক সময় দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটি শ্রেণী বিশেষ করে ছাত্র সমাজের একটি অংশের কাছে কয়েকটি শব্দ খুব পরিচিত ছিল-পুঁজিবাদ, বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, সর্বহারা, বিচ্যুতি, বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, হঠকারিতা, বস্তুবাদ, লুটেরা, দ্বন্দ্ব, ধনিক-শ্রেণি, কায়েমী-স্বার্থবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেতো কথাই নেই। মুখে মুখে এসব বুলি। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ শব্দগুলো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই দেশের মেধাবী ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বামপন্থী হয়ে যায়। এরা রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের ছাতার নীচে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে আবার মস্কো, পিকিং আরো নানা পন্থী ছিল। জাসদ শুরুর সে ইতিহাসও অর্ন্তদ্বন্দ্বেরই ইতিহাস, ছাত্রলীগের মধ্যে মেরুকরণের ইতিহাস। এরই মধ্যে নতুন আরেকটি শব্দ চালু হলো রাজনীতিতে। সেটি হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নেই ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ জাসদ গঠন করে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানা ঘটনার পরম্পরায় জাসদ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। এরপর জিয়া ও এরশাদ আমলে জাসদের ভাঙ্গনের খতিয়ান আরও দীর্ঘ। মেজর জলীল, কাজী আরেফ আহমদ, মনিরুল ইসলাম, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ইনু, রব হয়ে জাসদ এখন বর্তমান সুরতে বহাল আছে। বর্তমানে এক দল এক নেতার দল জাসদ। এর মাঝে আছে একাধিক পন্থী। দলের মাঝে ঐক্য ধরে রাখার জন্য জাসদ নেতারা কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু পারেননি। কারণ তারা নিজেরাই স্বার্থের দ্বন্দ্বে মরিয়া ছিলেন।

ছোট দলের জন্য দলের ঐক্য ধরে রাখা সব সময়ই কঠিন। সেটা জাসদ হোক বা জাপা। কারণ, রাজনীতিতে ঐক্যের মূল শক্তি ক্ষমতা অথবা আদর্শ। কিন্তু আমাদের এখানে আদর্শের ভীত বড় নড়বড়ে। আর নিজ শক্তিবলে এসব দলের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটও রচনা হয়নি। ফলে, দলের নেতারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য ক্ষমতায় দৌড়ে অধিকতর কাছাকাকাছি থাকা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য করেছেন। এখানেই ছোট দলের ভাঙনের মূল কারণ নিহিত। এছাড়া অপরের নেতৃত্ব মেনে না নেয়ার সহজাত প্রবণতা মানুষের থাকেই। সেই সাথে আরেকটি বিষয় হলো এসব দলের বড় নেতা ও পরবর্তী ধাপের নেতাদের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের মাঝে দৃশ্যমান তেমন বড় কোনো পার্থক্য নেই। ফলের ঐক্যের মূল ভিত্তি খুবই দূর্বল থাকে। রাজনৈতিক আদর্শ বাদ দিলেও, আওয়ামীর লীগের ঐক্যের ভিত্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার একথা অস্বীকার করা যাবে না। এখানে ঐক্যের একটি ‘পারিবারিক’ ভিত্তিও আছে।

জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের
জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের

 

বিএনপির ক্ষেত্রেও নেতাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি কখনো ক্ষমতায়া যাওয়ার আশা, সেই সাথে জিয়া পরিবার। এর বাইরে একটি রাজনৈতিক আদর্শতো কাজ করেই। এটি শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, নয় শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ভারতের কংগ্রেসের বর্তমান হাল হকিকত দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাহুল গান্ধী পদত্যাগ করেছেন দুই সপ্তাহ, কিন্তু দল এখনও নতুন নেতা নির্ধারণ করতে পারেনি। ব্যক্তি ও পারিবারিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে দলে পরবর্তী নেতৃত্বের পথ রচনা করার কাজটি এখনও শুরু হয়নি।

জাতীয় পার্টিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যারা বের হয়ে গেছেন তারা নিজেরাই নেতা হয়ে একনেতা নির্ভর দল গঠন করেছেন। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) (জেপি) ইত্যাদি নানা উপদলে ভাগ হয়েছে। আসলে এসব বিভক্তি ও ভাঙনের পেছনে কোনো আদর্শ কাজ করেনি। কাজ করেছে ক্ষমতা ও নগদ প্রাপ্তি।

গত এক দশকে জাপা বহুবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে জাপায় কোন্দল চরমে পৌঁছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে বিরাজ করে তীব্র ক্ষোভ ও দ্বন্দ্ব। একপক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছে আরেক পক্ষ চায়নি। এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডও হয়ে গেছে বহুবার। এর পেছনে শুধু দলের অর্ন্তকোন্দলই ছিল নাকি এর পেছনে আরও কারণ ছিল তা নিয়ে কথা হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের ভেতরের দ্বন্দ্ব বাইরে আসেনি, মানে দলে ভাঙন হয়নি।

তারপরও দলে আপাতত দুইটি গ্রুপ আছে। রওশন ও জিএম কাদেরপন্থী এ দু’টো গ্রুপ দলে বহুদিন ধরেই দৃশ্যমান। এনিয়ে এরশাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশনা ও আদেশ জারি করেছেন। পরে আবার সেই আদেশ প্রত্যাখ্যানও করেছেন, করতে বাধ্য হয়েছেন।

গত নির্বাচনের আগে থেকেই এরশাদ অসুস্থ। বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন। দলের ঐক্য বজায় রাখতে বা তার অবর্তমানে দল টিকিয়ে রাখতে কে হবেন জাপার পরবর্তী কর্ণধার, তা নিয়েও তার শঙ্কা ছিল। দলের একটি পক্ষ চেয়েছে রওশনকে সামনে নিয়ে আসতে, আরেক পক্ষ চেয়েছে জিএম কাদেরকে। এছাড়া আগে পরে অন্য পক্ষও সক্রিয় ছিল। তবে সর্বশেষ এই দুটি গ্রপই দৃশ্যমান ছিল। এরশাদ জানতেন হয়তো এ বিরোধ সহজে মিটবে না। তাই তিনি নিজের সম্পত্তি ওসিয়ত করে যাওয়ার পাশাপাশি দলের নেতৃত্বের বিষয়টিও ওসিয়তও করে গেছেন। এরশাদ জাপার গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে তার অবর্তমানে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদেশে থাকাকালে ছোট ভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

এর আগে তিনি কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেছেন আবার সে আদেশ বাতিলও করেছেন। গত ১৪ জুন তার মৃত্যুর পাঁচদিনের মাথায় তার সেই ওসিয়তই পুরণ হলো। কারণ এরশাদ আজ অবর্তমান। তার অবর্তমানে আপাতত জিএম কাদের বর্তমান। দেখা যাক, এই বর্তমানকে জিএম কাদের ভবিষ্যতের কাছে নিয়ে যেতে পারেন কি-না। এই দিনকে তিনি সেই দিনের কাছে তিনি নিয়ে যেতে পারেন কিনা এটাই তার জন্য বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তিনি পাস করলে ফেল করার হাত থেকে হয়তো বেঁচে যেতে পারে জাপা।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আরও পড়ুন: রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র