গুজবের এই মৃত্যু উপত্যকায়

এরশাদুল আলম প্রিন্স
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তা২৪

এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

জন্ম-মৃত্যু সবই আল্লাহর হাতে। মানুষ জীবন দিতেও পারে না, নিতেও পারে না। জন্মিলে মরিতে হবে, অমর সে কোথা কবে? পবিত্র কোরআনের সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ পাক বলেছেন, “সমস্ত প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’’ (আয়াত: ১৮৫)

মানুষ একবারই মরে, জন্মেও একবার। আগে জন্ম-মৃত্যু নিয়ে কানাঘুষা হয়নি। গ্রামে কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করলে সে বাড়িতে আযান দেয়া হতো। কেউ মারা গেলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিত। মানুষ দু’ক্ষেত্রেই দোয়া করতো। আনন্দ-বেদনায় শামিল হতো। এখনও এসব আছে, কিন্তু এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গুজব নামের এক মহামারি।

সম্প্রতি দেশে মানুষের মৃত্যু নিয়ে এক গুজবের সংস্কৃতি চালু হয়েছে। আগে এই দেশে কত বড় বড় মানুষ মারা গেছেন কোনোদিন তাদের মৃত্যু সংবাদ নিয়ে গুজব হয়নি। এখন কবি, টকশোজীবী, সেলিব্রিটি, নেতা, বুদ্ধিজীবী- সবার মৃত্যু নিয়েই দেশে এক মহাগুজবের সংস্কৃতি চালু হয়েছে। এর মূলে আছে ফেসবুক নামক এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এটি একটি শোঅফ মাধ্যম। এই মাধ্যমে যে যা করছেন, যে যাই জানেন, সঙ্গে সঙ্গেই আপলোড করে দেন তার অগনিত ভক্ত-অনুসারীদের জন্য। নিজেকে জাহির করার এক অদ্ভুত মানসিকতা দেখা যায় ফেসবুকে। ফেসবুকে মানুষের কর্মকাণ্ড নিয়ে আরেকদিন লিখব। কিন্তু, মানুষের মৃত্যু নিয়ে ফেসবুকীয় কাণ্ড-কীর্তির একটা সুরাহা হওয়া দরকার।

Status

হালে, দেশে কোনো সেলিব্রিটি গুরুতর অসুস্থ হলে বা হাসপাতালে নেওয়া হলে ফেসবুকে শুরু হয়ে যায় তার মৃত্যুর দিনক্ষণ গণনা। আইসিইউতে থাকলেতো কথাই নেই। তার মরণ না হওয়া পর্যন্ত যেন অতি উৎসাহী ফেসবুক ব্যবহারকারীদের শান্তি নেই। আসলে এটাও এক ধরনের শান্তি। আমরা সব সময় সেনসেশন পছন্দ করি। সবকিছুর মাঝেই একটি উত্তেজনা। এর মাঝে লুকায়িত আছে এক বিকৃত সুখানুভূতি। এটাই বাস্তবতা। সবকিছুতেই আমাদের রয়েছে এক অস্থিরতা। সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার-সব জায়গাতেই এক অস্থিরতা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার বৃত্তে আমরা বন্দী হয়ে আছি। কেন আমাদের এমন অস্থিরতা ও সেনসেশনের সন্ধান তা হয়তো সমাজ ও মনস্তত্ত্ববিদরাই ভালো বলতে পারবেন।

এভাবেই আমরা একের পর এক গুজব ছড়াতে থাকি। আমি যা জানি তা সবাইকে জানাতে চাই। সবার আগে সর্বশেষ নিয়ে আমরা হাজির হই আমাদের অগণিত ভক্ত অনুসারীদের কাছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সময় যে আমাদের নেই। কেউ মারা যাওয়ার আগেই তার দাফন-কাফন সারা। মৃতের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাইতেও ভুলেন না এসব গুজবকারীরা। এই মাত্র চলে গেলেন, একটি নক্ষত্রের পতন-ইত্যাদি ইত্যাদি...। এভাবেই চলছে আমাদের গুজব চর্চা।

এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই বিশ্ব দরবারে আমরা একটি গুজব সৃষ্টিকারী জাতি হিসেবে পরিচিতি পাব। তাই এর একটি ফুলস্টপ দরকার।

Status

গত এক দশকে গুজব নিয়ে অনেক গুজব হয়েছে। কিন্তু আজ গুজব এক বাস্তবতা। দেশে গুজব নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড হয়ে গেছে। রাজপথ রক্তাক্ত হয়েছে, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, ধর্ষণ-নির্যাতনও হয়েছে। গুজব দমনে সরকারকে হিমশিম খেতে হয়েছে। এমনকি গুজব বন্ধ করতে সরকারকে গুজবের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নও করতে হয়েছে। আইনানুযায়ী অনেক গুজবকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গুজব সৃষ্টিকারী অনেক ফেসবুক আইডি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আখেড়ে গুজব বন্ধ হয়নি।

ফেসবুকের এই গুজব মহড়ায় কোনটা আসল গুজব আর কোনটা নকল গুজব সেটা ধরাও আরেক মুশকিল। কিন্তু গুজব মহড়ার মধ্য থেকে সত্য প্রকাশের দায়িত্ব কার? গুজবের বিরুদ্ধে পাল্টা গুজব ছড়ানোও হয় এখানে। সরকার নিজেও মাঝে মাঝে এসব গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। গুজবের ঘটনায় এমন এমন সব সূত্র উল্লেখ করা হয় যাকে গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীও গুজবের লেজে পা দেন। তাদের দেখে বাকি পাতি গুজবকারীরা দ্বিগুন উৎসাহে গুজবের খেলায় মেতে ওঠেন। অনেক সময় গুজবকে পাকা-পোক্ত করার জন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নামে ফেক ফেসবুক আইডিও খোলা হয়। যাতে করে গুজব বিশ্বাসযোগ্য হয়।

গুজব বন্ধ করার দায়িত্ব কার? আইনানুযায়ী সরকার গুজবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। আমরা পাবলিক কী করতে পারি? গুজবে কান না দিতে পারি। কিন্তু গুজব শুনে পাবলিক মানসে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় তার অবদমন কীভাবে সম্ভব? গুজবের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিকার কী? যাকে নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে তার জন্য কি কোনো প্রতিকার আছে? আইনে এসব নিয়ে কোনো কথা নেই। তবে, সবকিছু আইন দিয়ে সম্ভবও না। সরকারকে এর বিরুদ্ধে কিছু প্রোঅ্যাক্টিভ ব্যবস্থা নিতেই হবে। সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। একটি ম্যাচুরড ডিজিটাল জেনারেশন তৈরি হতেও সময় লাগবে বৈকি।

Status

গুজবের ভেতর থেকে সত্য তুলে আনতে পারে পুলিশ ও সাংবাদিক। আমাদের পুলিশ ঔপনিবেশিক পুলিশিং পদ্ধতিই অনুসরণ করছে। কিন্তু দেশে গণমাধ্যমও যে এসব গুজবের বলি তার কী হবে? গণমাধ্যম শুধু গুজবে কানই দেয় না, গুজবের ওপর ভিত্তি করে সংবাদও প্রচার করে। গুজবে কান দিয়ে ব্রেকিং নিউজ দিয়েছে দেশের অনেক টিভি ও অনলাইন গণমাধ্যম। এ এক অস্থির প্রতিযোগিতা। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে কী অর্জন তা বোঝা কঠিন। স্বল্পমেয়াদে আছে শুধু উত্তেজনা। কোয়ালিটির ওপর গুরুত্ব না দিয়ে কেবল স্পিড ও কোয়ান্টিটির ওপর গুরুত্ব দেওয়া এসব গণমাধ্যম আখেড়ে সুবিধা করতে পারেনি।

দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পর্যায়ে গুজবের যাত্রা শুরু হয়েছে প্রায় ৭-৮ বছর হবে। তাই এটি একটি পুরোনো ইস্যু। কিন্তু আজ যে কারণে প্রসঙ্গের অবতারণা, গতকাল বিকেল থেকেই সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যু নিয়ে ফেসবুকে একের পর গুজব ছড়াতে থাকে। গুজব একটাই- এরশাদ মারা গেছেন। ফেসবুকে বিশ্বস্তসূত্রের বরাত দিয়ে এসব গুজব ছড়ানো হয়েছে। হয়তো এসব স্ট্যাটাসকারীর উদ্দেশ্য গুজব ছড়ানো নয়। কিন্তু বিষয়বস্তুর সংবেদনশীলতা এসব স্ট্যাটাসকে গুজবের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য যথেষ্ট। অতি নিকটস্ত আত্মীয় স্বজনের বরাত দিয়েও কেউ কেউ এসব গুজব মার্কা কথা ছড়িয়েছেন।

Status

এরশাদের মৃত্যু নিয়ে জাতীয় পার্টি, রওশন এরশাদ, জিএম কাদের, শাদ এরশাদ বা বিদিশা যতোটা না উদ্বিগ্ন তার চেয়েও ঢের বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলেন এসব গুজবকারীরা। গণমাধ্যমকর্মীরাও এসব গুজবের জন্য শান্তিতে ঘুমাতে পারেননি; কখন না গুজব সত্য হয়ে যায়! যদি ব্রেকিং দিতে দেরি হয়?

তবে, গণমাধ্যম এখন আগের চেয়ে অনেকটাই ধীরে চলো নীতিতে চলছে। এমন গুজবের পরও তারা এরকম কোনো সংবাদ প্রচার করেনি। কিছুদিন আগে সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর মৃত্যু বিষয়ক গুজবজাত সংবাদ থেকেই হয়তো তারা কিছুটা সচেতন হয়েছেন। গণমাধ্যমগুলো এসব গুজব থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। আশা করি, এক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইউজাররাও গুজব ছড়ানো বন্ধ করবেন। অনুরোধ, কোনো স্ট্যাটাস দেওয়ার আগে তার ইমপ্যাক্ট বা প্রভাব সম্পর্কে একবার ভাবুন।

আপনার মতামত লিখুন :