Barta24

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু কতটা প্রাধান্য পাবে?

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু কতটা প্রাধান্য পাবে?
ছয় দিনের সফরে চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্তী শেখ হাসিনা/ ছবি: সংগৃহীত
মাছুম বিল্লাহ


  • Font increase
  • Font Decrease

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছয় দিনের এক সরকারি সফরে বর্তমানে এশিয়ান অর্থনৈতিক জায়ান্ট ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তির অধিকারী চীনে রয়েছেন। বাংলাদেশে বিরাজমান অভ্যন্তরীণ সমস্যাবলির মধ্যে বর্তমানে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে নাজিলকৃত গলার কাঁটা হিসেবে চিহ্নিত সবচেয়ে যে বড় সম্যসাটি রয়েছে সেটি হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা।

এই সমস্যার সাথে মানবিক বিষয়টি যেমন জড়িত তেমনি জঙ্গিবাদের প্রসার, দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তা ও পরিবেশের বিষয়টি জড়িত। এই সমস্যার সাথে কমবেশি বিশ্বের সবাই বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এর রাজনৈতিক সমাধান রয়েছে চীনের কাছে বলে অনেকেই ধারণা করছেন। কৌশলগত কারণে মিয়ানমারের বৃহৎ ও শক্তিশালী প্রতিবেশী চীন শিল্প ও সামরিক কূটনৈতিক দিক দিয়ে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কিত। তাই দেশি ও বিদেশি কূটনীতিকরা আশায় চেয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু কতটা প্রাধান্য পাবে।

ছয় দিনের সফর শুরু হয়েছে ১ জুলাই ২০১৯। এ সফরে প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ঐ বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে আটটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিন চীনের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত ভোজসভায় অংশ নেবেন ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এছাড়া চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান লি ঝানসু ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে শেখ হাসিনার। ঐ বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুটি তিনি তুলবেন। প্রেসিডেন্টও প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করেছেন। শীর্ষ সম্মেলন শেষে দুই দেশ একটি যৌথ বিবৃতি প্রদান করবে। ৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বের প্রায় সব দেশ বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ালেও মূলত চীনের ইতিবাচক সমর্থন না থাকায় রোহিঙ্গারা তাদের ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে পারছে না বলেই আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ও পর্যবেক্ষকদের ধারণা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বহুবার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করেছেন কিন্তু এখনও সমাধান হয়নি।

২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অজুহাতে স্থানীয় কিছু উগ্রবাদী বৌদ্ধের মদদে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিকাণ্ডের মতো নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে পরবর্তী কয়েক মাসে দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলমান জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বিভিন্ন দেশের নেতারা বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বাংলাদেশে এসে স্বচক্ষে রোহিঙ্গাদের অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছেন এবং সমবেদনা জানিয়েছেন।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের ৭৩তম সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণের জন্য কিছু প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। তাছাড়াও বিভিন্ন আঞ্চলিক, দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বার বার বিশ্বাবাসীকে জোরালোভাবে অনুরোধ করেছেন।

২০১৭ সালের নভেম্বরে দুই দেশের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত যৌথ কর্মসভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করে বিষয়টি আর আগায়নি।

২৩ জনু ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলন শেষে প্রকাশিত বিবৃতিতে রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলোর টেকসই ও সমন্বিত সমাধানের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। নেতারা সমাধানের অঙ্গীকারও করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়টি উত্থাপন করেন। এ সময় মিয়ানমার আসিয়ানকে জানিয়েছিল যে, রাখাইনে যারা ফিরে যেতে চায় তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। সেটি কী ধরনের জাতীয় পরিচয়পত্র নাকি অন্য কিছু? রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের জাতীয় পরিচয়পত্রই দাবি করেছে কিন্তু সে ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের স্পষ্ট কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাই সন্দেহ করা হচ্ছে যে, যারা ফেরত যাবে তাদের আগের মতোই নির্দিষ্ট এলাকায় আটকে রাখা হবে নাকি কোন বিশেষ ক্যাম্পে থাকার ব্যবস্থা করা হবে? তাই এ বিষয়টি আর আগায়নি।

এদিকে গণনৃশংসতা ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে কাজ করা নিউ ইয়র্কভিত্তিক সংস্থা 'ফিজিসিয়ান্স ফল ইিউম্যান রাইটস' বা পিএইচআর কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছে। তারা ২৬ জুন একটি প্রতিবেদন পেশ করেছে। এতে হাজার হাজার রোহিঙ্গার উপর মিয়ানমার বাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ জেনোসাইডের নমুনা পাওয়া গেছে। স্থলমাইন ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকালে আটটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক হওয়ার কথা রয়েছে, তার মধ্যে ঋণ চুক্তিও আছে। তবে ঋণ চুক্তিতে অর্থের পরিমাণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। আটটি সমঝোত স্মারক হচ্ছে- ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আওতাধীন এলাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শক্তিশালী ও বৃদ্ধিকরণ চুক্তি, ডিপিডিসি এলাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার শক্তিশালী ও বৃদ্ধিকরণে ঋণ চুক্তি, ডিপিডিসি এলাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার শক্তিশালী ও বৃদ্ধিকরণে ক্রেতা অগ্রাধিকার ঋণ চুক্তি, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের আওতায় পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ চুক্তি, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা চুক্তি, বিনিয়োগ সহযোগিতা বিষয়ে সমঝোতা স্মারক, ইয়ালুজংবো ও ব্রক্ষপুত্র নদে হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য বিনিময় সমঝোতা স্মারক, সাংস্কৃতিক ও পর্যটন বিনিময় সমঝোতা স্মারক। রোহিঙ্গ সমস্যার বিষয়টি এখানে খুব জোড়ালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। চীনও হয়তো বিষয়টিতে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বর্তমান সরকারের অনেক সাফল্যের মধ্যে এটি একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হতে পারে যদি চীনের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসে।

রোহিঙ্গারা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি তারা দেখতে চাইছে না। নিজেদের বাসভূমে ফিরে গেলে তাদের ওপর যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি আবারও সৃষ্টি হবে না, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেনি। তাই, আন্তর্জাতিক মহল যদি ১০ লাখ রোহিঙ্গাদের চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটি দেশে ভাগ করে নিয়ে যায় সেটি একটি সমাধান হতে পারে। বিশ্বের বহু দেশেই জনশক্তির প্রয়োজন রয়েছে। তাছাড়া মানবাধিকারের বিষয়টি চিন্তায় রেখেও তারা অনেকগুলো দেশে রোহিঙ্গাদের ভাগ করে নিয়ে যেতে পারে আর মিয়ানমারকে সমস্যা সমাধানে ভিন্ন কৌশলে চাপ প্রয়োগ করতে পারে।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিকে কর্মরত।

আপনার মতামত লিখুন :

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন।  যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

জিএম কাদের কি পারবেন?

জিএম কাদের কি পারবেন?
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান থেকে দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের। দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জিএম কাদেরের উপস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) এ ঘোষণা দেন। এখন অপেক্ষা, জাপা জিএম কাদেরের নেতৃত্বকে কতটা সহজভাবে মেনে নেয়, সেটি দেখার।

জিএম কাদের প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারলে সেটা তার নিজের ও দলের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে আসবে বলেই মনে হয়। তবে জিএম কাদের আপাতত সফল হোন বা না হোন, জাপার জন্য আগামী দিনের রাজনীতিতে একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বহাল থাকার লড়াইটা খুব সহজ হবে না। নিশ্চিতভাবেই দলের ভেতর ও বাইরে থেকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আসবেই। তবে, সামগ্রীকভাবে দেশের রাজনীতির চালচিত্র কেমন যাবে, তার ওপর এটি অনেকটাই নির্ভর করে।

জাপায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়েই দলের নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন দেখা গেছে। এমন টানাপোড়েন শুধু জাপায় নয়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেও ছিল, এখনও আছে। যেকোনো বড় দলেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ‘পন্থী’রা শক্তিশালী থাকে। শক্তিহীনরা হয় টিকে থাকার চেষ্টা করেন, ধৈর্য ধরেন, না হয় এক সময় ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে ঝড়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা আজ দলে নেই। অনেকে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ পারেননি। বের হয়ে নতুন দল বা জোটে যোগ দিয়েছেন। বিএনপিতেও এমন নজিরের অভাব নেই। বড় দলে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে দলের ঐক্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। এতে দল ও নেতা উভয়ই লাভবান হয়। তা না হলে দলতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ই, দলের নেতারাও একসময় হারিয়ে যান। ১/১১ এর বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিতে অনেকেই তথাকথিত সংস্কারপন্থী হয়েছেন। এতে না দলের, না নিজের লাভ হয়েছে। দুঃসময়ে লড়াইটা চালিয়ে যাওয়াই রাজনীতিকের আসল পরীক্ষা। সুসময়ে সবাই মিছিলের সামনেই থাকে।

স্বাধীনতার পরে দেশের বড় তিনটি দলের ভাঙা-গড়াই আমরা দেখেছি। এর মধ্যে বিএনপি, ও জাপার জন্মই স্বাধীনতার পরে। তবে স্বাধীনতার পরে দলের ভাঙা-গড়ার সবচেয়ে বড় নজির জাসদের। এক সময় দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটি শ্রেণী বিশেষ করে ছাত্র সমাজের একটি অংশের কাছে কয়েকটি শব্দ খুব পরিচিত ছিল-পুঁজিবাদ, বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, সর্বহারা, বিচ্যুতি, বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, হঠকারিতা, বস্তুবাদ, লুটেরা, দ্বন্দ্ব, ধনিক-শ্রেণি, কায়েমী-স্বার্থবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেতো কথাই নেই। মুখে মুখে এসব বুলি। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ শব্দগুলো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই দেশের মেধাবী ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বামপন্থী হয়ে যায়। এরা রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের ছাতার নীচে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে আবার মস্কো, পিকিং আরো নানা পন্থী ছিল। জাসদ শুরুর সে ইতিহাসও অর্ন্তদ্বন্দ্বেরই ইতিহাস, ছাত্রলীগের মধ্যে মেরুকরণের ইতিহাস। এরই মধ্যে নতুন আরেকটি শব্দ চালু হলো রাজনীতিতে। সেটি হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নেই ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ জাসদ গঠন করে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানা ঘটনার পরম্পরায় জাসদ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। এরপর জিয়া ও এরশাদ আমলে জাসদের ভাঙ্গনের খতিয়ান আরও দীর্ঘ। মেজর জলীল, কাজী আরেফ আহমদ, মনিরুল ইসলাম, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ইনু, রব হয়ে জাসদ এখন বর্তমান সুরতে বহাল আছে। বর্তমানে এক দল এক নেতার দল জাসদ। এর মাঝে আছে একাধিক পন্থী। দলের মাঝে ঐক্য ধরে রাখার জন্য জাসদ নেতারা কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু পারেননি। কারণ তারা নিজেরাই স্বার্থের দ্বন্দ্বে মরিয়া ছিলেন।

ছোট দলের জন্য দলের ঐক্য ধরে রাখা সব সময়ই কঠিন। সেটা জাসদ হোক বা জাপা। কারণ, রাজনীতিতে ঐক্যের মূল শক্তি ক্ষমতা অথবা আদর্শ। কিন্তু আমাদের এখানে আদর্শের ভীত বড় নড়বড়ে। আর নিজ শক্তিবলে এসব দলের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটও রচনা হয়নি। ফলে, দলের নেতারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য ক্ষমতায় দৌড়ে অধিকতর কাছাকাকাছি থাকা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য করেছেন। এখানেই ছোট দলের ভাঙনের মূল কারণ নিহিত। এছাড়া অপরের নেতৃত্ব মেনে না নেয়ার সহজাত প্রবণতা মানুষের থাকেই। সেই সাথে আরেকটি বিষয় হলো এসব দলের বড় নেতা ও পরবর্তী ধাপের নেতাদের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের মাঝে দৃশ্যমান তেমন বড় কোনো পার্থক্য নেই। ফলের ঐক্যের মূল ভিত্তি খুবই দূর্বল থাকে। রাজনৈতিক আদর্শ বাদ দিলেও, আওয়ামীর লীগের ঐক্যের ভিত্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার একথা অস্বীকার করা যাবে না। এখানে ঐক্যের একটি ‘পারিবারিক’ ভিত্তিও আছে।

জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের
জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের

 

বিএনপির ক্ষেত্রেও নেতাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি কখনো ক্ষমতায়া যাওয়ার আশা, সেই সাথে জিয়া পরিবার। এর বাইরে একটি রাজনৈতিক আদর্শতো কাজ করেই। এটি শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, নয় শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ভারতের কংগ্রেসের বর্তমান হাল হকিকত দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাহুল গান্ধী পদত্যাগ করেছেন দুই সপ্তাহ, কিন্তু দল এখনও নতুন নেতা নির্ধারণ করতে পারেনি। ব্যক্তি ও পারিবারিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে দলে পরবর্তী নেতৃত্বের পথ রচনা করার কাজটি এখনও শুরু হয়নি।

জাতীয় পার্টিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যারা বের হয়ে গেছেন তারা নিজেরাই নেতা হয়ে একনেতা নির্ভর দল গঠন করেছেন। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) (জেপি) ইত্যাদি নানা উপদলে ভাগ হয়েছে। আসলে এসব বিভক্তি ও ভাঙনের পেছনে কোনো আদর্শ কাজ করেনি। কাজ করেছে ক্ষমতা ও নগদ প্রাপ্তি।

গত এক দশকে জাপা বহুবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে জাপায় কোন্দল চরমে পৌঁছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে বিরাজ করে তীব্র ক্ষোভ ও দ্বন্দ্ব। একপক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছে আরেক পক্ষ চায়নি। এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডও হয়ে গেছে বহুবার। এর পেছনে শুধু দলের অর্ন্তকোন্দলই ছিল নাকি এর পেছনে আরও কারণ ছিল তা নিয়ে কথা হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের ভেতরের দ্বন্দ্ব বাইরে আসেনি, মানে দলে ভাঙন হয়নি।

তারপরও দলে আপাতত দুইটি গ্রুপ আছে। রওশন ও জিএম কাদেরপন্থী এ দু’টো গ্রুপ দলে বহুদিন ধরেই দৃশ্যমান। এনিয়ে এরশাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশনা ও আদেশ জারি করেছেন। পরে আবার সেই আদেশ প্রত্যাখ্যানও করেছেন, করতে বাধ্য হয়েছেন।

গত নির্বাচনের আগে থেকেই এরশাদ অসুস্থ। বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন। দলের ঐক্য বজায় রাখতে বা তার অবর্তমানে দল টিকিয়ে রাখতে কে হবেন জাপার পরবর্তী কর্ণধার, তা নিয়েও তার শঙ্কা ছিল। দলের একটি পক্ষ চেয়েছে রওশনকে সামনে নিয়ে আসতে, আরেক পক্ষ চেয়েছে জিএম কাদেরকে। এছাড়া আগে পরে অন্য পক্ষও সক্রিয় ছিল। তবে সর্বশেষ এই দুটি গ্রপই দৃশ্যমান ছিল। এরশাদ জানতেন হয়তো এ বিরোধ সহজে মিটবে না। তাই তিনি নিজের সম্পত্তি ওসিয়ত করে যাওয়ার পাশাপাশি দলের নেতৃত্বের বিষয়টিও ওসিয়তও করে গেছেন। এরশাদ জাপার গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে তার অবর্তমানে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদেশে থাকাকালে ছোট ভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

এর আগে তিনি কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেছেন আবার সে আদেশ বাতিলও করেছেন। গত ১৪ জুন তার মৃত্যুর পাঁচদিনের মাথায় তার সেই ওসিয়তই পুরণ হলো। কারণ এরশাদ আজ অবর্তমান। তার অবর্তমানে আপাতত জিএম কাদের বর্তমান। দেখা যাক, এই বর্তমানকে জিএম কাদের ভবিষ্যতের কাছে নিয়ে যেতে পারেন কি-না। এই দিনকে তিনি সেই দিনের কাছে তিনি নিয়ে যেতে পারেন কিনা এটাই তার জন্য বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তিনি পাস করলে ফেল করার হাত থেকে হয়তো বেঁচে যেতে পারে জাপা।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আরও পড়ুন: রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র