প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু কতটা প্রাধান্য পাবে?

মাছুম বিল্লাহ
ছয় দিনের সফরে চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্তী শেখ হাসিনা/ ছবি: সংগৃহীত

ছয় দিনের সফরে চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্তী শেখ হাসিনা/ ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছয় দিনের এক সরকারি সফরে বর্তমানে এশিয়ান অর্থনৈতিক জায়ান্ট ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তির অধিকারী চীনে রয়েছেন। বাংলাদেশে বিরাজমান অভ্যন্তরীণ সমস্যাবলির মধ্যে বর্তমানে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে নাজিলকৃত গলার কাঁটা হিসেবে চিহ্নিত সবচেয়ে যে বড় সম্যসাটি রয়েছে সেটি হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা।

এই সমস্যার সাথে মানবিক বিষয়টি যেমন জড়িত তেমনি জঙ্গিবাদের প্রসার, দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তা ও পরিবেশের বিষয়টি জড়িত। এই সমস্যার সাথে কমবেশি বিশ্বের সবাই বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এর রাজনৈতিক সমাধান রয়েছে চীনের কাছে বলে অনেকেই ধারণা করছেন। কৌশলগত কারণে মিয়ানমারের বৃহৎ ও শক্তিশালী প্রতিবেশী চীন শিল্প ও সামরিক কূটনৈতিক দিক দিয়ে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কিত। তাই দেশি ও বিদেশি কূটনীতিকরা আশায় চেয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু কতটা প্রাধান্য পাবে।

ছয় দিনের সফর শুরু হয়েছে ১ জুলাই ২০১৯। এ সফরে প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ঐ বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে আটটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিন চীনের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত ভোজসভায় অংশ নেবেন ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এছাড়া চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান লি ঝানসু ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে শেখ হাসিনার। ঐ বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুটি তিনি তুলবেন। প্রেসিডেন্টও প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করেছেন। শীর্ষ সম্মেলন শেষে দুই দেশ একটি যৌথ বিবৃতি প্রদান করবে। ৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বের প্রায় সব দেশ বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ালেও মূলত চীনের ইতিবাচক সমর্থন না থাকায় রোহিঙ্গারা তাদের ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে পারছে না বলেই আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ও পর্যবেক্ষকদের ধারণা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বহুবার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করেছেন কিন্তু এখনও সমাধান হয়নি।

২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অজুহাতে স্থানীয় কিছু উগ্রবাদী বৌদ্ধের মদদে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিকাণ্ডের মতো নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে পরবর্তী কয়েক মাসে দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলমান জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বিভিন্ন দেশের নেতারা বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বাংলাদেশে এসে স্বচক্ষে রোহিঙ্গাদের অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছেন এবং সমবেদনা জানিয়েছেন।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের ৭৩তম সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণের জন্য কিছু প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। তাছাড়াও বিভিন্ন আঞ্চলিক, দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বার বার বিশ্বাবাসীকে জোরালোভাবে অনুরোধ করেছেন।

২০১৭ সালের নভেম্বরে দুই দেশের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত যৌথ কর্মসভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করে বিষয়টি আর আগায়নি।

২৩ জনু ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলন শেষে প্রকাশিত বিবৃতিতে রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলোর টেকসই ও সমন্বিত সমাধানের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। নেতারা সমাধানের অঙ্গীকারও করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়টি উত্থাপন করেন। এ সময় মিয়ানমার আসিয়ানকে জানিয়েছিল যে, রাখাইনে যারা ফিরে যেতে চায় তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। সেটি কী ধরনের জাতীয় পরিচয়পত্র নাকি অন্য কিছু? রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের জাতীয় পরিচয়পত্রই দাবি করেছে কিন্তু সে ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের স্পষ্ট কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাই সন্দেহ করা হচ্ছে যে, যারা ফেরত যাবে তাদের আগের মতোই নির্দিষ্ট এলাকায় আটকে রাখা হবে নাকি কোন বিশেষ ক্যাম্পে থাকার ব্যবস্থা করা হবে? তাই এ বিষয়টি আর আগায়নি।

এদিকে গণনৃশংসতা ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে কাজ করা নিউ ইয়র্কভিত্তিক সংস্থা 'ফিজিসিয়ান্স ফল ইিউম্যান রাইটস' বা পিএইচআর কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছে। তারা ২৬ জুন একটি প্রতিবেদন পেশ করেছে। এতে হাজার হাজার রোহিঙ্গার উপর মিয়ানমার বাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ জেনোসাইডের নমুনা পাওয়া গেছে। স্থলমাইন ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকালে আটটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক হওয়ার কথা রয়েছে, তার মধ্যে ঋণ চুক্তিও আছে। তবে ঋণ চুক্তিতে অর্থের পরিমাণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। আটটি সমঝোত স্মারক হচ্ছে- ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আওতাধীন এলাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শক্তিশালী ও বৃদ্ধিকরণ চুক্তি, ডিপিডিসি এলাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার শক্তিশালী ও বৃদ্ধিকরণে ঋণ চুক্তি, ডিপিডিসি এলাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার শক্তিশালী ও বৃদ্ধিকরণে ক্রেতা অগ্রাধিকার ঋণ চুক্তি, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের আওতায় পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ চুক্তি, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা চুক্তি, বিনিয়োগ সহযোগিতা বিষয়ে সমঝোতা স্মারক, ইয়ালুজংবো ও ব্রক্ষপুত্র নদে হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য বিনিময় সমঝোতা স্মারক, সাংস্কৃতিক ও পর্যটন বিনিময় সমঝোতা স্মারক। রোহিঙ্গ সমস্যার বিষয়টি এখানে খুব জোড়ালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। চীনও হয়তো বিষয়টিতে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বর্তমান সরকারের অনেক সাফল্যের মধ্যে এটি একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হতে পারে যদি চীনের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসে।

রোহিঙ্গারা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি তারা দেখতে চাইছে না। নিজেদের বাসভূমে ফিরে গেলে তাদের ওপর যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি আবারও সৃষ্টি হবে না, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেনি। তাই, আন্তর্জাতিক মহল যদি ১০ লাখ রোহিঙ্গাদের চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটি দেশে ভাগ করে নিয়ে যায় সেটি একটি সমাধান হতে পারে। বিশ্বের বহু দেশেই জনশক্তির প্রয়োজন রয়েছে। তাছাড়া মানবাধিকারের বিষয়টি চিন্তায় রেখেও তারা অনেকগুলো দেশে রোহিঙ্গাদের ভাগ করে নিয়ে যেতে পারে আর মিয়ানমারকে সমস্যা সমাধানে ভিন্ন কৌশলে চাপ প্রয়োগ করতে পারে।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিকে কর্মরত।

আপনার মতামত লিখুন :