সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হতে হবে মন্ত্রী-এমপিদের

রেজা-উদ্-দৌলাহ প্রধান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’—গত এক দশকে বাংলাদেশে বহুল প্রচারিত ও আলোচিত স্লোগান। ডিজিটাল বাংলাদেশ স্লোগানকে সামনে রেখে নবম সংসদ নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মকে দারুণ আকৃষ্ট করেছিল আওয়ামী লীগ। শুধু তরুণ প্রজন্ম নয়, প্রবীণরাও দারুণভাবে স্বাগত জানিয়েছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রচারণাকে।

টু-জি, থ্রি-জি, ফোর-জি ঘুরে বাংলাদেশ এখন ফাইভ-জি মোবাইল নেটওয়ার্ক চালুর দ্বারপ্রান্তে। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের মানুষ প্রযুক্তিবান্ধব। যেকোনো নতুন প্রযুক্তি মানুষের সামনে এলে মানুষ সেটা সাদরেই গ্রহণ করে। যেমন বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে মোবাইলফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৫ কোটি ছাড়িয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৮ কোটি ৪৫ লাখ ৪৫ হাজার। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মার্চ মাসে প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে ১৫ লাখ ১৪ হাজার গ্রাহক বেড়ে এখন তা দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ২ লাখ ৮৩ হাজার। মাত্র এক মাসে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়েছে ১৪ লাখ।

ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৬০-৭০ শতাংশই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী। বিশেষ করে ফেসবুক ব্যবহারে দারুণ সক্রিয় তারা। গ্রাম কিংবা শহর, তরুণ কিংবা প্রবীণ, ছেলে, মেয়ে নির্বিশেষে অনেকের ফেসবুক ছাড়া দিনই চলে না।

তবে শুধু ফেসবুক নয়, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই সক্রিয় আছেন টুইটার, হোয়াটস অ্যাপ, ইন্সটাগ্রাম, টেলিগ্রাম, লিঙ্কড্ ইন, টিন্ডার, ট্যান্টন, উইচ্যাটসহ নানা ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। টেলি কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী বিপ্লব নিয়ে এসেছে এই সামাজিক যোগাযোগধ্যমগুলো। এগুলোর ব্যবহার যেমন মানুষের মাঝে ‘দূরত্ব’কমিয়েছে ঠিক তেমনি নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জের সামনেও ফেলে দিয়েছে আমাদেরকে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যেমন কোনো গুজব অপপ্রচার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে, ঠিক তেমনি সঠিক তথ্য প্রচার গুজব প্রতিহতেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। আমেরিকা, ভারত, বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব কতুটুক শক্তিশালী হতে পারে সে চিত্র আমরা দেখতে পাই।

মানুষকে প্রভাবিত করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপার সুযোগটি গ্রহণ করে অনেক রাজনীতিবিদ, পাবলিক সেলিব্রেটি, তারকারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকেই নিজেদের প্রচারমাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কিংবা বলিউডের প্রিয়াঙ্কা চোপড়া থেকে ঢালিউডের তাহসান খান সকলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে বেছে নিয়েছেন নিজেদের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে। কেননা নিজের সম্পর্কে সঠিক তথ্য নিয়ে এর মাধ্যমে খুব সহজেই লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারেন তারা। কিন্তু প্রায় উল্টাচিত্র বাংলাদেশে!

বাংলাদেশ সম্ভবত পৃথিবীতে একমাত্র দেশ, যার সরকারের স্লোগানে ‘ডিজিটাল দেশ গড়া’ হলেও এখানে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর কোনো ভেরিফায়েড ফেসবুক, টুইটার অ্যাকাউন্ট নেই। এমনকি তাঁদের কার্যালয়ের নামেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির নামে অনেক ভুয়া অ্যাকাউন্ট সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই পাওয়া যায়। সেসব ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে অনেক সময় মিথ্যা, আপত্তিকর তথ্য ও ছবি শেয়ার করা হয় যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অথচ, ভেরিফায়েড একাউন্ট থাকলে এসব ফেক একাউন্ট থেকে কিছু প্রচার করা হলেও সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতো না। তারা বুঝতে পারত এগুলো ভেরিফায়েড একাউন্ট নয়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী-এমপিদের ফেক একাউন্ট খোলার প্রকোপও কমে যেত।

শুধু সরকারের মন্ত্রী-এমপি নয়, অন্যান্য দলের নেতা-নেত্রীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ৯০ বছর বয়সী সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার থেকে দূরে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলের নেতা-নেত্রীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় না। অনেকে সক্রিয় হলেও তাদের নেই কোনো ভেরিফায়েড পেজ। তবে কারান্তরিন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার টুইটারে একটি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট দেখতে পাওয়া যায়।

অনেক সেলিব্রিটি, লেখক ও টকশো বক্তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সক্রিয়। কিন্তু তাদের নামেও রয়েছে এক বা একাধিক ফেক একাউন্ট। ফলে, এসব ফেক একাউন্ট থেকে আপত্তিকর ও বিতর্কিত কিছু প্রচার করা হলে এগুলোকে তারা নিজের একাউন্ট হিসেবে অস্বীকার করেন। কারণ, তাদের নামে অন্য ইউজার এসব একাউন্ট খুলে প্রচারণা চালাচ্ছে। ফলে, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী-এমপি ও সেলিব্রিটিদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পেজগুলো ভেরিফায়েড হওয়া জরুরি।

কিন্তু আমাদের সংসদের ৩০০ সদস্য কিংবা মন্ত্রিসভার ৪৭ সদস্যের বেশিরভাগেরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট নেই। কারো কারো অ্যাকাউন্ট থাকলেও সেখানে তারা সক্রিয় নন। এছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম যেমন বিটিভি, বাসস, বেতারের নামে ফেসবুক অথবা টুইটারে অ্যাকাউন্ট থাকলেও কোনোটাই ‘ভেরিফায়েড’ নয়। এমনকি বিদেশে যেসব বাংলাদেশের দূতাবাস আছে, কোনোটিরই আইডি ভেরিফায়েড নয়।

অথচ আধুনিক এই যুগে কোনো রাষ্ট্রের সরকার প্রধান, মন্ত্রীদের ফেসবুক, টুইটার আইডি ‘ভেরিফায়েড’ হবে না, এটা আজকাল চিন্তাই করা যায় না। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভূটানের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, অধিকাংশ এমপি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়। প্রায় সবারই ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট আছে। অ্যাকাউন্টগুলোতে লাখ লাখ ফলোয়ার তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম সম্পর্কে আপডেট থাকতে পারছে। শুধু তা-ই নয়, এসব একাউন্টের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা একে অন্যকে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। টুইটারে তাদের ছোটোছোটো শুভেচ্ছা বার্তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রচার পায়। দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও রয়েছে এর ইতিবাচক প্রভাব। সময় বদলেছে, তাই এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।

এছাড়া জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনেরও সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই জানা যায় মানুষের মনোভাব। এ প্লাটফর্মকে অস্বীকার করা মানে আজকের বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া। মানুষের রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ, মান-অভিমান, সুখ, আনন্দ, বেদনা—সব অনুভূতি, অবস্থা ও অবস্থান আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দৃশ্যমান। অথচ, এই বিশাল জনসমাবেশে দেশের মন্ত্রী-এমপি, নেতা-নেত্রী, সেলিব্রিটি, বুদ্ধিজীবীরা কোথায়? কে শুনবে আমাদের কথা?

পশ্চিমা বিশ্বের কথা না-ই বা বললাম! তথ্যপ্রযুক্তি এমনকি উন্নয়নের দিক থেকে বাংলাদেশের তুলনায় পিছিয়ে থাকা অনেক দেশের সরকারের মন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিকরা বিকল্প প্রচার মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক, টুইটার ব্যবহার করছেন। ভেরিফায়েড একাউন্টের মাধ্যমেই তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন। অথচ আমরা এখনো তিমিরেই পড়ে আছি!

রেজা-উদ্-দৌলাহ প্রধান
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম

আপনার মতামত লিখুন :