এই ধর্ষণ উপত্যকাই আমার দেশ!

এরশাদুল আলম প্রিন্স, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
এরশাদুল আলম প্রিন্স/ ছবি: বার্তা২৪.কম

এরশাদুল আলম প্রিন্স/ ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি কবি নই, কবিতা লেখার মতো কঠিন কিছু আছে কি? যিনি কবি, তিনি তো দার্শনিক। ভবিষ্যৎ তার কাছে বর্তমান হয়ে ধরা দেয়। আর অতীত, সেতো কবির কাছে এক সোনালী স্বপ্ন-যেনো এক সোনালী কাবিন। তাই কবি যা বলেন, তা আমাদের কাছে স্বপ্ন বলে মনে হয়, অথবা কখনো মনে হয় অবাস্তব কল্পনা। দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র, সংসার, ধর্ম-অর্ধর্ম-আমাদের কাছে এক, কবির কাছে আরেক।

১৯৭২ সালে ভারতের কবি নবারুণ ভট্টাচার্য একটি কবিতা লিখেছেন। ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না/এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না/এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না/এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না।’ কিন্তু পাঁচ দশক পরে আজকের এই বাংলাদেশের কোনো কবি কীভাবে অস্বীকার করবেন যে এই মৃত্যু উপত্যকাই তার দেশ? অপরাধী, ধর্ষক ও জল্লাদদের উল্লাসমঞ্চ ও রক্তস্নাত কসাইখানাই কি আজ আমার দেশ নয়?

কবি বলেছেন, যে পিতা সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে ভয় পায়, আমি তাকে ঘৃণা করি/যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে আমি তাকে ঘৃণা করি/যে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কবি ও কেরানি প্রকাশ্য পথে এই হত্যার প্রতিশোধ চায় না আমি তাকে ঘৃণা করি।

কিন্তু হে কবি, আজ এই বঙ্গভূমিতে বাবারা শুধু সন্তানের লাশ শনাক্ত করতেই ভয় পান না, লাশটি যে তার সন্তানের সে পরিচয় দিতেও ভয় ও লজ্জা পান। শুধু বাবাই কেন? মা- যে সন্তানের জন্য তার জীবন কোরবান, সেই কলিজার টুকরা সন্তানের লাশও দেখতে চান না, এমনকি মা হিসেবে পরিচয় দিতেও চান না। আজ আমরা তেমনই এক রাষ্ট্র ও সমাজেরই একেকজন বাবা-ভাই-সন্তান অথবা মা-বোন-বউদি।

আসলে সমাজ বদলেছে। কবি যতো দূরদর্শী ও দার্শনিকই হোন না কেন, হালে বঙ্গভূমির এই সমাজের কাছে কবিদের প্রেম, ঘৃণা, কামনা, দর্শন সবই মার খেয়ে গেছে। ভালোবাসা আজ এক ধর্ষিত গোলাপ, আর ঘৃণা সেতো বঙ্গভূমির ভণ্ড বন্ডেরই রক্তান্ত রামদা। তফাৎ শুধু একটাই-ওই বন্ডকে সৃষ্টি করেছেন আয়ান ফ্লেমিং, আমরা জানি না, আমাদেরটা কে। তাই শুধু অন্ধকারেই খুঁজে ফিরি পেশিবহুল রামদার কামারকে। কিন্তু আমরা খুঁজে পাই না।

সন্ত্রাসের গডফাদার ও কারিগরদের খুঁজে পাওয়া এতো সহজও না। খুঁজে পাব কী করে? অযুত-নিযুত মৃত নুসরাত, সায়মার স্থির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমরা যে ক্লান্ত, হারিয়েছি দৃষ্টি। তাই রক্তাক্ত সায়মা, নুসরাত, রাজনদের নিথর দেহ দেখে এখন আর চোখে প্রতিরোধের আগুন জ্বলে না, ঝড়ে না বেদনার বৃষ্টি। পাশ ফিরে তাকানোরও ফুসরত নেই। কী-ই বা হবে এসব দেখে। কিছুদিন, কিছু কথা। তারপর ভুলে যাওয়ার দীর্ঘ তালিকা।

কত আর মনে রাখা যায়? আগে বছরে একটা দুইটা নির্যাতনের ঘটনা ঘটত, যা পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের চেতনাকে ছুঁয়ে যেত। ১৯৭৬ সালে রাজশাহীতে নীহারবানু হত্যাকাণ্ডের কথা আমরা ভুলে গেছি। এর দুই বছর পর সালেহা হত্যাকাণ্ড। এরপর সিকো বর্মন, সীমা চৌধুরী, শবমেহের, মৌলভীবাজারের নূরজাহান, দিনাজপুরের ইয়াসমিন আরও কত নাম যোগ হয়েছে এর সঙ্গে তার হিসাব নেই। কিন্তু এখনকার হিসাবটা প্রতিদিনের। প্রতিদিনই কেউ না কেউ হচ্ছে সালেহা, সীমা, শবমেহের, নূরজাহান, ইয়াসমিন, নূসরাত। হাপিয়ে উঠেছে মানুষ, অশুরেরা মুক্ত।

প্রতিবাদ যে একেবারে হচ্ছে না তা নয়, তবে তা প্রতিকারহীন নিষ্ফল আস্ফালন। তবু বেঁচে থাকতে হয় রক্ত ও অশ্রু মিশ্রিত এ কোলাজকৃত সমাজে। বিচারের দেবী বুঝি আজ একেবারেই অন্ধ হয়ে গেছে। ‘জাস্টিস হারিড ইজ জাস্টিস বারিড’ আর ‘জাস্টিস ডিলেড ইস জাস্টিস ডিনাই’-এই দুই প্রবাদের গ্যারাকলে পড়ে বিচার দেবী লেডি জাস্টিসিয়াও আজ কিংকর্তব্যবিমূঢ়!

আসলে আমরা প্রতিবাদ করতে ভুলে গিয়েছি। চোখের সামনে কাউকে মরতে দেখলে তাড়াতাড়ি পালানোর চেষ্টা করি, পাছে, কেউ দেখে ফেলে। এমনকি কেউ অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকলেও সাহায্য করতে ভয় পাই। যদি কোনো সমস্যায় পড়ি। আসলে এ সমাজে আমরা সবাই বড্ড একা। আজ আমি একা, কাল আপনি একা। এখানে কেউ কারো নয়। একজনের বিপদে, মৃত্যুতে আমি যেমন এগিয়ে যাইনি, আমার জন্যও কেউ এগিয়ে আসবে না। আমরা সবকিছু দেখতে পছন্দ করি। তাই শুধু দেখেই যাই।

নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী প্রকাশ্য দিবালোকে একজন মানুষকে কোপাল, কেউ একটু এগিয়ে এল না। সবাই দেখল। কেউ ভিডিও করল। কে দোষী, কে নির্দোষ, সেটি পরের কথা। কিন্তু নয়ন বন্ড সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। যারা এসব ঘটনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে তাদেরকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে রিফাত ফরাজী আর নয়ন বন্ডরা রামদা প্রদর্শন করেছে। একজনকে ক্রস ফায়ারে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে কি সমাধান আছে? কম তো হলো না। কিন্তু সমাজ কি অপরাধমুক্ত হয়েছে, নাকি অপরাধের প্রবণতা কমেছে? কিছুই হয়নি, হবেও না কিছু। কারণ, প্রয়োজন বিচার ও আইনের শাসন। আইন ও বিচারের চেয়ে শক্তিশালী কিছু নেই। কাগজের বাঘকে কেউ ভয় পায় না। তাই আইনের শাসন জরুরি, বিচার দৃশ্যমান হওয়া চাই।

এই যে ছোট্ট শিশু সায়মা। বয়স সবে সাত। ধর্ষণে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে তার ছোট্ট শরীরটি। এটাই কি প্রথম? নাকি এটাই শেষ? এর আগেও তিন-চার বছরের শিশুদের ধর্ষণ করা হয়েছে। সায়মার ধর্ষক ধরা পড়েছে, বলছে পুলিশ। দ্রুত বিচার হোক এটাই কাম্য। দেশের সব ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিচার হোক। বিচার হোক আইনি প্রক্রিয়ায়। তবেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে। আমরা কখনোই চাই না- এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ হোক, ধর্ষকদের উল্লাসমঞ্চই আমার দেশ হোক।

আপনার মতামত লিখুন :