একজন এরশাদ

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের তারুণ্য ও যৌবন কেটেছে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে। আমাদের শিক্ষাজীবনের একটা বড় অংশ বিনষ্ট হয়েছে এরশাদের সামরিক শাসনে সৃষ্ট ভ্যাকেশন ও সেশনজটে। আমাদের প্রজন্মের প্রায় সবার কাছেই এরশাদ একজন নেতিবাচক চরিত্র।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদের আগমন নাটকীয়। পেশাগত জীবনে ক্ষমতা ও রাজনীতির ত্রি-সীমানায় তিনি ছিলেন না। অ্যাম্বিশান দেখাননি কখনো। চুপচাপ পেশাদারিত্বে নিরাপদে কাটিয়েছেন চাকরি জীবন। অকস্মাৎ, আশ্চর্যজনকভাবে সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা-অভুত্থানের রক্ত পিচ্ছিল পথে সেনাপ্রধান থেকে তিনিই রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ পদে আসীন হন।

এরশাদের উত্থান ঘটে আশির দশকের গোড়ার দিকে। তারপর নব্বই দশকের শুরুর দিনগুলো পর্যন্ত তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে থাকলেও রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সমর্থন তিনি পাননি। তার আমলে নির্বাচন ব্যবস্থা চরম অবক্ষয়ের শিকার হয়। হোন্ডা আর গুণ্ডা দিয়ে নির্বাচনে জেতার সংস্কৃতি চালু করেন এরশাদ।

Ershad
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

 

গণভোট, জাতীয় নির্বাচন ইত্যাদির আয়োজন করলেও লেজিটিমেসি বা বৈধতা বলে যে কথাটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিভাষায় রয়েছে, তা তিনি অর্জন করতে পারেননি। বৈধতার সঙ্কট নিয়েই তাকে ক্ষমতায় থাকতে ও ক্ষমতা ত্যাগ করতে হয়। তার অনেকগুলো বিশেষণের মধ্যে স্বৈরাচার, বিশ্ব বেহায়া ইত্যাদি ছিল প্রধান।

ক্ষমতার দশ বছর পেরিয়ে এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও তিরিশ বছর সরব ছিলেন। একটি বিষয় তার সব সমালোচনার পরেও ইতিবাচক হয়ে আছে, তা হলো- ক্ষমতাচ্যুৎ হলেও তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। দেশেই থেকেছেন। রাজনীতি করেছেন। জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। এখানেই অন্যান্য ক্ষমতা দখলকারী স্বৈরাচারের সঙ্গে এরশাদের আচরণগত পার্থক্য।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে তার দল জাতীয় পার্টিকে নিয়ে তিনি চলতে চেয়েছেন। তবে, পরিতাপের বিষয় হলো- যে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন, ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়েও তিনি সেই ষড়যন্ত্রের কবলে পড়েন। বড় দলগুলো তাকে জেলে রেখে বা চাপে রেখে সুবিধা নিয়েছে এবং অনেক ধরনের চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি নানা রকমের নাটক করেছেন। এসব ঘটনায় তার প্রতি জনসমর্থন বা জনসহানুভূতি কতটুকু বেড়েছে, তা স্পষ্ট না হলেও তার প্রতি জনকৌতূহল যে এন্তার বেড়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

রাজনৈতিক কৌতুহলের পাশাপাশি এরশাদের ব্যক্তিগত আচরণ ও নারীঘটিত বিষয়াদি তাকে আরও বেশি আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে। এসব আলোচনা যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত, অস্বাস্থ্যকর ও হাস্য-রসাত্মক।

Ershad
বন্যার্তদের পাশে এরশাদ /ছবি: সংগৃহীত

 

বস্তুত, ক্ষমতা ও ক্ষমতার বাইরে এরশাদ একজন আলোচিত ব্যক্তি ছিলেন কিন্তু আস্থাভাজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন কিনা, তা চট করে বলা যায় না। জাতীয় রাজনীতিতে তার কিছু অংশগ্রহণ থাকলেও জাতীয় নেতৃত্বের ঐতিহ্যবাহী-সুদীর্ঘ তালিকায় তার নাম সংযুক্ত হওয়ার বিষয়টিও আজকেই নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না। বরং উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশের রাজনৈতিতে নেতিবাচক চরিত্রের কাফেলায় তিনি সগৌরবে থাকবেন। যেখানে আগে থেকেই আছেন সামরিক স্বৈরশাসক ইস্কান্দার মির্জা, আইয়ুব খান, আ. মোনেম খান, ইয়াহিয়া খান প্রমুখ।

কিন্তু এরশাদ অনেকগুলো বিষয়ে অন্যান্য স্বৈরশাসকের চেয়ে আলাদা হয়ে আছেন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে তিনি এমন কিছু কাজ করেছেন, যেগুলোকে অস্বীকারও করা যায় না। তার ওষুধ নীতি, ভূমি সংস্কার, যোগাযোগ ও উন্নয়ন নেটওয়ার্ক তৈরির প্রচেষ্টার কিছু সুফল এখনো পাওয়া যাচ্ছে।

ফলে বস্তুনিষ্ঠ রাজনৈতিক মূল্যায়নে একজন ব্যক্তি মানুষ ও শাসক হিসেবে এরশাদের প্রসঙ্গে অনেকগুলো সমালোচনার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ভালো কথাও থাকবে। গণতন্ত্র ও সামরিক শাসনের প্রশ্নে নীতিগত তীব্র বিরোধিতা করার পরেও আমরা এরশাদের জনকল্যণকামী প্রচেষ্টা ও সংবেদনশীল মনের পরিচয়ও লক্ষ্য করব।

কঠোর সামরিক শাসক হিসেবে গণতন্ত্রকামী হাজার হাজার মানুষের জেল-জুলুমের কারণ ও জীবন অতিষ্ঠকারী এই চরিত্র, খুবই আশ্চর্যজনকভাবে একজন কবি হতে আগ্রহী ছিলেন। ‘কনক প্রদীন জ্বালো’ নামের একটি কাব্যগ্রন্থ তার আছে। আর আছে দলমত নির্বিশেষে সমকালীন অগ্রণী কবিদের অর্থ, বিত্ত এবং বনানী-গুলশানে প্লট দেওয়ার কোমলতা।

সন্দেহ নেই, ক্ষেত্র বিশেষে এইসব পক্ষপাত এরশাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক কার্যক্রমকে সমর্থন করার নৈতিক শক্তি দেয় না। তার অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক তকমাকেও আড়াল করে না। বরং তাকে ইতিহাসের সংকুল সময়ের এক হতভাগ্য মানুষ হিসেবেই আমাদের সামনে দাঁড় করায়।

Ershad
ত্রাণ বিতরণ করছেন এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

 

ক্ষমতা দখল করে তিনি ব্যক্তিগত লাভ এবং ঐতিহাসিক স্বীকৃতির কোনটা কতটুকু পেয়েছেন, এ প্রশ্নটিও ইতিহাসের নিরিখে অমীমাংসিত থাকে। ক্ষমতার রাজনীতির পাশা খেলায় বহুবার ব্যবহৃত হয়ে জীর্ণ ও অকেজো অবস্থায় তিনি ইতিহাসের কাছে কীরূপ মূল্যায়ন পাবেন, তা জানার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

কারণ, বিপরীতমুখী দু’টি মাছের প্রতীক রাশি মীনের জাতক হিসেবে এরশাদের অবস্থান সমালোচনা ও প্রশংসার ক্রসরোডে। ‘মিস্টার হাইড অ্যান্ড মিস্টার জেকিল’ উপন্যাসের চরিত্রের মতোই তারও পরস্পর-বিরোধী দু’টি সত্ত্বা অতি স্পষ্ট।

একদিকে তিনি ক্ষমতা দখল ও নিপীড়ন করেছেন এবং অন্যদিকে বেনিভোলেন্ট ডিকটেটর বা জনমুখী স্বৈরাচারের মতো মানুষের কাছে গিয়েছেন। বন্যায়, বির্পযয়ে ‘তোমাদের পাশে এসে বিপদের সাথী হতে আজকের চেষ্টা আমার’ গান বাজিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন। দলের লোকদের দিয়ে নিজেকে ‘পল্লীবন্ধু’ আখ্যা দিয়েছেন।

স্বৈরতান্ত্রিকতা আর মানবিকতার সুতীব্র দোদুল্যমানতায় একজন এরশাদ শেষ বিচারে ইতিহাসের তুলাদণ্ডে কোন ব্যক্তিত্ব ও পরিচিতিতে গৃহীত হবেন, একমাত্র মহাকালই যথাসময়ে তা জানাতে পারবে।

আপনার মতামত লিখুন :