'গণ'তে এক নক্ষত্র মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

তুষার আবদুল্লাহ
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সাধ জাগলেও অনেক কিছুই সাধ্যে কুলোয় না। তারপরও সাধ মেটানোর তাড়না দমিয়ে রাখা যায় না। যেমন রাখতে পারছি না মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে নিয়ে কিছু লিখবার তাড়া। শিশু দর্শক হিসেবে যাদের টেলিভিশন উপস্থিতি আমাকে স্পর্শ করেছিল, সেই বিরলদের একজন জাহাঙ্গীর ভাই। বরাবর পরিশীলিত ও পরিমিত উচ্চারণ। শুধু কি বচনে? পোশাক ও শারীরিক ভাষাও কতো মার্জিত। কতো বিষয় নিয়ে যে বিটিভিতে উপস্থিত হয়েছেন এবং আমি তা হজম করেছি, বড়বেলায় এসে তা স্মরণে আনতে পারছি না।

কিন্তু একেবারেই সেদিনের অনুষ্ঠান বলে স্মৃতিতে আছে অভিমত। বিটিভিতে সামাজিক সঙ্কট নিয়ে ফোন ইন অনুষ্ঠান ছিল অভিমত। দর্শকের ফোন, স্টুডিওতে উপস্থিত বিশ্লেষক, সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এমন অনুষ্ঠান তৈরি ও সম্প্রচারের মুরোদ এতোদিনে বেসরকারি টেলিভিশনও দেখাতে পারেনি।

অভিমতের মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর এখনো আমার করোটিতে কথা বলে চলছেন। নিজে যখন গণমাধ্যমে, তখন এই বিষয়ক বইয়ের খোঁজ খবর নিতে থাকি। পাঠাগার, ফুটপাত খুঁজে বেড়াই সাংবাদিকতা বিষয়ক বই। এই তল্লাশিতে নির্ভরযোগ্য বই হিসেবে হাতে উঠে আসে মুহম্মদ জাহাঙ্গীরের বই। একাধিক বই সংগ্রহ করেছিলাম তাঁর। উপকৃত ও সমৃদ্ধ হয়েছি। টেলিভিশনে দেখা ওিই মানুষটির সঙ্গে দেখা হবে, এমন স্বপ্ন দেখিনি কখনো। সাধ্যের বাইরে বলেই হয়তো স্বপ্নও দেখা হয়নি।

jahangir
ছবি: মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, ছবি:সংগৃহীত

 

গণমাধ্যমে বয়স বাড়তে বাড়তে এক সময় একটি পত্রিকা বের করার সাধ হলো। গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিষয়ক পত্রিকা ‘মাধ্যম’। ওই পত্রিকার জন্য জাহাঙ্গীর ভাইয়ের একটি সাক্ষাৎকার নেবার বায়না করলাম। ভয়ে ভয়ে। কখনও কথা হয়নি। সরাসরি দেখা হয়নি। ফোনের আলাপনে মনে হলো আমরা দীর্ঘদিন একে অপরকে জানি। মগবাজার তাঁর অফিসে যখন মুখোমুখি- তখন গণমাধ্যমকে বহুমাত্রিকতায় দেখে যাচ্ছি।

বেসরকারি টেলিভিশন সাংবাদিকতায় এক দশক পেরিয়েও মনে হচ্ছিল, কোনো টেলিভিশনই গণমাধ্যম হিসেবে দুই আনা দায়িত্ব পালন করেনি। মিডিয়া স্বাক্ষরতা হয়নি আমাদের কারোরই। মাধ্যম আয়োজিত একটি সাংবাদিক প্রশিক্ষণে জাহাঙ্গীর ভাইকে দাওয়াত করি। তিনি ভাবিসহ সিলেট যান। এক বিকেলে সিলেট শহরের এক রেস্টুরেন্টে চায়ের আড্ডায় বসি। জাহাঙ্গীর ভাই, ভাবি, স্থপতি ইকবাল হাবিব, কাকলী প্রধান। আমার সেই রাতেই ঢাকায় ফিরতে হবে। তাই উত্তাল আড্ডা রেখে উঠে পড়তে হয়েছিল। জাহাঙ্গীর ভাই বলছিলেন, যাত্রা বাদ দেওয়া যায়? ঢাকায় ফেরার তাড়া যাত্রা থামাতে পারেনি। যেমন জাহাঙ্গীর ভাইও থামাতে পারলেন না তাঁর যাত্রা। ঔদ্ধত্য আচরণ করে ফেলেছিলাম আমি তাঁর সঙ্গে দুই দফা। তাঁকে দাওয়াত করে এনেছিলাম আমার অনুষ্ঠান সময় সংলাপে। আমি বিব্রত। যিনি সঞ্চালনার পুরোধা ব্যক্তি, তাঁর সামনে আমি সঞ্চালক? দুই দফাই তাঁকে শিক্ষকের আসনে বসিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করেছি।

অনেক দিন দেখা বা কথা হচ্ছিল না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর ছবি দেখি কয়েকদিন আগে। আঁতকে উঠি। তাঁকে দেখেই মনে হচ্ছিল ভীষণ অসুস্থ। ফোন দেব দেব করে দেওয়া হচ্ছিল না। নাগরিক আলসেমি। মঙ্গলবার সকালে বন্ধুবর তপু হাসান জানালেন- তিনি জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। বুধবার মধ্যরাতে জানলাম তাঁর সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার কথা। দীর্ঘশ্বাস ফুরোচ্ছে না। তাঁর দেবার যা সাধ্য ছিল, আমরা তা নেওয়ার উদারতা দেখাতে পারিনি। সামাজিক, রাজনৈতিক সংকীর্ণতা আমাদের দরিদ্র করে রাখে এমন করেই।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন।

আপনার মতামত লিখুন :