Barta24

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

প্রসঙ্গ রিকশা

মাথা ব্যথার চিকিৎসা মাথা কেটে ফেলা নয়

মাথা ব্যথার চিকিৎসা মাথা কেটে ফেলা নয়
ছবি. বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
প্রভাষ আমিন
হেড অব নিউজ
এটিএন নিউজ


  • Font increase
  • Font Decrease

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম আগামী দুই বছরের মধ্যে ঢাকাকে রিকশাশূন্য করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আমি তার প্রত্যয়ের সঙ্গে একমত। দুই বছরের মধ্যে হয়তো নয়, তবে আগে আর পরে ঢাকা একসময় রিকশাশূন্য হয়ে যাবে। এটাই যুগের চাহিদা, সময়ের দাবি। এখন যেমন ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। একটা সময় হয়তো ঢাকার একটি বা দুটি রাস্তায় রিকশা চলবে। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে গাড়ি দিয়ে রিকশা চড়তে আসবে। এটা কল্পনা নয়। একসময় ঢাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি। এখন শুধু গুলিস্তান থেকে সদরঘাট রুটে কয়েকটি ঘোড়ার গাড়ি চলে।

আরো কত পেশা আমাদের চোখের সামনে হারিয়ে গেছে। গুলিস্তানে একসময় ফুটপাতে স্টুডিওতে বক্স ক্যামেরায় ছবি তোলা হতো। সেগুলো তো গেছেই, বড় বড় স্টুডিও হারিয়ে যাওয়ার দশা। এক মোবাইলেই খেয়ে ফেলেছে কত কিছু। এই ঢাকায় একসময় তিন চাকার বেবি ট্যাক্সি চলত, মিশুক চলত। এখন হারিয়ে গেছে। মুড়ির টিন হিসেবে পরিচিত কিছু লক্কড়-ঝক্কড় বাস চলতো ঢাকায়, এখন সেগুলো জাদুঘরে গেলেও দেখা যাবে না। তাই রিকশাও হয়তো একসময় কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। কিন্তু সেই সময় আসেনি এখনো, আগামী দুই বছরেও যে আসবে না, আমি নিশ্চিত। যতদিন দেশে রিকশা চালানোর মতো মানুষ থাকবে, যতদিন রিকশায় ওঠার মতো মানুষ থাকবে; ততদিন আপনি রাজধানীকে রিকশাশূন্য করতে পারবেন না। সময়ের আগে কিছু করতে চাইলে বিক্ষোভ হবে, মারামারি হবে, অবরোধ হবে, ভোগান্তি হবে।

রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে রিকশা বন্ধ হবে

ঢাকায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ১১ লাখের মতো রিকশা আছে। এরমধ্যে বৈধ রিকশা আছে মাত্র ৮০ হাজারের মতো। বাকি সবই অবৈধ। ১৯৮৬ সালের পর আর রিকশার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তার মানে ১৯৮৬ সাল থেকেই রাজধানীকে রিকশাশূন্য করার পরিকল্পনা চলছে। কিন্তু অনুমোদন না দিলেও চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে রিকশার সংখ্যা খালি বেড়েছেই। এই যে মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি, রিকশাসহ সব ধরনের ধীরগতির যান চলাচল বন্ধে এত কথা বলা হচ্ছে। মহাসড়কে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ এই ধীরগতির যান চলাচল। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। চাহিদ আছে, তাই চলছে। এখন প্রধানমন্ত্রী সকল মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। আপাতত এটাই সমাধান। আর বাংলাদেশে প্রথানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া কিছুই হয় না। ঢাকায় রিকশা বন্ধের ব্যাপারেও এমন কোনো সমাধান লাগবে। মাথা ব্যথা বন্ধের সমাধান কখনোই মাথা কেটে ফেলা নয়।

ঢাকা শহরে কারা রিকশা চালায়? পুরান ঢাকার আদি ঢাকাইয়ারা নিশ্চয়ই নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে-প্রান্তে থাকা অতি দরিদ্র মানুষরা একসময় প্রান্তচ্যুত হয়ে যায়। তখন তারা শেষ আশ্রয় হিসেবে ঢাকায় ছুটে আসে। নদী হয়তো কারো সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। বন্যা হয়তো কারো ফসল ভাসিয়ে নিয়েছে। কেউ হয়তো বারবার ধান চাষ করে ফতুর হয়েছেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/10/1562766617913.jpg
একসময় মুড়ির টিন হিসেবে পরিচিত কিছু বাস চলতো ঢাকায় / ছবি. মিশেল লরেন্ট

 

শখ করে কেউ রিকশা চালায় না। রিকশা অনেক কায়িক পরিশ্রমের কাজ। পেট চালানোর আর কোনো উপায় না থাকলেই মানুষ রিকশা চালায়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা আয়ের যে কথা আমরা বলি, তা সবচেয়ে ভালো খাটে রিকশাওয়ালাদের ক্ষেত্রে। আমার ক্ষমতা থাকলে আমিও রিকশা চলাচল বন্ধ করে দিতাম। একজন মানুষ রিকশায় বসে থাকবে। আর তার চোখের ঠিক সামনে বসা মানুষটির শরীর ঘামে ভিজে যাবে, এই দৃশ্য অমানবিক। কিন্তু তারচেয়েও অমানবিক তাদের পেট চালানোর বিকল্প ব্যবস্থা না করে তাদের আয়ের উৎসটি বন্ধ করে দেওয়া। ঢাকায় ১১ লাখ রিকশা আছে মানে কিন্তু শুধু ১১ লাখ রিকশাচালক বা তাদের পরিবার নয়। রিকশার মালিক, রিকশার গ্যারেজ, রিকশার মেরামত, রিকশার যন্ত্রাংশ, রিকশা থেকে চাঁদাবাজি; সব মিলিয়ে রিকশাকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকারটা বেশ বড়।

আমি জানি, ঢাকার অসহনীয় যানজটের একটা প্রধান কারণ রিকশা। তাই পর্যায়ক্রমে রিকশা তুলে দিতে হবে। তবে হুট করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তই কার্যকর হয় না। ঢাকায় রিকশা বন্ধ করে দিলে রিকশাওয়ালারা গ্রামে চলে যাবে। আর তাহলে গ্রামে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাবে, এমন ভাবনা যাদের মাথায়, তাদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। ঢাকাকে রিকশামুক্ত করতে হলে পর্যায়ক্রমে রিকশা তোলার কথা ভাবতে হবে এবং রিকশাচালকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের কথাটিও মাথায় রাখতে হবে।

আমা‌দের হাঁটার অভ্যাস করা উ‌চিত : সাঈদ খোকন

রিকশা বন্ধ করে দিলেই তো আর রিকশাচালকরা গ্রামে ফিরে যাবে না। তারা চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই করবে। আচ্ছা রিকশাচালক বা তাদের পরিবারের কথা আপনি না হয় নাই ভাবলেন; রিকশা যাত্রীদের কথা তো আপনাকে ভাবতেই হবে। রিকশার চাহিদা আছে বলেই তো এর সংখ্যা বেড়েছে। আপনার মনে যদি ঢাকাকে রিকশাশূন্য করার আকাঙ্ক্ষা থাকেই, তাহলে আপনি এভাবে অবৈধ রিকশা বাড়তে দিলেন কেন? সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তো বেবি ট্যাক্সি, মিশুক হারিয়ে গেল; তাহলে ঢাকায় ১০ লাখের বেশি অবৈধ রিকশা চলে কিভাবে? রিকশা তুলতে হলে আগে যাত্রীদের জন্য বিকল্প যান নিশ্চিত করতে হবে।

৭ জুলাই থেকে ঢাকার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই নিয়ে এখন তুলকালাম। রিকশাচালকদের অবরোধে অচল ঢাকার একটি বড় অংশ। তার প্রভাবে যানজটে স্থবির ঢাকা। ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলছেন, রিকশার পরিবর্তে কুড়িল-বিশ্বরোডে বিআরটিসির চক্রাকার গাড়ি নামানোর চিন্তা করছি আমরা। একই ধরনের চিন্তার কথা বলছেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনও। মিরপুর রোডে বাস নামানোর ভাবনার কথা জানিয়েছেন তিনিও। খুব ভালো ভাবনা। কিন্তু মাননীয় মেয়রেরা আপনাদের ভাবনাটা একটু উল্টো হতে পারত। আপনাদের উচিত ছিল আগে নির্ধারিত সড়কগুলোতে বাস নামানো। সেই বাসে এলাকাবাসীকে অভ্যস্ত করা। মানুষ যদি ভালো বাস পায়, যদি কম সময়ে, কম পয়সায় গন্তব্যে যেতে পারে; কেন তিনি রিকশায় উঠবেন। সেগুলো কিছু না ভেবে হুট করে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে রিকশা বন্ধ করে দেওয়া সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। আপনাদের চক্রাকার বাস নামানোর চিন্তা বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত এই এলাকার মানুষ কিভাবে চলাচল করবে?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/10/1562766800456.jpg
ঢাকার রাস্তায় একসময়ের জনপ্রিয় যানবাহন বেবিটেক্সি / ছবি. জর্জ ওয়েব

 

সাঈদ খোকনের পরামর্শ মেনে অবশ্য তারা হেঁটে চলাচল করতে পারেন। আচ্ছা জনাব সাঈদ খোকন, মানুষকে হাঁটার পরামর্শ দেওয়ার আগে নিজে একটু হেঁটে দেখান। আপনার ঢাকার ফুটপাত কি হাঁটার উপযোগী? নিজে যেটা পারবেন না, করবেন না; সেটা নগরবাসীকে করতে বলার নৈতিক অধিকার কি আপনার আছে?

রিকশা বন্ধের প্রতিবাদে চালকদের রাস্তা অবরোধ

রিকশা ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ, কিন্তু একমাত্র তো নয়। ঢাকার কোনো ব্যস্ত সড়কের ছবি দেখলে যে কেউ মানবেন যানজটের প্রধান কারণ ছোট ছোট ব্যক্তিগত গাড়ি। তো আপনি যানজট নিরসনে রিকশা নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবলেন, প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবলেন না কেন? একটা স্বাভাবিক শহরে ২৫ ভাগ রাস্তা থাকে। আমরা অস্বাভাবিক শহর, আমাদের আছে ৮ ভাগ। আর এই ৮ ভাগ সড়কের বেশিরভাগটাই দখল করে রাখে এইসব প্রাইভেট কার। দ্রুত এইসব প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আপনি রিকশাশূন্য শহরেও যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন না। প্রাইভেট কার কমাতে হলে গাড়ির দাম বাড়াতে হবে। প্রাইভেট কারে সিএনজি সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। এক পরিবারে একাধিক গাড়ির ক্ষেত্রে বাড়তি ট্যাক্স আরোপ করতে হবে। দিনের বেলায় বাণ্যিজ্যিক এলাকায় গাড়ি ঢোকার জন্য বাড়তি ট্যাক্স আরোপ করতে হবে।

যানজট নিরসনে রিকশা যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, ব্যক্তিগত গাড়িও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবে সবকিছুর আগে ঢাকায় একটি সাশ্রয়ী, আরামদায়ক, সহজলভ্য পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আপনার শহরের সিএনজিচালিত থ্রি হুইলার কখনোই মিটারে যাবে না। আপনার শহরে বাসে ওঠা আর এভারেস্ট জয় সমান যুদ্ধ। আপনার শহরে বাস নিরাপদ নয়, পদে পদে ওত পেতে থাকে ইভটিজার, ছিনতাইকারী আর মলম পার্টি। আপনার শহরে সাইকেলের জন্য একটা আলাদা লেন নেই। আপনার শহরে নিরাপদ, হাঁটার মতো ফুটপাত নেই। আপনি আসছেন বিকল্প ব্যবস্থা না করে ব্যস্ত সড়কে রিকশা বন্ধ করতে।

মেয়র মহোদয়েরা মনে রাখবেন, মাথা ব্যথার সমাধান কখনোই মাথা কেটে ফেলা নয়। যানজট, নাগরিক সুবিধার বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে ভাবতে হবে; পরিকল্পনা করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র