হত্যা, ধর্ষণ ও হিংস্রতার কবল থেকে শিশুদের বাঁচান!

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

  • Font increase
  • Font Decrease

কবি বলেছিলেন, 'যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাতে, তার মুখে খবর পেলুম, সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক, নতুন বিশ্বের...।'

পরাধীন যুগের প্রেক্ষাপটে শিশুর সামনে অনেক অনাচার, শোষণ, নিপীড়ন ছিল। আর আজকে? স্বাধীন, অগ্রসর ও আধুনিক প্রেক্ষাপটে শিশু-কিশোররা হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের শিকার।

বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দিনে কমপক্ষে দশটি ঘটনা ঘটছে, যাতে ছয় বছরের শিশু থেকে কিশোরদের নিয়মিত ধর্ষণ করা হচ্ছে। পাশবিক হিংস্রতায় শিশুকে যৌন নিপীড়ন করে লাশ ফেলে দেওয়া হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, মাদরাসায় বছরের পর বছর এক বা একাধিক অবোধ শিশু-কিশোরকে যৌন লালসায় ক্ষত-বিক্ষত করা হচ্ছে।

এই ধর্ষণ উপত্যকাই আমার দেশ!

রাজধানী ঢাকা শহরেই শুধু নয়, শহরতলী, গ্রাম, গঞ্জ, মাঠ, ময়দান, পথঘাট, এমনকি পাড়া-মহল্লায় শিশুদের নিরাপত্তা নেই। ধরে নিয়ে ধর্ষণ এবং পরে মেরে ফেলার ঘটনা একাধিক। ভয়, ভীতি ও প্রলোভনের মাধ্যমে নাবালিকা শিশুকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করার রোমহষর্ক ঘটনাও প্রকাশ পাচ্ছে।

সহজেই অনুমান করা যায়, যৌন নির্যাতনের খুব কম ঘটনাই জানা সম্ভব হয়। যেসব ঘটনা জানাজানি হয়নি তার সংখ্যা প্রচুর। আশ্চর্যজনকভাবে, আমরা জানাজানির ভয় পাই, লোকলজ্জাকে ডরাই, অথচ চাই শিশুর নিরাপত্তা!

কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো এই যে, বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা তলানিতে এসে পৌঁছাতে আর বাকি নেই। অথচ শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে বিশ্বসমাজের চিন্তা অন্তহীন। বিষয়টি যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ তা মানুষ বুঝেছে ও মেনেছে সভ্যতার আদি লগ্ন থেকে। আর আমরা? শিশুর প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা দেখেও নির্বিকার রয়েছি! সমাজ ও প্রশাসনের তীব্র সংক্ষোভ ও প্রতিরোধে এখনো ফেটে পড়ছি না।

ধর্ষণের বিভীষিকাময় সমাজে আমি লজ্জিত

বিবেচনা শক্তিতে সমর্থ ও ভাব প্রকাশের যোগ্য হয়ে ওঠেনি এবং চিন্তাশক্তির পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি বলে ১৮ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে শিশু বলে আমরা গণ্য করি। স্বার্থান্বেষী অংশ তার সুযোগ নেয়। কেউ কেউ না বুঝে, আপন অক্ষমতা/অজ্ঞানতার কারণেও শিশুর ওপর অত্যাচার করে, শিশুকে অবহেলা করে। শিশু শ্রমিক, বাল্যবিবাহ, শিশু ধর্ষণ, এসবের অন্যতম কারণ যেমন লোলুপতা, স্বার্থ ও হিংস্রতা, তেমন আমাদের অশিক্ষা ও কুশিক্ষা এবং শিক্ষার ছদ্মাবরণে ভণ্ডামি।

মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে, ছোটরা বড়দের নকল করে, অনুসরণের চেষ্টা করে, কিন্তু বড়রা শিশুমনের খবর রাখে রাখতেও চায় না। কারও চোখে তারা অবোধ বাচ্ছা, কেউ ভাবে তাদের ‘নাক টিপলে দুধ গলে’, কেউ ভালোবাসে বা সম্ভোগ করে, কেউ আদর করে। কেউ কেউ বা চায়- সন্তান তার যেন থাকে দুধে-ভাতে। ব্যস, যেন ওই পর্যন্ত।

কিন্তু কেউ ভাবে কি- স্বপ্নপূরণের উপায় কী? কী উপায়ে তাদের নিরাপত্তা বা সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা যায়? কেমন করে শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটানো যায়?

পণ্ডিত সমাজ শিশু নিরাপত্তা ও বিকাশের গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন। সুইডিস সমাজবিজ্ঞানী এলান কী (Allen Key) সেই ১৯০৯ সালে অনুমান করে বলেছিলেন যে, 'বিংশ শতাব্দী হবে শিশুদের শতাব্দী।' পোলান্ডের বিজ্ঞানী জানুস করজাক (Janusz Korczak) লিখলেন এক চমৎকার ম্যানুয়েল গ্রন্থ, যার নাম 'How to Love a Child' (1919)।

অন্যদিকে ব্রিটিশ স্কুলশিক্ষিকা ও সমাজকর্মী মিজ জেব স্পষ্ট জানালেন যে, 'সমস্ত যুদ্ধই কার্যত শিশুদের বিরুদ্ধে।' সদ্যজাত লিগ অফ নেশনসের অনুরোধে জেব, অন্যদের সাহায্য নিয়ে, তৈরি করলেন শিশু অধিকার সুরক্ষা সনদ, যা ১৯২৪ সালে লিগ অফ নেশনস দ্বারা স্বীকৃতও হল। তবে সে সনদ হয়ে রইল কেবল শিশু কল্যাণে একটি ঘোষণাপত্র, শিশু অধিকারের আইনি স্বীকৃতি এল অনেক পরে, অনেক পথ পার হয়ে ১৯৮৯ সালে। পাওয়া গেল UNCRC (United Nations Convention on the Rights of the Child)।

ততদিনে বিশ্ব বদলে গেছে। আন্তর্জাতিক পালাবদলের তোড়ে লিগ অব নেশনস অনেক শক্তি অর্জন করে হয়েছে রাষ্ট্রসংঘ। পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সমর্থন করেছে। আমরাও এই উদ্যোগের শরিক।

শুধু তাই নয়, শিশুসুরক্ষায় এখন দেশে কত আইন, বিধি, নীতি, নিষেধের ছড়াছড়ি। তবু শিশুপাচার, ধর্ষণ, শিশুশ্রমিক, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি আমরা চাই বা না চাই, সবই আছে এবং দিনে দিনে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। আমি জানি, আপনি জানেন, রাষ্ট্র জানে। জানি তো, কিন্তু শিশুর বিপদ ও নিরাপত্তাহীনতা মোটেও কমছে না কেন? কেন সমাজের সর্বস্তরের দাবি উচ্চকিত হয়ে বলছে, 'হত্যা, ধর্ষণ ও হিংস্রতার কবল থেকে শিশুদের বাঁচান!'

কোনও কোনও মর্মন্তুদ ও পাশবিক শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও নিপীড়ন-নির্যাতনের ঘটনায় সংক্ষুব্ধ-অশান্ত জনমতকে শান্ত করতে, প্রতিবাদকে সম্মান জানাতে সরকার নতুন আইন, নতুন বিধি অথবা নতুন প্রকল্প এনে প্রতিকারের আশা জাগাবে বলে প্রবলভাবে দাবি আসছে। শিশুর অধিকার ও তার সুরক্ষা প্রত্যাশা করে লাশ বা ধর্ষিতা নিরীহ শিশুটিকে নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে হাহাকার জানানোর হৃদয় বিদারক পরিস্থিতির অবসান ঘটবে বলেও মানুষ প্রত্যাশা করছে।

ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে!

সাধারণ মানুষ দলমত নির্বিশেষে শিশুর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা কামনা করছেন। শিশু নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক সাজা ও প্রতিকার আশা করছেন। কায়মনোবাক্যে চাইছে শিশুবান্ধব, নিরাপদ সমাজ, যা সবার সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।

যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাতে, তার কাছে আমরা খবর পৌঁছে দিতে চাই- শিশুর জন্য নিরাপদ এক নতুন বিশ্বের।

আপনার মতামত লিখুন :