Barta24

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

হত্যা, ধর্ষণ ও হিংস্রতার কবল থেকে শিশুদের বাঁচান!

হত্যা, ধর্ষণ ও হিংস্রতার কবল থেকে শিশুদের বাঁচান!
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

কবি বলেছিলেন, 'যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাতে, তার মুখে খবর পেলুম, সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক, নতুন বিশ্বের...।'

পরাধীন যুগের প্রেক্ষাপটে শিশুর সামনে অনেক অনাচার, শোষণ, নিপীড়ন ছিল। আর আজকে? স্বাধীন, অগ্রসর ও আধুনিক প্রেক্ষাপটে শিশু-কিশোররা হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের শিকার।

বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দিনে কমপক্ষে দশটি ঘটনা ঘটছে, যাতে ছয় বছরের শিশু থেকে কিশোরদের নিয়মিত ধর্ষণ করা হচ্ছে। পাশবিক হিংস্রতায় শিশুকে যৌন নিপীড়ন করে লাশ ফেলে দেওয়া হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, মাদরাসায় বছরের পর বছর এক বা একাধিক অবোধ শিশু-কিশোরকে যৌন লালসায় ক্ষত-বিক্ষত করা হচ্ছে।

এই ধর্ষণ উপত্যকাই আমার দেশ!

রাজধানী ঢাকা শহরেই শুধু নয়, শহরতলী, গ্রাম, গঞ্জ, মাঠ, ময়দান, পথঘাট, এমনকি পাড়া-মহল্লায় শিশুদের নিরাপত্তা নেই। ধরে নিয়ে ধর্ষণ এবং পরে মেরে ফেলার ঘটনা একাধিক। ভয়, ভীতি ও প্রলোভনের মাধ্যমে নাবালিকা শিশুকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করার রোমহষর্ক ঘটনাও প্রকাশ পাচ্ছে।

সহজেই অনুমান করা যায়, যৌন নির্যাতনের খুব কম ঘটনাই জানা সম্ভব হয়। যেসব ঘটনা জানাজানি হয়নি তার সংখ্যা প্রচুর। আশ্চর্যজনকভাবে, আমরা জানাজানির ভয় পাই, লোকলজ্জাকে ডরাই, অথচ চাই শিশুর নিরাপত্তা!

কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো এই যে, বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা তলানিতে এসে পৌঁছাতে আর বাকি নেই। অথচ শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে বিশ্বসমাজের চিন্তা অন্তহীন। বিষয়টি যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ তা মানুষ বুঝেছে ও মেনেছে সভ্যতার আদি লগ্ন থেকে। আর আমরা? শিশুর প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা দেখেও নির্বিকার রয়েছি! সমাজ ও প্রশাসনের তীব্র সংক্ষোভ ও প্রতিরোধে এখনো ফেটে পড়ছি না।

ধর্ষণের বিভীষিকাময় সমাজে আমি লজ্জিত

বিবেচনা শক্তিতে সমর্থ ও ভাব প্রকাশের যোগ্য হয়ে ওঠেনি এবং চিন্তাশক্তির পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি বলে ১৮ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে শিশু বলে আমরা গণ্য করি। স্বার্থান্বেষী অংশ তার সুযোগ নেয়। কেউ কেউ না বুঝে, আপন অক্ষমতা/অজ্ঞানতার কারণেও শিশুর ওপর অত্যাচার করে, শিশুকে অবহেলা করে। শিশু শ্রমিক, বাল্যবিবাহ, শিশু ধর্ষণ, এসবের অন্যতম কারণ যেমন লোলুপতা, স্বার্থ ও হিংস্রতা, তেমন আমাদের অশিক্ষা ও কুশিক্ষা এবং শিক্ষার ছদ্মাবরণে ভণ্ডামি।

মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে, ছোটরা বড়দের নকল করে, অনুসরণের চেষ্টা করে, কিন্তু বড়রা শিশুমনের খবর রাখে রাখতেও চায় না। কারও চোখে তারা অবোধ বাচ্ছা, কেউ ভাবে তাদের ‘নাক টিপলে দুধ গলে’, কেউ ভালোবাসে বা সম্ভোগ করে, কেউ আদর করে। কেউ কেউ বা চায়- সন্তান তার যেন থাকে দুধে-ভাতে। ব্যস, যেন ওই পর্যন্ত।

কিন্তু কেউ ভাবে কি- স্বপ্নপূরণের উপায় কী? কী উপায়ে তাদের নিরাপত্তা বা সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা যায়? কেমন করে শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটানো যায়?

পণ্ডিত সমাজ শিশু নিরাপত্তা ও বিকাশের গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন। সুইডিস সমাজবিজ্ঞানী এলান কী (Allen Key) সেই ১৯০৯ সালে অনুমান করে বলেছিলেন যে, 'বিংশ শতাব্দী হবে শিশুদের শতাব্দী।' পোলান্ডের বিজ্ঞানী জানুস করজাক (Janusz Korczak) লিখলেন এক চমৎকার ম্যানুয়েল গ্রন্থ, যার নাম 'How to Love a Child' (1919)।

অন্যদিকে ব্রিটিশ স্কুলশিক্ষিকা ও সমাজকর্মী মিজ জেব স্পষ্ট জানালেন যে, 'সমস্ত যুদ্ধই কার্যত শিশুদের বিরুদ্ধে।' সদ্যজাত লিগ অফ নেশনসের অনুরোধে জেব, অন্যদের সাহায্য নিয়ে, তৈরি করলেন শিশু অধিকার সুরক্ষা সনদ, যা ১৯২৪ সালে লিগ অফ নেশনস দ্বারা স্বীকৃতও হল। তবে সে সনদ হয়ে রইল কেবল শিশু কল্যাণে একটি ঘোষণাপত্র, শিশু অধিকারের আইনি স্বীকৃতি এল অনেক পরে, অনেক পথ পার হয়ে ১৯৮৯ সালে। পাওয়া গেল UNCRC (United Nations Convention on the Rights of the Child)।

ততদিনে বিশ্ব বদলে গেছে। আন্তর্জাতিক পালাবদলের তোড়ে লিগ অব নেশনস অনেক শক্তি অর্জন করে হয়েছে রাষ্ট্রসংঘ। পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সমর্থন করেছে। আমরাও এই উদ্যোগের শরিক।

শুধু তাই নয়, শিশুসুরক্ষায় এখন দেশে কত আইন, বিধি, নীতি, নিষেধের ছড়াছড়ি। তবু শিশুপাচার, ধর্ষণ, শিশুশ্রমিক, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি আমরা চাই বা না চাই, সবই আছে এবং দিনে দিনে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। আমি জানি, আপনি জানেন, রাষ্ট্র জানে। জানি তো, কিন্তু শিশুর বিপদ ও নিরাপত্তাহীনতা মোটেও কমছে না কেন? কেন সমাজের সর্বস্তরের দাবি উচ্চকিত হয়ে বলছে, 'হত্যা, ধর্ষণ ও হিংস্রতার কবল থেকে শিশুদের বাঁচান!'

কোনও কোনও মর্মন্তুদ ও পাশবিক শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও নিপীড়ন-নির্যাতনের ঘটনায় সংক্ষুব্ধ-অশান্ত জনমতকে শান্ত করতে, প্রতিবাদকে সম্মান জানাতে সরকার নতুন আইন, নতুন বিধি অথবা নতুন প্রকল্প এনে প্রতিকারের আশা জাগাবে বলে প্রবলভাবে দাবি আসছে। শিশুর অধিকার ও তার সুরক্ষা প্রত্যাশা করে লাশ বা ধর্ষিতা নিরীহ শিশুটিকে নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে হাহাকার জানানোর হৃদয় বিদারক পরিস্থিতির অবসান ঘটবে বলেও মানুষ প্রত্যাশা করছে।

ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে!

সাধারণ মানুষ দলমত নির্বিশেষে শিশুর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা কামনা করছেন। শিশু নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক সাজা ও প্রতিকার আশা করছেন। কায়মনোবাক্যে চাইছে শিশুবান্ধব, নিরাপদ সমাজ, যা সবার সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।

যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাতে, তার কাছে আমরা খবর পৌঁছে দিতে চাই- শিশুর জন্য নিরাপদ এক নতুন বিশ্বের।

আপনার মতামত লিখুন :

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র