প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের তাৎপর্য

ফরিদুল আলম
ফরিদুল আলম/ ছবি: বার্তা২৪.কম

ফরিদুল আলম/ ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ঘিরে সকলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে প্রত্যাশাটি ছিল, তা হচ্ছে বাংলাদেশে অবস্থানরত মিয়ানমার থেকে আগত ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনে চীনের সক্রিয় ভূমিকা পালনে সেদেশের সরকারকে রাজি করানো। এই সফরে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সহ ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি এবং সরকারের সংশ্লিষ্টদের সাথে বাংলাদেশ সরকারের আলোচনার পর যে বিষয়টি বের হয়ে এসেছে তা আমাদের জন্য আপাতদৃষ্টিতে খুব একটা আশাব্যাঞ্জক মনে হচ্ছে না এই মর্মে যে, চীনের পক্ষ থেকে কেবল ‘মিয়ানমার সরকারকে বুঝানো হবে’ বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।

চীনের এই পরোক্ষ প্রতিশ্রুতিকে অনেকে এক ধরনের দায়সারা মনোভাবের প্রকাশ মনে করলেও এর মধ্যে আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক আশাবাদের জায়গা খুঁজে পাই এই যুক্তিতে যে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় চীনকে কুটনৈতিকভাবে ঘায়েল করার বেশকিছু অস্ত্র আমাদের হাতে রয়েছে, যার সফল প্রয়োগ পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা যদি চীনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখতে পাব যে চীনের অর্থনীতির ক্রমোন্নয়নের ধারাটি গত একবছর সময়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য সংলাপ কার্যত গন্তব্যহীন থাকার কারণে সামনের দিনগুলোতে বিশ্ব অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় চীনের একঘরে হয়ে পড়ার একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এমন নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এশিয়ার ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ তাদের বিশেষ কৌশলগত অংশীদার হতে পারে।

এক সময়ের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির অন্বেষণ করা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের বর্তমান ধারা দেখলে যে কোন বিশ্লেষক এই মর্মে একমত হবেন যে এখন আমাদের পররাষ্ট্রনীতি কারও দ্বারা প্রভাবিত নয়। আর সেজন্যই ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্ত্বেও এবং আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগী জাপান কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়ন পছন্দ করবেনা জেনেও কেবল জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে বর্তমান সরকার আমাদের নৌবাহিনীর সামর্থ্য উন্নয়নে চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন ক্রয় করেছে। আবার একই সাথে চীনের প্রস্তাবকে উপেক্ষা করে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে চীনের বিনিয়োগকে উপেক্ষা করেছে এই শংকায় যে তারা যেন দেনা পরিশোধে ব্যর্থতায় এর দখল নিয়ে আমাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানতে না পারে, যেমনটা করেছে কেনিয়া এবং শ্রীলংকার হাম্বানটোটার ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কথা বলছিলাম। বিগত সময়গুলোতে, বিশেষ করে গত ১০ বছর সময়ের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাব যে ভারতের সাথা আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটেছে। ঐতিহাসিক সকল সমস্যার সমাধান ঘটেছে। যদিও তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে। এই সম্পর্কোন্নয়ন দুই দেশকেই সুফল দিয়েছে। একদা বাংলাদেশ ঘেষা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর আভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তাদের ব্যাপক মাথাব্যাথার কারণ ছিল। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ তাদের স্বস্তি দিয়েছে।

দুই দেশের বাণিজ্যিক বৈষম্যের একটি সম্মানজনক সমাধানে উভয়ই উপকৃত হয়েছে। সর্বোপরি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্কের) ব্যর্থতা সত্ত্বেও নিরবিচ্ছিন্নভাবে এঁকে অপরের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে চলেছে। এই বোধ থেকে নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের স্বার্থের ক্ষতি হয় এমন কিছু নয়, অথচ নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে যেভাবে প্রয়োজন প্রয়োজন সেভাবেই বাংলাদেশ তাদের নীতি নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। সে দিক দিয়ে সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারতের প্রভাবমুক্ত রয়েছে।

এই বাস্তবতায় একমাসের ব্যবধানে আমরা চীন-জাপান পরষ্পর বৈরী এই দুদেশে আমাদের সরকারও প্রধানের সফরকে মূল্যায়ণ করতে গিয়ে একথাই বলতে পারি যে বঙ্গবন্ধু অনুসৃত ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরীতা নয়’- নীতির আলোকে একটি সমৃদ্ধ আগামীর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তাঁর তনয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে তাই রোহিঙ্গা সমস্যার রাতারাতি সমাধান হয়ে যাবে এমন প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে আমর কী পেতে যাচ্ছি সেটা অনুধাবন করা শ্রেয়তর। আমরা দেখেছি ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর বাংলাদেশ সফরে দুই দেশের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার আওতায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ করেছে এবং বর্তমানে মিরেরসরাইয়ে বাস্তবায়নাধীন ৭০০ একর জায়গা নিয়ে চীনের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও বেশ কিছু কোম্পানী বিনিয়োগে আসতে যাচ্ছে।

এর সাথে যুক্তরাষ্ট্র–চীন চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের বাস্তবতায় এই ধারা আরও বেগবান হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সহজলভ্য কাঁচামাল এবং সর্বোপরি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ চীনের পছন্দের তালিকায় বাংলাদেশকে শীর্ষে রেখেছে। সেই সাথে আমাদের মনে রাখতে হবে যে উৎপাদনশীলতার স্বার্থে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানী করা হলে তা মিয়ানমার, বাংলাদেশ এবং চীন সকলের জন্যই ভাল হবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে উৎপাদিত চীনা পণ্য ভারত, নেপাল, ভূটানসহ এশিয়া এবং ইউরোপের অপরাপর দেশগুলোতে রপ্তানীর মাধ্যমেএকটি নতুন অর্থনৈতিক বলয় তৈরী করা যেতে পারে।

বাস্তব পরিস্থিতিতে তাই আমাদের বুঝতে হবে এখানে কোন বিষয়টি মোক্ষম উপায়ে সকলের স্বার্থে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে বর্তমান বৈশ্বিক উন্নয়নের ধারায় কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ই রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে অধিক কার্যকর হতে পারে। আজকের ইউরোপের দিকে তাকালেও আমরা দেখব যে শত শত বছরের যুদ্ধ তাদের স্বস্তি দিয়েছে সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যে যে অফুরন্ত বিণিয়োগ এবং উত্তরোত্তর বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের সুযোগ রয়েছে, অভিন্ন স্বার্থের নিরাপদ বিনিয়োগই সকল রাজনৈতিক বিবাদ মীমাংসায় সুদূরপ্রাসারী ভূমিকা রাখতে পারে।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্বিবিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :