Barta24

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের তাৎপর্য

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের তাৎপর্য
ফরিদুল আলম/ ছবি: বার্তা২৪.কম
ফরিদুল আলম


  • Font increase
  • Font Decrease

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ঘিরে সকলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে প্রত্যাশাটি ছিল, তা হচ্ছে বাংলাদেশে অবস্থানরত মিয়ানমার থেকে আগত ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনে চীনের সক্রিয় ভূমিকা পালনে সেদেশের সরকারকে রাজি করানো। এই সফরে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সহ ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি এবং সরকারের সংশ্লিষ্টদের সাথে বাংলাদেশ সরকারের আলোচনার পর যে বিষয়টি বের হয়ে এসেছে তা আমাদের জন্য আপাতদৃষ্টিতে খুব একটা আশাব্যাঞ্জক মনে হচ্ছে না এই মর্মে যে, চীনের পক্ষ থেকে কেবল ‘মিয়ানমার সরকারকে বুঝানো হবে’ বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।

চীনের এই পরোক্ষ প্রতিশ্রুতিকে অনেকে এক ধরনের দায়সারা মনোভাবের প্রকাশ মনে করলেও এর মধ্যে আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক আশাবাদের জায়গা খুঁজে পাই এই যুক্তিতে যে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় চীনকে কুটনৈতিকভাবে ঘায়েল করার বেশকিছু অস্ত্র আমাদের হাতে রয়েছে, যার সফল প্রয়োগ পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা যদি চীনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখতে পাব যে চীনের অর্থনীতির ক্রমোন্নয়নের ধারাটি গত একবছর সময়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য সংলাপ কার্যত গন্তব্যহীন থাকার কারণে সামনের দিনগুলোতে বিশ্ব অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় চীনের একঘরে হয়ে পড়ার একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এমন নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এশিয়ার ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ তাদের বিশেষ কৌশলগত অংশীদার হতে পারে।

এক সময়ের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির অন্বেষণ করা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের বর্তমান ধারা দেখলে যে কোন বিশ্লেষক এই মর্মে একমত হবেন যে এখন আমাদের পররাষ্ট্রনীতি কারও দ্বারা প্রভাবিত নয়। আর সেজন্যই ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্ত্বেও এবং আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগী জাপান কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়ন পছন্দ করবেনা জেনেও কেবল জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে বর্তমান সরকার আমাদের নৌবাহিনীর সামর্থ্য উন্নয়নে চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন ক্রয় করেছে। আবার একই সাথে চীনের প্রস্তাবকে উপেক্ষা করে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে চীনের বিনিয়োগকে উপেক্ষা করেছে এই শংকায় যে তারা যেন দেনা পরিশোধে ব্যর্থতায় এর দখল নিয়ে আমাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানতে না পারে, যেমনটা করেছে কেনিয়া এবং শ্রীলংকার হাম্বানটোটার ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কথা বলছিলাম। বিগত সময়গুলোতে, বিশেষ করে গত ১০ বছর সময়ের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাব যে ভারতের সাথা আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটেছে। ঐতিহাসিক সকল সমস্যার সমাধান ঘটেছে। যদিও তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে। এই সম্পর্কোন্নয়ন দুই দেশকেই সুফল দিয়েছে। একদা বাংলাদেশ ঘেষা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর আভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তাদের ব্যাপক মাথাব্যাথার কারণ ছিল। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ তাদের স্বস্তি দিয়েছে।

দুই দেশের বাণিজ্যিক বৈষম্যের একটি সম্মানজনক সমাধানে উভয়ই উপকৃত হয়েছে। সর্বোপরি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্কের) ব্যর্থতা সত্ত্বেও নিরবিচ্ছিন্নভাবে এঁকে অপরের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে চলেছে। এই বোধ থেকে নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের স্বার্থের ক্ষতি হয় এমন কিছু নয়, অথচ নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে যেভাবে প্রয়োজন প্রয়োজন সেভাবেই বাংলাদেশ তাদের নীতি নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। সে দিক দিয়ে সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারতের প্রভাবমুক্ত রয়েছে।

এই বাস্তবতায় একমাসের ব্যবধানে আমরা চীন-জাপান পরষ্পর বৈরী এই দুদেশে আমাদের সরকারও প্রধানের সফরকে মূল্যায়ণ করতে গিয়ে একথাই বলতে পারি যে বঙ্গবন্ধু অনুসৃত ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরীতা নয়’- নীতির আলোকে একটি সমৃদ্ধ আগামীর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তাঁর তনয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে তাই রোহিঙ্গা সমস্যার রাতারাতি সমাধান হয়ে যাবে এমন প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে আমর কী পেতে যাচ্ছি সেটা অনুধাবন করা শ্রেয়তর। আমরা দেখেছি ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর বাংলাদেশ সফরে দুই দেশের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার আওতায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ করেছে এবং বর্তমানে মিরেরসরাইয়ে বাস্তবায়নাধীন ৭০০ একর জায়গা নিয়ে চীনের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও বেশ কিছু কোম্পানী বিনিয়োগে আসতে যাচ্ছে।

এর সাথে যুক্তরাষ্ট্র–চীন চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের বাস্তবতায় এই ধারা আরও বেগবান হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সহজলভ্য কাঁচামাল এবং সর্বোপরি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ চীনের পছন্দের তালিকায় বাংলাদেশকে শীর্ষে রেখেছে। সেই সাথে আমাদের মনে রাখতে হবে যে উৎপাদনশীলতার স্বার্থে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানী করা হলে তা মিয়ানমার, বাংলাদেশ এবং চীন সকলের জন্যই ভাল হবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে উৎপাদিত চীনা পণ্য ভারত, নেপাল, ভূটানসহ এশিয়া এবং ইউরোপের অপরাপর দেশগুলোতে রপ্তানীর মাধ্যমেএকটি নতুন অর্থনৈতিক বলয় তৈরী করা যেতে পারে।

বাস্তব পরিস্থিতিতে তাই আমাদের বুঝতে হবে এখানে কোন বিষয়টি মোক্ষম উপায়ে সকলের স্বার্থে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে বর্তমান বৈশ্বিক উন্নয়নের ধারায় কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ই রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে অধিক কার্যকর হতে পারে। আজকের ইউরোপের দিকে তাকালেও আমরা দেখব যে শত শত বছরের যুদ্ধ তাদের স্বস্তি দিয়েছে সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যে যে অফুরন্ত বিণিয়োগ এবং উত্তরোত্তর বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের সুযোগ রয়েছে, অভিন্ন স্বার্থের নিরাপদ বিনিয়োগই সকল রাজনৈতিক বিবাদ মীমাংসায় সুদূরপ্রাসারী ভূমিকা রাখতে পারে।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্বিবিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র