Barta24

শনিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৯, ২ ভাদ্র ১৪২৬

English

এরশাদ-এক রাজনৈতিক অধ্যায়

এরশাদ-এক রাজনৈতিক অধ্যায়
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
এরশাদুল আলম প্রিন্স


  • Font increase
  • Font Decrease

এরশাদ আর নেই। প্রায় ৮৯ বছরের এক সুদীর্ঘ জীবন। এর মধ্যে ক্ষমতায় ছিলেন এক দশক আর ক্ষমতার বাইরে ছিলেন তিন দশক। ঠিক পুরোপুরি ক্ষমতার বাইরে ছিলেন এ কথাও বলা যাবে না। বলা যেতে পারে তিনি গদিতে ছিলেন না। কিন্তু গদিতে না থাকলেও ক্ষমতার চৌহদ্দির মধ্যেই ছিল তার ঘোড়াফেরা।

উত্থান-পতনেই গড়া মানুষের জীবন। যারা রাজনীতি করেন, তাদের জীবনে উত্থান পতনের চেয়ে বড় সত্য আর নাই। রাজনীতি মানে ক্ষমতার খেলা। এ খেলায় জয় আছে, আছে পরাজয়। যে জয়ী সবই তার-উইনারস টেক অল। এমনকি ইতিহাসও বিজয়ী সেনাপতির ভাষাতেই কথা বলে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরশাদের অবস্থান কোথায় একথা বলার সময় এখনও হয়নি। তিন দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পরও রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি বা এরশাদের অবস্থান নিরুপণ করা সম্ভব হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে হবে বলেও মনে হয় না। কারণ, এরশাদ ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পরেই বাংলাদেশ একটি দ্বিদলীয় রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে অগ্রসর হয়। পৃথিবীর শক্তিশালী সব গণতান্ত্রিক দেশেই রাজনৈতিক ক্ষমতা দুইটি দলের মাঝেই ঘুরপাক খায়। ’৯০ এর পরে আমাদের দেশেও সেটি হয়েছে। কিন্তু পার্থক্য হলো, এখানে দ্বিদলীয় রাজনীতি তার আপন মহিমায় সহজাত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নিয়ে বেড়ে উঠতে পারেনি। ফলে, আমাদের এখানে নামকাওয়াস্তে গণতন্ত্রের বয়স চল্লিশ হলেও বাস্তবে এখনও তা আতুরঘরে। এই যে অপুষ্ট দ্বিদলীয় রাজনৈতিক মেরুকরণ, তার পেছনে একটি নেতিবাচক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে এরশাদ বা জাতীয় পার্টি। সব শাসকেরই কিছু জনপ্রিয়তা থাকে। ক্ষমতাচ্যুত এরশাদের সেই জনপ্রিয়তা বা সমর্থনের নগদ সুবিধা নিতে চেয়েছে সব আমলের ক্ষমতাসীন দল ও সরকারগুলো।

স্বাধীনতার পর আমাদের রাজনীতি তার আপন মহিমায় বিকাশের সুযোগ পায়নি। একেকটি সাংবিধানিক পরিবর্তন ধীরে ধীরে গণতান্ত্রের অঙ্কুরটিকে মহিরুহ হতে দেয়নি। এর পরেই রাজনীতিতে সামরিক উর্দি পরিহিতদের আগমন ঘটতে থাকে। সৈনিক থেকে সরাসরি ক্ষমতায় আসার প্রথম বরপুত্র জিয়াউর রহমান, আর দ্বিতীয় বরপুত্র হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল সশস্ত্র সেনাসদস্য চট্টগ্রাম সার্কিক হাউস রেইড করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে। এরশাদ তখন সেনাপ্রধান। উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার তখন সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ২৪ পদাতিক ডিভিশনের মেজর জেনারেল মঞ্জুর ও তার অধীনস্ত কিছু সামরিক কর্মকর্তা ও সৈন্য এ হত্যার সাথে জড়িত বলে তখন প্রচার পায়। কিন্তু শুধুই কি ২৪ পদাতিক ডিভিশন বা মেজর জেনারেল মঞ্জুরই জড়িত, নাকি এর পেছনে আরও কেউ জড়িত আজও প্রকাশ পায়নি। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে মেজর জেনারেল মঞ্জুরও নিহত হন। মঞ্জুর হত্যার পেছনেও কে বা কারা কতটুকু জড়িত সেটাও আজ আলোর মুখ দেখেনি। মঞ্জুর হত্যার পেছনের এরশাদের হাত আছে বলে আদালতে মামলা চলমান। সে মামলার রায় আজও আমরা পাইনি। হয়তো কোনো একদিন পাবো যেদিন আইন, বিচার ও রাজনীতি আপন গতিতে চলতে শিখবে। সেদিন ক্ষমতার অন্দর মহলের দৃশ্যপটও আমাদের সামনে দৃশ্যমান হবে।

তবে, এরশাদ যেভাবে ক্ষমতা দখল করেন সেটি ছিল দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য চরম লজ্জার। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তিনি সামরিক শাসন জারি করে ওই দিনই সংসদ ভেঙে দেন। ১৯৮৩ সালের ১০ অক্টোবর তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দাবি করেন এবং ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ হ্যা-না ভোটে তার ক্ষমতা দখলকে বৈধ করে নেন। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাধ্যমে তার ক্ষমতারোহনকে আরো বৈধতা দেন। ১০ নভেম্বর সামরিক শাসন প্রত্যাহার করা হয়।

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির গালভুরা বুরি ঝাড়েন ঠিকই, কিন্তু এরশাদের উত্থানের দিনগুলোতে কেউ বিচারপতি সাত্তারের পাশে দাঁড়াননি। তা না হলে বাংলাদেশ আমলের একটি সরাসরি নিরপেক্ষ নির্বাচনে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির এমন দশা হবে কেন?

সামরিক শাসকরা সব সময়ই গণতান্ত্রিক দলগুলোর মাঝে বিদ্যমান বিরোধীতার সুবিধা নিয়ে থাকেন। এরশাদও তাই করেছেন। এরশাদের আমলে প্রথম পাঁচ বছরে যখনই নির্বাচনের কথা উঠেছে, তখনই হিসাব-নিকাশ হয়েছে কার ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ফলে বারবার নির্বাচন বিলম্বিত হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার থেকে শুরু করে সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত এ হিসাব-নিকাশ চলেছে। আর এ সুযোগে এরশাদ নিজেও একদলীয় নির্বাচনের পথে হেঁটেছেন। ক্ষমতার হিসাব মেলাতে না পেরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত ১৯৮৮ সালের নির্বাচন বর্জন করে। এদিকে এরশাদ সেই সুযোগে ছোটো-খাটো দলগুলোকে নিয়ে নির্বাচনের মাঠে শামিল হয়েছেন। সে নির্বাচনে জাতীয় পার্ট ২৫১টি আসন লাভ করে। এটি ছিল একেবারেই একটি বিরোধীদল বিহীন সংসদ।

আসলে ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। চতুর্থ সংসদে এরশাদ আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে একটি গৃহপালিত বিরোধীদল গড়ে তোলেন। নিয়তির নির্মম পরিহাস সেই সংসদেই (নবম, দশম, একাদশ সংসদ) এরশাদের জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের অধীনে একটি গৃহপালিত বিরোধীদলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। শুধু তা-ই নয়, গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ভূমিকা পালন করতে হয়-সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টার পাশাপাশি সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে জাতীয় পার্টি।    

জিয়া হত্যার পর অনেকেই প্রশ্ন করেছিল, বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আওয়ামী লীগ আছে, কিন্তু বিএনপি কি জিয়াউর রহমানকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। এ প্রশ্নের উত্তর আজ সবারই জানা। আজও সেই পুরনো প্রশ্ন, এরশাদ নেই, জাতীয় পার্টি কি এরশাদকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে? এর উত্তর হয়তো বা না। কারণ, রাজনীতিতে এরশাদ কোনো নিজস্ব আদর্শবাদীতার উত্তরণ ঘটাতে পারেননি। এরশাদ মূলত একটি বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী জাতীয়তাবাদের সম্মিলনে এক নতুন ধারার রাজনীতির উত্থান ঘটাতে চেয়েছেন। যেটি জিয়াউর রহমানও চেয়েছিলেন। সে উদ্দেশ্যে জিয়া বিভিন্ন ইসলামী দেশগুলোর সঙ্গে গভীর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু এরশাদ এক ধাপ এগিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থাৎ সাংবিধানিকভাবে এ কাজটি করেছেন। হয়তো জিয়া বেঁচে থাকলে এ কাজটিই করতেন। তাই হয়তো আগামী দিনের রাজনীতির আলোচনায় এরশাদ থাকবেন না। কিন্তু রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির প্রাসঙ্গিকতা রয়ে যাবে আরো বহুদিন।

আপনার মতামত লিখুন :

আবদুল মোনেম: এক মহান কর্মবীরের প্রতিকৃতি

আবদুল মোনেম: এক মহান কর্মবীরের প্রতিকৃতি
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

#ও বন্ধু আমার 🌷 জনাব আবদুল মোনেম। দেশের প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব। সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্ট অবকাঠামো, যা আজকের বাংলাদেশে আমরা দেখি, এসবের সিংহভাগেরই নির্মাতা আবদুল মোনেম লিমিটেড তথা জনাব মোনেম। যৌবনের স্বর্ণালী সময়সহ তাঁর জীবনের প্রায় পুরোটাই তিনি অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন প্রিয় মাতৃভূমির বৃহৎ সব নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে। দেশি বিদেশি সব কন্ট্রাক্টররা যে প্রকল্প তাদের পক্ষে করা অসম্ভব বলেছে, আবদুল মোনেম সাহেব সে চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন হাসি মুখে। প্রাণান্ত চেষ্টা আর অধ্যাবসায় দিয়ে অসম্ভব সেসব প্রকল্পকে দেখিয়েছেন সাফল্যের মুখ। সমাজ সংসার আত্মীয় পরিজন সব ছেড়ে ছুঁড়ে প্রকল্প এলাকায় কাটিয়েছেন মাসের পর মাস। গলা পর্যন্ত কাদা পানিতে নেমে শ্রমিকদের দেখিয়েছেন কাজের দিশা! তাঁর কোম্পানির প্রকৌশলীরা অবাক বিস্ময়ে দেখেছেন কিভাবে একজন কর্মবীর আবদুল মোনেম বাস্তবায়ন করে চলেছেন উন্নয়নের পথরেখা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566051707738.gif
গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে আবদুল মোনেমের (ডানে) সঙ্গে লেখক/ সংগৃহীত


ব্যবসায়ের লাভ লোকসানকে কখনোই গুরুত্ব দেননি জনাব মোনেম। দেশমাতৃকার উন্নতি সবসময় তাঁর কাছে মুখ্য হয়ে থেকেছে। যে কারণে মুনাফাখোর ব্যবসাদাররা যেখানে মানুষের অশ্রদ্ধার পাত্র হন, জনাব মোনেম সেখানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বের আসনে। দিন গেছে, ব্যবসা ডাইভার্সিফাই হয়েছে। বিশ্বখ্যাত কোমল পানীয় কোকাকোলা বা ইগলু’র মতো দুনিয়া জোড়া সুনামের আইসক্রিম ব্র্যান্ড সমৃদ্ধ আবদুল মোনেম লি. এখন পরিণত হয়েছে আবদুল মোনেম গ্রুপে। কয়েক কোটি টাকার টার্নওভারের সেদিনের কোম্পানি এখন হাজার কোটি টাকার কনগ্লোমারেট! কোক ইগলু ছাড়াও বিশ্বের বেশকিছু নামকরা ব্র্যান্ড এখন মোনেম গ্রুপের সঙ্গে পার্টনার। তাই বলে মোনেম ভাই পরিবর্তিত হননি এতটুকু। সেই শুরুতে যেমন নিরহংকারী, দানশীল ও ডাউন টু আর্থ ছিলেন, আজও তেমনই আছেন!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566051780819.gif

দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে জনাব মোনেমের সঙ্গে আমার ও আমার পরিবারের সম্পর্ক। দেশ বিদেশের অনেক স্টেশন আমরা একসঙ্গে সফর করেছি, একত্রে থেকেছি। সুযোগ হয়েছে পরস্পরকে জানার ও কাছে আসার। আজ জীবন সায়াহ্নে এসে পৌঁছেছেন জনাব আবদুল মোনেম। আমাদের স্বার্থহীন মানবিক সম্পর্ক আজও দ্যুতিময় প্রথম দিনের ঔজ্জ্বল্যেই! এতটা পথ আমরা পাড়ি দিয়ে এসেছি, কিন্তু স্বার্থের কোনো সংঘাত না থাকায় আমাদের পারিবারিক সম্পর্কে মালিন্য সামান্য মরিচা ধরাতে পারেনি, আলহামদুলিল্লাহ!
পবিত্র ঈদ আল-আদহা’র সালাত আদায়ে গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে আমাদের এই হিরণ্ময় সাক্ষাৎ। আল্লাহ সুবহানআহু ওয়াতা’আলা উন্নয়ন ব্যক্তিত্ব আমার প্রিয়-শ্রদ্ধেয় মোনেম ভাইকে সুস্থ ও নেক আমলময় হায়াতে তাইয়েবা দান করুন, আমীন...

লেখক: জাতীয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

বাংলাদেশ-ভারত: নাগরিকদের দূরত্ব কি বাড়ছে?

বাংলাদেশ-ভারত: নাগরিকদের দূরত্ব কি বাড়ছে?
শেখ আদনান ফাহাদ/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

১৯৪৭ সালেই বর্তমান বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাঙালিদের নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মহান প্রয়াস চালিয়েছিলেন তৎকালীন কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের কয়েকজন প্রগতিশীল নেতা। কিন্তু দুই দলের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে পেরে উঠেননি তাঁরা। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জহরলাল নেহেরু, সরদার বল্লভভাই প্যাটেল ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রমুখের ধূর্ত রাজনীতির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন বাঙালির রাষ্ট্রকামী রাজনীতিবিদগণ। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ৭৩ এবং ৭৪ নং পৃষ্ঠায় সে সময়ের ঘটনাবলীর বর্ণনা দেওয়া আছে। পূর্ববাংলার সম্পদ লুটে গড়া উঠা কলকাতা হারিয়ে বাঙালি দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে ১৯৭১ এর গণহত্যা সংঘটিত করার সুযোগই পেত না পাকিস্তানি হায়েনারা।

বাঙালি আজ দুইভাগে বিভক্ত- ভারতীয় বাঙালি আর বাংলাদেশি বাঙালি! বাঙালির একান্ত রাষ্ট্র একমাত্র বাংলাদেশ। হিন্দি আর ইংরেজির আগ্রাসনে ভারতে বাংলা আজ ধুঁকে ধুঁকে মরলেও বাংলাদেশে রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা হিসেবে বাংলা এখানে টিকে আছে স্বমহিমায়। ইতিহাসের নানা খেলায় বাঙালি বিভক্ত হয়ে তার অতীত গৌরবের অনেকখানি হারিয়েছে। ভারতের পুরো ক্রিকেট টিমে আজ একজন বাঙালি খেলোয়াড় নেই; অদূর ভবিষ্যতে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট টিমে কোনো বাঙালি সন্তান খেলতে পারবে- এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমে ১১ জন বাঙালি বিশ্ব ক্রিকেট আলোকিত করছে। বাঙালি অনেক হারিয়েও বুঝতে পারে না, কী তার ছিল আর কী তার আছে?

৪৭ এ বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা না গেলেও পরবর্তী ২৪ বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার মানুষকে প্রস্তুত করেছেন স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। আর এ যাত্রায় সাথে নিয়েছেন তৎকালীন সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন আর প্রতিবেশী ভারতকে। ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ভারত সরাসরি যুদ্ধে জড়ালেও সীমান্ত খোলা রেখেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক চালানো গণহত্যার শুরু থেকেই। বাঙালি অধ্যুষিত আগরতলা আর কলকাতার মানুষ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের স্বাগত জানিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। বাংলাদেশের পাশে ছিল পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও প্রতিবেশী ভারত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ অর্জন করেছিল স্বাধীনতা আর ভারত পেয়েছিল এই অঞ্চলে তার একমাত্র নিরাপদ এবং বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রে তৎকালীন সামরিক বাহিনীর কিছু বখাটে কর্মকর্তার হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতি বঙ্গবন্ধুকে না হারালে, বাংলাদেশই হত বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলে। জাতির পিতাকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেন মাঝিবিহীন নৌকায় পরিণত হয়। রাষ্ট্র চলে যায় সামরিক আর বেসামরিক আমলাতন্ত্রের দখলে। বাংলাদেশ মূলত উন্নয়নের ছোঁয়া পেয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমল থেকে।

তবে পণ্য উৎপাদন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার ফলে বাংলাদেশ মূলত ভারত আর চীনের নানা পণ্যের বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে। সিপিডির এক রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। বাংলাদেশে চাকুরি ও ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ হয় হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিকের। এক তথ্যমতে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধলক্ষ ভারতীয় চাকুরি করে। অথচ ভারতে বাংলাদেশের নাগরিকদের কাজের অনুমতি দেয়া হয় না। হাজার হাজার বাংলাদেশি ভারতের বিভিন্ন স্থানে পর্যটক হিসেবে ঘুরতে যায়; তাছাড়া মেডিক্যাল সেবা পেতে ভারতে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ফলে বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি লাভজনক রাষ্ট্র। এমন একটি লাভজনক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে ভারতের নাগরিক সমাজ, বিশেষ করে বাঙালিদের সম্পর্ক দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে!

ফেসবুক ও ইউটিউবের দুনিয়ায় দুই পারের বাঙালিদের মধ্যে ভয়ানক কথাযুদ্ধ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন সব বাজে শব্দ বলা হচ্ছে যা মুখে আনা যায় না। বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে কিছু বলা হলেই ওপার থেকে শুরু হয় পুরো বাংলাদেশকে অপমান করে নানাবিধ অশ্রাব্য বাক্যবান। অনেক ফেইক আইডি থেকেও বিতর্ক উসকে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাস না জেনেই, অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাকে না বুঝেই পুরো দেশকে নিয়ে অনেককে আপত্তিকর কথা বলতে দেখা যায়। ফেসবুকে আনন্দবাজার কিংবা প্রথম আলোর পেইজে ঢুকলেই দুই বাংলার মানুষের মধ্যকার কথাযুদ্ধের নমুনা পাওয়া যায়। কাশ্মীর সমস্যা হোক, কিংবা ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলা হোক কিংবা হোক সাকিব আল হাসানের উপর হওয়া কোনো নিউজ, ফেসবুকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু হয় বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে।

ইন্টারনেট পুরো বিশ্বকে এখন আমাদের ধরাছোঁয়ার আওতায় এনে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, কোনো বিষয়ে নিজের মত, অমত, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ মিথস্ক্রিয়ার দুনিয়াকে করেছে ব্যস্ত। মানুষ আগের যে কোনো সময়ের চাইতে যোগাযোগপ্রবণ এবং একইসাথে প্রতিক্রিয়া-প্রবণও। অনলাইন নিউজপেপার এবং প্রিন্ট নিউজপেপারগুলোর অনলাইন ভার্সন এবং ফেসবুক পেইজে বাংলাদেশ এবং ভারতের বাঙালিদের আনাগোনা অহরহ। ইন্টারনেট এবং ভাষার শক্তিকে গঠনমূলকভাবে কাজে লাগাতে পারত ভারত ও বাংলাদেশের বাঙালিরা। কিন্তু কাজের চেয়ে যে অকাজই বেশী হচ্ছে।

ভারত-বিদ্বেষী বাংলাদেশি আর বাংলাদেশ-বিদ্বেষী ভারতীয়রা দুই রাষ্ট্রের নাম বিকৃত করেছেন। যে গালি মুখে আনা যায় না, সেসব কথা লেখা থাকে কমেন্ট আকারে। বাংলাদেশের কেউ ভারতের কারও কথার প্রতিবাদ করলেই শুরু হয় ১৯৭১ সালের রেফারেন্স দিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। ৭১ কে ভারতীয় প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে গিয়ে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবদান, ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি, মুক্তিবাহিনীর বীরত্ব ইত্যাদি বিষয়কে খাটো করে দেখার একটা প্রবণতা ভারতীয় বাঙালিদের মধ্যে দেখা যায়। কোনো বাংলাদেশি ভারতের দিক থেকে করা কোনো কাজের সমালোচনা করলেই ৭১ এর কথা বলে খোটা দেয়ার চেষ্টা হয়। ভারতীয়রা একাত্তরকে দেখে থাকে তাঁদের নিজস্ব প্রেক্ষিত থেকে। বাংলাদেশ যে ভারতের কত উপকারে আসে কিংবা আসছে, সেটি ফেসবুকের জগতে খুব কম ভারতীয়ই স্বীকার করেন।

বাংলাদেশিদের একটা ছোট অংশ ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আনন্দবাজারসহ নানা পত্রিকার ফেসবুক পেইজের নিউজে কমেন্ট করে। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয়রা ক্ষিপ্ত হয়। ক্ষিপ্ত হওয়ার অধিকার তাঁদের আছে, কিন্তু গুটি কয়েক বাংলাদেশির ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এই ভারতীয়রা পুরো বাংলাদেশ নিয়ে অত্যন্ত অপমানজনক মন্তব্য করে। এই মন্তব্য কোনো সচেতন বাংলাদেশির পক্ষে হজম করা মুশকিল। ভারতীয়দের বড় একটা অংশ বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেই না। তারা শুধু জানে, ১৯৭১ এ ভারত পাকিস্তানকে যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে?

বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বিশালত্ব, জাতি সংগঠনে আওয়ামী লীগ এর অবদান, স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি, বিশ্ব রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর প্রভাব, বাঙালি আর্মি, নেভি ও বিমান সেনা, মুক্তিবাহিনী, মুজিববাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী কিংবা ক্র্যাক প্লাটুন এর বীরত্ব ইত্যাদি কিছুই না জেনে ৭১ কে শুধু ভারতীয় প্রেক্ষিত থেকে দেখতে অভ্যস্ত এসব ভারতীয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের সহযোগিতা আদায় করেছেন। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের যে কোনো বিশ্লেষণে প্রধান চরিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শাহাদাত বরণ করা বীর বাঙালিরা। ৭১ প্রশ্নে ভারতীয়দের উচিত হবে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। মূলত বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর বীরত্বেই ৭১ সালে পাকিস্তানকে পরাজিত করার গৌরবের ভাগীদার হতে পেরেছিল ভারত।

বাংলাদেশকে ‘কাঙ্গালের’ দেশ বলে মন্তব্য করে কিছু ভারতীয়। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে কোথায় চলে গেছে এবং যাচ্ছে সেটি এসব ভারতীয় বন্ধুরা জানেন না। সামাজিক উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলেছে বহু আগেই। মাথাপিছু আয়ের হিসেবেও আর কয়েক বছর পরে পেছনে পড়বে ভারত। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করে বহু বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন। গুগলে সার্চ করলেই সব লিংক পাওয়া যাবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ নানা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ঢুকলেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির দলিল মিলবে। ভারতীয়দের উচিত হবে সিনেমার জগতে শুধু না থেকে বাস্তবতাকে জানার চেষ্টা করা।

সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, ভারতের চলচ্চিত্র জগতে বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি, সংবাদ মাধ্যমগুলোতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন, ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ইত্যাদি কয়েকটি কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারত-প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় একই সভ্যতা ও সংস্কৃতির দুটো প্রতিবেশী রাষ্ট্রে এমন বাস্তবতা নিশ্চয় কারও কাম্য নয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র