এরশাদ-এক রাজনৈতিক অধ্যায়

এরশাদুল আলম প্রিন্স
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

  • Font increase
  • Font Decrease

এরশাদ আর নেই। প্রায় ৮৯ বছরের এক সুদীর্ঘ জীবন। এর মধ্যে ক্ষমতায় ছিলেন এক দশক আর ক্ষমতার বাইরে ছিলেন তিন দশক। ঠিক পুরোপুরি ক্ষমতার বাইরে ছিলেন এ কথাও বলা যাবে না। বলা যেতে পারে তিনি গদিতে ছিলেন না। কিন্তু গদিতে না থাকলেও ক্ষমতার চৌহদ্দির মধ্যেই ছিল তার ঘোড়াফেরা।

উত্থান-পতনেই গড়া মানুষের জীবন। যারা রাজনীতি করেন, তাদের জীবনে উত্থান পতনের চেয়ে বড় সত্য আর নাই। রাজনীতি মানে ক্ষমতার খেলা। এ খেলায় জয় আছে, আছে পরাজয়। যে জয়ী সবই তার-উইনারস টেক অল। এমনকি ইতিহাসও বিজয়ী সেনাপতির ভাষাতেই কথা বলে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরশাদের অবস্থান কোথায় একথা বলার সময় এখনও হয়নি। তিন দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পরও রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি বা এরশাদের অবস্থান নিরুপণ করা সম্ভব হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে হবে বলেও মনে হয় না। কারণ, এরশাদ ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পরেই বাংলাদেশ একটি দ্বিদলীয় রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে অগ্রসর হয়। পৃথিবীর শক্তিশালী সব গণতান্ত্রিক দেশেই রাজনৈতিক ক্ষমতা দুইটি দলের মাঝেই ঘুরপাক খায়। ’৯০ এর পরে আমাদের দেশেও সেটি হয়েছে। কিন্তু পার্থক্য হলো, এখানে দ্বিদলীয় রাজনীতি তার আপন মহিমায় সহজাত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নিয়ে বেড়ে উঠতে পারেনি। ফলে, আমাদের এখানে নামকাওয়াস্তে গণতন্ত্রের বয়স চল্লিশ হলেও বাস্তবে এখনও তা আতুরঘরে। এই যে অপুষ্ট দ্বিদলীয় রাজনৈতিক মেরুকরণ, তার পেছনে একটি নেতিবাচক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে এরশাদ বা জাতীয় পার্টি। সব শাসকেরই কিছু জনপ্রিয়তা থাকে। ক্ষমতাচ্যুত এরশাদের সেই জনপ্রিয়তা বা সমর্থনের নগদ সুবিধা নিতে চেয়েছে সব আমলের ক্ষমতাসীন দল ও সরকারগুলো।

স্বাধীনতার পর আমাদের রাজনীতি তার আপন মহিমায় বিকাশের সুযোগ পায়নি। একেকটি সাংবিধানিক পরিবর্তন ধীরে ধীরে গণতান্ত্রের অঙ্কুরটিকে মহিরুহ হতে দেয়নি। এর পরেই রাজনীতিতে সামরিক উর্দি পরিহিতদের আগমন ঘটতে থাকে। সৈনিক থেকে সরাসরি ক্ষমতায় আসার প্রথম বরপুত্র জিয়াউর রহমান, আর দ্বিতীয় বরপুত্র হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল সশস্ত্র সেনাসদস্য চট্টগ্রাম সার্কিক হাউস রেইড করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে। এরশাদ তখন সেনাপ্রধান। উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার তখন সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ২৪ পদাতিক ডিভিশনের মেজর জেনারেল মঞ্জুর ও তার অধীনস্ত কিছু সামরিক কর্মকর্তা ও সৈন্য এ হত্যার সাথে জড়িত বলে তখন প্রচার পায়। কিন্তু শুধুই কি ২৪ পদাতিক ডিভিশন বা মেজর জেনারেল মঞ্জুরই জড়িত, নাকি এর পেছনে আরও কেউ জড়িত আজও প্রকাশ পায়নি। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে মেজর জেনারেল মঞ্জুরও নিহত হন। মঞ্জুর হত্যার পেছনেও কে বা কারা কতটুকু জড়িত সেটাও আজ আলোর মুখ দেখেনি। মঞ্জুর হত্যার পেছনের এরশাদের হাত আছে বলে আদালতে মামলা চলমান। সে মামলার রায় আজও আমরা পাইনি। হয়তো কোনো একদিন পাবো যেদিন আইন, বিচার ও রাজনীতি আপন গতিতে চলতে শিখবে। সেদিন ক্ষমতার অন্দর মহলের দৃশ্যপটও আমাদের সামনে দৃশ্যমান হবে।

তবে, এরশাদ যেভাবে ক্ষমতা দখল করেন সেটি ছিল দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য চরম লজ্জার। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তিনি সামরিক শাসন জারি করে ওই দিনই সংসদ ভেঙে দেন। ১৯৮৩ সালের ১০ অক্টোবর তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দাবি করেন এবং ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ হ্যা-না ভোটে তার ক্ষমতা দখলকে বৈধ করে নেন। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাধ্যমে তার ক্ষমতারোহনকে আরো বৈধতা দেন। ১০ নভেম্বর সামরিক শাসন প্রত্যাহার করা হয়।

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির গালভুরা বুরি ঝাড়েন ঠিকই, কিন্তু এরশাদের উত্থানের দিনগুলোতে কেউ বিচারপতি সাত্তারের পাশে দাঁড়াননি। তা না হলে বাংলাদেশ আমলের একটি সরাসরি নিরপেক্ষ নির্বাচনে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির এমন দশা হবে কেন?

সামরিক শাসকরা সব সময়ই গণতান্ত্রিক দলগুলোর মাঝে বিদ্যমান বিরোধীতার সুবিধা নিয়ে থাকেন। এরশাদও তাই করেছেন। এরশাদের আমলে প্রথম পাঁচ বছরে যখনই নির্বাচনের কথা উঠেছে, তখনই হিসাব-নিকাশ হয়েছে কার ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ফলে বারবার নির্বাচন বিলম্বিত হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার থেকে শুরু করে সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত এ হিসাব-নিকাশ চলেছে। আর এ সুযোগে এরশাদ নিজেও একদলীয় নির্বাচনের পথে হেঁটেছেন। ক্ষমতার হিসাব মেলাতে না পেরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত ১৯৮৮ সালের নির্বাচন বর্জন করে। এদিকে এরশাদ সেই সুযোগে ছোটো-খাটো দলগুলোকে নিয়ে নির্বাচনের মাঠে শামিল হয়েছেন। সে নির্বাচনে জাতীয় পার্ট ২৫১টি আসন লাভ করে। এটি ছিল একেবারেই একটি বিরোধীদল বিহীন সংসদ।

আসলে ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। চতুর্থ সংসদে এরশাদ আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে একটি গৃহপালিত বিরোধীদল গড়ে তোলেন। নিয়তির নির্মম পরিহাস সেই সংসদেই (নবম, দশম, একাদশ সংসদ) এরশাদের জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের অধীনে একটি গৃহপালিত বিরোধীদলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। শুধু তা-ই নয়, গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ভূমিকা পালন করতে হয়-সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টার পাশাপাশি সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে জাতীয় পার্টি।    

জিয়া হত্যার পর অনেকেই প্রশ্ন করেছিল, বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আওয়ামী লীগ আছে, কিন্তু বিএনপি কি জিয়াউর রহমানকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। এ প্রশ্নের উত্তর আজ সবারই জানা। আজও সেই পুরনো প্রশ্ন, এরশাদ নেই, জাতীয় পার্টি কি এরশাদকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে? এর উত্তর হয়তো বা না। কারণ, রাজনীতিতে এরশাদ কোনো নিজস্ব আদর্শবাদীতার উত্তরণ ঘটাতে পারেননি। এরশাদ মূলত একটি বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী জাতীয়তাবাদের সম্মিলনে এক নতুন ধারার রাজনীতির উত্থান ঘটাতে চেয়েছেন। যেটি জিয়াউর রহমানও চেয়েছিলেন। সে উদ্দেশ্যে জিয়া বিভিন্ন ইসলামী দেশগুলোর সঙ্গে গভীর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু এরশাদ এক ধাপ এগিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থাৎ সাংবিধানিকভাবে এ কাজটি করেছেন। হয়তো জিয়া বেঁচে থাকলে এ কাজটিই করতেন। তাই হয়তো আগামী দিনের রাজনীতির আলোচনায় এরশাদ থাকবেন না। কিন্তু রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির প্রাসঙ্গিকতা রয়ে যাবে আরো বহুদিন।

আপনার মতামত লিখুন :