গুজবের যুগে হুজুগে সমাজ

নাজমুল হুদা
নাজমুল হুদা, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

নাজমুল হুদা, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

  • Font increase
  • Font Decrease

যতই বলা হোক গুজবে কান দেবেন না, তারপরও ‘কান নিয়েছে চিলে’ বলে আমরা সবাই মিলে অদৃশ্য চিলের পিছেই ছুটছি! অন্যায় জেনেও অপরাধের দিকে ঝুঁকছি। সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হল চরম এবং চূড়ান্ত অপরাধকেও আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে! গণধর্ষণ, গণপিটুনি, প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা কিংবা অন্ধকারের ‘বন্দুকযুদ্ধ’ এসবই যেন আমাদের গা সওয়া ঘটনা, মেনে নেওয়া নিয়তি!

গত ২১ জুলাই পর্যন্ত যে ১১ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে বাকপ্রতিবন্ধী বাবা, বিধবা নারীও রয়েছেন। আবার প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে শতাধিক স্থানীয় মানুষ! ধরে নেওয়া যায় এই মানুষদের মধ্যে সচেতন, শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, নারী, পুরুষ সবাই ছিলেন। এদের কারো কি একবারও মনে হয়নি যে, শুধু সন্দেহের বশে কাউকে হত্যা করা যায় না, এমনকি প্রকৃত অপরাধী হলেও। তারা কি জানেন না যে, অপরাধীকে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে তুলে না দিয়ে আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া চরম অপরাধ। অবশ্যই জানেন। প্রশ্ন হল তারপরও কেন আমরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছি? এগুলো কি শুধু গুজবে উত্তেজিত জনতার ক্ষণিকের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ? নাকি দীর্ঘদিনে ক্ষয়ে যাওয়া বিক্ষুদ্ধ সমাজের বিকৃত প্রতিক্রিয়া?

নেত্রকোণা শহরে এক যুবকের ব্যাগ তল্লাশি করে ‘শিশুর মাথা’ পাওয়ার পর তাকে পিটিয়ে হত্যা করে এলাকাবাসী। এরপর যেন হত্যার হিড়িক পড়ে গেছে সারাদেশে। শহর গ্রামে গুজব এবং পিটিয়ে হত্যা যেন সমান্তরালে চলছে। ‘ছেলে ধরা’ নামক জুজুর ভয়তো বহু পুরনো প্রলাপ! শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতের অবস্থানকে ঘিরে হত্যার গুজব, চাঁদে সাঈদীর মুখ দেখা যাওয়ার ঘোষণাও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাহলে বিজ্ঞান মনস্ক ‘আধুনিক মানুষ’ এখনো কেন তাহলে পুরনো বৃত্তে আটকা পড়ে আছে?

আসলে অনিশ্চয়তা, গুজব আমাদের গ্রাস করে ফেলছে। নিরাপত্তাহীনতার চাদরে কুকড়ে মুচড়ে আমরা অদৃশ্য জুজুর ভয়ে শঙ্কার ভিতর বসবাস করছি। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছি ক্রমেই। মানুষের মন স্বভাবতই অপরাধ প্রবণ; অনিশ্চিত ও অদৃশ্য বিষয়ের প্রতি আবিষ্ট; আকৃষ্ট। ‘ভূতের’ ভয় আমাদের অবচেতন মনকে সবসময় তাড়া করে বেড়ায়। ‘বনের বাঘ নয়, মনের বাঘ’ আমাদের সবচেয়ে বেশি আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে।

মানুষের অপরাধপ্রবণ ও অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তিনটি বিষয় কাজ করে- সামাজিক নিয়ম, ধর্মীয় বিধি বা অনুশাসন এবং রাষ্ট্র অনুমোদিত আইন। এই তিনটি উপাদান পরষ্পর সম্পর্কযুক্ত। যখন কোনো একটি ঠিকমত কাজ করে না তখন অন্যগুলোতেও ফাটল ধরে। আস্থার সংকট দেখা দেয়। যেমন বাসে উঠে ১২ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা দেওয়ার জন্য তুমুল বাক-বিতণ্ডা, চিৎকার চেচামেচি, অকথ্য গালাগালি এমনকি হাতাহাতি পর্যন্ত ঘটে যায়। আসলে সমস্যা দুই টাকা বেশি কম নিয়ে নয়। সমস্যা আরো গভীরে।

তীব্র গরমে ও প্রচণ্ড জ্যামে অতিষ্ট ঠাসাঠাসি করে বাসে ওঠা মানুষ মনে করে তারা নানাভাবে বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার। এজন্য দুই টাকা কম দিতেই পারে। একইভাবে কোনো অভিভাবক প্রশ্ন ফাঁস হতে দেখে, শিশু ধর্ষণ হতে দেখে, প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা দেখে কিংবা দু’একটি ‘মাথা কাটার’ ঘটনা শোনে তখন সামান্য গুজবেও ফুসে ওঠে। নিজেদের অনিরাপদ ও অসহায় ভাবতে থাকে। মনের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা জমতে থাকে। বিক্ষুদ্ধ মন বিকৃত হতে সময় নেয় না। গুজবের কারণে সৃষ্ট সমস্যার শুধু সাময়িক সমাধান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমন; আস্থা ফিরিয়ে দেওয়া ও সেই সাথে সবার সংযত ও দায়িত্বশীল আচরণ।

নাজমুল হুদা: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

আপনার মতামত লিখুন :