গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে

ড. মাহফুজ পারভেজ
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গুজব খুব সহজ বিষয় নয় এবং একজনের কাজও নয়। এর সঙ্গে প্রকাশ্যে বা গোপনে সমাজের এক বা একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকে। একটি সম্মিলিত বা উদ্দেশ্যমূলক পদক্ষেপ ছাড়া গুজব আপনা আপনি ছড়াতে পারে না।

একাডেমিক পরিভাষায় গুজবের ইংরেজি 'রিউমার', যার অর্থ হলো, 'জনসাধারণ সম্পর্কিত যে কোনও বিষয়, ঘটনা বা ব্যক্তি নিয়ে মুখে মুখে সমাজে প্রচারিত কোনো বর্ণনা বা গল্প, যা সত্য না হয়ে মিথ্যা হয়।' বলাই বাহুল্য, সত্য ঘটনা বা বিষয় প্রচারিত হলে এর নাম হবে তথ্য। আর মিথ্যা ছড়ানো হলে একে বলা হবে গুজব।

ফলে সমাজে বসবাস করার সময় প্রত্যেক নাগরিককে তথ্য ও গুজব সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হয়। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে হয়। বিশেষত, বর্তমান বল্গাহীন তথ্য-প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক-প্লাবিত পরিস্থিতিতে যে কোনও বিষয় বা খবর ভালো করে পরখ করে দেখতে হয় যে এর মধ্যে সত্য ও তথ্য কতটুকু আর গুজব কতটুকু।

গুজব থেকে সতর্ক থাকার পেছনে যথেষ্ট কারণ আছে। কেননা, গুজবের সঙ্গে সত্যের সম্পর্ক নেই। সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়েছে, গুজব হলো এমন কোনও বিবৃতি, যার সত্যতা অল্প সময়ের মধ্যে অথবা কখনোই নিশ্চত করা সম্ভব হয় না। অনেক পণ্ডিতের মতে, গুজব হলো প্রচারণার একটি নেতিবাচক কৌশল মাত্র। অভিধানে গুজবের যে ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা পাওয়া যায়, সেগুলো সামাজিকভাবে ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত।

গুজব অনেক ক্ষেত্রে ‘ভুল তথ্য’ এবং ‘অসঙ্গত তথ্য’ প্রচার করে। ‘ভুল তথ্য’ বলতে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্যকে বোঝায় এবং ‘অসঙ্গত তথ্য’ বলতে বোঝায় ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করা। বাংলাদেশে বর্তমানে পদ্মা সেতু ও ছেলে ধরা প্রসঙ্গে এমন গুজবই প্রচারিত হচ্ছে।

সমাজে ও রাজনীতিতে গুজব বরাবর একটি হটকারী কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে ইতিবাচক তথ্য বা খবরের পরিবর্তে নেতিবাচক দিক প্রচার করা হয়, যা আসলে সত্য নয়।

প্রশ্ন হলো, গুজব কি আপনা আপনি ছড়ায় বা ছড়াতে পারে? সব বিশেষজ্ঞের মত হলো, না। গুজবের পেছনে কাউকে না কাউকে থাকতে হয়। তবে গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার পর আর কিছু করতে হয় না। গুজব নিজেই হাত-পা গজিয়ে ছড়াতে থাকে।

ফলে গুজব অত্যন্ত বিপজ্জনক বিষয়। আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো তা ভয়াবহ দাবানল হয়ে ছড়িয়ে যেতে পারে। স্বার্থবাদী মহল গুজবের ফুলকি থেকে বিরাট অগ্নিকাণ্ডের সূচনাও করতে পারে।

অতএব, শুধু ব্যক্তিগত দিক থেকেই নয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দিক থেকেও গুজব থেকে সাবধান থাকতে হয়। গুজবের উদ্ভব ও বিকাশ কঠোর হস্তে দমন করতে হয়, যাতে তা মানুষ ও সমাজকে অসত্য ও ভুল তথ্য দিয়ে উস্কানি ও হটকারিতায় ফেলতে না পারে।

এ ক্ষেত্রে গুজবের পেছনের ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে সরকারকে দায়িত্ব নিতে হয়। কারণ, শুধু বর্তমান সময়েই নয়, অতীতে গুজব ছড়িয়ে একাধিকবার শান্তি বিনষ্ট ও সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। মানুষের জানমাল ও সম্পদের অপূরণীয় ধ্বংস হয়েছে। এমনটি বার বার হতে দেওয়া যায় না।

পাশাপাশি গুজব প্রচার ও উৎপাদন ঠেকাতে সম্প্রচার নীতিকেও শক্ত করতে হবে। ভুঁইফোড় মিডিয়া ও পোর্টাল বা ব্যক্তি পর্যায়ে গুজব সৃষ্টি ও ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। অপচেষ্টা গোড়াতেই নির্মূল করলে বিপদ অনেক কমে আসবে।

যেহেতু গুজবের হাত-পা নেই এবং গুজব আপনা আপনি তৈরি হয়ে ছড়িয়ে যায় না, কোনও ব্যক্তি বা মিডিয়া এগুলো ছড়ায়, সেহেতু এসব ক্ষেত্রে আইনগত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে গুজবের সৃষ্টি, বিকাশ ও চর্চা বন্ধ করে জনস্বার্থ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

আপনার মতামত লিখুন :