শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তা২৪.কম

ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শিশু ধর্ষণ শুধু বাংলাদেশেই নয়, প্রায়-সকল উন্নয়নকামী দেশের ক্ষেত্রেই প্রধান সামাজিক সমস্যা রূপে অভিহিত হচ্ছে। তথ্য ও পরিসংখ্যানে প্রাপ্ত ক্রমবর্ধমান শিশু ধর্ষণের ঘটনায় বিশেষজ্ঞরা ভয়ানক চিন্তিত। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সংস্থা এ সমস্যা নিরসনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও গ্রহণ করছে।

বাংলাদেশেও শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের প্রতিরোধে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করে আশু পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক। কারণ, পথেঘাটে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব নৃশংস শিশু ধর্ষণের খবর প্রকাশ পেয়েছে, তা অকল্পনীয়। প্রলোভন, প্ররোচনার পাশাপাশি ধর্মকে অপব্যবহার বা হাতিয়ার বানিয়ে একদল পাষণ্ড যেভাবে দিনের পর দিন এক বা একাধিক শিশুকন্যাকে ধর্ষণ ও বালকদের বলাৎকার করেছে, তা শুধু ঘৃণ্যই নয়, চরম শাস্তির উপযুক্ত।

বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও শিশু ধর্ষণ চরম আকার ধারণ করার খবর পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছ’মাসে ভারতে ২৪ হাজারের বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার। এতে ভারতীয় সমাজ উৎকণ্ঠিত, যার ফলে সে দেশের বিচার ব্যবস্থার পক্ষে একটি অনুকরণীয় পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে, যা শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধে অন্যান্য দেশও অনুসরণ করতে পারে।

ভারতের বিচার ব্যবস্থার শীর্ষ ব্যক্তি, প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের নির্দেশক্রমে গোটা দেশে শিশুধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে প্রধান বিচারপতি শীর্ষ আদালতের রেজিস্ট্রারকে এ নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সন্দেহ নেই, এ কার্যক্রম দৃষ্টান্তমুলক এবং ধর্ষণ ও নির্যাতনের প্রতিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপ।

ভারতের প্রধান বিচারপতি এমন পদক্ষেপ নিয়েছে সে দেশে শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের চরম পরিস্থিতিতে। কারণ ভারতে শিশু ধর্ষণের যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তাতে শীর্ষে আছে উত্তরপ্রদেশ। সেখানে গত ছ’মাসে ৩,৪৫৭টি শিশুধর্ষণ ঘটেছে। উত্তরপ্রদেশের পরেই আছে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান আর মহারাষ্ট্র। ১,৫৫১টি শিশু ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে আমাদের পাশের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য রয়েছে পঞ্চম স্থানে। ফলে বিচার ব্যবস্থা যথার্থ পদক্ষেপই নিয়েছে।

বাংলাদেশে শিশুকন্যা ধর্ষণ ও বালক শিশুদের বলাৎকারের তথ্য ও পরিসংখ্যান নেহাৎ কম নয়। লোভ দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে, বাধ্য করে বা কৌশলে ফাঁদে ফেলে শত শত বালক-বালিকাকে যৌন নির্যাতন করা হচ্ছে। এমনকি, ধর্মের আলখাল্লা চাপিয়ে ভণ্ড ও প্রবঞ্চক শ্রেণি অবাধে বালক-বালিকাদের ধর্ষণ ও নির্যাতন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে এমন কয়েকটি ঘটনা ধরা পড়েছে, যেসব দেখে ও শুনে শিউরে উঠতে হয়।

এসব ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই মিডিয়া সেনসেশন তৈরি হয়েছে। কয়েক দিন এসব স্পর্শকাতর সংবাদ জনমনে সঞ্চারিত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত জনমত বলতে যা বোঝায়, তা এসব ঘৃণ্য ও জঘন্য অপকর্মের বিরুদ্ধে তৈরি হয় নি। স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি কোনও প্রতিরোধী পদক্ষেপও গৃহীত হয় নি। হলে, জনগণ ও সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো প্রতিবাদ ও আইনগত পদক্ষেপ গৃহীত হতো।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, একমাত্র ভিকটিম ও তার পরিবার-পরিজন ছাড়া শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ইস্যুতে আর কেউ কার্যকর অর্থে মাঠে নেই। সব কিছু এবং সমাজ ও প্রশাসনের বাকি সবাই চলছে রুটিন মাফিন। যেন সমাজ ও সরকারের কোনও দায় নেই এ বিষয়ে। যে বা যারা ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এ সমস্যা নির্মূল ও প্রতিকার পাওয়ার ও প্রতিবিধান করার দায়-দায়িত্ব যেন একমাত্র ভুক্তভোগীরই!

প্রকৃত বিবেচনায় বিষয়টি এমন নয় এবং এমন হওয়াও মোটেই উচিত নয়। কারণ, ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে অপরাধের দায়িত্ব ব্যক্তিগত। কিন্তু সামাজিকভাবে কোনও অপরাধ ছড়িয়ে পড়লে, সমাজে কেউ প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হলে এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পদের জোরে অপরাধ করা হলে, তা নির্মূল ও প্রতিহতের দায়িত্ব পুরো সমাজের।

তদুপরি সমাজের প্রান্তিক ও দুর্বল কোনও অংশ বা শ্রেণি আক্রান্ত হলে তাকে সুরক্ষা দেওয়া সমাজের মূলস্রোতের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের একান্ত কর্তব্য। সমাজের নারী, শিশু, সংখ্যালঘু, অতি দরিদ্র ও অতি ক্ষুদ্র অংশকে বাঁচানোর দায়িত্ব সমাজের শক্তিশালী বৃহদাংশের। যে কারণে শিশুরা সমগ্র সমাজের আশ্রয়, নিরাপত্তা ও পরিচর্যার দাবিদার।

অথচ বাস্তবে হচ্ছে পুরো বিপরীত কাজ। আশ্রয়, নিরাপত্তা ও পরিচর্যা দেওয়ার বদলে প্রতিনিয়ত তাদেরকে ঘায়েল করা হচ্ছে। শিক্ষা বা অন্যবিধ প্রয়োজনে যে বা যাদের কাছে আশ্রয়, নিরাপত্তা ও পরিচর্যার জন্য একটি বালক বা বালিকা যাচ্ছে, তাদের দ্বারাই সে বা তারা চরম ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকারে পরিণত হচ্ছে। ধর্ম, দর্শন, আইন, কানুন, নীতি, নৈতিকতা তথা কোনও বিবেচনাতেও তা কাম্য নয়, গ্রহণযোগ্য নয়, যথোপযুক্ত সামাজিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ও বিচারের আওতার বাইরে থাকার বিষয় নয়

ভারতের বিচার ব্যবস্থা এক্ষেত্রে যে দৃষ্টান্ত রেখেছে, তা আমাদের সমাজ, ব্যক্তি ও সংস্থাসমূহের ক্ষেত্রে বোধোদয়ের জন্য যথেষ্ট।

ড. মাহফুজ পারভেজ: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

আপনার মতামত লিখুন :