বঙ্গবন্ধুর গল্প

শুভ কিবরিয়া
শুভ কিবরিয়া, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

শুভ কিবরিয়া, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বন্দী দিনের ভাবনা

'দুপুরের দিকে সূর্য্য মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে শুরু করেছে। রৌদ্র একটু উঠবে বলে মনে হয়। বৃষ্টি আর ভালো লাগছে না। একটা উপকার হয়েছে আমার দূর্বার বাগানটার। ছোট মাঠটা সবুজ হয়ে উঠেছে। সবুজ ঘাসগুলি বাতাসের তালে তালে নাচতে থাকে। চমৎকার লাগে, যেই আসে আমার বাগানের দিকে একবার না তাকিয়ে যেতে পারে না। বাজে গাছগুলো আমি নিজেই তুলে ফেলি। আগাছাগুলিকে আমার বড় ভয়, এগুলি না তুললে আসল গাছগুলি ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন আমাদের দেশের পরগাছা রাজনীতিবিদ-যারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক তাদের ধ্বংস করে, এবং করতে চেষ্টা করে। তাই পরগাছাকে আমার বড় ভয়। আমি লেগেই থাকি। কুলাতে না পারলে আরও কয়েকজনকে ডেকে আনি। আজ বিকালে অনেকগুলি তুললাম।' (২৩জুন ১৯৬৬, বৃহস্পতিবার, কারাগারের রোজনামচা)

খুব নরম এবং আদ্রভাষায় মোলায়েম করে প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে মানবচরিত্রের একটা বিশ্লেষণ আছে এই বয়ানে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫)-এর বয়স তখন মাত্র ছেচল্লিশ বছর। জেলখানায় বসে তিনি ভাবছেন এইসব কথা। আগাছা আর পরগাছার সঙ্গে রাজনীতিতে থাকা বিচিত্র সব সুবিধাবাদী আর বর্ণচোরা মানুষের মিল খুঁজছেন। মানুষ নিয়ে এই ভাবনা ছিল তাঁর আমৃত্যু। নিজে ছিলেন জনস্বার্থে, পরার্থে নিবেদিত মানুষ। তাঁর রাজনীতির মূল দর্শনও ছিল তাই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে চিন্তা, তাঁর জন্য যে জীবনপর লড়াই, তাঁর কেন্দ্রীয় ভাবনাও ছিল দেশের জনকল্যাণে। ফলে তাঁর জীবন জুড়ে সব কর্মকাণ্ডেই রাজনৈতিক হৃদয় ছাপিয়ে জায়গা পেয়েছে একজন মানবিক মানুষের বড় হৃদয়। তার কিছু কাহিনী নিয়েই আজকের লেখাটি।

আমি ওঠাই আপনার বাক্সটা

একদিন আমার এলাকার স্কুল থেকে নাজীর আহমদ নামের এক ছাত্র প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়ে বেকার হোস্টেলে থাকতে এসেছে। নাজীরের উচিত ছিল বন্ধুবান্ধব কাউকে খবর দেওয়া কিংবা কাউকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা। কারণ, তখন গ্রাম থেকে কলকাতা আসা আজকের ঢাকা থেকে লন্ডন যাওয়ার মতোই ছিল। কিন্তু নাজীরের পক্ষে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

নাজীর বেলা ১১টার দিকে একাই কুলির মাথায় বাক্স ও বিছানা নিয়ে হোস্টেলে উপস্থিত। নাজীরকে কুলি এত ভারী ধরনের বাক্স ও বিছানা ( হোল্ড অল) নিয়ে এসে নিচের তলার সিঁড়ির কাছে নামিয়ে দিয়ে গেছে। নাজীরের বরাদ্দ পাওয়া কামরা দোতলায় ৩২ কি ৩৩ নম্বর। নাজীর কী করবে, কাকে জিজ্ঞেস করবে, কার সাহায্য চাইবে ভাবছে। বলতে গেলে ভীতই হয়ে পড়েছে সে। ১১টার দিকে বেশির ভাগ ছাত্র কলেজে গেছে ও ব্লক পরিচারকেরা খেতে গেছে। দু-চারজন ছাত্র সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল আর কেউ কেউ ওপরে উঠে গেল। সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকা নাজীরকে কেউ দেখেও দেখল না। এমন সময় দীর্ঘদেহী এক ছাত্র, অর্থাৎ শেখ মুজিব, তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছেন। কোথাও যেতে হবে, একেবারেই সময় নেই। নাজীরকে পাশ কাটিয়ে দুই পা এগিয়েও গেলেন। তারপর ফিরে এলেন। 

'আসসালামু আলাইকুম। আপনি কি হোস্টেলে নতুন এসেছেন?' নাজীর বলল, 'জি হ্যাঁ', 'কত নম্বর কামরা পেয়েছেন?' '৩২ নম্বর'। সে তো দোতলায়, আমার রুমের পাশেই। তা আপনার জিনিসগুলো নেওয়ার জন্য লোক নেই?' নাজীর নিরুত্তর। শেখ সাহেবের চিৎকার, 'কই তোমরা? রিয়াসাত, জহুর?' কোথাও থেকে কোনো সাড়া নেই। অবশেষে শেখ মুজিব বললেন, 'আপনি আপনার বিছানাটা উঠান, আমি ওঠাই আপনার বাক্সটা।' নাজীরও ছিল লম্বা ও শক্তিশালী। বললেন, 'না, তা হয় না। যদি ধরতেই চান, তবে আপনি বিছানাটা নিন, আমি ওঠাই বাক্স। ওটা তো ওঠানোই কঠিন। তারপর বয়ে নিয়ে অতটা ওপরে যাওয়া' ততক্ষণে মুজিব লোহার বাক্সটা কাঁধে নিয়ে সিঁড়ি বাইতে শুরু করেছেন।

মুজিব নাজীরকে নিয়ে গেলেন তাঁর কামরায়। দরজা খুলে নিজের ঘর থেকে পরিত্যক্ত নেকড়ার ঝাড়ন এনে মোটামুটি খাট, টেবিল ও চেয়ার ঝেড়ে বললেন, 'এবার বিশ্রাম করুন। প্রত্যেক ব্লকের ছাত্রদের দেখাশোনা করার জন্য একজন পরিচারক আছে। আমি ওকে নিচে থেকে খুঁজে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনার খাবারদাবার ও যা-কিছু লাগে ওকে বলবেন।' ঘড়ি দেখে বললেন, 'আমার খুব তাড়া। না হলে আমি সব দেখিয়ে দিতাম। বিকেলে দেখা হবে।' বলে চলে গেলেন।

ঘটনাটির বর্ণনা দিতে গিয়ে এখনো ডাক্তার নাজীরের (অ্যানেস্থেশিয়ার ফেলো ও বর্তমানে ইংল্যান্ডে কনসালট্যান্ট) স্বরটা আর্দ্র হয়ে ওঠে।

ছাত্রজীবনে বঙ্গবন্ধু আর মেজর জেনারেল এম খলিলুর রহমান একসময় কলকাতার বেকার হোস্টেলে থাকতেন। সে সুবাদে তাঁদের মধ্যে সদ্ভাব ছিল। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে জেনারেল খলিলকে বিডিআর (এখনকার বিজিবি)-এর মহাপরিচালক নিযুক্ত করেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবনের এই ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন মেজর জেনারেল খলিল তাঁর, ‘ কাছ থেকে দেখা ১৯৭৩-৭৫’ বইয়ে।

জহুর ও শাড়ি সমাচার

ঘটনাটি বাহাত্তরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফরের সময়ের। বঙ্গভবনে অনুষ্ঠান শেষে তিনি ১৪ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী প্রত্যেকের হাতে উপহারস্বরুপ একটি করে ভারতীয় বেঙ্গালুরু সিল্কের শাড়ি দিলেন। বলা বাহুল্য, শাড়িগুলো মন্ত্রীদের বেগম সাহেবদের জন্য। শাড়ি বিতরণ শেষ, মন্ত্রীরা ইন্দিরা গান্ধীকে সমবেতভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। এমন সময় দূর থেকে এগিয়ে এলেন বঙ্গবন্ধু।

তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরের শাড়ি প্রায় ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে জহুর আহমদ চৌধুরীর হাতে ধরিয়ে দিলেন। ইন্দিরাজি অবাক হয়ে বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকালেন। তিনি বললেন, মনোরঞ্জন ধর ব্যাচেলর মানুষ। তাঁর শাড়ির দরকার নেই। বেচারা জহুরের দুই বউ। এক শাড়ি নিয়ে দুইজনে টানাটানি করবে। তাই তাঁরটি জহুরের আরেকটি বউয়ের জন্য দিলাম।

এই ঘটনাটি লিখেছেন প্রয়াত সাংবাদিক এ বি এম মূসা তাঁর 'মুজিব ভাই' গ্রন্থে।

তোমলোক খুন কিয়া

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার দুই দিন পর। বঙ্গবন্ধু একদিন পুরোনো গণভবনে আমাকে বললেন, হ্যাঁ রে সবাইকে দেখলাম বদরুদ্দিন ভাই কোথায়? বদরুদ্দিন মানে তৎকালীন পাকিস্তানি মালিকানার ট্রাস্ট্রের পত্রিকা মর্নিং নিউজ-এর সম্পাদক। পত্রিকাটি অহর্নিশ তাঁর কুৎসা গেয়েছে, আগরতলা মামলার সময় তাঁর ফাঁসি দাবি করেছে। এই সেই পত্রিকা যার অফিস বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় জনগণ পুড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর সম্পর্কে অহর্নিশ বিষোদগারকারী সেই পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গেও তাঁর ব্যাক্তিগত সম্পর্কের কমতি ছিল না। তাঁর নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে আমাকে বললেন, ‘কোথায় আছেন বদরুদ্দিন ভাই? খুঁজে নিয়ে আয়। ভালো আছেন তো? কোন অসুবিধায় নেই তো?’

বঙ্গবন্ধুর আদেশে বদরুদ্দিনকে খুঁজতে লাগলাম। পেয়েও গেলাম, লালমাটিয়ার একটি বাড়িতে আত্মগোপন করে আছেন তিনি। বহু কোশেশ করে দেখা করলাম। বললাম, 'মুজিব ভাই আপনাকে খুঁজছেন। চলুন আমার সঙ্গে।' বদরুদ্দিন ভাইয়ের চোখমুখ যেন ঝলসে উঠল, 'ক্যায়া, শেখ সাব মুঝে বোলায়া, আই ক্যান গো টু হিম, সি হিম? নিয়ে এলাম তাঁকে গণভবনে, যেন দুই বৈরী নয়, যেন দুই বন্ধুর মিলন দেখলাম। বুকে জড়িয়ে ধরলেন, পাশে বসালেন। নেতা জিজ্ঞেস করলেন, 'হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ। আপনি কী করতে চান? কাঁহা যাতে চাহেঁ? কোনো বিপদে নেই তো? আবেগময় প্রশ্নগুলো শুনে বদরুদ্দিন আধো কান্না আধো খুশি মেশানো কন্ঠে বললেন, 'পাকিস্তানে যেতে চাই, মে আই লিভ ফর করাচি? বঙ্গবন্ধু একান্ত সচিব রফিকউল্লাহকে ডাকলেন, 'বদরুদ্দিন ভাই যা চান, তা-ই করে দাও।' উল্লেখ করা প্রয়োজন পাকিস্তান তখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের সঙ্গেও নৌ-স্থল-বিমান যোগাযোগ নেই। কিছু অবাঙালি গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে ভারত ও কাঠমান্ডু হয়ে তারপর পাকিস্তানে যাচ্ছেন। 

তার পরের কাহিনী। বদরুদ্দিন ভাইয়ের আরেকটি প্রার্থনা, আসাদ অ্যাভিনিউয়ের বাড়িটি বিক্রি করবেন, সেই টাকাও তিনি সঙ্গে নিয়ে যাবেন। বাহাত্তরে সেই সময়ে একজন বিহারির এহেন একটি আবদার কেউ কল্পনাও করতে পারত না। কিন্ত বঙ্গবন্ধু বলেন তথাস্তু, তা-ই হবে।

ক্রেতা ঠিক হলো আতাউদ্দিন খান, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, পরবর্তী সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধুর সচিব রফিকউল্লাহ চৌধুরীর সহায়তায় আতা সাহেব বাড়ি কিনে যে টাকা দিয়েছিলেন তা বিদেশি মুদ্রায় রূপান্তরিত করে বাইরে নেওয়ার অনুমতি দিয়ে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হামিদুল্লাহ সাহেবকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছিলেন। অত:পর বদরুদ্দিন স্বচ্ছন্দে নেপাল হয়ে পাকিস্তানে চলে গেলেন।

পঁচাত্তরের অনেক বছর পর লাহোরে বদরুদ্দিনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন। বলছিলেন, 'আল্লাহর শোকর, শেখ সাহেব ফিরে এসেছিলেন। তাই তো বেঁচে আছি। এখনো বহাল তবিয়তে আছি 'তারপরই মাথা থাবড়াতে থাকলেন, 'ইয়ে ফেরেশতা কো তোমলোক খুন কিয়া?'

শেখ মুজিবের বিশাল হৃদয়ের বহুমাত্রিক উদারতার এই প্রত্যক্ষ বয়ান লিখেছেন সাংবাদিক এবিএম মূসা তাঁর 'মুজিব ভাই' নামের এক ক্ষীণকায়া বইয়ে।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক. সাপ্তাহিক

আপনার মতামত লিখুন :