গরুর হাট ও ডেঙ্গুমুক্ত কোরবানি

তুষার আবদুল্লাহ
তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪

তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

ঢাকার রাস্তায় বছর ঘুরে আবার সেই পরিচিত দৃশ্য-গরু দৌড়চ্ছে, তার পেছনে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটছেন নব্য ক্রেতা। গরুর মেজাজ বোঝা মুশকিল। কোন দিকে দৌড় দেবে ঠাওর করা যায় না। তাই পথচারী ও মোটরযান থমকে দাঁড়াচ্ছে। গরু মহাশয়ই আগে চলুক।

গত কোরবানি ঈদে একাধিক ক্লান্ত গরুকে দেখা গেছে ছুটতে গিয়ে পথেই এলিয়ে পড়তে। তারা আর দাঁড়ানোর শক্তি পায়নি। বিদায় নিয়েছে পথে। এবারও যাদের এলোপাতাড়ি ছুটতে দেখছি তাদের দেখে শঙ্কিত। কারণ ঢাকায় এই মূহুর্তে যে গবাদি পশু অবস্থান করছে, প্রবেশ করছে তারা দীর্ঘ পথপাড়ি দিয়ে এসেছে। বাহনে করে তাদের নিয়ে আসার প্রক্রিয়াটিও স্বচ্ছন্দের নয়। ট্রাকে, ট্রলারে যেভাবে তাদের নিয়ে আসা হয়, তা দেখে বেচারা প্রাণী গুলোর প্রতি শুধু মায়াই তৈরি হয়। কোরবানির যে পশু সীমানা পেরিয়ে আসে তাদের তারকাঁটা ডিঙানোর গল্প বা প্রক্রিয়া আরো করুন। ওষুধ খাইয়ে, হাত –পা বেঁধে , কলাগাছের ভেলার নিচে ডুবিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে নিয়ে আসা হয় গরু। সেই গরু রাজধানীসহ সারাদেশের হাটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তো ক্লান্ত হবেই। এই ক্লান্ত-শ্রান্ত এই গবাদি পশুরা সমর্পিত হয় আমাদের সমর্পণের দরবারে।

স্থানীয়ভাবে আমাদের খামার তৈরি হয়েছে অসংখ্য। এই খামারগুলোতে উৎপাদিত গরু-ছাগল কোরবানির চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা রাখে। কিন্তু গত কয়েক বছরের কোরবানির বাজারে সীমান্তের ওপারের গরু ঢুকে পড়ায় স্থানীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শেষ মুহূর্তের দরপতনে চোখে জল নিয়ে লোকসান গুনতে গুনতে খামারি ও ব্যবসায়ীরা হাট ছেড়েছেন। দরপতনের ঐ প্রভাবে কিছু খামার বন্ধ হয় যায়।

এবার এখন পর্যন্ত স্থানীয় খামারিদের মুখে হাসি আছে। শেষ পর্যন্ত যদি ভারতীয় গরু কোরবানির হাটের দখল না নেয়, তাহলে হাসি অটুট থাকবে। না হলে স্থানীয় খামারিরা আরেকদফা নিরাশায় নিমজ্জিত হবে। বন্ধ হবে খামার। এমনিতেই খামার মালিকদের ওপর অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ে এক প্রকার বিপর্যয় বয়ে গেলো মাত্র। সেই বিপর্যয় সামলে উঠতে পারেনি অনেক বড় পুঁজির খামার মালিকেরাও। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বন্যায়। বন্যার সুযোগে ফড়িয়ারা সস্তায় গরু নিয়ে নিয়েছে কৃষকের কাছ থেকে। সারাবছর গরু প্রতিপালনের খরচ উঠেনি বিক্রির টাকায়। তারপরও গরুর হাটে আসছে গরু। শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে কেনাকাটা।

কোরবানির লক্ষ্যে যে গবাদি পশুর কেনাকাটা, তা অনেক আগেই সামাজিক অবস্থান নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশী, স্বজন, রাজনৈতিক কর্মী, ব্যবসায়ী মহলে নিজেদের আর্থিক ক্ষমতা দেখানোর একটি উপলক্ষ্য হয়ে উঠেছে কোরবানি। কে কতো দামে কোরবানির পশু কিনছেন, তা এখন গণমাধ্যমের কাছে খবর । যিনি কিনছেন এবং যে গবাদি পশুটি কেনা হচ্ছে উভয়ই এখন তারকা। লালু-ভুলু, টাইটানিক থেক শুরু করে মেসি , নেইমারের নামেও গরুর বিক্রি হচ্ছে। নিলামে এদের দাম ২০-৪০ লাখ। অনলাইন, টেলিভিশন ও পত্রিকায় এদের সদ্য মালিকদের ছবি ও নাম দেখে আমরা বোঝার চেষ্টা করি, এদের কতজন নতুন বিত্তশালী আর কতজন পুরনো।

এবারের কোরবানি ঈদ চিত্তে সুখ নিয়ে যে আমরা উদযাপন করতে যাচ্ছি এমন বলা যাবেনা। আছি আতঙ্কে। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় সিক্ত আমরা। সরকারি হিসেবে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ৩০ ছুঁলেও বেসরকারি হিসেবে সেটা একশর কাছাকাছি। আক্রান্ত হচ্ছে প্রতিদিনই গড়ে ২ হাজার মানুষ। সারাদেশেই এডিস মশা আতঙ্ক। এই আতঙ্ক ও স্বজন হারানোর বেদনা কোরবানি ঈদের আড়ম্বরে অনেকটাই ভাটা ফেলেছে। আতঙ্ক আছে যদি কোরবানি উদযাপনের সময়গুলোতে পরিচ্ছন্নতায় ঘাটতি থাকে, তাহলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সতর্ক থাকতে হবে কোরবানির পশুও যেন নিরাপদে থাকে। সবার ওপরে এবারের উৎসবে পরিচ্ছন্নতা হোক প্রথম।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

আপনার মতামত লিখুন :