গরু নিয়ে গরুদের কারবার

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈদুল আজহার আনন্দটা একদিনের নয়, কারো কারো ঈদ শুরু হয় ৭ দিন আগে থেকেই।

বাজারে  ঘুরে গরু পছন্দ করা, সেই গরু কিনে বাড়ি এনে লালন-পালন করা, অল্প কদিনেই সেই গরুর ওপর মায়া পড়ে যাওয়া, চোখের জলে সেই গরু কোরবানি করা, নিজ হাতে মাংস কাটা, সেই মাংস বিলি করা- ঈদুল আজহার আনন্দ আসলেই বহুমাত্রিক। ছেলেবেলায় আমাদের আসল আনন্দ ছিল হাটে ঘুরে ঘুরে গরু পছন্দ করা। কিনতেন অবশ্য বড়রাই। আমরা কেবল সাথে যেতাম। আমরা ছেলেবেলায় কোরবানি দিতাম অনেকে মিলে একসাথে। এক গরুতে সাত নামে কোরবানি দেয়া যায়। মধ্যবিত্ত পরিবারে সেটাই ছিল বিলাসিতা। সামর্থ্য কম থাকলেও আনন্দ ছিল ভরপুর। কেনার পর সাত পরিবারের শিশুরা মিলে সেই গরুকে ঘাস, খৈল, ভুষি খাওয়ানো, নিয়মিত গোসল করানো চলতো। কোরবানির পর আমাদের গরুর মাংস আট ভাগ হতো। এক ভাগ চলে যেতো ‘সমাজে’। ‘সমাজের মাংস’ হলো আমাদের গ্রামে যারা কোরবানি দিতে পারতো না, তাদের জন্য। সবাই স্বেচ্ছায়, মনের আনন্দে সমাজের মাংস পৌছে দিতো।

সমাজের মাংস সমানভাবে ভাগ করে দেয়া হতো। তাতে ঈদের আনন্দ পৌছে যেতো সবার ঘরে ঘরে, বঞ্চিত হতো না কেউই।

কোরবানির গরুর বাজারে যাওয়া আনন্দ পেয়েছে আমার ছেলে প্রসূনও। ছেলেবেলা থেকেই তার বায়না তাকে গরুর হাটে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু বীরপুরুষ ছেলে গরুর হাটের কাছে গিয়ে গরুর ভয়ে আর ঢুকতে চাইতো না। তাই তাকে দূর থেকে গরুর হাট দেখিয়েই ফিরতে হতো। আরো যখন ছোট ছিল প্রসূনকে ঘাড়ে তুলে আমি গরুর হাটে ঘুরে বেড়িয়েছি আমি। আহা বড় মধুর ছিল সেই দিনগুলো। কিন্তু এখন দিন পাল্টেছে, বয়স বেড়েছে। ব্যাকপেইন হামলা এবং অ্যাজমার সমস্যার কারণে এখন আর গরুর হাটে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রসূন তার বন্ধু-বান্ধব, কাজিনদের সাথে যায়।

ঢাকায় এখন জমজমাট। ঢাকায় গাবতলীর স্থায়ী গরুর হাট ছাড়াই ঈদুল আজহা

উপলক্ষে মোট ২১টি জায়গায় হাট বসেছে। তবে গরুর হাটে পুরো প্রক্রিয়াটায় এত বেশি মাস্তানি, চাঁদাবাজি, গা জোয়ারি, নির্মমতা মিশে গেছে; ধর্মটাই যেন হারিয়ে যায়। ইসলাম ধর্মের যে স্নিগ্ধ, শান্ত রূপটাই খুঁজে পাওয়া যায় না গরুর হাটে। ইজারা প্রক্রিয়া থেকে মাস্তানির শুরু, চলে টাকা-পয়সার লেনদেন। তারপর সেই হাটে গরু আনতে চলে মাস্তানি। সেদিন ফেসবুকে একজন লিখলেন, তিনি ব্যক্তিগত ৬টি গরু নিয়ে ঢাকায় আসছিলেন। কিন্তু সাভারে তার গরু আটকে সেখানে বাজারে নিতে জোর করে বাধ্য করা হয়। এক পর্যায়ে তিনি গরু রেখে চলে আসতে চাইলে মুক্তি পান। গরু নিয়ে এই টানাটানি নিয়ে অনেক নিষ্ঠুরতার কথাও জানি আমরা। টানাটানিতে পশুর মৃত্যুও ঘটে। আর যেভাবে অমানবিক কায়দায় বাংলাদেশে পশু পরিবহন করা হয়, তার কোনো ক্ষমা নেই আসলে।

কয়েকবছর আগে ঈদ এলেই ভারতীয় গরুতে সয়লাব হয়ে যেতো বাংলাদেশের পশুর হাটগুলো। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গরু চোরাচালানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ায় বন্ধ হয়ে যায় ভারতীয় গরু আসা। তাতে দারুণ একটা ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশে বিকশিত হয় গরুর খামার। বাংলাদেশ এখন গরুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই গরুর হাটে আর কোনো সঙ্কট নেই। তবে এবার বাজারে শুরুতে বন্যাসহ নানা কারণে পশুর সরবরাহ কম ছিল। তাতে দাম, ছিল চড়া। অনেকে গরু কিনতে গিয়ে খাসি কিনে বাড়ি ফিরেছেন।  কিন্তু দাম চড়া শুনে গরুর সরবরাহ বেড়েছে, তাতে কমছে দাম।

যারা আগেই গরু কিনে ফেলেছেন, তারা ঠকেছেন। যারা সবুর করেছেন, তারা জিতবেন। গত কয়েকবছরে অনলাইনে গরুর কেনাবেচা হচ্ছে। তবে প্রতিবছরই গরুর হাটে কিছু সংবাদ আমাকে অসুস্থ করে দেয়। যেমন এবার দেখছি, এক ভদ্রলোক ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনেছেন। গরুর নাম বস। এটি বাংলাদেশের গরুর দামের রেকর্ড। তবে শুধু বস নয়; এমন বাহারি নামে আরো অনেক মূল্যবান গরুর আছে বাজারে।  শাহজাদা, প্রিন্স, খান বাহাদুর, বীর বাহাদুর, লাল বাহাদুর, কালাচাঁদ কিংবা সিনবাদ- এসন হরেক নামের গরু আছে নানান হাটে।

এদের কারো দামই ১০ লাখ টাকার নিচে নয়। ১০ লাখ টাকা দাম, এমন গরু গাবতলী হাটেই আছে ১০০টি। ঢাকার অন্য হাট মিলিয়ে যদি আরো ১০০টি ১০ লাখ টাকা দামের গরু কেনা বেচা হয়; তাহলে মানতে হবে শুধু ঢাকাতেই ১০ লাখ টাকা বা এরচেয়ে বেশি দামে গরু কেনার মত মানুষ আছেন অন্তত ২০০! সংখ্যাটা আসলেই বিস্ময়কর।

এই সংখ্যাটা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি কতটা হয়েছে এবং তার সাথে বৈষম্যও বেড়েছে কতটা নগ্নভাবে।

বাংলাদেশে দারিদ্রের হার কমেছে বটে, কিন্তু এখনও এসন অনেক মানুষ আছেন, মাত্র এক লাখ টাকা একসাথে পেলে পুরো পরিবারের ভাগ্য বদলে যেতে পারে।

গ্রামের বাড়িতে দুটি গরু পালন করে, একটু খামার করে বা ছোট একটা দোকান দিয়ে, একটা ট্রাক্টর কিনে চলে যেতে পারে একটি সংসার। মাসে অল্পকিছু টাকার জন্য আটকে যায় কত মানুষের স্বপ্ন, কত মেধাবী পড়াশোনাটা শেষই করতে পারে না।

যিনি বা যারা ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে বা ১০ লাখের বেশি টাকা দিয়ে গরু কিনেছেন; তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কিনেছেন। আমার বলার কিছু নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তাদেরও গরু বলেই সম্বোধন করা হচ্ছে। আমি সেটা বলতে চাই না। তার কামাই করা অর্থ তিনি কীভাবে খরচ করবেন, অবশ্যই সেটা তার ব্যাপার।

তবে পকেটে অর্থ এলে যে কারো কারো বুদ্ধি গরু পর্যায়ে নেমে যায়, সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই। ধরুন যিনি ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনেছেন, তিনি যদি একই দামে ৩৭টা গরু কিনতেন, তাহলে অনেক বেশি মাংস পেতেন এবং অনেক মানুষকে দিতে পারতেন। তিনি যদি ২ লাখ টাকা দিয়ে একটি গরু কিনে বাকি টাকাগুলো দরিদ্র পরিবারের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন, আল্লাহ কি কম খুশি হতেন? অন্তত ৩৫টি পরিবারের সমস্যা সারাজীবনের জন্য মিটিয়ে দিতে পারতেন তিনি। কিন্তু আমি নিশ্চিত আল্লাহকে খুশি করার জন্য নয়, নিজের নাম ফাটানোর জন্য তিনি এই কাজটি করেছেন। তাই আমি এখানে তার নামটি লিখছি না। তিনি মানুষের নজর কাড়ার জন্য ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনেছেন। আশা করি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং দুদকের নজরও তিনি কাড়তে পেরেছেন। আশা করি ঈদের পর দুদক তাদের সম্পদের হিসাব চাইবেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও তাদের আয়কর নথিগুলো চেক করে দেখবে।

সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানির কথা বলেছেন আল্লাহ। কিন্তু কোরবানি নিয়ে প্রতিযোগিতার কথা বলা নেই কোথাও। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভালো মুসলমান হওয়ার তৌফিক দান করুক।

প্রভাষ আমিন, হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :