বাংলাদেশ-ভারত: নাগরিকদের দূরত্ব কি বাড়ছে?

শেখ আদনান ফাহাদ
শেখ আদনান ফাহাদ/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

শেখ আদনান ফাহাদ/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৪৭ সালেই বর্তমান বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাঙালিদের নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মহান প্রয়াস চালিয়েছিলেন তৎকালীন কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের কয়েকজন প্রগতিশীল নেতা। কিন্তু দুই দলের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে পেরে উঠেননি তাঁরা। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জহরলাল নেহেরু, সরদার বল্লভভাই প্যাটেল ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রমুখের ধূর্ত রাজনীতির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন বাঙালির রাষ্ট্রকামী রাজনীতিবিদগণ। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ৭৩ এবং ৭৪ নং পৃষ্ঠায় সে সময়ের ঘটনাবলীর বর্ণনা দেওয়া আছে। পূর্ববাংলার সম্পদ লুটে গড়া উঠা কলকাতা হারিয়ে বাঙালি দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে ১৯৭১ এর গণহত্যা সংঘটিত করার সুযোগই পেত না পাকিস্তানি হায়েনারা।

বাঙালি আজ দুইভাগে বিভক্ত- ভারতীয় বাঙালি আর বাংলাদেশি বাঙালি! বাঙালির একান্ত রাষ্ট্র একমাত্র বাংলাদেশ। হিন্দি আর ইংরেজির আগ্রাসনে ভারতে বাংলা আজ ধুঁকে ধুঁকে মরলেও বাংলাদেশে রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা হিসেবে বাংলা এখানে টিকে আছে স্বমহিমায়। ইতিহাসের নানা খেলায় বাঙালি বিভক্ত হয়ে তার অতীত গৌরবের অনেকখানি হারিয়েছে। ভারতের পুরো ক্রিকেট টিমে আজ একজন বাঙালি খেলোয়াড় নেই; অদূর ভবিষ্যতে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট টিমে কোনো বাঙালি সন্তান খেলতে পারবে- এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমে ১১ জন বাঙালি বিশ্ব ক্রিকেট আলোকিত করছে। বাঙালি অনেক হারিয়েও বুঝতে পারে না, কী তার ছিল আর কী তার আছে?

৪৭ এ বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা না গেলেও পরবর্তী ২৪ বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার মানুষকে প্রস্তুত করেছেন স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। আর এ যাত্রায় সাথে নিয়েছেন তৎকালীন সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন আর প্রতিবেশী ভারতকে। ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ভারত সরাসরি যুদ্ধে জড়ালেও সীমান্ত খোলা রেখেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক চালানো গণহত্যার শুরু থেকেই। বাঙালি অধ্যুষিত আগরতলা আর কলকাতার মানুষ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের স্বাগত জানিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। বাংলাদেশের পাশে ছিল পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও প্রতিবেশী ভারত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ অর্জন করেছিল স্বাধীনতা আর ভারত পেয়েছিল এই অঞ্চলে তার একমাত্র নিরাপদ এবং বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রে তৎকালীন সামরিক বাহিনীর কিছু বখাটে কর্মকর্তার হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতি বঙ্গবন্ধুকে না হারালে, বাংলাদেশই হত বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলে। জাতির পিতাকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেন মাঝিবিহীন নৌকায় পরিণত হয়। রাষ্ট্র চলে যায় সামরিক আর বেসামরিক আমলাতন্ত্রের দখলে। বাংলাদেশ মূলত উন্নয়নের ছোঁয়া পেয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমল থেকে।

তবে পণ্য উৎপাদন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার ফলে বাংলাদেশ মূলত ভারত আর চীনের নানা পণ্যের বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে। সিপিডির এক রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। বাংলাদেশে চাকুরি ও ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ হয় হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিকের। এক তথ্যমতে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধলক্ষ ভারতীয় চাকুরি করে। অথচ ভারতে বাংলাদেশের নাগরিকদের কাজের অনুমতি দেয়া হয় না। হাজার হাজার বাংলাদেশি ভারতের বিভিন্ন স্থানে পর্যটক হিসেবে ঘুরতে যায়; তাছাড়া মেডিক্যাল সেবা পেতে ভারতে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ফলে বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি লাভজনক রাষ্ট্র। এমন একটি লাভজনক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে ভারতের নাগরিক সমাজ, বিশেষ করে বাঙালিদের সম্পর্ক দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে!

ফেসবুক ও ইউটিউবের দুনিয়ায় দুই পারের বাঙালিদের মধ্যে ভয়ানক কথাযুদ্ধ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন সব বাজে শব্দ বলা হচ্ছে যা মুখে আনা যায় না। বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে কিছু বলা হলেই ওপার থেকে শুরু হয় পুরো বাংলাদেশকে অপমান করে নানাবিধ অশ্রাব্য বাক্যবান। অনেক ফেইক আইডি থেকেও বিতর্ক উসকে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাস না জেনেই, অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাকে না বুঝেই পুরো দেশকে নিয়ে অনেককে আপত্তিকর কথা বলতে দেখা যায়। ফেসবুকে আনন্দবাজার কিংবা প্রথম আলোর পেইজে ঢুকলেই দুই বাংলার মানুষের মধ্যকার কথাযুদ্ধের নমুনা পাওয়া যায়। কাশ্মীর সমস্যা হোক, কিংবা ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলা হোক কিংবা হোক সাকিব আল হাসানের উপর হওয়া কোনো নিউজ, ফেসবুকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু হয় বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে।

ইন্টারনেট পুরো বিশ্বকে এখন আমাদের ধরাছোঁয়ার আওতায় এনে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, কোনো বিষয়ে নিজের মত, অমত, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ মিথস্ক্রিয়ার দুনিয়াকে করেছে ব্যস্ত। মানুষ আগের যে কোনো সময়ের চাইতে যোগাযোগপ্রবণ এবং একইসাথে প্রতিক্রিয়া-প্রবণও। অনলাইন নিউজপেপার এবং প্রিন্ট নিউজপেপারগুলোর অনলাইন ভার্সন এবং ফেসবুক পেইজে বাংলাদেশ এবং ভারতের বাঙালিদের আনাগোনা অহরহ। ইন্টারনেট এবং ভাষার শক্তিকে গঠনমূলকভাবে কাজে লাগাতে পারত ভারত ও বাংলাদেশের বাঙালিরা। কিন্তু কাজের চেয়ে যে অকাজই বেশী হচ্ছে।

ভারত-বিদ্বেষী বাংলাদেশি আর বাংলাদেশ-বিদ্বেষী ভারতীয়রা দুই রাষ্ট্রের নাম বিকৃত করেছেন। যে গালি মুখে আনা যায় না, সেসব কথা লেখা থাকে কমেন্ট আকারে। বাংলাদেশের কেউ ভারতের কারও কথার প্রতিবাদ করলেই শুরু হয় ১৯৭১ সালের রেফারেন্স দিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। ৭১ কে ভারতীয় প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে গিয়ে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবদান, ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি, মুক্তিবাহিনীর বীরত্ব ইত্যাদি বিষয়কে খাটো করে দেখার একটা প্রবণতা ভারতীয় বাঙালিদের মধ্যে দেখা যায়। কোনো বাংলাদেশি ভারতের দিক থেকে করা কোনো কাজের সমালোচনা করলেই ৭১ এর কথা বলে খোটা দেয়ার চেষ্টা হয়। ভারতীয়রা একাত্তরকে দেখে থাকে তাঁদের নিজস্ব প্রেক্ষিত থেকে। বাংলাদেশ যে ভারতের কত উপকারে আসে কিংবা আসছে, সেটি ফেসবুকের জগতে খুব কম ভারতীয়ই স্বীকার করেন।

বাংলাদেশিদের একটা ছোট অংশ ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আনন্দবাজারসহ নানা পত্রিকার ফেসবুক পেইজের নিউজে কমেন্ট করে। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয়রা ক্ষিপ্ত হয়। ক্ষিপ্ত হওয়ার অধিকার তাঁদের আছে, কিন্তু গুটি কয়েক বাংলাদেশির ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এই ভারতীয়রা পুরো বাংলাদেশ নিয়ে অত্যন্ত অপমানজনক মন্তব্য করে। এই মন্তব্য কোনো সচেতন বাংলাদেশির পক্ষে হজম করা মুশকিল। ভারতীয়দের বড় একটা অংশ বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেই না। তারা শুধু জানে, ১৯৭১ এ ভারত পাকিস্তানকে যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে?

বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বিশালত্ব, জাতি সংগঠনে আওয়ামী লীগ এর অবদান, স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি, বিশ্ব রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর প্রভাব, বাঙালি আর্মি, নেভি ও বিমান সেনা, মুক্তিবাহিনী, মুজিববাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী কিংবা ক্র্যাক প্লাটুন এর বীরত্ব ইত্যাদি কিছুই না জেনে ৭১ কে শুধু ভারতীয় প্রেক্ষিত থেকে দেখতে অভ্যস্ত এসব ভারতীয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের সহযোগিতা আদায় করেছেন। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের যে কোনো বিশ্লেষণে প্রধান চরিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শাহাদাত বরণ করা বীর বাঙালিরা। ৭১ প্রশ্নে ভারতীয়দের উচিত হবে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। মূলত বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর বীরত্বেই ৭১ সালে পাকিস্তানকে পরাজিত করার গৌরবের ভাগীদার হতে পেরেছিল ভারত।

বাংলাদেশকে ‘কাঙ্গালের’ দেশ বলে মন্তব্য করে কিছু ভারতীয়। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে কোথায় চলে গেছে এবং যাচ্ছে সেটি এসব ভারতীয় বন্ধুরা জানেন না। সামাজিক উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলেছে বহু আগেই। মাথাপিছু আয়ের হিসেবেও আর কয়েক বছর পরে পেছনে পড়বে ভারত। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করে বহু বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন। গুগলে সার্চ করলেই সব লিংক পাওয়া যাবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ নানা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ঢুকলেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির দলিল মিলবে। ভারতীয়দের উচিত হবে সিনেমার জগতে শুধু না থেকে বাস্তবতাকে জানার চেষ্টা করা।

সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, ভারতের চলচ্চিত্র জগতে বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি, সংবাদ মাধ্যমগুলোতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন, ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ইত্যাদি কয়েকটি কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারত-প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় একই সভ্যতা ও সংস্কৃতির দুটো প্রতিবেশী রাষ্ট্রে এমন বাস্তবতা নিশ্চয় কারও কাম্য নয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন :