ভিআইপিতান্ত্রিক বাংলাদেশ

নাহিদ হাসান
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ ফেরি ঘাটে আটকে আছে যেন বাপ্পি হয়ে। ভিআইপির ভারে ন্যুব্জ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ। সংবিধানের ব্যাখ্যাদাতা হাইকোর্ট জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কেউ ভিআইপি নন।

ইউরোপ নিজ দেশে গণতান্ত্রিক আইন চালু করলেও উপনিবেশ-আধা উপনিবেশ ও পরাধীন অঞ্চলগুলোতে জমিদারি বা ভিআইপি কানুন বহাল রেখেছে। ১৭৭৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন, ১৮৬০ সালের পেনাল কোড, ১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্ট, ১৮৭২ সালের এভিডেন্স অ্যাক্ট, ১৮৭৮ সালের আর্মস অ্যাক্ট, ১৮৯৮ ক্রিমিন্যাল প্রসিডিউর অ্যাক্ট, ১৯০৮ সালের সিভিল প্রসিডিউর কোডসহ ১৯১০ সালের মধ্যে পরাধীন ভারতের আইনগত কাঠামো নির্মাণ মোটামুটি শেষ হয়। এরই মধ্যে এই অঞ্চলের লড়াই ও রাজনীতির নিজস্ব পথ শেষ করা সম্ভব হয়। এর ফলে কথিত ভিআইপি সংস্কৃতির আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়। ফলে ট্রেন-বাস-হাসপাতাল থেকে শুরু করে সর্বত্র এটি চালু হয়।

আজকের বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের 'প্রচলিত আইন' ও 'আইন' এর সংজ্ঞা অনুসারে এই ব্রিটিশ বিধি মুক্তিযুদ্ধের সংবিধানে আত্মীকৃত হয়। একজন উপজেলা চেয়ারম্যান জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন কিংবা ডিসি আমলাতান্ত্রিক বিধানে নিযুক্ত হন; তারা একই একেকজন জমিদারে পরিণত হন। তারা দাবি করেন, জনগণ তাদের স্যার বলুক। বাংলাদেশ ভিআইপিতান্ত্রিকই থেকে যায়। কিছুদিন আগে সুপ্রিমকোর্ট একটি বক্তব্যে বলেছিলেন, আমরা এমন একটি পঙ্গু সমাজে বসবাস করছি যেখানে ভাল মানুষ স্বপ্ন দেখতে পারছে না, রাজনীতি বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে,... আমাদের পূর্বপুরুষরা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, কোনো ক্ষমতার দৈত্য নয়।

সংবিধানের ৭(ক) অনুসারে জনগণ রাষ্ট্রের মালিক বটে, তবে যখন সেই মালিকানা সংবিধানের অধিন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হয়, তখন সংবিধানই বলে, সেই মালিকানা একচ্ছত্রভাবে ভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। আর প্রচলিত আইন অনুসারে জেলা, উপজেলার শীর্ষ কর্তারা একেকজন ছোট প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ভোগ করেন। ডিসি সম্মেলনগুলোয় বছর বছর যে দাবিগুলো উঠে, এ তারই প্রতিফলন। আলিশান বাড়ি ও গাড়ির দাবি যে ক্যাডাররা দাবি করেন, সেটাও। চাকরির ট্রেনিংগুলোতেও তাই শেখানো হয়, তারা বিশেষ কিছু। এই জন্যই আমলারা জনপ্রতিনিধিদের ঠাট্টা করে বলেন, তাদের ক্ষমতা পাঁচ বছরের নয়। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পরেই কেবল এটা আলোচনায় এল।

আইন প্রণয়নে সংসদের একচ্ছত্র ক্ষমতা আছে বলে মনে করি। অথচ ১৫২ অনুচ্ছেদে আইন অর্থ কোনো আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশের আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনো প্রথা বা রীতি। মানে ডিসি, সচিবদের সেইসব আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন আর বিজ্ঞপ্তিও আইন। এইভাবে সংসদ ছাড়াও আইন তৈরি হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের অধিকাংশ আইন এইভাবে তৈরি হয়। তাই একজন ইউএনও কিংবা পুলিশ সুপার চুলের ছাঁট বা গণঅধিকার সংকুচিত করতে পারেন আইন শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে। পুলিশ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কিংবা সরল বিশ্বাসে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে। আমলাদের বেলায় সরল বিশ্বাস দুর্নীতি নয়। কিংবা বিভাগীয় মামলার নামে সামরিক আদালতের মতো আলাদা আদালতি কর্ম সারতে পারেন। যা বাংলাদেশের কোনো আদালতে আপিল করা যাবে না।-এইভাবে ভিআইপিতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠিত হয়েছে। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়ে সাম্য, মৈত্রী আর স্বাধীনতাকে লক্ষ্য ধরে। অথচ বাংলাদেশ কাঁতড়াচ্ছে ফেরি ঘাটে।

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ও ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট অ্যাক্ট এর অধীনে ভারত-পাকিস্তান নামে স্বাধীন ডোমিনিয়নে বিভক্ত হয়। মানে বৃটিশদের প্রণীত সংবিধানের অধিনে দুটি দেশ স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরু করে। আর মুক্তিযুদ্ধের দামে কেনা বাংলাদেশও এক বছরের মাথায় একই পথে যাত্রা করে। ফলে ভিআইপিতন্ত্রের কবল থেকে বাংলাদেশের মুক্তি ঘটে না।

লেখক: রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি।

আপনার মতামত লিখুন :