২১ আগস্ট: বাংলাদেশের রাজনীতির স্থায়ী বিভক্তি রেখা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের রাজনীতির দুটি ধারা- আওয়ামী লীগ এবং এন্টি আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার আগে এন্টি আওয়ামী লীগ ধারার নেতৃত্ব ছিল মুসলিম লীগের হাতে, স্বাধীনতার পর এন্টি আওয়ামী লীগ ধারার নেতৃত্ব হাতে তুলে নেয় জাসদ। আর ৭৫এর পর থেকে এই ধারাটির নেতৃত্ব বিএনপির হাতে। রাজনীতিতে দুটি ধারা থাকা অস্বাভাবিক বা অভূতপূর্ব নয়। বরং এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই রাজনীতির একাধিক ধারা রয়েছে। তবে আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও সব দেশেই দুই ধারার রাজনীতির মধ্যে আলাপ-আলোচনা, স্বাভাবিক সৌজন্য, ক্ষমতার পালাবদল ইত্যাদি থাকে। আমাদের দেশেও ছিল, এখন আর নেই। নেই কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর খুজতেই আজকের লেখা।

বাংলাদেশের রাজনীতির সকল বিভক্তি আগস্টে। বিভক্তি রেখা দুটি- ১৫ আগস্ট আর ২১ আগস্ট। আগস্ট মানেই যেন শোক আর বেদনা। ৭৫এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল ঘাতকরা। বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঘাতকরা তাদের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার মিশনে নেমেছিল। নেতারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবঢাল হয়ে শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে পেরেছেন। তবে আইভি রহমানসহ ২৪ জন মারা গেছেন নির্মম এই গ্রেনেড হামলায়। আগস্টের এই দুই নির্মম তারিখ আমাদের রাজনীতিতে স্থায়ী বিভক্তি রেখা টেনে দিয়েছে। যদিও ১৫ আগস্টের দায় চাইলে বিএনপি এড়াতে পারতো। কারণ ৭৫এর ১৫ আগস্ট বিএনপির জন্ম হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৫ আগস্টের মূল বেনিফিশিয়ারি জিয়াউর রহমানই বটে, তবুও বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। কর্নেল ফারুক ৭৫এ একবার উপসেনা প্রধান জিয়াউর রহমানের সাথে দেখা করে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের কথা বলেছিলেন। জিয়া তাকে, তোমরা জুনিয়র অফিসাররা কিছু করো, জাতীয় হালকা উস্তানি দিয়ে বিদায় করেছিলেন এবং সতর্ক জিয়া পরে আর ফারুক গংকে অ্যালাউ করেননি। জিয়াউর রহমান চাইলে জুনিয়র অফিসারদের অসন্তোষের কথা সিনিয়রদের জানাতে পারতেন। তা না করে তিনি সুযোগের অপেক্ষায় থাকলেন। সুযোগটা তিনি পেয়েও গেলেন। নানা ঘটনার পর ৭৫এর ৭ নভেম্বর ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন জিয়াউর রহমান।

১৫ আগস্ট সকালে রাষ্ট্রপতি হত্যার খবর শুনে শেভ করতে করতে নির্বিকার কণ্ঠে জিয়া বলোছিলেন, 'সো হোয়াট। ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার। আপহোল্ড দ্যা কনস্টিটিউশন।' জিয়ার প্রতিপক্ষের লোকজন বলেন, রাষ্ট্রপতির হত্যার খবর শুনে উপসেনা প্রধান হিসেবে তার যা দায়িত্ব ছিল তা পালন করেননি। অন্য সবাই যখন খবর শুনে রাতের পোশাকে সেনা সদরে গেছেন। জিয়াউর রহমান তখন শেভ করে, চালক নিয়ে ইউনিফর্ম পড়ে গেছেন। তার মানে তিনি ঘটনা জানতেন এবং অপেক্ষা করছিলেন। আর জিয়ার পক্ষের লোকজনের যুক্তি হলো, তিনি তো সংবিধান সমুন্নত রাখার কথা বলেছিলেন; ক্যু বা বিশৃঙ্খলা নয়। আর সেনা প্রধান থেকে শুরু করে সবাই যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তখন উপসেনা প্রধান কী করবেন। আর পেশাদার সৈনিক হিসেবে দ্রুত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিজেকে তৈরি করে ফেলাটা তো কৃতিত্বের। ১৫ আগস্টে জিয়াউর রহমানের যেটুকু ভূমিকা বা অবস্থান; চাইলে তিনি সেটা এড়াতে পারতেন। কিন্তু ১৫ আগস্টের খুনীদের পুনর্বাসন করে, চাকরি দিয়ে, খন্দকার মোশতাকের করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বহাল রেখে জিয়াউর রহমান বুঝিয়ে দিলেন; পরিস্থিতি যাই হোক, ১৫ আগস্টই বিএনপির রাজনৈতিক জন্ম। জিয়াউর রহমান যাই হোক, চাইলে বেগম খালেদা জিয়া ১৫ আগস্টের দায় এড়াতে পারতেন, রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গা ফিরিয়ে আনতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা তো করেনইনি, উল্টো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৫ আগস্ট জন্মদিন আবিষ্কার ও ঘটা করে পালন করে বুঝিয়ে দিলেন ১৫ আগস্টই তার এবং তার দলের রাজনৈতিক জন্ম। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করেছিল। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আবার পুরো বিচার প্রক্রিয়া ডিপ ফ্রিজে পাঠিয়ে দেয়। ১৫ আগস্টের দায় এড়ানোর সুযোগ থাকলেও জিয়া, খালেদা, বিএনপি বারবার নানাভাবে সে দায় নিজেদের কাঁধে টেনে নিয়েছে, যা আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপির রাজনৈতিক দূরত্ব আরো বাড়িয়েছে শুধু। তারপরও ১৫ আগস্টের বিভক্তি রেখাটা অলঙ্ঘনীয় ছিল না।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে স্থায়ী ও অলঙ্ঘনীয় বিভক্তি রেখা টেনে দিয়েছে ২১ আগস্ট, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। সবকিছুরই একটা নিয়ম থাকে। কিন্তু ২১ আগস্ট রাজনীতির সকল নিয়ম কানুন ভুলুণ্ঠিত করে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। দেশের বাইরে থাকায় ১৫ আগস্টের নির্মমতা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর থেকে বারবার তাঁর ওপর হামলা হয়েছে। ১৯টি হত্যাচেষ্টা থেকে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে অন্য সব হত্যাচেষ্টার সাথে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার একটা পার্থক্য রয়েছে। ২১ আগস্টের চেষ্টাটি ছিল বেপরোয়া, মরিয়া, নিষ্ঠুর ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বিরোধী দলীয় হত্যার চেষ্টা নজিরবিহীন। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো হত্যা পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত থাকতে পারেন, এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। তারচেয়ে বড় কথা হলো, ২১ আগস্ট হত্যা পরিকল্পনা হয়েছিল তখনকার বিকল্প ক্ষমতা কেন্দ্র হাওয়া ভবনে এবং মূল পরিকল্পনাটা ছিল তখনকার প্রধানমন্ত্রীপুত্র তারেক রহমানের। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও, এসব এখন আদালতে প্রমাণিত সত্য।

আমরা রাজনীতিতে সমঝোতার কথা বলি, আলোচনার কথা বলি। কিন্তু যখন জানি, শেখ হাসিনাকে মারতে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনায় ছিলেন তারেক রহমানও, তখন বুঝি কাজটা কত কঠিন। ১৫ আগস্ট যে বিভক্তির শুরু, ২১ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতির সেই বিভক্তিকে যেন স্থায়ী রূপ দিয়েছে। এই গত ১১ বছর ধরে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মুছে ফেলার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে, তার উৎসও কিন্তু ২১ আগস্ট। আপনি যথন রাজনীতির নিয়ম ভাঙবেন, তখন আপনিও প্রতিপক্ষের কাছ থেকে নিয়ম আশা করতে পারবেন না। জানি প্রায় অসম্ভব, তবু চাই রাজনীতিটা আবার নিয়মে ফিরুক। প্রতিহিংসার জবাব প্রতিহিংসায় না হোক। রাজনীতির লড়াইটা, বিভেদটা হোক আদর্শের।

আপনার মতামত লিখুন :