আরাকানের পর আসাম: কী করবে বাংলাদেশ?

শেখ আদনান ফাহাদ
শেখ আদনান ফাহাদ

শেখ আদনান ফাহাদ

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রতিবেশী ভারতীয় রাজ্য আসামে ১৯ লাখেরও বেশি মানুষকে রাষ্ট্রহীন ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। ভারতের মানুষকে ভারত সরকার রাষ্ট্রহীন ঘোষণা করুক আর যাই করুক, বাংলাদেশের তাতে সমস্যা হওয়ার কথা না। সাধারণ দৃষ্টিতে এমনটা মনে হলেও আসামকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের খুব সাবধান হওয়ার অনেক কারণ আছে। কারণ ইতোমধ্যে ভারত সরকারের অনেক দায়িত্বশীল মন্ত্রী এমনটা বলার চেষ্টা করছেন যে আসামের বাঙালিরা বিশেষ করে শুধু মুসলমানরা বাংলাদেশ থেকে গেছে!

এটা ইতিহাস বিকৃতি। বরং মুসলমানরাই আসামের স্থানীয় মানুষ। ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হলে পূর্ব বাংলা থেকে অনেক হিন্দু বাঙালি ভারত চলে যান এবং আসামসহ নানা স্থানে বসতি স্থাপন করেন। পূর্ববাংলা ছেড়ে হিন্দুদের ভারত চলে যাওয়া পাকিস্তান আমলে অব্যাহত ছিল এবং স্বাধীন বাংলাদেশ আমলেও অব্যাহত রয়েছে।

ভারত থেকেও একটা বড় সংখ্যক মুসলমান পূর্ব-পাকিস্তানে চলে এসেছিল। তবে ভারতের কোটি কোটি মুসলমান ভারতে তাদের সহায়-সম্পদ ফেলে, বাপ-দাদার ভিটে পরিত্যাগ করে শুধু ধর্মের দোহাই শুনে মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে পাকিস্তানে আসতে চায়নি। ফলে, ভারতে বিশ্বের অন্যতম বড় মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস।

মুসলমানরা শত শত বছর ভারত শাসন করেছে; ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। সেই মুসলমানদের এখন অভারতীয় পরিচয় দেওয়া হচ্ছে! শুধু তাই নয়, ভারতের আসাম রাজ্যের মুসলমানদের বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে এদেশে ঠেলে দেওয়ার প্রকাশ্য হুমকি এসেছে।

আগস্ট মাসের শুরুতে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দিল্লীতে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। সেখানে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি। দুই দেশ আলাদাভাবে বক্তব্য তুলে ধরেছে। অনুপ্রবেশ ইস্যুতে যৌথ বিবৃতি রাখার ব্যাপারে ভারতের দিক থেকে একটা চাপ তৈরি করা হয়েছিল বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যদিও অনুপ্রবেশের বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আলোচ্য সূচিতে ছিল না, কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তোলা হয় বলে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

সূত্রগুলো বলছে, অনুপ্রবেশ ইস্যুতে ভারতের বক্তব্য গ্রহণ করেনি বাংলাদেশ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বিবিসিকে বলেছেন, ‘অনুপ্রবেশের ব্যাপারে তারা যেটা আমাদের বলছেন, যেটা উনারা বলতে চাচ্ছেন যে- তোমাদের দেশ থেকে তো বহু লোক আসে। আমি সেখানে বলেছি, আমাদের দেশ থেকে এখন আর অবৈধভাবে কেউ যায় না। ভিসা নিয়েই যায়। অবৈধভাবে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না, কারণ আমাদের দেশে মাথাপিছু আয় বেড়ে গেছে। প্রবৃদ্ধি বেড়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারাই (ভারত) স্বীকার করলেন, গত বছর নাকি আমাদের ১৪ লাখ লোককে তারা ভিসা দিয়েছেন। আর মাল্টিপল ভিসা দেওয়া ছিল। সব মিলিয়ে ২৩ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক গত বছর ভারত গিয়েছিল।’

ভারত সরকার এখন ব্যস্ত কাশ্মীর নিয়ে। কাশ্মীর সঙ্কটের একটা সুরাহা হলে বাংলাদেশ সীমান্তে একইভাবে অস্থিতিশীল হবে না, এ কথা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায় না। তেমন হলে শেখ হাসিনার সরকার শক্ত অবস্থান নেবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবিকতা দেখিয়ে যে সঙ্কট বাংলাদেশ এখন মোকাবেলা করছে, সেটি নিশ্চয় সরকার অনুধাবন করতে পারছে। আসামের একজন মুসলমানও যেন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য কড়া দৃষ্টি সরকার এবং জনগণ সবাইকে রাখতে হবে।

ভারত সরকার যাই বলুক না কেন, যাই করুক না কেন, এই আবদার কোনোমতেই মেনে নেওয়া হবে না। শেখ হাসিনার সরকার অতীতের মত বাংলাদেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেবেন বলেই আশা করা যায়।

ভারত, পাকিস্তান কিংবা ধর্ম-সংক্রান্ত যে কোনো বিষয়ে বাংলাদেশের মুসলমানদের আর বেহুঁশ হলে চলবে না। রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষায় মাথা ঠাণ্ডা রেখে সচেতনভাবে জীবন যাপন করতে হবে। নানা দিক থেকে উসকানি আসছে। বিশেষ করে ধর্ম নিয়ে একাধিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দেশের কোটি কোটি মুসলমানকে উসকানি দিয়ে চলেছে। অন্য ধর্মের বাঙালি, অবাঙালিদের কথা এখানে বললাম না। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হিসেবে মুসলমানদের দায়িত্বই বেশি।

উসকানি ভারত বাংলাদেশ উভয় দিক থেকে আসছে। স্বাধীনতা বিরোধী পাকিস্তানপন্থী জামায়াত আর ভারতের সাম্প্রদায়িক শক্তির বাংলাদেশি সহযোগীরা সরাসরি এবং গোপনে ক্রমাগত উসকানি দিয়ে যাচ্ছে। এদের ধর্মের লেবাস ভিন্ন হলেও এরা নিজেদের কর্মকাণ্ড দিয়ে একে অপরের উদ্দেশ্য পূরণে সহায়তা করে।

বাংলাদেশ নিয়ে নানা দিকে, নানা পর্যায়ে ষড়যন্ত্র চলছে। চিরশত্রু পাকিস্তান তো আগে থেকেই আছে। আঞ্চলিক রাজনীতি-অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পশ্চিম ও প্রাচ্যের কতিপয় বড় দেশের মনোযোগের কেন্দ্রে এখন বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে বাগে রাখতে চায় সবাই। ফলে ষড়যন্ত্র ডালপালা মেলছে। চলমান রোহিঙ্গা সঙ্কট শুধুমাত্র ধর্মীয়, জাতিগত ও অর্থনৈতিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক ও বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের খেলা।

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে বাংলাদেশ সরকার যখন আপ্রাণ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে সাফল্য পেতে শুরু করেছে, তখন ভারত সরকার ১৯ লাখেরও বেশি আসামবাসীকে রাষ্ট্রহীন ঘোষণা করেছে। আসাম থেকে লাখ লাখ মুসলিমকে তাড়িয়ে সেখানে আরও একটি মিয়ানমার তৈরি করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে ২০১৭ সালেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দের প্রবীণ নেতা মাওলানা সৈয়দ আর্শাদ মাদানি।

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ সম্পর্কে আমাদের অনেকেই জানি না। ব্রিটিশ শাসনামলে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে ভাগ করে ফেলার অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে সবার আগে সংগঠন হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ রুখে দাঁড়িয়েছিল। আলাদা নয়, সম্মিলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার দাবিতে ব্রিটিশ আমলে দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছে এই জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ।

বৈধ নাগরিকদের তালিকা থেকে রাজ্যের লাখ লাখ মুসলিম বাদ পড়তে পারেন, সেই আশঙ্কা প্রকাশ করে দিল্লিতে জমিয়ত নেতা মওলানা মাদানি বলেছিলেন, ‘৪০০ বছর ধরে যারা বংশপরম্পরায় আসামে বসবাস করছেন, তাদের আপনি বাংলাদেশি বলে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন, তা আমরা কিছুতেই হতে দেব না। আমি পরিষ্কার বলতে চাই, তাহলে আগুন জ্বলে যাবে। ভারতীয় নয় বলে এই মুসলিমদের যদি আপনি বের করার চেষ্টা করেন, তাহলে তো বলব আসামের বিজেপি সরকার এটাকেও আর একটা মিয়ানমার বানানোর চেষ্টা করছে।’

চরমপন্থী দলগুলোর এহেন কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক অভিলাষ রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে নানা ছুতোয় হিন্দুদের ভাগিয়ে নিয়ে আসামে স্থান দিয়ে নিজেদের ভোটার বাড়াতে চায় এরা। মুসলমানদের বের করে দিয়ে হিন্দুত্ববাদের স্লোগানে নিজেদের একাধিপত্য নিশ্চিত করতে চায় ক্ষমতাসীন দলগুলো।

ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র হয়েছে দুটো-ভারত আর পাকিস্তান। পাকিস্তানকে যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্তিতে। তাই ইতিহাসের মানদণ্ডে আমরা বলতে পারি, মুসলমানদের কোথাও পাঠাতে হলে পাকিস্তানে পাঠানোর চেষ্টা করে দেখতে পারে ভারত। বাংলাদেশ শুধু মুসলিম বা হিন্দুর রাষ্ট্র নয়, এ রাষ্ট্র সবার। বাংলাদেশের মুসলমানদের আবেগমুক্ত হয়ে সাবধান থাকতে হবে। বিশেষ করে হেফাজতে ইসলাম ও মাদ্রাসা কমিউনিটিকে অনেক সাবধান হতে হবে। ভারত বা পাকিস্তানের মুসলমান আর আমরা এক নই। এক হলে আমাদের বর্ডার থাকত না, ভাষা আলাদা হত না। পাকিস্তানের মুসলিম সেনাবাহিনী আমাদেরকেই কচুকাটা করেছিল। তাই আমাদের সতর্ক হতে হবে।

পাকিস্তান-ভারতের সাম্প্রদায়িক শক্তির শক্ত নেটওয়ার্ক আছে বাংলাদেশেও। অন্যের
উসকানিতে যে মুসলমান হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করে, সেও এই সাম্প্রদায়িক শক্তির উদ্দেশ্য সাধন করে। তাই বাংলাদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা যতটুকু আছে, তা দূর করার দায়িত্ব আমাদেরকে নিতে হবে।

ভারত, পাকিস্তান, চীন, মিয়ানমার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, রাশিয়া তথা বিশ্বের নানা দেশকে সামাল দিয়েই আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে এগিয়ে যেতে হবে। রাজনীতিবিদ, সামরিক-বেসামরিক নীতি নির্ধারকরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নিশ্চয় সঠিক সব সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালান করবেন। নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্বও অনেক।

ধর্মকে ব্যক্তিজীবনে আপনি সবার ওপরে স্থান দিয়ে চর্চা করেন, আপনার ইচ্ছা। কিন্তু যখনই রাষ্ট্র হিসেব করবেন, তখন প্রতিবেশী রাষ্ট্র, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ইত্যাদি নানা বিষয় মাথায় রেখে কাজ করতে হবে।

শেখ আদনান ফাহাদ: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন :