গণমাধ্যম কার?

ইমরান হোসাইন
ইমরান হোসাইন

ইমরান হোসাইন

  • Font increase
  • Font Decrease
গণমাধ্যম আসলে কার? গণমানুষের? নাকি সমাজের এলিট সম্প্রদায়ের? এক কথায় এ প্রশ্নের উত্তর যতটা কঠিন মনে হয় আসলে ততটা কঠিন নয়। গণযোগাযোগ প্রচারণার বিভিন্ন তত্ত্বের ভিত্তিতে আমরা সহজেই বলতে পারি গণমাধ্যম এলিট সম্প্রদায়ের। ছলে-বলে-কৌশলে তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করাই যেন গণমাধ্যমের মুখ্য কাজ।

আমরা প্রচারণার আধুনিক তত্ত্ব দিয়ে শুরু করতে পারি। যোগাযোগ তাত্ত্বিকদের প্রণীত প্রচারণার আধুনিক তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, গণমাধ্যম এলিটদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই কাজ করে। আর তা করতে গিয়ে গণমাধ্যম বিভিন্ন ধরণের প্রচারণা চালায়। এ তত্ত্বে বলা হয়েছে, 'অতীতে গণমাধ্যমকে যেভাবে প্রচারণার টুল (হাতিয়ার) হিসেবে ব্যবহার করা হতো বর্তমানেও সেভাবেই ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে পার্থক্যের জায়গাটুকু হলো আধুনিক প্রচারণা অনেক বেশি সূক্ষ্ম, কৌশলপূর্ণ ও জটিল। এছাড়া এলিটদের কথিত স্ট্যাটাস কো (স্থিতিশীলবস্থা) টিকিয়ে রাখাই আধুনিক প্রচারণার উদ্দেশ্য।'

আরও শক্ত তথ্য দেওয়া যাক। ক্ল্যাসিকাল মার্ক্সিস্টরা মনে করেন, গণমাধ্যম ছলে-বলে কৌশলে সমাজের আধিপত্যশীল শ্রেণীর মতাদর্শকেই প্রতিফলিত করে। তাদের মতে, 'একটি সমাজের মূল চালিকাশক্তি তথা ভিত্তি কাঠামো হচ্ছে অর্থনীতি। আর যারা অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে চূড়ান্ত বিচারে তারাই সমাজের উপরিকাঠামো তথা রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি এবং গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে। 'এক্ষেত্রে আমাদের গণমাধ্যমগুলোর মালিকানার দিকে তাকালে আমরা এটা নির্ধিদ্বায় বলতে পারি যে, অধিকাংশ গণমাধ্যমের মালিকানা হয় কোনো ব্যবসায়ী নয়তো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হাতে। সুতরাং গণমাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে তাদের ব্যবসায়ীক নীতি প্রতিফলিত হয়। তবে এই অল্প যুক্তিতে গণমাধ্যমকে আমরা এলিটদের বলতে পারি না।

এক্ষেত্রে আমরা বিশিষ্ট ভাষা তাত্ত্বিক আমেরিকার কট্টর সমালোচক নোয়াম চমস্কি এবং যোগাযোগ তাত্ত্বিক অ্যাডওয়ার্ড এস হারমেন এর প্রচারণা মডেল উল্লেখ করতে পারি। তারা তাদের 'ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্টঃ দ্য পলিটিকাল ইকোনমি অব দ্যা ম্যাস মিডিয়া ১৯৮৮' গ্রন্থে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট সংবাদ মাধ্যমগুলো কীভাবে কাজ করছে, সেগুলো কীভাবে এলিটদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহার হয় এসবের ব্যাখ্যায় পাঁচটি ফিল্টার বা ছাঁকনির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে এসবের কারণে গণমাধ্যম বাধ্যবাধকভাবে এলিটদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। সেগুলো হচ্ছে: প্রথমত,গণমাধ্যমের মালিকানা-যা কয়েকটি করপোরেশনের হাতে পুঞ্জিভূত। এসব গণমাধ্যমে এমন কোনো আধেয় প্রচারিত হয় না যা তাদের ব্যবসায়ীক স্বার্থের পরিপন্থী।

দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞাপন-এটি গণমাধ্যমের প্রাণশক্তি বা ব্লাড হিসেবে পরিচিত। আয়ের সবচেয়ে বড় খাত। তাই স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞাপনদাতাদের স্বার্থবিরোধী কোনো আধেয় গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় না।

তৃতীয়ত, সংবাদ সূত্র-তথ্য প্রাপ্তির খাতিরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সূত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে সাংবাদিকরা এদের সঙ্গে একধরণের সুসম্পর্ক বজায় রাখে। যার ফলে ইচ্ছাসত্ত্বেও সাংবাদিকরা এসব এলিটসূত্র বিরোধী কোনো খবর প্রকাশ করতে পারে না। পাশাপাশি সাংবাদিকরা এন্টি-এলিট সূত্রও এড়িয়ে চলে। অনেক সাংবাদিক-কে এমনও দেখেছি ঈদের সময় এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বকশিস গ্রহণ করতে। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে লিখবে কীভাবে?

চতুর্থ বিষয়টি আরও ভয়ানক। সেটা হচ্ছে ফ্লাক-গণমাধ্যমের স্বাধীন মত প্রকাশের প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে এটি। এতে বিরোধী তথ্য প্রচারের জন্য গণমাধ্যমকে কড়া ভাষায় হুমকি প্রদান, মামলা দায়ের, কণ্ঠরোধে আইন প্রণয়ন ইত্যাদি করা হয়। এটির প্রভাবে একজন সাংবাদিক সেল্প-সেন্সরশিপে আটকা পড়ে যায়। আর এর বিপরীত করতে গেলে কী ঘটে সেটা কারোরই অজানা নয়। জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ড এর চেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে না।সবশেষে যে বিষয়টি এলিটদের পক্ষে ফিল্টার হিসেবে কাজ করে সেটা হচ্ছে এন্টি কমিউনিজম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধাত্তর স্নায়ুযুদ্ধের সময় মার্কিনরা সারা দুনিয়াব্যাপী কমিউনিজমের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে।বর্তমানে এটি জায়গা বদল করেছে। চলছে দুনিয়াব্যাপী এন্টি মুসলিম প্রচারণা। এলিটরা ইচ্ছা করলেই গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে যেকোনো মত কিংবা জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে।

গণমাধ্যম কর্তৃক এলিটদের স্বার্থরক্ষার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রিচার্ড লাইটিনেন ও রিচার্ড রাকোস গবেষকদ্বয় 'The Control Of Behavior By Media Manipulation' শব্দের অবতারণা করেন। তাদের মতে, গণমাধ্যম বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতা তথা জনগণের আচরণকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। জনগণের মাঝে কোনো ক্ষোভ দেখা দিলে গণমাধ্যম তা নিয়ন্ত্রণ করে। এভাবেই গণমাধ্যম এলিট শ্রেণীর স্বার্থ ও আধিপত্য বজায় রাখতে নিরন্তণ কাজ করে যায়।

উপরে উল্লিখিত তথ্যাদি ও প্রচারণার মডেলগুলো ভালোভাবে খেয়াল করলে আমরা এইটুকু নিশ্চিতভাবে বলতে পারব যে, গণমাধ্যম কি সত্যিকারার্থে এলিট, আধিপত্যবাদ, ক্ষমতাসীনদের, নাকি অধিকার বঞ্চিত, মুক্তিকামী গণমানুষের।

তবে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলতে গেলে গণমাধ্যম শুধু এলিটদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করে একথা পুরোপুরি সঠিক নয়। বাংলাদেশে এখনও ক্ষমতার সাথে আপোষহীন কিছু সংবাদ মাধ্যম রয়েছে। যাদের কাছ থেকে আমরা সত্য, সুন্দর, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পেয়ে থাকি। এসব সাহসী গণমাধ্যমের প্রতি সম্মান জানাচ্ছি। তবে এ সংখ্যাটা নিতান্তই কম।সেটা আমাদের আরও বাড়াতে হবে।

আমরা এইটুকু প্রত্যাশা করি, দেশ, জনগণ,মুক্তিকামী মানুষের অধিকার আদায়ে গণমাধ্যম ওয়াচডগ তথা অতন্ত্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামো নির্বাহী, আইন প্রণয়ন সংস্থা এবং বিচার বিভাগকে পর্যবেক্ষণে রাখবে।গণমাধ্যম হয়ে উঠবে গণমানুষের কণ্ঠস্বর।দূর করবে দুর্নীতি, সত্য প্রতিষ্ঠায় থাকবে আপোষহীন। সময় এসেছে,পুঁজিবাদ, আধিপত্যবাদ, গরীবের রক্তচোষা এলিটদের হাত থেকে গণমাধ্যমকে মুক্ত করতে হবে। গণমাধ্যমকে হতে হবে গণবান্ধব।

ইমরান হোসাইন, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন :