স্যারও একজন পুরুষ

শিমুল সুলতানা
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

স্যার কিন্তু কোনো রাখ-ঢাক না রেখেই শাড়িতে মেয়েদের কেমন দেখায় সে বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি শাড়িতে মেয়েদের যৌন আবেদনময়ী হিসেবে দেখেছেন। শাড়ি জড়িয়ে নারীদেহের এমন রহস্যময় ও ইঙ্গিতপূর্ণ বর্ণনা আপনি বা আমি তার মতো একজন গুণীজনের কাছ থেকে শুনতে চাইনি—এ সমস্যা কিন্তু স্যারের নয়, আমাদের। তিনি তো কোনো মহামানবীয় বক্তব্য দেননি। শাড়ির উপমা দিতে গিয়ে তিনি মায়ের আঁচলের প্রসঙ্গ টানবেন—আপনার আমার এমন আশার দায় তো স্যারের নয়।

স্যার শাড়িতে নারীকে যেভাবে দেখেন, সেভাবেই একটি দৈনিকে ‘শাড়ি’ শিরোনামের প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন। তাকে মানুষ শ্রদ্ধা করেন, তাই তিনি যে শাড়ি পরা মেয়েদের এভাবে দেখেন, তা অনেকে মেনে নিতে পারছেন না। কে তার সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করেন, সেটা নিয়ে ভাবার দায়ও কিন্তু তার নয়। আর সে দায় মাথায় নিয়ে ঘুরলে স্যারের মাথা থেকে শাড়িতে নারীর এমন বর্ণনা আমরা কোথায় পেতাম? 

স্যারের কাছে লম্বা মেয়েদের শাড়িতে সুন্দর লাগে, খাটোদের লাগে না, তা তো না লাগতেই পারে। কিন্তু তাই বলে খাটো মা-খালা-বোন-স্ত্রীরা কি শাড়ি পরা ছেড়ে দেবেন? স্বীকার করি, খাটো নারীদের হাতে বারো হাত দীর্ঘ এক শাড়ি বোঝাই বটে। কিন্তু তারপরও খাটো নারীরাও তো বাঙালি। যুগ যুগ ধরে শাড়ির ভাঁজেই বাঙালি নারী বন্দী অথবা মুক্ত। কেউ হয়তো শাড়ির ভাঁজে নিজের ভাঁজ লুকিয়েছেন, কেউ বা করেছেন প্রকাশ। স্যার শাড়ির ভাঁজ ভেদ করে নারীর প্রকাশিত ভাঁজই দেখেছেন। শাড়ির মাঝে লুকায়িত নারীর আভিজাত্য তার চোখে পড়েনি। 

স্যারের কাছে প্যান্ট-শার্ট পরা মেয়েদের দেখতে হাস্যকর লাগে, লাগতেই পারে। যারা ভাবছেন, স্যারের মতো একজন মানুষ কীভাবে শাড়ি নিয়ে এমন কামপূর্ণ বর্ণনা দিলেন, তাদের ভুলে গেলে চলবে না যে স্যার কিন্তু একজন পুরুষই।

স্যার লিখেছেন, `আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ।’  আমরা দেখে অভ্যস্ত তাই শাড়িতেই আমাদের কাছে বাঙালি নারীদের বেশি সুন্দর লাগে। মা, দাদি, নানি, ফুপু, খালা, চাচি, মামি, বোন, স্ত্রী বা কন্যার শাড়ির আঁচলে যৌন আবেদন নয়, প্রশান্তি খুঁজলেই আমরা খুশি হই। তবে আমাদের খুশি করার ঠিকাদারি তো স্যার নেননি। শাড়িতে বেশি যৌন আবেদন ফুটিয়ে তোলা যায়—এ কথা সিনেমার ক্ষেত্রে শুনলে হজম হয়, কিন্তু কোনো গুণীজনের কাছ থেকে শুনলে হজম হওয়া কঠিন।

বেশিরভাগ মেয়েই কিন্তু শাড়ি পরেন অভ্যস্ততার কারণে, ভালোলাগা থেকে বা ঐতিহ্যের কারণে। নারীর দেহে জড়ানো শাড়িতে ঐতিহ্য বা প্রশান্তি না দেখে তিনি উঁচু-নিচু ঢেউ দেখেছেন! সেই ঢেউয়ে সাঁতার কেটেছেন। এখন হয়তো অনেকেই শাড়ি পরে বিব্রত বোধ করতে পারেন। কারণ যে পোশাক তিনি লজ্জা নিবারণের জন্য পরেছেন, তা ভেদ করে স্যারের মতো কেউ হয়তো তার দেহের ভাঁজগুলোর মাপ নিতে ব্যস্ত।

স্যার লিখেছেন, ‘আজকাল শাড়ি ছাড়া অনেক রকম কাপড় পরছে তারা—সালোয়ার–কামিজ তো আছেই, পাশ্চাত্য ফ্যাশনের কাপড়ও কম পরছে না—এবং পরার পর ইউরোপ বা ভারতের ওইসব পোশাক পরা সুন্দরীদের সমকক্ষ ভেবে হয়তো কিছুটা হাস্যকর আত্মতৃপ্তিও পাচ্ছে।’ এমন লেখায় মর্মাহত হওয়ার দায়ও স্যারের নয়। ইউরোপ বা ভারতীয় নারীদের দেখাদেখি নিত্যনতুন ডিজাইনের কোনো পোশাক পরা মানেই যে তাদের সমকক্ষ হতে চাওয়া—এমন উদ্ভট ধারণা তিনি করতেই পারেন। কিন্তু যারা এমন পোশাক পরেন, তারা কি এই ধারণা থেকেই পরেন?

স্যার আরো লিখেছেন, ‘আমার ধারণা, একটা মেয়ের উচ্চতা অন্তত ৫ ফুট ৪-এর কম হলে তার শরীরে নারীজনিত গীতিময় ভঙ্গি পুরোপুরি ফুটে ওঠে না।’  আমাদের উচ্চতা, গায়ের রঙ, দেহসৌষ্ঠব, চেহারায় যে ভিন্নতা রয়েছে তাকে বৈচিত্র্য হিসেবে না দেখে তিনি ঘাটতি হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, প্রতিটি মানুষই সুন্দর। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেটে-লম্বা সবাই ভাবতে চাই, আই অ্যাম বিউটিফুল।

নিজের দেহ এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে পোশাক পরতে হবে। বিশ্বায়নের এ যুগে স্বাভাবিকভাবেই পোশাকেরও বিশ্বায়ন হচ্ছে। আমাদের দেশের মেয়েরা খুব সহজভাবেই পোশাক হিসেবে বেছে নিচ্ছেন ভিনদেশি বোরকা, আবায়া থেকে শুরু করে প্যান্ট-শার্ট, জিন্স, টি-শার্ট, স্কার্ট, ফ্রকসহ নানা ধরনের পোশাক। আবার বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে বিদেশি নারীদের অঙ্গেও শোভা পায় আমাদের শাড়ি। এভাবেই বিশ্বে বিনিময় হয় পোশাক থেকে শুরু করে কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, খাবার-দাবারসহ পুরো লাইফস্টাইল।

এদিকে যেসব পুরুষ স্যারের সমালোচনা করছেন, তাদের অনেকেই ফেসবুকিয় ভালোমানুষি দেখাচ্ছেন না তো? তাদের কেউ কি কখনো পরনারীর প্রতি আসক্ত হননি? স্যার একজন পুরুষ হিসেবে শাড়িতে শালীনতা নয়, নারী দেহের রহস্যময়তা দেখেছেন। তিনি স্ত্রী ছাড়া সব মেয়েকে মা-বোন হিসেবে দেখবেন, নারীদের সম্মান করবেন বা তিনি কামের ঊর্ধ্বে—এমন সব ধারণা যারা পোষণ করছি, দায় কিন্তু তাদেরই। তিনিও একজন পুরুষ। তার কাছ থেকে পৌরুষ বাদ দিয়ে শুধু মানবতা খুঁজলে তো হবে না।

দেখলাম এক ব্যক্তি ফেসবুকে লিখেছেন, ভেতরে ভেতরে বেশিরভাগ লোকই জামালপুরের ডিসি। পার্থক্য শুধু এই যে এখনো কারো কারো ভিডিও বের হয়নি, কারোটা হয়েছে। বিষয়টি হয়তো একেবারে এরকম নয়। কিন্তু নারী বা পরনারীর দেহের প্রতি তাদের কারোই কি আসক্তি নেই? জানতে ইচ্ছা করে। একজন ধর্মীয় নেতা যখন মেয়েদের তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করলেন, তখন অনেকেই হইচই শুরু করে দিলেন। প্রশ্ন হলো, তেতুল হুজুর কি একজনই? আমার জানতে ইচ্ছা করে।

সে যাই হোক, আমি বলি, স্যারকে পুরুষই ভাবতে হবে, মহাপুরুষ নয়। সব পুরুষই যে নারীকে এভাবে দেখেন, তা কিন্তু নয়। স্যারও দেখেন না নিশ্চয়ই। তিনি নারীর একটি দিক তুলে ধরেছেন মাত্র।

সব শেষে বলতে চাই, হাজার বছরের আলোকিত শাড়ির ভাঁজ ভেদ করে প্রকাশিত হোক আলোকিত বাঙালি নারী; দেখুক তা আলোকিত পুরুষরা।

শিমুল সুলতানা: আউটপুট এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

আপনার মতামত লিখুন :