এই দারিদ্র্য আর কতদিন?

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বেশ কিছুদিন আগের কথা। আইসিডিডিআর,বি-র সম্মেলন কক্ষ থেকে বের হয়ে ইউনেস্কোর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সাবেক এক পরিচালক মহোদয়ের সঙ্গে গাড়িতে ঢাকার রাস্তায় চলছিলাম। তিনি এক সময় আমার কোর্স শিক্ষক ছিলেন। বাড়ি নিউজিল্যান্ডে। বর্তমানে আমেরিকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। সুযোগ পেলে ঢাকায় আসেন, আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জিজ্ঞাসা করলাম, স্যার আপনি তো অনেকবার এদেশে এসছেন। কেমন লাগছে বর্তমান বাংলাদেশকে? তিনি অনেক বিষয়ে ভাল বললেন। কিন্তু অনেক কথার পর বললেন-মনে কিছু কর না, তোমাদের আর্থ-সামাজিক অনেক পরিবর্তন হলেও দারিদ্র্যটা এখনও সর্বত্র দেখা যায় কেন? আমি বললাম সেটা কী রকম ?

তিনি বললেন, আমি সম্প্রতি উগান্ডা, সামোয়া ও থাইল্যান্ড ঘুরে এসেছি। ওদের চেয়ে তোমাদের জমি, ব্যবসা ও আবহাওয়া-পরিবেশ অবস্থা ভাল বলে মনে হয়। কিন্তু ওসব দেশের রাস্তায় তোমাদের মত এত ভবঘুরে, ভিক্ষুক ও কর্মহীন শ্রেণি চোখে পড়ে না। আমি কিছু বলার আগেই গাড়িটা জ্যামে পড়ে গেল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেশ ক’জন ভিক্ষুক এসে জানালায় হাত পাতলো। ভাবলাম দেশ স্বাধীন হবার অর্ধশতক হতে চলেছে, তবুও মানুষ এখনও ভিক্ষা করে।

দীর্ঘদিন পরে মরুভূমির দেশে এসে হঠাৎ আামার নিউজিল্যান্ডের শিক্ষকের কথা মনে হলো। সৌদি আরবে পবিত্র হজব্রত পালনের জন্য প্রায় চল্লিশ দিন ধরে অবস্থান করছি। মসজিদুল হারামাইনে প্রতি ওয়াক্ত নামাজের শেষে লক্ষ লক্ষ হাজি একসংগে রাস্তায় বের হন। ভিড়ের মধ্যেই ক্লিনারের পোশাক পরা দেশি চেহারার মানুষগুলো চোখে পড়ত।

সুদান, পাকিস্তান, ভারত ছাড়া মাসজিদুল হারামাইনের বেশিরভাগ ক্লিনাররা বাংলাদেশি। তারা হাজিদের থেকে খালি বোতল, জুসের খালি প্যাক, ক্যান ইত্যাদি সংগ্রহ করে। এজন্য তারা নীল রঙের পলিথিন বস্তা মেলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাবতাম ভিড়ের সময় তারা মানুষের চাপে কাজ বন্ধ করে জড়সড় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু না, ভিড়ের মধ্যে ওরা ভিনদেশি হাজিদের কাছে আরবি ভাষায় ‘সাদকা’ চায়। অনেকে ওদের বস্তার মধ্যে টাকা-পয়সা দেন। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,  কেন এমন ‘সাদকা’ চান? কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে জানালেন, তিনি সৌদি আরবের ভিন্ন শহরে কাজ করেন। হজের জন্য কাজ করতে ওদেরকে তিন মাসের জন্য আনা হয়েছে। সে 'সাদকা’ পছন্দ করেন না, কিন্তু যারা এভাবে 'সাদকা’ প্রার্থনা করেন তাদের এই মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।

তাছাড়া এখানে হাজিদের কাছে 'সাদকা’ চাওয়া নিষেধ। সৌদি টিভি-তে এর ওপর সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। অনেকের চাকরি চলে গেছে। তবুও 'সাদকা’ নেয়া চলছেই। মনে মনে ভাবলাম-ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে! আমাদের নৈতিকতার উন্নতি না হলে নিজের বা দেশের আয়-উন্নতিতে কোন বরকত বা প্রাচুর্য্য আসবে কীভাবে?

দেশের কিছু হজ এজেন্সির লোকদের কিপ্টেমীর  কথা বলতে চাই। অগ্রিম সবধরনের খরচের অর্থ বুঝে নিয়ে বাংলাদেশ থেকে হাজিদের মক্কায় এনে সেবাদান দূরে থাক অনেক মোনাজ্জেম লাপাত্তা হয়ে যান। গাইড নামধারী যাদেরকে আনা হয়েছে তারা অনেকেই ইতোপূর্বে একবারও হজ করেননি। কোথাও বেশি অর্থ নিয়ে গাইডের কোটায় প্রাক-রেজিস্ট্রেশনে পিছনে থাকা ধনী হাজিদের মক্কায় আনা হয়েছে। এটা বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, এই ধরনের মিথ্যা-জালিয়াতিকে অনেক উচ্চশিক্ষিত আলেম-হাফেজ মাওলানা মোনাজ্জেমরা পাপাচার বলে স্বীকারই করেন না!

কয়েক বছর ধরে দেশে হজ ব্যবসায় এক শ্রেণির প্রতারক আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে। এরা দেশীয় রাজনৈতিক ও অসাধু ব্যবসায়িক গডফাদারদের ছত্রছায়ায় হাজিদের সেবার নামে অতি মুনাফালোভী হয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এরা সৌদি আরবে বাড়িভাড়া, খাবার, যাতায়াত সবকিছুতেই নিম্নমানের ব্যবস্থাপনা করে ও প্রতিশ্রুত সব কিছুই লঙ্ঘন করে ও হাজিদেরকে অবর্ণনীয় কষ্ট দেয়। এমনকি অগ্রিম হোটেল ভাড়া না করে মদীনায় নিয়ে প্রতিশ্রুত থাকার জায়গা দিতে না পেরে দেশের কিছু সম্ভ্রান্ত ও ধনী হাজিকে মসজিদে রাতযাপন করতে বাধ্য করা হয়েছে। কিছু এজেন্সির মনোনীত লোকজন নিরীহ, বয়স্ক, অশিক্ষিত, গ্রামীণ হাজিদের সাথে আশকোনা হাজিক্যাম্প থেকেই প্রতারণা ও দুর্ব্যবহার শুরু করে।

হাজিদেরকে বোঝানো হয় হজ মানেই কষ্ট। অনেক মোনাজ্জেম হাজিদের এক জায়গায় রেখে নিজেরা ভিন্ন জায়গায় থাকে অথবা সেবা দেয়ার ভয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। বাংলাদেশের তুলনায় আনুপাতিক কম খরচে হজে গিয়ে ভিন দেশের হাজিরা ভাল হোটেলে থাকেন, ভাল সেবা পান। কিন্তু আমাদের দেশের হাজিরা বেশি টাকা খরচ করেও প্রতারণার শিকার হন। আমাদের দেশের ভুঁইফোড় এজেন্সিগুলোর সেবার নামে ভন্ডামী ও প্রতারণা অচিরেই বন্ধ করে দেয়া উচিত। কিন্তু সেটা কে করবে?

এবারে হজে হাজিদের কাছ থেকে উচ্চ ফি নিয়ে মক্কায় নিয়ে যাবার পর অনেক এজেন্সি নতুন প্রতারণার ঝাঁপি খুলেছে। নিম্নমানের বাসস্থান ভাড়া করেছে যেগুলো হারাম শরীফ থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। পবিত্র কাবায় গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য যানবাহনের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। চল্লিশ ডিগ্রীর অধিক তাপমাত্রায় বয়স্ক হাজিদের পায়ে হেঁটে নামাজে যেতে গিয়ে বিপদে ফেলে অনেক এজেন্সির এজেন্টরা লাপাত্তা হয়েছেন।

পর্যাপ্ত টাকা নিয়েও খাবারের তালিকায় অত্যন্ত নিম্নমানের খাবার দিতে দেখা গেছে। চুরি-দুর্নীতিতে অভ্যস্ত এক শ্রেণির মানুষেরা হজকেও লাভের ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে। তারা চিহ্নিত প্রতারক ও দাগী অপরাধী। কিন্তু ফিবছর অজানা কারণে হজ এজেন্সি লাইসেন্স নবায়ন করার সুযোগ পেয়ে নতুন করে প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেন।

হজের মৌসুমে পবিত্র মক্কা-মদিনা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে বাঙালি চরিত্রের অপবাদ বিদেশ-বিভুঁইয়ে ছড়িয়ে দিতে কুণ্ঠিত হচ্ছে না। নিউজিল্যান্ডের শিক্ষকের কথা আবার মনে হলো। বুঝলাম আমাদের দারিদ্র্যের বহুমুখী চরিত্রের স্বরূপ।

তাই, কি দেশ, কি বিদেশ-আমাদের দারিদ্র্য সব জায়গায় চোখে পড়ে। নৈতিক দারিদ্র মূল দারিদ্র।  মনে হচ্ছে, অসৎ মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমরা মিথ্যা, চুরি, ঘুষ-দুর্নীতি, প্রতারণা, অন্যায়, অসততা সব কিছুর সাথে মিলে-মিশেই বসবাস করতে ভালবাসি-যা সবচেয়ে বড় অনৈতিকতা ও অধর্ম। এজন্য উন্নয়নের ‘বরকত’ উধাও হয়ে যাচ্ছে!

প্রফেসর . মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর সাবেক চেয়ারম্যান

আপনার মতামত লিখুন :