হিন্দুরা নিজেদের সংখ্যালঘু ভাববে না কেন

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বুধবার হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা গণভবনে গিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা বিনিময় করতে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী মন থেকে সব ধরনের হীনমন্যতা ঝেড়ে ফেলতে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেছেন, ‘এখানে আমার একটা অনুরোধ থাকবে। আপনারা জানি না কেন বারবার নিজেদেরকে সংখ্যালঘু সংখ্যালঘু বলেন। আপনারা কি এই রাষ্ট্রের নাগরিক না? আপনারা কি এই দেশের মানুষ না? এটা আপনার জন্মভূমি না?’ এই প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন শেখ হাসিনাই, ‘এটা আপনাদের জন্মভূমি। তাহলে আপনারা নিজেদেরকে ছোট করে এইভাবে সংখ্যালঘুভাবে দেখবেন কেন? এখানে সকলের সমান অধিকার রয়েছে। আমি সব সময় এটা শুনি, আমার কাছে খারাপ লাগে আপনারা নিজেদের কেন এভাবে খাটো করে দেখবেন। বাংলাদেশ আমাদের সকলের। আমরা বলি এই দেশ সকলের। আমি আপনাদের সকলকে বলবো নিজেদের ওই

সংখ্যালঘু সংখ্যালঘু না বলে- এই মাটি আপনাদের, এই দেশ আপনাদের। এই জন্ম ভুমি আপনাদের। কেন নিজেদের মধ্যে এই বিশ্বাস থাকবে না? অন্তত আওয়ামী লীগ সরকার যতদিন ক্ষমতায় আছে, কখনও আমরা ওই রকম ব্যবধান করে আমরা দেখি না।‘

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, 'আমরা সব সময় বিশ্বাস করি, যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে। ইসলাম ধর্মও সে শিক্ষা দেয়। আমরা মনে করি সব ধর্মেই এ কথা বলা আছে। প্রত্যেকটা ধর্মই শান্তির বাণী শুনিয়েছে।‘

প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তা তাঁর বিশ্বাস থেকেই বলেছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান এবং মনেপ্রাণে অসাম্প্রদায়িক। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনায়। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ধারণ করা ছিল একটি স্লোগানে, ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি।‘

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে রাষ্ট্রের চার মূলনীতির একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। যদিও ৭৫’র পর নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে, সংবিধান কাঁটাছেড়া করা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা সরে গিয়ে রাষ্ট্রধর্ম এসেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে এনেছে বটে, কিন্তু সংবিধানে এখনও রাষ্ট্রধর্মও আছে।

ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় শেখ হাসিনা সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম সরাতে না পারলেও তিনি যে মনেপ্রাণে ধর্মনিরপেক্ষ, তা বারবার প্রমাণ করেছেন। বুধবারের অনুষ্ঠানেও শেখ হাসিনা বলেছেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়।

কিন্তু শেখ হাসিনার এই ধর্মনিররপেক্ষ চেতনা আওয়ামী লীগ সরকার ধারণ করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। যেদিন গণভবনে প্রধানমন্ত্রী হিন্দুদের নিজেদের সংখ্যালঘু মনে না করার আহবান জানিয়েছেন, সেদিনই দৈনিক ভোরের কাগজে একটি শিরোনাম ছিল ‘’দুর্গাপূজায় ‘আনন্দ’ থাকছে না হিন্দুদের’। সংবাদটি পড়লে যে কোনো সংবেদনশীল মানুষের মন খারাপ হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর আহবানের সাথে এই সংবাদের কোনো মিল নেই। এই নিউজে যা আছে, সেই বিষয়গুলোই হিন্দুদের নিজেদের সংখ্যালঘু ভাবতে বাধ্য করে। আগামী ৪ অক্টোবর শুরু হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা।

৪ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজায় শুরু হবে শারদীয় দুর্গোৎসব। ৮ অক্টোবর বিজয়া দশমী ও বিসর্জনে শেষ হবে পাঁচদিনের এই উৎসব। শারদীয় দুর্গোৎসব যতটা ধর্মীয়, তারচেয়ে বেশি উৎসব। শুধু পূজার আনুষ্ঠানিকতাটুকু হিন্দুদের, উৎসবটা সবার। মজাটা হলো শারদীয় দুর্গোৎসব পাঁচদিনের হলেও সরকারি ছুটি কিন্তু মাত্র একদিনের। পাঁচদিনের শারদীয় দুর্গোৎসবে পুরো পাঁচদিন না হলেও অন্তত তিনদিনের সরকারি ছুটির দাবি দীর্ঘদিনের। সরকারি ছুটি একদিনের হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটু বেশিই ছুটি দেয়া হয়। এবার যেন তার ব্যতিক্রম। প্রতিবার অন্তত সাতদিন ছুটি দেয়া হলেও এবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছুটি দেয়া হয়েছে মাত্র তিনদিন, তাও সেই ছুটি শুরু হবে পূজার চতুর্থ দিনে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটি ৭-৯ অক্টোবর। অথচ পূজা ৪ অক্টোবর শুরু হয়ে ৮ অক্টোবর শেষ হয়ে যাবে। তারমানে হিন্দু শিশুদের পূজার প্রথম তিনতিন উৎসবে সামিল হতে হবে স্কুল শেষে। হিন্দু শিশুদের জন্য বছরের সবচেয়ে বড় উৎসবের সময় স্কুল করাটা নিশ্চয়ই অনেক কষ্টকর হবে। শিশুদের সেই বেদনাটা অন্তর দিয়ে বোঝার মত কেউ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আছে বলে মনে হয় না।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটির নির্ধারকদের মাথায় পূজার ক্যালেন্ডার না থাকলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কর্তাদের মাথায় ঠিকই ছিল। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৮ দিনের পূজার ছুটি শুরু হবে ৪ অক্টোবর। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পূজার ছুটি ৮ দিন হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনদিন হবে কেন? এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার মত কেউ কি আছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে?

সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৫ অক্টোবর। দিনটি হলো শারদীয় দুর্গোৎসবের দ্বিতীয় দিন। উপনির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশনের হাতে ৯০ দিন সময় থাকে। আর তাদেরকে কিনা দুর্গোৎসবের মধ্যেই ভোটগ্রহণের তারিখ দিতে হলো!  কিন্তু চাইলে পূজা শুরুর আগেই নির্বাচনের কাজ শেষ করে রাখা সম্ভব ছিল। এখন রংপুর-৩ আসনের হিন্দু ভোটাররা কি ভোট দেবে না পুজা করবে। তাছাড়া অনেক জায়গায় ভোটকেন্দ্র ও পূজামণ্ডপ পাশাপাশি থাকে। তেমন হলেও ভোট এবং পূজা দুটিই বিঘ্নিত হতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়বে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তিযুদ্ধে সামিল হওয়া হিন্দু তরুণরা। উচ্চশিক্ষায় ভর্তিতে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের পছন্দের শীর্ষে থাকে মেডিকেল কলেজ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। এবার মেডিকেল ও বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা হবে পরপর দুই দিনে। এর মধ্যে ৪ অক্টোবর মানে পূজার শুরুর দিনে দেশের বিভিন্নস্থানে ১৯টি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা।

এর পরদিন মানে ৫ অক্টোবর, মানে দুর্গোৎসবের দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হবে বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা। সমস্যা দুটি। ঢাকার বাইরের কেন্দ্রে যারা মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা দেবেন, পরীক্ষা শেষ করেই তাদের ছুটতে হবে ঢাকায়, বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য। শেষ মূহুর্তের প্রস্তুতি নেয়া তো দূরের কথা, অনেকে হয়তো ঠিকমত ঢাকায় এসে পৌছতেই পারবেন না। যারা মেডিকেল আর বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঠিক করেছেন, তারা হয়তো ভেবেছেন হিন্দুদের আবার ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে কেন। তাই পরীক্ষার তারিখ ঠিক করার সময় নিশ্চয়ই তাদের মাথায় পূজা ছিল না, হিন্দু তরুণদের কথা ছিল না। হিন্দু তরুণরা যদি নিজেদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবে সামিল হয়, তাহলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না; আর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলে পূজা করতে পারবেন না। তাতে কার কি যায় আসে। শুনলাম পূজার পাঁচদিনের মধ্যে দুদিন নাকি বিসিএস'এর ভাইভা আছে। তো হিন্দুদের আবার বিসিএস দেয়ার দরকার কি। তারা পূজাই করুক।

জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা বিনিময়ের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমাদের সবসময় ওইটাই লক্ষ্য থাকবে যে আমাদের প্রত্যেকটা ধর্ম- আমাদের ঈদ বলেন, আপনাদের পূজা বলেন বা বৌদ্ধ পূর্ণিমা বলেন অথবা বড়দিন… আমি বলবো পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশেই মনে হয় এত সুন্দর, এত আন্তরিক পরিবেশে প্রত্যেকটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান আমরা মিলেমিশে উদযাপন করি। এখানে কিন্তু আর কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকে না, সবাই মিলেই সবার অনুষ্ঠানে যাই।‘ প্রধানমন্ত্রীর এই আন্তরিকতা, এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা তার সরকারের লোকজন ধারণ করে না। করলে হিন্দুদের সবচেয়ে ধর্মীয় উৎসবে ছুটি নিয়ে, ভোট নিয়ে, ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে, বিসিএস'এর ভাইভা নিয়ে এমন কাটাকুটি খেলা সম্ভব হতো না। যারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটি ঠিক করেছেন, যারা ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঠিক করেছেন, যারা নির্বাচনের তারিখ ঠিক করেছেন, যারা বিসিএস'এর ভাইভার তারিখ ঠিক করেছেন; তাদের মাথায় নিশ্চয়ই হিন্দু ধর্মের মানুষদের কথা ছিল না। এ ধরনের মানুষের কারণেই হিন্দুরা নিজেদের সংখ্যালঘু মনে করেন, হীনমন্যতায় ভোগেন। তাই প্রধানমন্ত্রীর হিন্দুদের প্রতি আহবান না জানিয়ে মুসলমানদের প্রতি আহবান জানানো উচিত ছিল- হে মুসলমান ভাইয়েরা আপনাদের কোনো আচরণে হিন্দু বা বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান বন্ধুরা যেন নিজেদের সংখ্যালঘু মনে না করেন। একটি মানবিক রাষ্ট্রে সংখ্যায় যারা কম, যারা একটু দুর্বল; তাদের অধিকার রক্ষায়, দাবি আদায়ে সংখ্যায় যারা বেশি তারাই বেশি সোচ্চার হন।

প্রধানমন্ত্রী তার আকাঙ্খার কথাটি বলেছেন। আর সেই আকাঙ্খাটি আসলে বাংলাদেশেরই আকাঙ্খা। ধর্মিভিত্তিক পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনে বাংলাদেশ হয়েছিল একটি সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়তে। যে রাষ্ট্রে ধর্ম দিয়ে কাউকে বিবেচনা করা হবে না, বঞ্চিত করা হবে না। শেখ হাসিনা মুখে যাই বলুন, তিনি একা তো আর সব সামলাতে পারবেন না। তার চারপাশে যারা আছেন, যারা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন; তাদের আরো সংবেদনশীল হতে হবে, ধর্মনিরপেক্ষে চেতনা ধারণ করতে হবে।

ধর্ম যার যার, উৎসব সবার; এটা শুধু স্লোগান দিলে হবে না, মুখে বললে হবে না। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা যাতে পরীক্ষা, ভোট, স্কুলের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে নির্বিঘ্নে, দ্বিধাহীন চিত্তে উৎসবে সামিল হতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। হিন্দুরা যাতে নিজেদের সংখ্যালঘু মনে না করে, সেটা মুখে বললে হবে না; সংখ্যাগুরুদের আচরণ দিয়েই সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :