আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের নতুন সংজ্ঞায়ন প্রয়োজন

মাছুম বিল্লাহ
মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বের সব প্রান্তে সরকার, সমাজ এবং বিভিন্ন অংশীদারদের জন্য একটি সুযোগ হিসেবে 'আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস’ পালিত হয়। দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য, সাক্ষরতার ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি হয়েছে সেটি জানা, সাক্ষরতায় অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা এবং সেগুলো উত্তরণের পথগুলো চিহ্নিত করা। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে Literacy and Multilingualism অর্থাৎ বহু ভাষায় সাক্ষরতা, উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা।

সাক্ষরতার সঙ্গে শিক্ষা আর শিক্ষার সঙ্গে উন্নত জীবন, ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পৃথিবীতে বহু ভাষা প্রচলিত রয়েছে। সেগুলোকে আমাদের স্বীকৃতি দিতে হবে। এথনোলগ ওয়েবসাইট সূত্র থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে বর্তমানে আনুমানিক সাত হাজার ৯৭টি ভাষা বেঁচে আছে। এর মধ্যে দুই হাজার ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা এক হাজারেরও কম। এ ছাড়া মোট ভাষার মাত্র অর্ধেকের আছে লিখিত রূপ। এসব ভাষায় ব্যবহার করা হয় ৪৬ ধরনের বর্ণমালা। বাকিগুলো মৌখিকভাবেই চর্চিত হয়।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাকেন্দ্রিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি দুই সপ্তাহে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একটি করে ভাষা।

সাক্ষরতা অর্জনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে সত্য, কিন্তু এখনও বহু চ্যালেঞ্জ থেকে গেছে এবং সাক্ষরতার ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন হয়েছে সেটি অসম। দেশে দেশে মানুষে মানুষে এর ভিন্নতা স্পষ্ট। এক্ষেত্রে সমতা আনয়নের জন্য কী করা প্রয়োজন, সেটিও সাক্ষরতা দিবসের আলোচনার বিষয়।

বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় ও ডিজিটালাইজড বিশ্বে বহুভাষিকতার বৈশিষ্ট্যগুলো, রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার প্রভাব ও ফল কী হতে পারে বহুভাষিক প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্যান্য সব ভাষার বৃহত্তর অন্তর্ভুক্তি ঘটানোও সাক্ষরতা দিবসের উল্লেখযোগ্য একটি দিক।

২০১৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গোটা পৃথিবীতে ৭৭৫ মিলিয়ন জনসংখ্যা সাক্ষরতার মৌলিক ধারণা থেকে দূরে অবস্থান করছে। এর অর্থ হচ্ছে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন নয়। এই ২০ শতাংশের মধ্যে আবার প্রায় ৬৬ শতাংশ হচ্ছে নারী। প্রায় ৭৫ মিলিয়ন শিশু এখনও হয় বিদ্যালয়ে যায়নি কিংবা বিদ্যালয় থেকে ঝড়ে পড়েছে। অর্থাৎ সাক্ষরতা অর্জন থেকে দূরে অবস্থান করছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আমরা কোথায় অবস্থান করছি এবং আমাদের কী করতে হবে।

১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে পৃথিবীর সব দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করতে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরে ১৯৬৫ সালের ৮-১৯ সেপ্টেম্বর ইউনেস্কোর উদ্যোগে ইরানের তেহরানে বিশ্ব সাক্ষরতা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্বের ৮০টি দেশের শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছিলেন। ওই সম্মেলনে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের প্রস্তাব করা হয়।

পরে ১৯৬৫ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। আর ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো দিবসটি প্রথম উদযাপন করে। তবে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে ১৯৭২ সাল থেকে।

সাক্ষরতার সঙ্গে উন্নয়নের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তার জ্বলন্ত প্রমাণ হচ্ছে, বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭২ শতাংশ এবং আমাদের মাথাপিছু আয় ১৯০৯ ডলার। এখন সাক্ষরতা মানে শুধুমাত্র অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন নয়, এর সঙ্গে জীবনধারণ, যোগাযোগ দক্ষতা ও ক্ষমতায়নের দক্ষতাও যুক্ত হয়েছে।

এক সময় ছিল যখন কেউ নাম লিখতে পারলেই তাকে স্বাক্ষর বলা হতো। বর্তমানে যিনি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে পারবেন, সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারবেন এবং দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসাবনিকাশ করতে পারবেন, তাকে আমরা সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন বলব।

পৃথিবী এখন এই তিন শর্তযুক্ত সংজ্ঞাকেই সাক্ষরতার সংজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করে। এই সংজ্ঞাটি পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ১৯৯৩ সালে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করে ইউনেস্কো।

এখন সব শ্রেণি-পেশার মানুষের হাতে হাতে মোবাইল। তাদের মধ্যে অনেকেই ইংরেজি পড়তে পারেন না, অথচ মোবাইল ফোন রিসিভ করেন, ফোন করেন, অনেকে ইংরেজিতে মেসেজও লেখেন। একইভাবে অনেকের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই অথচ কম্পিউটারে কাজ করেন। যার অধিকাংশই ইংরেজিতে করতে হয়। তাদের আমরা কি বলব?

প্রচলিত অর্থে নিরক্ষর মানুষেরাই এখন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার সমৃদ্ধ করছে। তারা কি আসলেই নিরক্ষর? ২০১৯ সালে দাঁড়িয়ে আমরা কাদের সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন বলব আর কাদের নিরক্ষর বলব, তার নির্দিষ্ট পার্থক্য ও সীমারেখা নির্ণয় করতে হবে।

এখন যেসব শ্রমিক পরিবহনের সঙ্গে সংযুক্ত, তাদের সাক্ষরতা বলতে আমরা কী বুঝব? তারা অবশ্যই নিজের নাম লিখতে পারবে, পরিবহন সম্পর্কিত আদেশ নিষেধ নিজ ভাষায় পড়তে পারবে, কোন কোন বিষয়টি জনসাধারণের জন্য ক্ষতিকর, সমাজের জন্য ক্ষতিকর, সে বিষয়গুলো জানবে এবং পালন করবে। যেমন অযথা হর্ন বাজানো, হাইড্রলিক হর্ন না বাজানো, কোথায় কোথায় হর্ন একেবারেই বাজানো যাবে না, ইত্যাদি বিষয়গুলোও সাক্ষরতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে। একইভাবে, কৃষি শ্রমিকদের নিজ ভাষায় ফসল উৎপাদনের সাধারণ নিয়ম-কানুন লেখা সম্বলিত পুস্তিকা পাঠ করে তা বুঝতে পারা, শিশু শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তার শিক্ষার পূর্ণ অধিকার সম্পর্কে জানা ও আদায় করা, তাদের জন্য কোন কাজগুলো ঝুঁকিপূর্ণ, তা বুঝতে পারা তার সাক্ষরতার অংশ।

সাক্ষরতার সঙ্গে এগুলো যোগ করতে না পারলে সাক্ষরতা দিবস পালনের মধ্য দিয়ে আমরা প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারব না। নির্দিষ্ট বিভাগ তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত জনগণকে সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করে তুলবে, সরকার সেখানে সহায়তা করবে, সামর্থ্য অনুযায়ী বেসরকারি সংস্থাগুলো ও ব্যক্তি সেখানে সহায়তা করবে। এভাবেই দেশ ও বিশ্ব থেকে প্রকৃত নিরক্ষরতা দূর হবে, প্রয়োজনীয় সাক্ষরতা সম্পন্ন মানুষ তৈরি হবে প্রতি সেক্টরে।

১৯৯১ সালে আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে বই সরবরাহ করা হচ্ছে আর মেয়েদের শিক্ষা বৃত্তিতো আছেই।

আমাদের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে ছয় থেকে ১০ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্য বিনামূল্যে মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো সাক্ষরতা বৃদ্ধি তথা প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু এটিও তো ঠিক যে পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পরেও অনেক শিক্ষার্থী দেখে দেখে বাংলা পড়তে পারে না, ইংরেজি তো দূরের কথা। এটিকে কোন ধরনের সাক্ষরতা বলব? সাক্ষরতার হার নির্ধারণে আমরা যে পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছি, সেটি সাক্ষরতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না।

১৯৮৫ সালে লেসোথোতে ব্যক্তিপ্রদত্ত মূল্যায়ন, যা আমাদের দেশেও অনুসরণ করা হয়। এ পদ্ধতি ব্যবহার করে সাক্ষরতার হার দেখানো হয়েছিল ৬০ শতাংশ। অথচ সাক্ষরতার পরিবর্তিত সংজ্ঞা অনুযায়ী ব্যক্তিকে নিদিষ্ট করার মাধ্যমে মূল্যায়ন ও যাচাই করা হলে সাক্ষরতার হার ৪৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। আমাদেরও সাক্ষরতার সঠিক হার নির্ধারণ করতে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

সাক্ষরতার বিষয়টি তাই ব্যক্তি, সমাজ, দেশ- সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। সাক্ষরতার পরিবর্তিত সংজ্ঞা অনুযায়ী আমাদের অবস্থান কোথায়, স্ট্যান্ডার্ড মানদণ্ডে সেটি পরিমাপ করতে হবে, শুধুমাত্র সংখ্যার বৃদ্ধিতে উন্নীত করে তৃপ্তি পাবার অবকাশ নেই।

মাছুম বিল্লাহ: ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত, ভাইস প্রেসিডেন্ট-বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেল্টা)।

আপনার মতামত লিখুন :