ভারতের এনআরসি নিয়ে আমরা শঙ্কিত হব কেন?

ফরিদুল আলম
ফরিদুল আলম. ছবি, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ফরিদুল আলম. ছবি, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কথায় বলে 'ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়'। আমাদের ক্ষেত্রে আজকাল এই প্রবাদ বাক্যটি বেশ যায়। কথাটির অবতারণা করছি ভারতের আসাম রাজ্যে গত ৩১ আগস্টের এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি ঘোষণা নিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের দেশে প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ঢল এবং তাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে জটিলতর পরিস্থিতি নিয়ে যখন দেশ উত্তপ্ত এমন সময়ে সঙ্গত কারণেই আমাদের নাগরিকদের একাংশ ভারতের আসামের নাগরিকপঞ্জি থেকে ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৬ জনের বাদ পড়াকে আমাদের জন্য অশনি সংকেত বলে মনে করছেন।

এই আশঙ্কার সবচেয়ে বড় কারণ ভারতের শাসকশ্রেণির অতি কট্টর আচরণ, যারা বেশ কয়েক বছর ধরে দাবি করে আসছেন আসামে বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি কেউ কেউ (এদের মধ্যে বিজেপি সভাপতি এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্‌ও রয়েছেন) প্রকাশ্যে বলছেন, বাংলাদেশ থেকে আসা এইসব মুসলমানদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।

পুরো আসামব্যাপী বিজেপির নেতৃবৃন্দের কথার ধরন আর কেন্দ্রীয় নেতাদের কথার ধরনের মধ্যে খুব বেশিই মিল পাওয়া যায়। তবে অমিত শাহ্‌ বিগত সাধারণ নির্বাচনে এনিয়ে যতটা প্রকাশ্যে কথা বলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবার পর ততটা সরব নন, যা অতটা শঙ্কার নয়।

বিতর্কিত এই এনআরসি নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মধ্যেই ইতোমধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে এই মর্মে যে এখানে সর্বসাধারণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল না, যার ফলে এই নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদপড়াদের মধ্যে যেমন কয়েকজন সাবেক বিধায়ক রয়েছেন তেমনি রয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহম্মদ এবং তার স্বজনরা। সবকিছু মিলে বলার অপেক্ষা রাখে না যে কতটুকু অশুভ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ক্ষমতাসীন দল এমন একটি তালিকা প্রণয়নের কাজে হাত দিয়েছে।

তাদের এই কাজে যে নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাব ছিল তার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে মুসলমানদের বাদ দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করা এই কাজে বাদপড়াদের মধ্যে ১২ লাখেরও অধিক রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, মুসলমান ৭ লাখের কাছাকাছি।

এখন তাদের নিজেদের কথায় আসি। তারা আগে থেকেই ঘোষণা দিয়েছিল যে এই তালিকার মাধ্যমে যারা চিহ্নিত হবেন, তাদের রাষ্ট্রহীন ঘোষণা করা হবে। তবে এদের মধ্যে যারা হিন্দু থাকবেন, তাদের ভারতের নাগরিকত্ব দেয়া হবে, আর মুসলমানদের ফেরত পাঠানো হবে তাদের নিজ দেশে। এই কথার মধ্যে দিয়ে যে সরল অংকটি সকলের সামনে পরিষ্কার হয়ে আসে তা হচ্ছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার কিছু হিন্দুদের প্রতি দয়াপরবেশ হয়েছে এমনটা জানান দিয়ে তাদের ভোটব্যাংককে সমৃদ্ধ করতে চাইছে।

এখন কথা হচ্ছে যাদের তারা চূড়ান্ত বিবেচনায় রাষ্ট্রহীন বিবেচনা করে নিজ দেশে (ধরে নিলাম বাংলাদেশে) ফেরত পাঠাতে চাইবে, সেই তথাকথিত নিজ দেশ কোন যুক্তিতে ভারত কর্তৃক ঘোষিত এই সকল ‘রাষ্ট্রহীনদের’ গ্রহণ করবে?

এখানে যারা এবিষয়ে রোহিঙ্গাদের সাথে এই পরিস্থিতিকে মিলিয়ে ফেলতে চাইছেন তাদের মনে রাখতে হবে যে মিয়ানমার সরকার কর্তৃক ঘোষিত রাষ্ট্রহীন (১৯৮২ সালের তথাকথিত নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী) রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অনেক আগ থেকেই অবগত এবং সেখানকার সামরিক সরকারের রোহিঙ্গা নিধনের চিত্র সাড়া বিশ্ব সম্যকভাবে অবহিত এবং এদের প্রতি যে মিয়ানমার সরকারের দায় নেই এটি আজ পর্যন্ত স্বীকৃত নয়।

সুতরাং ভারত যদি আজ হঠাৎ করে মিয়ানমার সরকারের মত করে আচরণ শুরু করে তাহলে বাংলাদেশ কেন এবং কোন বিবেচনায় চিরদিনের জন্য রাষ্ট্রহীন বলে ঘোষিত মানুষদের গ্রহণ করবে?

বিষয়টি যত সহজভাবে আমাদের কিছু বিশ্লেষকরা শংকার দৃষ্টিতে দেখছেন, এর কোন যৌক্তিক কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখছি না। বিষয়টি স্রেফ যেভাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শংকর তার সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরে ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে অভিহিত করেছেন এর বেশি যদি আমরা মনে করতে যাই তাহলে তো আর কিছু বলার নেই।

এ বিষয়ে কেউ কেউ আমাদের সরকারের নীরবতাকে কটাক্ষ করেছেন। আসলে কিইবা করতে পারে আমাদের সরকার? আমাদের বুঝতে হবে এক্ষেত্রে ভারতের আইনের ব্যাখ্যা রয়েছে। কয়েকদফার আপিলের মধ্য দিয়ে যারা চূড়ান্তভাবে বাদ পড়ে যাবেন, সে বিষয়ে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, অর্থাৎ জেল জরিমানা, ডিটেনশন ইত্যাদি। এর অর্থ কোনভাবেই এটা নয় যে অপর কোন সার্বভৌম দেশের কাধে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বোঝা চাপিয়ে দেয়া। আর এতটা দূর্বল আমরা এমন যারা ভাবছেন তারা ভুল করছেন।

এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার যে ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে আসামের নাগরিকপঞ্জি প্রকাশের মাধ্যমে কার্যত ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত এনআরসির কার্যক্রম শুরু হল। এতদিন ধরে কোন সরকার প্রতিপক্ষ্যের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে পারেন বিবেচনায় এধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে হাত দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। আজ বিজেপি যা করেছে তা এককথায় অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে এই এনআরসি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের দলের স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছে।

মনে রাখতে হবে যে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিরোধী দলের দুর্বল অবস্থাকে পুঁজি করে এই দফায় সরকার গঠনের পরপরই বিজেপি সরকার দ্রুততম সময়ে কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করে নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে জম্মু এবং কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার রদ করে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিকপঞ্জি ঘোষণার মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতের ভোটের রাজনীতিতে তাদের কট্টর সমর্থকদের আশ্বস্ত করার পাশাপাশি অপরাপর হিন্দুদের ভেতর তাদের কথিত জাতীয়তাবাদের বীজ ঢুকিয়ে দিতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে। সুতরাং রোহিঙ্গা সমস্যার সাথে একে মিলিয়ে আমাদের আতংকিত হওয়া মানে নিজেদের ইচ্ছে করে দুর্বল হিসেবে উপস্থাপন করা।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :