সব দায় কি রাষ্ট্রের?

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দেরিতে ফেরি ছাড়ার কারণে স্কুলছাত্র তিতাসের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি যার জন্য ফেরির অপেক্ষা সেই যুগ্মসচিব ও মাদারীপুরের জেলা প্রশাসকের কোনো দায় খুঁজে পায়নি। পাওয়ার কথাও নয়। কেননা তারা জানতেন না যে, তাদের কারণে মুমূর্ষু তিতাসকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স পার হতে পারেনি। তবে, দায়িত্বে অবহেলা, অযোগ্যতা ও অদক্ষতার জন্য ঘাট ম্যানেজার, প্রান্তিক সহকারী এবং উচ্চমান সহকারীকে দায়ী করেছে তদন্ত কমিটি।

দুই.

সম্প্রতি এমন অনেকগুলো বিষয় সংবাদ শিরোনাম হয়েছে পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের টকশো ও সংবাদে, গলি থেকে রাজপথের চায়ের দোকানে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যার জন্য রাষ্ট্রকে বিব্রত হতে হয়েছে। যেমন: কোরবানির চামড়ার মূল্য নির্ধারণে কারসাজি, ডেঙ্গু, গলাকাটা ও ছেলেধরা গুজব, পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগা গুজব, বন্যা, মিন্নি, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি, বালিশ কেলেঙ্কারি, ধর্ষণ, চৌদ্দটি কোম্পানির পাস্তুরিত দুধে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি, ভিআইপি’র জন্য ফেরির অপেক্ষা ও কিশোর ছাত্রের অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যু, জিআরপি থানার ওসিসহ অন্য পুলিশ কর্মকর্তা দ্বারা রেলযাত্রীকে ধর্ষণ, ডাকসু ভিপি নুরের ওপর বারবার আক্রমণ, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের ডিআইজি (প্রিজন) পার্থ গোপাল ঘুষের ৮০ লক্ষ টাকাসহ দুদক কর্তৃক গ্রেফতার, ফেনীর সোনাগাজীর অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ড, ডিআইজি মিজানের ঘুষ ও নারী কেলেঙ্কারি ইত্যাদি।

তিন.

যে দেশের প্রধানমন্ত্রী দিন-রাত ১৬-১৮ ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করেন, উন্নয়নের মহাসড়কে দেশের অগ্রযাত্রা অবিরাম গতিশীল রাখেন, তার পরিশ্রমের সম্মানের প্রাপ্তি এগুলো কোনভাবেই হতে পারে না।

মন্ত্রী, সাংসদ ও তাদের স্বজন; ছাত্র নেতা; সরকারবিরোধী দলগুলোর ঘাপটি মেরে থাকা গুজব সৃষ্টি ও ছড়ানোর কুশীলব; এমনকি টেলিভিশনের টকশোর কথার যুদ্ধ; নিজ দল ও জোটের নেতৃবৃন্দের পরস্পরবিরোধী অবিবেচনাপ্রসূত বক্তব্য এবং ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড সত্যিকার অর্থেই রাষ্ট্রকে বিব্রত করেছে।

আবার সরকারের প্রধান মুখপাত্রের বাইরে দল ও জোটের নেতৃবৃন্দকে অবলীলায় অপরিণামদর্শী বক্তব্য প্রদান করার সুযোগ করে দেওয়াসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ‘পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি’ বিরোধী পক্ষের চেয়ে কম হওয়ায় সরকার নিজেও বিব্রত হওয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দিয়েছে। দল ও জোটের নেতৃবৃন্দের মন্ত্রিত্ব পেলে বক্তব্য এক রকম আর মন্ত্রিত্ব না পেলে বক্তব্য অন্য রকম।

চার.

সরকারের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, বর্ষায় এডিস মশার সংখ্যা পূর্বের তুলনায় ছয় গুণ বেড়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত জরিপে দেখা যাচ্ছে, সব ধরনের মশার লার্ভার ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে আগামী দিনগুলোতে মশার সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে।

হঠাৎ করে বাংলাদেশসহ ভারত, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনসহ বিশ্বের অনেক দেশে ভয়াবহ আকারে ডেঙ্গু রোগের বিস্তৃতি ঘটেছে। এডিস লার্ভা জীবন শঙ্কার কারণ হয়েছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নেওয়ায় এডিস মশা নির্দ্বিধায় জন্ম নিয়েছে। কারো ঘরের অভ্যন্তরীণ বিষয় সরকার বা রাষ্ট্রের জানার যেমন কথা নয়, তেমনি সময়মত মশা নিধন, আবর্জনা পরিষ্কার ও পয়োনিষ্কাশন সঠিকভাবে করল কিনা তা সত্যিকার অর্থেই সরকারের জানার কথা নয়। কেননা তা সঠিকভাবে দেখভালের জন্যই দেশে সিটি করপোরেশন, জেলা ও উপজেলা পরিষদ এবং পৌরসভার মত বিভিন্ন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। অথচ যেই দোষ করুক, সব দোষ পড়ে সরকারের ওপর।

পাঁচ.

প্রতি বছর প্রায় অধিকাংশ জেলায় বন্যা প্লাবিত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে সঠিক উপায়ে প্রতিরোধ করার সময় এসেছে। বন্যা প্রাকৃতিক কারণেই হয়ে থাকে। তবে গবেষণার মাধ্যমে পরিকল্পিত উপায়ে প্রাকৃতিক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা যায় যা বিশ্বের অনেক দেশ করে থাকে।

রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যয় করে যে বিদেশ ভ্রমণ আমলাতন্ত্রে নিত্যনৈমিত্তিক রূপ পেয়েছে ইতিমধ্যে, সেই বিদেশ ভ্রমণের ‘উদ্দেশ্য-বিধেয়’ রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য কত কল্যাণ বয়ে আনে তারও একটি হিসাব থাকা জরুরি।

এছাড়া যে বাহিনীতে তাৎপর্য সংখ্যক মহৎ ও মহানুভব পুলিশ কর্মকর্তার কল্যাণে হতদরিদ্র কৃষক ও রিকশাচালকের সন্তান মাত্র ১০৩ টাকায় পুলিশের চাকরিতে যোগদান করায় পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়, সেই বাহিনীর সুনাম অন্য অনেক দুর্নীতিবাজ পুলিশ অফিসাররা যেন কোনভাবে নষ্ট করে না দেয় তা দেখার দায় যেমন পুলিশ বাহিনীর, তেমনি রাষ্ট্রেরও।

ছয়.

তিন ঘণ্টা ভিআইপি’র জন্য ফেরি’র অপেক্ষায় কিশোর ছাত্র তিতাসের মৃত্যু অনেক বিবেকবান মানুষের মনকে নাড়া দিয়েছে। তাতে কাঙ্ক্ষিত মৌলিক পরিবর্তন আসবে কি? সেদিন বেশি দুরে নয়, যেদিন পদ্মার বুকে স্বপ্নের সেতু দিয়ে পার হবে মানুষ। সেদিনও হয়ত তিতাসদের অ্যাম্বুলেন্সকে দাঁড়িয়ে থেকে ভিআইপিকে আগে যাওয়ার জন্য রাস্তা করে দিতে হবে।

একবার ৭/৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে জরুরি ঢাকায় আসার পথে খুব অনুনয় করার পরও সিট পেয়েছিলাম গাড়ির পেছনের চাকার ঠিক উপরে। গাড়ি ছাড়ার পর দেখলাম একজন সহকারী কমিশনারের জন্য সামনের দিকে পরিবহন কর্তৃপক্ষ দুটি আসন বরাদ্দ রেখেছেন। এসব কষ্টের আসলে কোনো উত্তর নেই।

একটি পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ রেজাল্ট নিয়ে অন্য একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে মাঝে মাঝে মনে হয়, শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়ে কি বড় বেশি ভুল করলাম! কত সুন্দর করে ‘আমলাতন্ত্র’ তার নিজের জনবলকে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে নিজেরাই তৈরি করে নিল। রাষ্ট্রের জন্য মানুষের তৈরি সংবিধানের ‘অর্ডার অব প্রিসিডেন্স’ মর্যাদা দিতে গিয়ে ছাত্রকে সামনে আর শিক্ষককে পেছনের সারিতে ফেলল কিনা তা নতুন করে আরেকবার ভেবে দেখার দায় নিতে পারে রাষ্ট্র।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন ও শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ

আপনার মতামত লিখুন :