বঙ্গবন্ধুর কল্যাণধর্মী উন্নয়ন ভাবনা ও সমকালীন বাংলাদেশ [পর্ব ১]

‘শ্মশান বাংলাকে আমরা সোনার বাংলা করে গড়ে তুলতে চাই। যে বাংলায় আগামীদিনের মায়েরা হাসবে, শিশুরা খেলবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলব। ক্ষেত-খামার কলকারখানায় দেশ গড়ার আন্দোলন গড়ে তুলুন। কাজের মাধ্যমে দেশকে নতুন করে গড়া যায়। আসুন সকলে মিলে সমবেতভাবে আমরা চেষ্টা করি যাতে সোনার বাংলা আবার হাসে, সোনার বাংলাকে আমরা নতুন করে গড়ে তুলতে পারি। ’
(বঙ্গবন্ধুর বেতার ও টেলিভিশন ভাষণ, ২৬ মার্চ ১৯৭২)

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।  অসামান্য নেতৃত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, মেধা-মমত্ববোধ, সততা এবং দেশপ্রেমের প্রজ্জ্বলিত এক অগ্নিশিখা। যার উত্তাপ এখনো চিরন্তন। মৃত্যুকে পরোয়া না করে তিনি গোটা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। এনে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি শোষণের হাত থেকে একটি জাতিকে মুক্ত করে ‘বাংলাদেশ’ নামের এক নতুন সূর্যোদয়। ছিলেন তিনি এক মহৎ মানবিক প্রাণ। ছিলেন প্রকৃত বীর। যার সরল, দৃঢ়, সাহসী মুখচ্ছবি দেখলেই যেন পুরো বাংলাদেশকে দেখা যায়। তাই তিনি চিরঞ্জীব, অবিনশ্বর।

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও তাঁর সংগ্রাম থেকে জানতে পেরেছি যে তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু। বাঙালির আর্থ-সামাজিক মুক্তির জন্যে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। একেবারে ছাত্র জীবন থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এদেশের দুখি মানুষের কল্যাণের জন্যে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। তাই তাঁর উন্নয়ন ভাবনায় বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছে। ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নোর নির্বাচন, সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে এবং জীবনের বড় একটা সময় কারাগারে থেকে তিনি এদেশের মানুষের দুঃখ ও বঞ্চনার তল খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই তিনি ‘ছয়-দফা’কে বাঙালির ‘বাঁচার দাবি’ হিসেবে মুক্তি আকাঙ্ক্ষী বাঙালির কাছে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন। ওই ছয়-দফার ভেতরেই বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির বীজ তিনি বুনেছিলেন। আর সেকারণেই তিনি জেলে বন্দি থাকলেও এই ছয়-দফার  মূল কথাগুলো দাবানলের মতো সারা বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল।

‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ আওয়ামী লীগের সেই কালজয়ী পোস্টার ছয়-দফার চেতনা থেকেই উৎসারিত। ‘দুই অর্থনীতির’ ভিত্তিও এই ছয়-দফা। এই ছয়-দফার ভিত্তিতেই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উদ্ভব হয়। সেই গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারেই স্বৈরশাসক আয়ুব খানের মসনদ ভেসে যায় এবং শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধুতে রূপান্তরিত হন। তাই সত্তরের নির্বাচনে বাঙালি এই ছয়-দফার পক্ষে গণরায় দেন। ভোটে জিতেই বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সকল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ পাঠ করান এই ছয় দফার পক্ষে অবিচল থাকার জন্য। ছয় দফার মূল ভাবনাকে সংবিধানে কী করে প্রতিস্থাপন করা যায় সে বিষয়টি নিয়েই তিনি কাজ করছিলেন তাঁর সহ-নেতা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে। আর সে সময়ই ইয়াহিয়া খান ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেন। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। আসলে এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব। এই আন্দোলন চলমান থাকা অবস্থায় ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ তৎকালীন রমনা রেসকোর্সে এক বিরাট জন সমুদ্রে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির ডাক দেন। সেই ডাকের পটভূমিতেই নির্মম পাকিস্তানী বাহিনী ২৫ মার্চ ১৯৭১ গণহত্যা শুরু করে। এর পরপরই ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। যার যা আছে তাই নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানান। এর কিছুক্ষণ পর তিনি বন্দি হন। শুরু হয় বাঙালির মহত্তম সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধ। মূলত কৃষক সন্তান তথা সাধারণ মানুষের সন্তানেরাই ব্যাপকভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এ দেশকে স্বাধীন করে। তাই ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ মুক্ত স্বদেশে পদার্পণ করেই বঙ্গবন্ধু  এ দেশের ‘মাটি ও মানুষ’কে উপযুক্ত সম্পদ মনে করে সাম্য-ভিত্তিকে গরিবহিতৈষী এক অভূতপূর্ব উন্নয়ন অভিযাত্রা শুরু করেন।

তাঁর এই জনকল্যাণধর্মী দুখি ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে নেওয়া দূরদর্শী উন্নয়ন কৌশলের নৈতিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৭২ সালে গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় পর্বে। ‘রাষ্ট্রীয় মৌলনীতি’র অংশ হিসেবে অর্থনীতি ও সমাজে সাম্য নিশ্চিত করা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করা, খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, নারীর ক্ষমতায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ এই সংবিধানে স্থান করে নেয়। বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেও গণমানুষের চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সমর্থন ভিত্তিক মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক নীতি কৌশল গ্রহণ করা হয়। সময়ের প্রয়োজনে শুরুতে রাষ্ট্রীয় খাতকে প্রাধান্য দিলেও ধীরে ধীরে সমবায় ও ব্যক্তিখাতের বিকাশের জন্যে উপযুক্ত নীতি সংস্কারেও তিনি হাত দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট, রেল, বন্দর, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, প্রশাসন, শিক্ষালয়, হাসপাতালসহ ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো গড়ার কাজে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করতেন। দুর্যোগ দুর্বিপাক মোকাবেলা করে খাদ্য ঘাটতি পূরণে বিদেশি সহযোগিতা ও স্বদেশের কৃষি উন্নয়নে তিনি বিশেষ মনোযোগী হন। মনে রাখতে হবে, এক ডলারও বিদেশি মুদ্রার মজুত ছিল না তাঁর হাতে। তবু তিনি স্বদেশের অর্থনীতির চাকা ফের সচল করেছিলেন অতি অল্প সময়েই। অনেক পরিশ্রমের ফসল যখন তিনি ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত ঠিক তখনই বাংলাদেশের শত্রুরা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট আচমকা আঘাত করে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে বঙ্গবন্ধুকে তাঁর প্রিয় দেশবাসী থেকে। কিন্তু শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে তিনি রয়ে গেছেন আমাদের নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে। শুয়ে আছেন তিনি সাধারণ মানুষের পাশেই। আছেন তিনি বাংলাদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়েই।

বঙ্গবন্ধু হলেন সেই মানুষ যিনি সারাজীবনই দেশ ও মানুষের উন্নয়নের কথা ভেবেছেন। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ কমিয়ে আনা, ধনী-দরিদ্র বৈষম্য কমিয়ে আনা, সকল ধরনের রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে সাধারণ মানুষের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা, কর্মসংস্থান ও কর্মমুখী মানুষ তৈরি করা, সকল ধরনের সেবা বাড়ানো—এসবই তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন ও বাস্তবায়নে স্বচেষ্ট ছিলেন।

৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ঐতিহাসিক এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লব, জাতীয় ঐক্য গঠন ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ঘোষণা করেন। সেই ভাষণের এক জায়গায় তিনি বলেন—‘‘এখন আমাদের কাজ কী? এক. দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে। কলে-কারখানায় সব জায়গায়। পপুলেশন প্লানিং আমাদের করতে হবে এবং পপুলেশন কন্ট্রোল আমাদের করতে হবে। আমাদের দুর্নীতি, ঘুষ, চোরাকারবারি, মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং সংগ্রাম করতে হবে। আমাদের কী করতে হবে? আমাদের জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। বাঙালি জাতি যে প্রাণ, যে অনুপ্রেরণা নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিল সে প্রাণ, সেই অনুপ্রেরণার মতবাদ নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। দেশের দুখি মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে, তাদের মুখে হাসি ফোটাবার জন্যে।’ বলতে দ্বিধা নেই তাঁর হৃদয়ে প্রোথিত ছিল এদেশের সাধারণ মানুষের জীনবমানের উন্নয়ন।

ফিরে দেখা একজন শেখ মুজিব
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অবিভক্ত ভারতবর্ষের বঙ্গ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে (বর্তমানে উপজেলা) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। বাবা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন সরকারি চাকুরে। মা শেখ সায়েরা খাতুন। ছয় ভাই-বোনের (চার বোন ও দুই ভাই) মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বাবা-মা আদর করে ডাকতেন ‘খোকা’ বলে। ভাইবোন ও গ্রামবাসীদের কাছে ‘মিয়া ভাই’ খ্যাত শেখ মুজিবের ছোটবেলা কাটে টুঙ্গিপাড়ার সহজ-সরল মানুষ আর প্রকৃতির মাঝে। মধুমতি নদীর পাশে টুঙ্গিপাড়ার মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর পারিবারিক ঐতিহ্যের মাঝে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠেন অসাধারণ এই মানুষটি।

সাত বছর বয়সে বঙ্গবন্ধুর লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয় গ্রামের গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে। তিনি গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন ১৯৪২ সালে। ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ছোটবেলা থেকেই শেখ মুজিব গরিব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। ভালোবেসে বুকে টেনে নিতেন। ১৯৩৮ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর চাচাত বোন ফজিলাতুননেছার বিয়ে হয়। স্পষ্টবাদী ও সাহসী মুজিব কিশোর বয়সেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৩৯ সালে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় থেকেই শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন। শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর সাথে পরিচয়ের সূত্র ধরে শেখ মুজিব ১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন এবং গোপালগঞ্জ মুসলিম ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। ১৯৪২ সালে প্রবেশিকা পাস করার পর প্রত্যক্ষভাবে ছাত্র-রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরপর নিজগুণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নেতৃত্বের আসনে আসীন হন। তিনি যখন গোপালগঞ্জ মুসলিম সেবা সমিতির সম্পাদক ছিলেন সে সময় তাঁর নেতৃত্বে ‘মুষ্টিভিক্ষা’র মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে গরিব ছাত্রদের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছিলেন। এই মানবিক নেতৃত্বের প্রেরণা তিনি তাঁর শিক্ষকদের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। রাজনীতির প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করতেন যে রাজনীতির মাধ্যমেই দেশের সেবা করা যায়। এরপর তিনি নিজ যোগ্যতার বলেই নেতৃত্বে এসেছেন এবং আমরা দেখেছি প্রতিটি জায়গাতেই রাজনীতির পাশাপাশি তাঁর মানবিক তৎপরতা। যখন যেখানে গিয়েছেন দুখি মানুষের কথা বলেছেন। তাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনের বিষয়ে নির্বাচনী কমিটিতে বঙ্গবন্ধু যে ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবি পেশ করেন সেখানে মুল স্লোগান ছিল ‘নিজে বাঁচো ও অপরকে বাঁচতে দাও’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্সের ময়দানে (বর্তমানে সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান) ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র অভিযোগ থেকে মুক্ত হবার পর এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে। লাখো জনতার ওই সম্মেলনে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এই সভায় শেখ মুজিব ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এগার দফা দাবির পক্ষে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেন, “আমি সরকারের সাথে প্রস্তাবিত রাজনৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করে দেশের উভয় অংশের পক্ষ থেকে দেশবাসীর অধিকারের দাবি উত্থাপন করব। উত্থাপিত দাবি যদি গ্রাহ্য করা না হয় তবে সে বৈঠক থেকে ফিরে এসে দাবি আদায়ের জন্যে আমি দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তুলব। কিন্তু মানুষের প্রেম-ভালোবাসার ডালি মাথায় নিয়ে দেশবাসীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না। রাজনীতি, অর্থনীতি, চাকরি-বাকরি অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল পর্যায়ে জনসংখ্যার অনুপাতে পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব চাই। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি চাই। কৃষকের উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য চাই। সাংবাদিকদের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাই।” ৭ মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্সের জনসমুদ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।” এই ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে পাকিস্তানের শাসন ও শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে আরো ঘোষণা করেন, “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।

বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন ভাবনা
বঙ্গবন্ধুর প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্যই ছিল এদেশের গরিব-দুখি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা। এ কারণে আমরা দেখতে পাই সেই ছোট্টবেলা থেকেই এবং পরবর্তীতে তাঁর সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে এটি প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যেখানে গিয়েছেন সেখানেই উদাত্ত কণ্ঠে বলেছেন—মানুষের উন্নয়নের কথা। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মাঝে বরাবরই প্রস্ফুটিত হয়েছে এটি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শনে সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার পান এদেশের সাধারণ জনগণ। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং  অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করতে তিনি বিরাট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। উন্নয়ন দর্শনে তিনি প্রথমেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। একই সাথে বিভিন্ন দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে উদ্যোগী হন। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই তিনি প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন, সংবিধান-প্রণয়ন, এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, যুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী, পুলিশ, বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) পুনর্গঠন, যোগাযোগ-ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের জন্যে প্রাথমিক স্কুল পর্যন্ত বিনামূল্যে এবং মাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত নামমাত্র মূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, মদ, জুয়া, ঘোড়দৌড় ইত্যাদি ইসলাম-বিরোধী কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধকরণ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন, নতুন ১১ হাজার প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ মোট ৪০ হাজার প্রাথমিক স্কুল সরকারিকরণ, দুস্থ মহিলাদের কল্যাণে নারী-পুনর্বাসন ব্যবস্থা, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফসহ প্রায় ৩০ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ, কৃষকদের মাঝে দেড় লাখ গাভি ও ৪০ হাজার সেচপাম্প বিতরণ এবং ব্যাপক কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ দেবার জন্যে ‘বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার’ প্রবর্তন করেন। এ ছাড়াও বিনা/স্বল্পমূল্যে কৃষকদের মধ্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত ব্যাংক-বীমার ও ৫৮০টি শিল্প ইউনিটের জাতীয়করণ ও সেসব চালুর মাধ্যমে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান, সার কারখানা, আশুগঞ্জ কমপ্লেক্সের প্রাথমিক কাজ ও অন্যান্য নতুন শিল্প স্থাপন, বঙ্গ শিল্প-কারখানা চালুসহ একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

স্বল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায় এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য। স্বাধীনতা লাভের এক বছরের মধ্যেই দেশ পুনর্গঠনে বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণ, পুরো দেশবাসিকে এ কাজে উজ্জীবিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর নেওয়া পদক্ষেপসমূহ আশাতীত সাফল্য অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ব্রিজ, কালভার্ট, সেতু নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল-ব্যবস্থার উন্নয়ন, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্গঠন, দক্ষ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন, উত্তর-দক্ষিণ শীতল রাজনৈতিক মেরুকরণে দেশেকে ‘জোট নিরপেক্ষ—সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বৈরিতা নয়’ নীতিতে প্রতিষ্ঠিত করা, পাঁচশালা পরিকল্পনা প্রণয়ন, আদম শুমারি ইত্যাদি কর্মপ্রয়াসে বঙ্গবন্ধু উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছেন স্বদেশকে। তাঁর শোষণহীন সমাজ গঠনের স্বপ্নের জমিনের বড় অংশই জুড়ে ছিল বাংলাদেশের কৃষক। সারা বাংলাদেশের হৃদয়কে এক করার নিরলস প্রচেষ্টায় তিনি কৃষকদের চাওয়া পাওয়াকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। গরিবহিতৈষী বঙ্গবন্ধু সেজন্যেই স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম কৃষকদের দিকে নজর দেন। তিনি সব সময় বলতেন, ‘আমার দেশের কৃষকেরা সবচাইতে নির্যাতিত।’ কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্যে তিনি কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। উন্নত বীজ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কৃষক-শ্রমিকসহ মেহনতী মানুষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। পঞ্চাশের দশকে তাঁকে দেখেছি পাকিস্তানের পার্লামেন্টে কৃষকের পক্ষে কথা বলতে, ষাটের দশকে দেখেছি ৬-দফার আন্দোলনে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে সোচ্চার হতে। আর স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দেখেছি সর্বক্ষণ কৃষক-অন্তপ্রাণ বঙ্গবন্ধুকে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ২৮ অক্টোবর ১৯৭০ তারিখের ভাষণেও এদেশের কৃষক-সমাজের অধিকার সংরক্ষণের কথা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন দ্ব্যর্থহীনভাবে। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক সমাবেশে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করানোর পর বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন তাতে কৃষকদের জন্যে অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার দল ক্ষমতায় যাওয়ার সাথে সাথেই ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করে দেবে। আর দশ বছর পর বাংলাদেশের কাউকেই জমির খাজনা দিতে হবে না।’

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য যে-সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি-অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, কৃষি-যন্ত্রপাতি সরবরাহ জরুরি ভিত্তিতে বিনামূল্যে এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে নামমাত্র মূল্যে অধিক কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্যে ধানবীজ, পাটবীজ ও গমবীজ সরবরাহ করা হয়। দখলদার পাকিস্তানি শাসনকালে রুজু করা ১০ লক্ষ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকদের মুক্তি দেওয়া হয় ও তাঁদের সকল বকেয়া ঋণ সুদসহ মাফ করে দেওয়া হয়। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা চিরতরে রহিত করা হয়। ধান, পাট, তামাক ও আখসহ গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির লক্ষ্যে ন্যূনতম ন্যায্যমূল্য বেঁধে দেওয়া হয়। গরিব কৃষকদের বাঁচানোর স্বার্থে সুবিধাজনক নিম্নমূল্যের রেশন-সুবিধা তাদের আয়ত্তে নিয়ে আসা হয়। বঙ্গবন্ধু প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সামাজিক ন্যায়বিচার ও দারিদ্র্য নিবারণের তাগিদে কৃষি-উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের পর্যায়ে আনা হয়। ওই সময় দেশে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা ছিল শতকরা ৩৫ ভাগ। বিরাজমান খাসজমির সঙ্গে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিতরণযোগ্য জমির সরবরাহ বৃদ্ধির জন্যে বঙ্গবন্ধু পরিবারপিছু জমির সিলিং ১০০ বিঘায় নির্ধারণ করে দেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশের খাদ্যঘাটতি ছিল প্রাথমিক হিসেবে ৩০ লক্ষ টন। তাৎক্ষণিক আমদানির মাধ্যমে এবং স্বল্প মেয়াদে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি-উপকরণ সরবরাহ করে এবং কৃষিঋণ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার ও খাসজমি বিতরণ করে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করা হয়।

বঙ্গবন্ধু ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টনের ফর্মুলা নির্ধারণে অত্যন্ত জোরদার উদ্যোগ নেন। এর ফলে ভাটির দেশ হিসেবে গঙ্গার পানির ৪৪ হাজার কিউসেক হিস্যা পাওয়ার সম্মতি তিনি আদায় করেন। ১৯৬৮-৬৯ সালের ১১ হাজার শক্তিচালিত পাম্পের স্থলে ১৯৭৪-৭৫ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬ হাজার। এর ফলে সেচের আওতাধীন জমির পরিমাণ এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬ লক্ষ একরে উন্নীত হয়। বাংলার কৃষককে সারে ভর্তুকি দিয়ে রক্ষা করেন বঙ্গবন্ধু। গঙ্গা নদীর প্রবাহ থেকে অধিক পানি প্রাপ্তি, সেচব্যবস্থার প্রসার, উন্নত বীজ, সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, অতিরিক্ত খাস জমি প্রাপ্তি এবং মূল্যসমর্থনমূলক সচেতন ও কৃষকদরদী নীতির ফলে কৃষিক্ষেত্রে অগ্রগতির যে-ধারা সূচিত হয়েছিল তারই ফলে আজ কৃষিক্ষেত্রে শক্তিশালী ধারা বজায় রয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা সেই ধারাকে আরো বেগবান করেছেন।

২য় পর্বের লিংক

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

//election count down