২২ ছাত্রকে মুক্তি দিন

প্রভাষ আমিন

  • Font increase
  • Font Decrease

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অনেকগুলো দিক আছে। ন্যায় প্রতিষ্ঠার এ আন্দোলনে অনেক ন্যায় হয়েছে, অন্যায় হয়েছে, গুজব ছড়িয়েছে, উসকানি দেয়া হয়েছে, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিনতাই করে নিয়েছে তাদের বড় ভাইয়েরা। আন্দোলনের শেষ তিন দিন বহুমুখী সংঘর্ষ হয়েছে, পক্ষ-বিপক্ষের অনেকে আহত হয়েছেন।

তবে খুব বেশি আলোচনা না হলেও এ আন্দোলনের শেষ দিনে একটা বড় অবিচার হয়েছে। চার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, সাউথ ইস্ট ও ব্র্যাকের ২২ ছাত্র এখন কারাগারে। সোমবার গ্রেপ্তারের পর তাদের দুদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ড শেষে জামিন না দিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অন্তত ৩৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। গুজব ছড়ানো, ফেসবুকে উসকানি দেয়া বা ষড়যন্ত্রের অভিযোগেই তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একেক মামলার একেক প্রেক্ষাপট। তবে মূলআন্দোলনকারী অর্থাৎ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সরকারকে এ জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

অনেকে গ্রেপ্তার হলেও দুজনের গ্রেপ্তার নিয়ে তোলপাড়- অভিনেত্রী কাজী নওশাবা এবং আলোকচিত্রী শহীদুল আলম। বুঝে হোক না বুঝে হোক নওশাবা যা করেছেন, তা অবশ্যই অপরাধ। তিনি উত্তরায় শ্যুটিং করার ফাঁকে যেভাবে অভিনয় করে ঝিগাতলায় একজনের চোখ তুলে ফেলা এবং দুজনকে মেরে ফেলার অভিযোগ করেছেন, তা আগুনে ঘি ঢেলেছে।

বড়দের দায়িত্ব পরিস্থিতি শান্ত করা, বাচ্চাদের বুঝিয়ে ক্লাশে পাঠানো। দায়িত্বশীলরা যখন এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করেন; তখন তা আসলে নিছক ভুল নয়, অন্যায়ই হয়। নওশাবা পরে তার ভুল বুঝতে পেরে আবার ফেসবুক লাইভে ভুল স্বীকার করেছেন। তবে কিছু কিছু ভুলআছে, শুধরানো যায় না। নওশাবার বন্ধুরা বলছেন, তিনি খুব ভালো, তবে ইমোশনাল। বাচ্চাদের নিয়ে অনেক কাজ করেন। তার নিজেরও সাড়ে চার বছরের একটা মেয়ে আছে এবং তিনি খুব যত্নশীল মা। যত যাই হোক, নওশাবা যে ভুল করেছেন তা নিছক ভুল নয়, অপরাধ। আর অপরাধ করলে শাস্তি তো পেতেই হবে। তার মত সেলিব্রেটির লাইভেই গুজব ছড়িয়েছে দ্রুত এবং তা বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে।

নওশাবা হয়তো ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত হয়ে না বুঝে লাইভ করেছেন। তবে শহীদুল আলম যা করেছেন, বুঝে শুনেই করেছেন। নওশাবা তো উত্তরায় বসে ফেসবুক লাইভ করেছেন। আর শহীদুল আলম ঘটনাস্থলে ঘুরে ঘুরে লাইভ করেছেন, আল জাজিরায় সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।

তার সাক্ষাৎকারের অনেক বক্তব্যের সাথেই আমি একমত নই। যেমন ২০১৪ সালের নির্বাচন নৈতিক বিচারে উচ্চমানের ছিল না। তাই বলে এ সরকারকে আমি অনির্বাচিত মনে করি না। তাদের দেশ চালানোর অধিকার নেই, এমনটাও মনে করি না। ব্যাংকিং খাতে লুটপাট, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আমি তার সাথে অনেকটা একমত। তবে কোটা নিয়ে তার অবস্থানের সাথে আমার প্রবল দ্বিমত। আমি বিশ্বাস করি, বৈষম্য সৃষ্টি করতে নয়, বৈষম্য দূর করতেই কোটা ব্যবস্থার প্রচলন। আর রাষ্ট্রে যতদিন বৈষম্য থাকবে, ততদিন কোটাও থাকবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, শহীদুল আলমের এ ধারণার সাথেও আমি একমত নই। আমি বরাবরই, আওয়ামী লীগ যখনতত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছিল, তখনও আমি এ ধারণার বিরোধিতা করেছিলাম।

তত্ত্বাবধায়ক ধারণাটাই রাজনীতিবিদদের প্রতি এক ধরনের অনাস্থা। যাদের ওপর ৫ বছর গোটা দেশের দায়িত্ব, তাদের ওপর একটা নির্বাচন পরিচালনার আস্থা রাখা যাবে না, এ কেমন কথা। শহীদুল আলম অবশ্যই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান, এটা তার ব্যক্তিগত মত। তার মতের সাথে আমার মিলতে পারে, নাও মিলতে পারে। কিন্তু তার মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। শহীদুল আলম সরকারকে অনির্বাচিত মনে করতে পারেন, ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইতেই পারেন। তবে তার বক্তব্যে অপরাধের উপাদান আছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে আছে, 'রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ-সাপেক্ষে

ক. প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং

খ. সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল'।

মামলায় উদ্ধৃত শহীদুল আলমের বক্তব্যে অপরাধ সংঘটন ও জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের উপাদান আছে। ছাত্রীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তারা নিখোঁজ হয়ে গেছে- এ বক্তব্য তথ্য নির্ভর নয়। তার এ মিথ্যা বক্তব্য শনিবারের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করেছে। আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলন বলে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, যা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সস্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে ভুল বার্তা দিয়েছে।

ভুল তথ্য আর গুজব ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো অবশ্যই অপরাধ। আর অপরাধ করলে তার শাস্তি পেতেই হবে। শহীদুলআলম সাংবাদিক নন, তবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী। তাই তার ব্যাপারে বিশ্বের অনেকের উদ্বেগ আছে। তাই কারো সাথেই যাতে আইন বহির্ভূত কোনো আচরণ করা না হয়।

শহীদুল আলমের গ্রেপ্তারের পর অনেকেই দেখছি তার বর্তমান অপরাধ বাদ দিয়ে অতীত নিয়ে টানাটানি করছেন। তিনি স্বাধীনতা বিরোধী, তিনিসবুর খানের ভাগ্নি বিয়ে করেছেন, তার মা একাত্তরে পাকিস্তানী হারাদারদের সহযোগী ছিলেন ইত্যাদি এন্তার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।

পাকিস্তানী হানাদাররা খালেদ মোশাররফের দুই শিশু কন্যাকে শহীদুল আলমের মা অগ্রনী স্কুলের হেড মিস্ট্রেস আনোয়ারা মনসুরের কাছে রেখেছিল, এটা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর 'একাত্তরের দিনগুলি'তে বিস্তারিত লিখেছেন। তবে অতীত টানতে গিয়ে যেন শহীদুল আলমের বর্তমান অপরাধকে আড়াল বা হালকা করা না হয়। আর শহীদুল আলম স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হলেও তো তার বর্তমান অপরাধ কমে যেতো না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন-সংগ্রামে খুব একটা যায় না, আসলে পড়াশোনার চাপে যাওয়ার সময় পায় না। নিজেদের ঘাড়ের ওপর পড়েছিল বলে, ভ্যাট বিরোধী সফল আন্দোলন করে সবার নজর কেড়েছিল তারা। অনেকে 'ডিজুস প্রজন্ম' বলে নাক সিটকালেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছে।

নিরাপদ সড়কের আন্দোলনেও তারা খুব একটা সক্রিয় ছিল না। কিন্তু শনিবার ও রোববারে হামলার প্রতিবাদে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা সোমবার রাস্তায় নেমে আসায় সংঘর্ষের শুরু। পরে পুলিশ এসে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের ওপর বল প্রয়োগ করে। ইস্ট ওয়েস্টে হামলার খবর উত্তেজনা ছড়ায় নর্থ সাউথের বসুন্ধরা ক্যাম্পাসে। সেখানেও দিনভর সংঘর্ষ চলে। আর ব্র্যাক এবং অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছুটে আসে ইস্ট ওয়েস্টের শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করতে। এসব ঘটনায় পুলিশ এই ২২ জনকে গ্রেপ্তার করে।

শনিবার ও রোববার যারা মিছিল নিয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে যেতে চেয়েছে, হামলা চালিয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু সোমবারের ঘটনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয় না। যদিও অসময়ে, তবুও তারা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের চেতনাতেই রাস্তায় নেমেছিল। সোমবার তারা আক্রমনকারী নয়, আক্রান্ত। কিন্তু পুলিশ আক্রান্তদের ধরে রিমান্ডে নিয়েছে। আক্রমনকারীদের খুঁজে পায়নি।

মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রীর সাথে বৈঠকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা অভিন্ন কণ্ঠে ২২ শিক্ষার্থীকে সাধারণ ক্ষমা করার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, ক্ষমা নয়, আইন নিজের গতিতে চলবে। শিক্ষামন্ত্রী আইনের কথা বলেছেন। ভালো কথা। কিন্তু আইন তো সবারজন্য সমান হওয়ার কথা। আক্রান্তরা কারাগারে থাকে, আর আক্রমনকারীরা ঘুরে বেড়ায়। এটা কেমন আইন? তবুও এরা যদি সন্ত্রাসী হতো, ষড়যন্ত্রকারী হতো; তাহলেও না হয় মানা যেতো। কিন্তু উপাচার্যরা সবাই মিলে এদের জন্য সাধারণ ক্ষমা চেয়েছেন।

অন্যায়ের প্রতিবাদ করা কখনোই অপরাধ নয়। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী আপনার আইনের গতির ধাক্কায় তো এই ২২ জনের শিক্ষাজীবন ধ্বংস হয়ে যাবে। বড় আন্দোলনে অনেকভুল হয়, ন্যায়-অন্যায় হয়, বিচ্যুতি ঘটে। সরকার চাইলে এই শিক্ষার্থীদের ক্ষমা করে ঔদার্য্যের পরিচয় দিতে পারে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :