কী কথা তাহাদের সাথে?

মো. জাকির হোসেন

  • Font increase
  • Font Decrease

জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় লিখেছেন -

‘সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি,/বোলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে;/ কী কথা তাহার সাথে? তার সাথে!

জীবনের এ অপরাহ্ন বেলায় কবির মতো আমার কোন সুরঞ্জনা নেই। থাকতেও নেই। তাই আমার এ লেখা সুরঞ্জনাকে নিয়ে নয়। বরং বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাট -কে নিয়ে। এক্সিলেন্সি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা আইন ও রীতি ভেঙ্গে সঙ্গোপনে দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন সুজনের বদিউল আলম মজুমদারের বাসায়। নৈশভোজ শেষে বের হওয়ার সময় হামলার মুখে পড়ে এক্সিলেন্সির গাড়ি।

যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছে,“মোটরসাইকেল আরোহীসহ একদল সশস্ত্র লোক শনিবার মোহাম্মদপুর এলাকায় ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে বহনকারী দূতাবাসের একটি গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালায়।” প্রশ্ন হলো, এক্সিলেন্সি কেন সঙ্গোপনে গেলেন? মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেন গোপনীয়তাকে বেছে নিলেন?

মোহাম্মদপুর থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এই এলাকায় এলে তা আমাদের জানানোর কথা। কিন্তু আমাদের কিছু জানানো হয়নি।” অন্যদিকে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারও বলেছেন, “আমাদের জানানো হলে তার নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখতাম এবং সেক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা হওয়ার সুযোগ থাকত না।”

মার্কিন রাষ্ট্রদূত দূতাবাস থেকে অনেকটা দূরে মোহাম্মদপুর গেলেন আর বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সদস্যকে জানানো হলো না, কেন এমন লুকোচুরি? কী সেই রহস্য?

তদুপরি রাষ্ট্র মেরামত আন্দোলন নিয়ে বাংলাদেশ যখন উত্তাল, নাবালকদের আন্দোলনে সাবালকদের রাজনৈতিক ধান্দা যখন সংঘর্ষে রূপ নিয়েছিলো সে সময় পুলিশকে না জানিয়ে রাষ্ট্রদূত কেন এমন ঝুঁকি নিলেন?

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইটে গত ৩ জুলাই বাংলাদেশে বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তাজনিত কিছু বিধিবিধান মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে নাগরিকরা কোথায় যেতে পারবে বা পারবে না সে সংক্রান্ত নির্দেশনাও আছে। কোনো মার্কিন অফিসিয়াল নির্ধারিত এলাকা ও নির্ধারিত সময়ের বাইরে কোথাও যেতে পারবে না এই নির্দেশও দেওয়া হয়েছে ওয়েবসাইটে। এই নিয়মানুসারে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদপুরে সুজন সম্পাদকের বাসায় যেতে পারেন না। কোনো ধরনের প্রটোকল ছাড়া কূটনৈতিক পাড়ার বাইরে ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ রক্ষার্থে সুজন সম্পাদকের বাসায় গিয়ে মার্শা বার্নিকাট নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান ভঙ্গ করেছেন। কিন্তু কী কথা তাহার সাথে যে কারণে রাষ্ট্রদূতকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত তার রাষ্ট্রের বিধানকে লঙ্ঘন করতেই হলো?

খবরে প্রকাশ, মজুমদারের বাসায় আগে থেকেই মওজুত ছিলেন ড. কামাল হোসেন। ড. কামাল সম্প্রতি সরকার পতনের ডাক দিয়েছেন। পতনের ডাক দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি, সরকারের পতনের জন্য দেশি-বিদেশি কোন কসরতই তিনি বাদ রাখছেন না। ড. কামালের সরকার পতনের ডাকের সাথে এক্সিলেন্সির সঙ্গোপনে মজুমদারের বাসায় যাওয়ার কি কোন কানেকশন রয়েছে? এক্সিলেন্সি কি জানেন না সুজনের আড়ালে সুশীলের মোড়কে জনাব মজুমদারের কর্মকাণ্ড পক্ষপাতমূলক ও বিতর্কিত?

গত বছরের ১৩ জুলাই রাতে একটি রাজনৈতিক জোট গঠনের জন্য জেএসডি নেতা আ স ম রবের উত্তরার বাড়িতে সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বদিউল আলম মজুমদারও উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক জোট গঠন কি সুশীলের কাজের অংশ? তাহলে এক্সিলেন্সিও কি মজুমদার ও ড. কামাল হোসেন গংদের ষড়যন্ত্রের অংশ?

খবরে চাউর হয়েছে আওয়ামী লীগ বিরোধী একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছে মার্কিন দূত। দেশের সুশীল সমাজের একাংশের পৃষ্ঠপোষকতায় এই জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই জোটে বিএনপি থাকলেও জোটের নেতৃত্ব বিএনপির হাতে থাকবে না। এরকম একটি জোটের নেতৃত্ব ড. কামাল হোসেন অথবা বদরুদ্দোজা চৌধুরীর হাতে থাকা নিয়ে আলোচনা চলছে। বর্তমান সরকারকে হটাতে নূন্যতম ইস্যুতে এরকম একটি ঐক্য প্রক্রিয়ার জন্য বেশ কিছুদিন ধরেই কাজ চলছে।

তবে সম্প্রতি এরকম ঐক্য প্রক্রিয়ার তাগিদ দিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাট। এক্সিলেন্সির পছন্দ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে এরকম একটি মোর্চা গড়ে উঠুক। আওয়ামী লীগ কে আগামী নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ জানাতে নতুন জোটের নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির হিসেব-নিকেশে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতার জন্যই মজুমদারের বাসায় এ দাওয়াতী কার্যক্রম মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

‘কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দেশের মালিক জনগণের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অতি সম্প্রতি কামাল হোসেন বলেছেন, দেশে পরিবর্তন দ্রুতই হবে। এইচ এম এরশাদের পতনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে ব্রিটিশ মিনিস্টার এসে বলে, তোমার ওই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করে এসেছি, ও (এরশাদ) তো বলে যে, সে আরও ১৫ বছর আছে। আমি তখন ফট করে বলে দিলাম যে, আমি তো ওকে (এরশাদ) ১৫ সপ্তাহও দেখি না। সেপ্টেম্বর মাস ছিল, আল্লাহর রহমতে ১৫ সপ্তাহের মধ্যে আমরা মুক্ত হলাম। আমি লন্ডনে যখন গেছি, ব্রিটিশ মন্ত্রী লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, তুমি কি করে এই ধরনের ভবিষ্যৎবাণী করেছিলে। আমি ব্রিটিশ মন্ত্রীকে বললাম, দেখ, আমাদের বাঙালিদের একটা ব্যাপার আছে। অন্যায়ের সহ্যের সীমা যখন পার হয়ে যায়, তখন বাঙালিরা দাঁড়িয়ে যাই- আর মেনে নেওয়া যায় না, পরির্বতন আনতে হবে।

জনগণের জাগরণের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তন স্বীকৃত রাজনৈতিক ও আইনগত পন্থা। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি না করে কামাল হোসেন গংরা বিদেশী শক্তিকে কেন বেছে নিলেন? একটি রাষ্ট্রের রাজনীতিতে অন্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে সম্পৃক্ত করা তো রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ড. কামাল হোসেন তো বঙ্গবন্ধুর সাথে রাজনীতি করেছেন, সরকার পরিচালনা করেছেন। বঙ্গবন্ধু কি বিদেশী শক্তির কাঁধে চড়ে রাজনীতি করেছেন? মুক্তিযুদ্ধের আগে সিআইএর কর্তা ব্যক্তিরা বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ‘বিনা যুদ্ধেই তুমি বাংলাদেশ পেতে পারো। কিন্তু আমাদের একটি শর্ত মানতে হবে-সেন্ট মার্টিনে মার্কিন নৌঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ দিতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু সেই শর্ত মানেননি। তাহলে কামাল হোসেন কেন সরকারের পতন ঘটাতে বিদেশীদের কাছে হাত পেতেছেন? তাহলে কি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টির অবস্থা নেই? আর তাই কামাল হোসেন গংরা মার্শার অনুগ্রহ প্রার্থী হয়েছেন? যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য কি গণতন্ত্র এনে দেবে?

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ যেসব প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক গণতন্ত্রের র‍্যাংকিং প্রকাশ করে তাদের মতে ২০১৬ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আর পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। এটি ‘পূর্ণ গণতন্ত্র’ থেকে ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ শ্রেণিতে নেমে গেছে। ২০১৭-এর সূচকে ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রের দেশগুলোর তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ারও নিচে নেমে গেছে। যার নিজেরই ত্রুটিমুক্ত গণতন্ত্র নাই সে রাষ্ট্র কীভাবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র রফতানি করবে?

অর্থনৈতিক সাহায্যের আশায় কামাল হোসেনরা বার্নিকাটের কাছে হাত পেতেছেন কি? তাহলে শুনুন, জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ‘আঙ্কটাড’ এর হিসাব অনুযায়ী অন্যায্য বৈশ্বিক বাণিজ্যের কারণে দরিদ্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রসহ ধনী দেশগুলো হতে যে সাহায্য পায় তার চেয়ে ১৪ গুণ বেশি (প্রতিদিন ১.৩ বিলিয়ন পাউন্ড) তাদেরকে নানাভাবে পরিশোধ করে থাকে। লন্ডন ভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন অনুযায়ী দরিদ্র রাষ্ট্রসমূহ প্রতিবছর ৫০-৫৫ বিলিয়ন ডলারের সাহায্য প্রাপ্তির বিপরীতে ২০০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ ঋণ পরিশোধ ও শোষণমূলক বাণিজ্য, বাণিজ্য উদারীকরণ, ধনী রাষ্ট্রসমূহ কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে শিল্পের কাঁচামাল বিক্রিতে বাধ্য হওয়া, শর্তযুক্ত ঋণ গ্রহণ ইত্যাদির কারণে পরিশোধ করে থাকে।

কানাডা ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা Centre for Research on Globalization (Global Research) এর গবেষক James A. Lucas তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ৩৭টি রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ মিলিয়ন তথা ২ কোটি মানুষকে হত্যা করেছে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নিজ রাষ্ট্রের শাসকের প্রতি ক্ষোভ, রাগ, অভিমানে শাসককে শায়েস্তা করতে যেসব রাষ্ট্রের মানুষরা যুক্তরাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সেসব রাষ্ট্র স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এসব রাষ্ট্র এখন রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ভাষায় ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্র। এরুপ আশ্রিত, ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্র খুঁজতে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে না। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া এর জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ।

ফিলিস্তিনীদের তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র থেকে উৎখাত করে অবৈধ ইসরাইল প্রতিষ্ঠা ও তা টিকিয়ে রাখা, স্বঘোষিত অবৈধ ইসরাইলের সীমানার বাইরে প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনীদের ভূমি দখল, তাদের নির্বিচারে হত্যা ও জাতিসংঘের সিদ্ধান্তকে লংঘন করে ইসলাম ধর্মের পবিত্র ভূমি জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি ও জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তরসহ ইসরাইলের সকল অন্যায়-অপরাধ আর জবরদস্তির পিছনে সবচেয়ে বড় বলতে গেলে একক আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা হলো যুক্তরাষ্ট্র।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আইনের শাসন, সুশাসন ও মানবাধিকারের জন্য বড় হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্ব করে কামাল হোসেন ও মজুমদার গংরা কী অর্জন করতে চান? আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে ও সহযোগিতায় অনেক ওয়ার লর্ড ও মার্সেনারি বাহিনী গড়ে ওঠেছে। এর ফলে গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে যুদ্ধ, হিংসা-বিদ্বেষ, রক্তপাত আফ্রিকার অনেক রাষ্ট্রকে অকার্যকর করে রেখেছে।ওয়ার লর্ড ও মার্সেনারি বাহিনী সর্দার যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শান্তির কী অমিয় বাণী কামাল হোসেনরা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করতে চান?

যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৯টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির মধ্যে মাত্র ৩টি অনুসমর্থন করেছে আর ৬টি এখনও অনুমোদন করেনি। নাগরিক ও রাজনৈতিকি অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জতিক মানবাধিকার চুক্তিতে ৫টি শর্তসংরক্ষণ, ৫টি বোঝাপড়া ও ৪টি ঘোষণা সাপেক্ষে যুক্তরাষ্ট্র অনুসমর্থন করলেও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি অনুসমর্থন করেনি।

জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ৬টি রাষ্ট্র নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত আন্তর্জতিক মানবাধিকার চুক্তি অনুমোদন দেয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি। যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের সংবিধিতে তো স্বাক্ষর করেই নি, উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্র অনেক রাষ্ট্রকে এ মর্মে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতে বাধ্য করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের কোন সেনা সদস্য গণহত্যা, যুদ্ধপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করলেও তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে মামলা করা যাবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো এমন মানবাধিকার দরদী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সাথে সঙ্গোপনে বৈঠক করে বাংলাদেশে কি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে?

লক্ষ-লক্ষ শহীদের রক্ত ও মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনময়ে অর্জিত বাংলাদেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে যারাই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে তাদের পরিণতি ভয়াবহ হয়েছে। কারও অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে, অনেকের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, আর কেউ মত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী কিসিঞ্জার বাঙালিদের কাছে ঘৃণিত। আর বাঙালি গণহত্যায় মদদ দেয়ার জন্য Christopher Hitchens কিসিঞ্জারের বিচার দাবি করে ২০০১ সালে The Trial of Henry Kissinger শিরোণামে প্রামাণিক বই লিখেছেন। ইতিহাসে তার নাম ঘাতকদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়ে গিয়েছে।

সিরাজ উৎখাতে পলাশী ষড়যন্ত্রে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলো, ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে তাদেরও হয়েছিল মর্মান্তিক পরিণতি। কাউকে পাগল হতে হয়েছিল, কারো হয়েছিল অপঘাতে মৃত্যু। কাউকে নির্মম অপমৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়েছিল। সবার ভাগ্যে জুটেছিল কোন না কোন ভয়াবহ পরিণতি। ইতিহাসের আজন্ম খল-নায়ক রবার্র্ট ক্লাইভ নিজেই নিজের বুকে ছুড়ি চালিয়ে আত্নহত্যা করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশ এর সাথে ছন্দ মিলিয়ে তাই আমিও বলতে চাই –

এক্সিলেন্সি,...কী কথা তাহাদের সাথে? তাদের সাথে!

গোপনের আড়ালে অতি সঙ্গোপনে।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

আপনার মতামত লিখুন :