বাঙালির প্রমিথিউসের জন্য শোক

স্বকৃত নোমান

  • Font increase
  • Font Decrease

গ্রিক পুরাণের প্রমিথিউসের কথা নিশ্চয়ই সবাই জানেন। প্রমিথিউস মানুষকে সৃষ্টি করে দেবতাদের আদলে। মানুষকে দেয় সোজা হয়ে দাঁড়ানোর এবং আকাশের দিকে তাকাতে পারার ক্ষমতা। মানুষকে তৈরি করে সৃষ্টিশীল চিন্তা-ভাবনা করার গুণ দিয়ে। মানুষ সৃষ্টি করে মানুষের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে প্রমিথিউস। মানুষেরা পৃথিবীতে বসবাস শুরু করার পর তার মনে হলো মানুষের আগুনের প্রয়োজন। তাই সে মানুষকে আগুন উপহার দেওয়ার জন্য জিউসের কাছে প্রস্তাব রাখল। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল জিউস। কিন্তু দমল না প্রমিথিউস। স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে মানুষকে উপহার দিলো। এর ফলে জিউসের কোপানলে পড়ল প্রমিথিউস। ক্রোধান্বিত জিউস এক পাহাড়ের সাথে বেঁধে ফেলল প্রমিথিউসকে। তার নির্দেশে এক বিশালাকার ঈগল প্রতিদিন ঠুকরে ঠুকরে খেয়ে ফেলত প্রমিথিউসের যকৃৎ। রাতের বেলায় আবার তৈরি হতো সেই যকৃৎ। ঈগল আবার খেয়ে ফেলত। এভাবে চলল বহু বছর। পরে জিউসপুত্র হারকিউলিস বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে প্রমিথিউসকে।

বঙ্গবন্ধুকে কি গ্রিক পুরাণের প্রমিথিউসের সঙ্গে তুলনা করা যায়? আমার মনে হয়, যায়। প্রমিথিউস যেমন মানুষকে ভালোবেসেছিল, তেমনি বঙ্গবন্ধু ভালোবেসেছিলেন বাঙালিকে। প্রমিথিউস মানুষকে দিয়েছিল সোজা হয়ে দাঁড়ানোর এবং আকাশের দিকে তাকাতে পারার ক্ষমতা। বঙ্গবন্ধু বাঙালির বুকে পুরে দিয়েছিলেন অফুরান সাহস, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার স্পর্ধা। প্রমিথিউস মানুষকে দিয়েছিল আগুন, বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। মানুষকে আগুন উপহার দেওয়ায় জিউসের কোপানলে পড়েছিল প্রমিথিউস, আর বাঙালিকে স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দেওয়ায় বিশ্বাসঘাতকদের কোপানালে পড়েন বঙ্গবন্ধু। তাই দুজনের মধ্যে খুব বেশি ফারাক নেই। ফারাক শুধু এটুকু―প্রমিথিউসকে উদ্ধার করেছিল হারকিউলিস। বঙ্গবন্ধুকে ঘাতকদের বুলেট থেকে কেউ উদ্ধার করতে পারেনি। বাঙালিকে ভালোবাসে তিনি উৎসর্গ করেন নিজের জীবন। তাই বাঙালি-দরদী বঙ্গবন্ধুকে গ্রিক পুরানের মানব-দরদী প্রমিথিউসের সঙ্গে তুলনা করাই যায়।

বঙ্গবন্ধুকে বলা হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। কেন তিনি শ্রেষ্ঠ? হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ হওয়ার মতো বাঙালি কি আর নেই? জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে অবদান রাখা গুণী বাঙালির সংখ্যা কম নয়। কিন্তু রাজনীতির ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টি নেই। জ্ঞান বলি, বিজ্ঞান বলি, শিল্প বলি, সাহিত্য বলি, সংস্কৃতি বলি, অর্থনীতি বলি―সবকিছুর নিয়ন্তা হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতিই সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। রাজনীতি তার সঠিক রাস্তায় থাকলে সবকিছুর বিকাশ ঘটে। রাজনীতি যদি তার সঠিক রাস্তা থেকে চ্যূত হয়, তবে সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু এমন এক রাজনীতিবিদ, যিনি বাঙালিকে উপহার দিয়েছেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এরচেয়ে বড় উপহার আর কিছু হতে পারে না। এখানেই বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠত্ব। একারণেই তিনি বাঙালি জাতির জনক, বাঙালি জাতির কাণ্ডারি, বাঙালির বাতিঘর।

দুই.
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাঙালি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন বঙ্গবন্ধু। তাই স্বাবলম্বিতা অর্জনের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক নীতিমালাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজান। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কাজের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যার লক্ষ্য ছিল দুর্নীতি দমন, ক্ষেতে খামারে ও কলকারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে অভূতপূর্ব সাড়া পান তিনি। অল্প সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। বৃদ্ধি পায় উৎপাদন, বন্ধ হয় চোরাকারবার, দ্রব্যমূল্য চলে আসে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার নাগালে। নতুন আশার উদ্দীপনা নিয়ে স্বাধীনতার সুফল মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে অগ্রসর হতে শুরু করে।

কিন্তু মানুষের সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স তখন কেবল ৪ বছর ৪ মাস ১৯ দিন। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট রাত। তখনও ভোর হয়নি। সুবহে সাদেক। পুবের আকাশে জেগে উঠেছে লালিমা। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বাড়িতে তখন গার্ড পরিবর্তনের সময়। বাড়িতে আছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, পুত্রবধূরা এবং বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের। ডিউটিতে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মহিতুল ইসলাম। রাত একটার দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি। হঠাৎ করে একটা ফোন এলো। ঘুমের মধ্যেই ফোন ধরলেন তিনি। ফোনের অপর পাশে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। তখন পাঁচটার কাঁটা ছুঁইছে ঘড়ি। মহিতুল ইসলামকে পুলিশ কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন বঙ্গবন্ধু। কারণ এইমাত্র তিনি খবর পেয়েছেন তাঁর ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতে আক্রমণ করা হয়েছে।

পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ডায়াল করেন মহিতুল, কিন্তু কিছুতেই সংযোগ পান না। গণভবন এক্সচেঞ্জের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। অপর পাশে কেউ একজন ফোন ধরে, কিন্তু নিশ্চুপ, কোনো কথা বলে না। বঙ্গবন্ধু অস্থির হয়ে মহিতুলকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন তিনি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। মহিতুল জানালেন যে, তিনি কোথাও যোগাযোগ করতে পারছেন না। বিরক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু রিসিভারটি মহিতুলের কাছ থেকে নিয়ে কানে ঠেকিয়ে বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান বলছি।’ ঠিক সেই মুহূর্তে মহিতুলের অফিসের কাচ ভেঙে যায় গুলিতে। বঙ্গবন্ধু তখনও বুঝতে পারেননি তাঁকে হত্যার মিশন যে শুরু হয়ে গেছে। বুঝতে পারেননি, আর যে দেখতে পারবেন না শান্ত-স্নিগ্ধ ভোর।

হাবিলদার মোহাম্মাদ কুদ্দুস সিকদার তখন সাতজন গার্ডকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির পতাকা-স্ট্যান্ডে জাতীয় পতাকা লাগাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই গুলির শব্দ শুনতে পেলেন তিনি। গার্ডরা দ্রুত বাউন্ডারি ওয়ালের পেছনে অবস্থান নিলো। তাদের সামনে দিয়েই কালো এবং খাকি ইউনিফর্মের আর্মির সদস্যরা ঢুকে পড়ল বাড়িতে। গার্ডদের উদ্দেশ্যে তারা চিৎকার করে বলল, ‘হ্যান্ডস আপ।’ বাড়ির কাজের ছেলে আবদুল পাঞ্জাবি ও চশমা এনে বঙ্গবন্ধুর হাতে দেয়। সেগুলো পরে নিয়ে বঙ্গবন্ধু গার্ডদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললেন, ‘চারপাশে ফায়ারিং হচ্ছে, তোমরা কী করছো?’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি উঠে ওপরে যান তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে। তখনও তিনি জানতেন না এটাই যে পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষ সাক্ষাত।

যে ঘরে বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়েছিল বাড়ির কাজের লোক মো. সেলিম (আবদুল) ও আব্দুর রহমান শেখ (রমা)। হঠাৎ করে বেগম ফজিলাতুন্নেছা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়ি আক্রমণের শিকার।’ রমা ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠল। অস্থিরভাবে দৌড়ে সামনের গেটের কাছে গিয়ে দেখল সশস্ত্র আর্মি সদস্যরা ৬৭৭ নম্বর বাড়ির দিকে এগোচ্ছে। রমা আবার দৌড়ে বাড়িতে ঢুকল এবং শেখ কামাল-সুলতানার ঘরে গেল। শেখ কামালকে উঠিয়ে কোনোরকমে আক্রান্ত হওয়ার খবরটি দিলো। শেখ কামাল দ্রুত নিচতলায় নেমে এলেন। সুলতানাকে পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে নিয়ে গেল রমা এবং শেখ জামাল ও তাঁর স্ত্রীকেও উঠিয়ে খবরটা জানাল। তাঁরা সবাই বেগম মুজিবের ঘরে চলে গেলেন। চারদিকে তখন মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। নিচতলায় কারো আর্তনাদ শুনতে পেলেন শেখ জামাল। ঘুণাক্ষরেও তিনি বুঝতে পারলেন না সেই আর্তনাদ যে তাঁর বড় ভাই শেখ কামালের।

শেখ কামালকে নিচে নেমে আসতে দেখেন মহিতুল। তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠেন, ‘আর্মি এবং পুলিশের সদস্যরা, আমার সাথে আসুন।’ হামলাকারীদের অবস্থান বুঝতে চাইছিলেন তিনি। এর কিছুক্ষণ পরেই খুনীরা তাঁর সামনে চলে এলো। কালো ও খাকি ইউনিফর্মের তিন-চারজন ঘাতক। ওয়েস্ট লেভেলে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। শেখ কামালের ঠিক সামনে গিয়ে থামল তারা। পেছনে স্তব্ধ হয়ে যান মহিতুল ও নুরুল ইসলাম। মহিতুল চিনতে পারেন মেজর বজলুল হুদাকে। ঘাতকেরা প্রথমে শেখ কামালের পায়ে গুলি করল। মহিতুলের পাশে সরে আসেন শেখ কামাল। মহিতুল চিৎকার করে ওঠেন, ‘ওকে গুলি করো না, ও শেখ কামাল, বঙ্গবন্ধুর ছেলে।’

মুহূর্তে ঘাতকদের কতগুলো বুলেট এসে ঝাঁঝরা করে দিল শেখ কামালের বুক। পুলিশকে মহিতুল ও নুরুল ইসলামের দিকে নজর রাখতে বলে ভারী পদক্ষেপে ঘাতকেরা প্রথম ফ্লোরের দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধুর সুউচ্চ ভরাট কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন মহিতুল। এরপর গুলির শব্দ। কী হচ্ছে কিছুই কল্পনা করতে পারছিলেন না তিনি। শুধু প্রার্থনা করছিলেন যাতে বঙ্গবন্ধুর কোনো ক্ষতি না হয়। ভয়াবহ ঘটনাটিকে নিজের চোখের সামনে ঘটতে দেখেন হাবিলদার কুদ্দুস। আর্মিদের কথামতো একতলায় তাদেরকে অনুসরণ করেন কুদ্দুস। হুদা ও নূর সিঁড়িতে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে মেজর মহিউদ্দিন আর তার সৈন্যরা চলে আসে। তাদের সঙ্গে আছেন বঙ্গবন্ধু। হাবিলদার কুদ্দুস আছেন হুদা ও নূর-এর ঠিক পেছনে। নূর ইংরেজিতে কিছু বললে মহিউদ্দিন আর তার সৈন্যরা সরে যায়। বঙ্গবন্ধু প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা কী চাও?’ কেউ উত্তর দিলো না। হুদা আর নূর-এর অস্ত্র থেকে একঝাঁক বুলেট ছুটে গেল জাতির পিতার দিকে। নীরবে সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়লেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চারপাশে এবং সিঁড়িতে গড়িয়ে পড়তে থাকে জাতির পিতার রক্ত। তখনও তাঁর প্রিয় পাইপটি তাঁর হাতে ধরা। মহিউদ্দিন, নূর, হুদা এবং অন্যরা বাড়ির দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গেল। বুলেটের ধাক্কায় বঙ্গবন্ধুকে লুটিয়ে পড়তে দেখে কাঁপতে কাঁপতে বেগম মুজিবের রুমের বাথরুমে ঢুকে গেল রমা। সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজি, শেখ রাসেল, শেখ নাসের সবাই সেখানে ছিলেন। শেখ নাসেরের হাত থেকে রক্ত পড়ছিল। বেগম মুজিবকে রমা জানাল যে, বঙ্গবন্ধু আর নেই।

কিছুক্ষণ পরেই ঘাতকেরা ফিরে আসে। দরজা ধাক্কাতে শুরু করে এবং দরজায় গুলি করে। ‘মরতে যদি হয় সবাই একসাথে মরব’—এই বলে বেগম মুজিব দরজা খুলে দিলেন। ঘাতকেরা শেখ নাসের, শেখ রাসেল, বেগম মুজিব ও রমাকে সিঁড়ির দিকে নিয়ে গেল। বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে কেঁদে উঠলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। দৃপ্ত সাহস বুকে ভরে নিয়ে বললেন, ‘আমি আর সামনে যাব না, আমাকে এখানেই মারো।’ খুনীরা বেগম মুজিবকে তাঁর ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। চোখের সামনে আরেকটি বীভৎস দৃশ্য দেখলেন হবিলদার কুদ্দুস। মেজর আজিজ পাশা ও রিসালাহদার মুসলেহউদ্দিন স্টেনগান থেকে ফায়ারিং শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন বেগম মুজিব, শেখ জামাল, সুলতানা, রোজী। শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে গিয়ে মহিতুলের সঙ্গে এক লাইনে দাঁড় করাল ঘাতকেরা। শেখ নাসের বললেন, ‘আমি রাজনীতির সাথে জড়িত নই। জীবিকার জন্য ব্যবসা করি।’ তখন একজন আর্মি অফিসার বলল, ‘আমরা তোমাকে কিছু করব না।’

কিন্তু না, বর্বর ঘাতকেরা শেখ নাসেরকে নিয়ে গেল মহিতুলের অফিস সংলগ্ন একটি বাথরুমে। তাঁর বুকে চালিয়ে দিলো গুলি। মৃত্যুর আগ মূহূর্তে ‘পানি পানি’ বলে আর্তনাদ করতে থাকেন শেখ নাসের। তখন আরেকজন আর্মি অফিসার গিয়ে আবার গুলি চালাল তার ওপর। শেষ হয়ে গেল আরেকটি জীবন। খুনিরা এরপর উপরে উঠল। নিচে নামল শেখ রাসেলকে নিয়ে। বঙ্গবন্ধুর দশ বছর বয়সী শিশুপুত্র রাসেল একবার রমার কাছে, একবার মহিতুলের কাছে আশ্রয় খুঁজতে থাকে। রাসেল প্রশ্ন করে, ‘ভাইয়া, ওরা কি আমাকেও মারবে?’ মহিতুল উত্তর দেন, ‘না, তোমাকে মারবে না।’

এরপর কী হতে যাচ্ছে সে-সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না মহিতুলের। ঘাতকদের একজন এসে তাঁর কাছ থেকে রাসেলকে সরিয়ে নিলো। রাসেল তাঁর মায়ের কাছে যেতে চাইল। ক্রন্দনরত রাসেলকে এক হাবিলদার নিয়ে গেল বেগম মুজিবের লাশের কাছে। তারপর আবার গুলি। নিথর হয়ে গেল শেখ রাসেলের নিষ্পাপ ছোট্ট দেহটিও। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছাড়া বঙ্গবন্ধু পরিবারের আর কেউ জীবিত রইল না।

তিন.
পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তো সবার জানা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বদলে যেতে থাকে বাংলাদেশের চেহারা। যে দেশের মানুষ অকাতরে জীবন দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছিল সে দেশটি আবার পেছনমুখী হাঁটতে শুরু করল। ১৬ আগস্ট থেকেই বদলে যেতে লাগল সবকিছু। পরবর্তীকালে জাতির পিতাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার জন্য যা যা করা দরকার সব করার উদ্যোগ নিলো বিশ্বাসঘাতকেরা।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নাম কি মোছা গেছে? তিনি শহীদ হয়েছেন তেতাল্লিশ বছর আগে। তেতাল্লিশ বছর পর আমি এখন তাঁকে নিয়ে লিখছি। আমার মতো অসংখ্যা মানুষ লিখছেন। তেতাল্লিশ বছরে তাঁকে নিয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচিত হয়েছে। রচিত হয়েছে অনেক বই। বাংলার কোটি কোটি মানুষের বুকে উচ্চারিত হয়েছে, হচ্ছে তাঁর নাম। প্রতি বছরই পালিত হচ্ছে তাঁর জন্মদিবস। ১৫ আগস্ট এখন জাতীয় শোক দিবস। প্রতিদিন টুঙ্গিপাড়ায় অসংখ্য মানুষ তার সমাধিতে যায়।

তার মানে ইতিহাসের পাতা থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার যে অপচেষ্টা হয়েছিল তা সফল হয়নি। সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। হওয়ারই কথা। কারণ, বঙ্গবন্ধু বাংলার দিগন্তের সূর্য। কৃষ্ণভয়ঙ্করী মেঘ মাঝেমধ্যে সূর্যকে ঢেকে ফেলে। কিন্তু তা খুবই সাময়িক। দীর্ঘক্ষণ সূর্যকে ঢেকে রাখা যায় না। সূর্য তার আপন বিভায় মেঘ তাড়িয়ে উঁকি দেবেই। দিন যতই যাচ্ছে ততই উজ্জ্বল হয়ে উঠছে বঙ্গবন্ধুর নাম। বেশ কয়েক বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘কারাগারের রোজনামচা’। এ দুটি বই বের হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রকাশিত হয়েছেন। জাতি জানতে পেরেছে তার জীবনের নানা অজানা অধ্যায়। এর মধ্য দিয়ে জাতির হৃদয়ে পাকাপোক্ত হচ্ছে তাঁর নাম, তাঁর কীর্তি।

প্রতি বছর শোকাবহ পনের আগস্ট আমাদের দুয়ারে হাজির হয়। পনেরই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। এদিনে আমরা বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করি। শোক পালন করি। এই শোক পালনের একটা তাৎপর্য আছে। বাঙালি তো বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি। সহজেই অতীতকে ভুলে যায়। অতীত থেকে শিক্ষা নেয় না। বাঙালির বিস্মৃতিপ্রবণতার বিরুদ্ধে শোক দিবসের একটা ভূমিকা রয়েছে। প্রতি বছর পনেরই আগস্ট আমাদের জাগিয়ে দিয়ে যায়। আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বঙ্গবন্ধু আমাদের বাতিঘর। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন জাতি হিসেবে আমাদের পথ চলার পাথেয়। পনেরই আগস্ট আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ভবিষ্যতে যেন আর পনেরই আগস্টের মতো দুঃখজনক ঘটনা না ঘটে। পনেরই আগস্ট আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল মহীরূহ এবং অকুতোভয় বীর আমাদের জাতির জনক। তিনি আমাদের মাথার উপর আছেন। থাকবেন বহু বহু দিন। আমাদের সামনে সংকট এলে আমরা তার প্রতিকৃতির দিকে ফিরে তাকাব। তার জীবনদর্শনের দিকে ফিরে তাকাব। সাহসে ভরিয়ে তুলব আমাদের বুক। পনেরই আগস্ট আমাদের সতর্ক করে দেয়, বাঙালির শত্রুদের এখনো নিপাত হয়নি। তারা এখনো নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। পনেরই আগস্টের শোককে শক্তিতে পরিণত করে সেসব শত্রুকে মোকাবিলা করতে হবে। পনেরই আগস্ট আমাদেরকে এই বার্তা দিয়ে যায়, বঙ্গবন্ধু যে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনাকে যারা হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে তারা এই দেশের একেকজন সম্পদ হিসেবে আবির্ভূত হবে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই রাজনৈতিক দার্শনিকের গুণগুলোকে আমরা যদি ধারণ ও চর্চা করি তাহলে আমরা এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারব, যে রাষ্ট্র হবে বিশ্ববাসীর জন্য অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়।

শোকাবহ পনেরই আগস্টের এই দিনে ঘৃণা জানাই সেসব ঘাতকদের প্রতি, যারা জাতির পিতাকে বর্বরতম কায়দায় হত্যা করেছিল। শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্বীকার করি বাঙালির প্রমিথিউস জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঋণ। কামনা করি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়িত হোক রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে।

তথ্যঋণ :
১। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, এমএ ওয়াজেদ মিয়া, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা।
২। মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর, আনিসুজ্জামান, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
৩। শেখ হাসিনা রচনাসমগ্র (১ ও ২), মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।
৪। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ : সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল, নূহ-উল-আলম লেনিন, সময় প্রকাশন, ঢাকা।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

আপনার মতামত লিখুন :