ফিরে আসুক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ

রুমা মোদক

  • Font increase
  • Font Decrease

এক সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী থেকে অমিত সম্ভাবনাময় নেতা আর তা থেকে এক স্বাধীন দেশের স্থপতি, জাতির পিতা হয়ে ওঠা ক্ষণজন্মা মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর এই ক্রমউত্থানের ইতিহাস একজন মানুষের মহামানব হয়ে ওঠার সমতুল্য। এটা কোনো অলৌকিক-আকস্মিক আবির্ভাব নয়, যেমন স্বাধীনতার যুদ্ধ কোনো আকস্মিক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ নয় কিংবা বিজয়ও নয় কারো দয়ার দান।

বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের মহানায়ক। স্বশরীরে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত না থেকেও একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মুজিবরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে গর্জে উঠেছিল বিজয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্যের প্রণোদনায়। ৫২ থেকে জাতি হিসাবে বাঙালির যে আত্ম অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই, ৭১ পর্যন্ত নানা চড়াই উৎরাই ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে একে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব একজন বঙ্গবন্ধুর। মূলত ধাপে ধাপে রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে, যথোপযুক্ত কৌশল নির্ধারণের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের চেতনায় ঐক্যবদ্ধতাই একটি জাতিকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার সাহস ও শক্তি যুগিয়েছিল।

স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন আর স্বাধীনতা অর্জনের পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই সেই মহানায়কের মৃত্যু একটা দেশ এবং জাতিকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করে নিক্ষিপ্ত করে আদর্শহীন অন্ধকারে। সপরিবারে তাঁর পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করার জন্য তাঁর সংসদীয় ব্যবস্থাকে ভেঙে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া আর বাকশাল গঠন করাই মূল কারণ বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। এখনো পর্যন্ত এই অপপ্রচার থেকে মুক্তি পাননি বঙ্গবন্ধু। মূলত বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেছে তারাই প্রাণপণে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বিসর্জন দিতে চেষ্টা করেছে। চেষ্টা করেছে বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করতে, তাঁর অবদানকে খাটো করতে। তাঁর পুরো পরিবারকে কলঙ্কে কালিমালিপ্ত করতে। এ কেবল একজন মানুষ কিংবা একটি পরিবারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত নয়। একটি সদ্য স্বাধীন দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে চক্রান্ত।

মূলত ব্যক্তি মুজিবকে এই বিতর্ক কিংবা খাটো করার প্রবণতাই প্রমাণ করে তাঁর প্রভাব। কেন তাঁর পরবর্তী সরকারগুলোর এভাবে তাঁকে অস্বীকার করা জরুরি হয়ে ওঠে? কারণ ষড়যন্ত্রীরা  জানে জীবিত কিংবা মৃত, স্বশরীরে কিংবা অশরীরে এক মুজিব মানে একটি আদর্শিক উত্থানের ইতিহাস। একটি লড়াকু ইতিহাস। একটি জাতির ক্রমউত্থানের ইতিহাস। এবং তাদের আশঙ্কা সত্যি করে আর প্রচেষ্টা ধুলিস্যাৎ করে ২১ বছর পর তীব্রভাবে তিনি ফিরে এসে জানান দেন তাঁকে মুছে দেওয়ার প্রচেষ্টা যত রূঢ় তাঁর বেঁচে ওঠার প্রক্রিয়া তাঁর থেকেও অধিক শক্তিশালী।

৭৫ এর শুরুতে বঙ্গবন্ধুর গৃহীত সিদ্ধান্তগুলির জন্য তাঁকে যদি হত্যা করা হয়ে থাকে, তবে আজ ৪৩ বছর পর তাঁর নিজের দল যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তখন পূনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে তৎকালীন পরিস্থিতির। সদ্য স্বাধীন দেশ, অনভিজ্ঞ প্রশাসন, ধ্বংসস্তূপ কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তে তাঁর সামনে তেমন কোনো পথ কি খোলা ছিল? যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সরকার-বিরোধী শক্তি। দেশ পুনর্গঠনে সহায়তা করার বদলে দেনা পাওনার হিসাব করতে বসা অতি বিপ্লবীরা। তাদের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে উৎসাহ যোগাচ্ছে স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তি। একের পর এক আন্তর্জাতিক সাফল্য পর্যুদুস্ত হচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীদের হীন ষড়যন্ত্রে। একমাত্র বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সম্পদ পাটের গুদামে আগুন জ্বলছে ষড়যন্ত্রকারীদের হঠকারিতায়। দুর্ভিক্ষ নেমে আসছে আন্তর্জাতিক কিছু মহলের চক্রান্তে। তখন একটি আপৎকালীন পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসাবে বাকশাল গঠন কিংবা দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দেওয়া কি একেবারেই ভুল সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর? ভুলই যদি হয়ে থাকে সেই ভুলটুকু প্রমাণ হবার সময়ই বা দেওয়া হলো কই? অনেককাল যে সিদ্ধান্তগুলোকে ভুল বলে বিবেচিত করে তাঁর মৃত্যুকে জাস্টিফাই করার কূট প্রয়াস নেওয়া হয়েছে, সেই সিদ্ধান্তগুলো জাস্টিফাই করার সময়টাই কি দেওয়া হয়েছে?

মূলত বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড একটি ইতিহাসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার অপচেষ্টা। একটি জাতিসত্তার উত্থানের মৌল চেতনাকে অস্বীকার করা। যার ফলে তাঁর মৃত্যুই শেষ কথা নয়, শেষ কথা নয় একজন তথাকথিত ব্যর্থ রাষ্ট্রনায়ককে হত্যা। বরং তারপরই সংশোধিত হয় সংবিধান। বদলে যায় জাতীয় চার মূলনীতি। প্রতিষ্ঠিত করতে হয় নতুন ঘোষক। বিতর্কিত করতে হয় স্বাধীনতার যুদ্ধে ব্যক্তি মুজিবের স্বশরীরে অনুপস্থিতি।

যার মাশুল জাতি দিচ্ছে আজও। ৭১-এ অর্জিত স্বাধীন দেশে বাস করছি বটে। রাষ্ট্রক্ষমতায় তাঁর নিজ হাতে গড়া দল। তবু আজও নির্বাসিত ৭২-এর সংবিধান। নির্বাসিত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। যতই যাই বলি তাঁর প্রতিকৃতি সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া দেশ আর তাঁর আদর্শিক স্বপ্নে লালিত স্বদেশে যোজন যোজন দূরত্ব।

তাঁর মহাপ্রয়াণ দিবসে কাঙ্ক্ষা করি তাঁর আদর্শিক প্রত্যাবর্তনের।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিককর্মী

আপনার মতামত লিখুন :