ঢাকায় বাড়ছে ‘কীট’, তবু ঢাকা ফিট

এরশাদুল আলম প্রিন্স, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর

  • Font increase
  • Font Decrease

মানুষ যখন যেভাবে থাকে তখন সেভাবেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। এটাই মানুষকে বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়। তাই কথায় বলে, জীবন যেখানে যেমন। জীবন এখানে-  মানে ঢাকায় তবে কেমন?

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বিলাসি’ গল্পে বলেছেন, “অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে”। এর মাধ্যমে তিনি সমকালীন রক্ষণশীল সমাজের জরাজীর্ণ সমাজব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতা, নিষ্ঠুর, ও অশুভ চেহারা তুলে ধরেছেন। শরৎবাবু ওভাবে টিকে থাকাকে যতোই গালাগাল করুন না কেন, বাঙালি সমাজ আজও ওভাবেই টিকে আছে। শুধু টিকে আছে তাই-ই নয়, বাঙালিদের রাজধানী খোদ ঢাকাতেই তারা তেলাপোকা ও অতিকায় হস্তি উভয়কেই হটিয়ে দিয়ে নিজেরাই রাজধানী শাসন করছে। কিন্তু তারপরও কেন ঢাকাকে পৃথিবীর দ্বিতীয় অবাসযোগ্য শহর ঘোষণা করা হলো তা বোধগম্য নয়। আমরা তো এখানে বিবি-বাচ্চাদের নিয়ে বেশ আছি। খাচ্ছি-দাচ্ছি-ঘুমোচ্ছি-ফূর্তি করছি, রাজনীতি করছি, কোরবানি করছি ইত্যাদি ইত্যাদি।

একবিংশ শতাব্দীতে বেঁচে থাকার চেয়ে বেশি স্বার্থকতা আর কী হতে পারে? অনেকে বলবেন, বেঁচেতো আছি মশাই, কিন্তু ভালো নেই। আমি বলি, ভালোরতো আর শেষ নেই। এনিয়ে তর্ক চলতে  পারে। কিন্তু তারপরও আসলে একটা কথা থেকেই যায়-জীবন যাপনের একটা মানদণ্ডতো আছে। সে মান ইংরেজিতে স্টান্ডার্ড বা মানসম্পন্ন হোক বা না হোক অথবা সে মান যতো নিম্ন মানেরই হোক না কেন-জীবনযাত্রার  একটা সর্বনিম্ন মান চাই। জীবনযাত্রার এ সর্বনিম্ন মান নিয়ে ঢাকায় ক’জন বসবাস করতে পারে সেটিই আসল কথা।

একটা শহরের বা দেশের সবাই একই মানের জীবনযাত্রা করতে পারবে না তা জানি। এটাই পৃথিবীর নিয়ম। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য অন্তত একটা মান চাই যাতে আমরা শরৎচন্দ্রের ভাষায় অন্তত ‘টিকিয়া থাকিতে’ পারি।

মানছি, এই মহানগরে আমাদের জীবন থেমে নেই। আমরা চলছি। কিন্তু সে চলার গতি কত? একে কি চলা বলে। অন্তত কোনো শহরে কি মানুষ এই গতিতে চলাচল করে? তবে আর গ্রাম আর শহরের মধ্যে তফাৎ কই? গ্রামে হেঁটে গেলে ঘণ্টায় ৫-৭ কিলোমিটার যাওয়া যায়। শহরের বাসে উঠে যদি সেই একই সময় লাগে তবে আর শহরে কেন? সম্প্রতি ঢাকা শহরের এই চলাচল নিয়ে কম খিস্তি-খেউড় হয়নি। তাই এনিয়ে আর বাড়তি বয়ান নিষ্প্রয়োজন। তবে একটা কথা না বললেই নয়, ঢাকার চলাচলে সংস্কার না আনলে বেশি দিন আর চলাচল করা যাবে না। পরিবহন ব্যবস্থার সংস্কারই শুধু নয়, আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

একজন পাগলকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় সে কেমন আছে, সে বলবে ভালো আছে। আর পাগল যদি বলে যে সে ভালো আছে, তাহলে বুঝতে হবে আসলেই সে পাগল।অতি শীঘ্রই তার চিকিৎসা শুরু করা সমীচীন, না হলে অবস্থা আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। আমাদের ঢাকাবাসীদের অবস্থা হয়েছে সেই পাগলের মতো। জিজ্ঞেস করলে কেউ বলবে না খারাপ আছি, বরং বলবে ভালোই আছি। এর মানে ঢাকার অবস্থাকে আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছি। মানুষ রুগ্ন পরিবেশে দীর্ঘকাল থাকলে এক সময় তার স্নায়ুবৈকল্য ঘটে। এমন অবস্থায় মানুষ নিজের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারে না। তাই তার উত্তর হয়, ভালো আছি। আমাদের হয়েছে এখন সে অবস্থা। আমরা এখন পাগলের মতো ভালো আছি। ঢাকার অবস্থা আমাদের ব্যবস্থা বা সিস্টেমের সাথে খাপ খাইয়ে গেছে, তাই আমরা বুঝতে অক্ষম যে আমরা কেমন আছি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একটাই উপায়-চিকিৎসা ও সংস্কার; হয় ঢাকার নয়তো ঢাকাবাসীর।

যুক্তরাজ্যের দ্য ইকোনমিস্ট সাময়িকীর ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০১৮ সালের বৈশ্বিক বসবাসযোগ্যতার সূচক বলছে, পৃথিবীর যেসব বড় শহরের বসবাসযোগ্যতা সবচেয়ে কম, সেগুলোর তালিকায় ঢাকা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। আমাদের আফসোফ যে আমরা প্রথম স্থান অধিকার করতে পারিনি। সূচক আরো বলছে, সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক হয়েছে প্রথম।কোনো রকম চেষ্টা তদবির ছাড়াই আমরা দামেস্কের কাছাকাছি চলে গেছি। এই যদি হয় অবস্থা, তবে আমাদের বুঝতে হবে আমরা কোথায় আছি। সিরিয়াকে নিয়ে ঢাকাবাসীর এতো উদ্বেগ, লেখালেখি, টকশো- আরো কতো কি! সিরিয়ার মানবাধিকার, সন্ত্রাস, শরণার্থী, রাজনীতি নিয়ে আমাদের চিন্তার অন্ত নেই। অথচ, একবারও নিজের অন্দরের দিকে নজর দেইনি। যদিও অন্দরে অশান্তি রেখে সদরের চিন্তা আমাদের নতুন নয়।

সূচকে শহরগুলোর বসবাসযোগ্যতা পরিমাপ করা হয়েছে ৫টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। সেগুলো হলো, স্থিতিশীলতা (রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত), স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ ও সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং ভৌত অবকাঠামো। সব বিষয় নিয়ে কথা বললে এখানে কলেবরই বৃদ্ধি পাবে। 

ওই সূচকে রাজনীতির ক্ষেত্রে আমরা সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছি। সিরিয়া ২০ আর  আমরা পেয়েছি ৫০। সিরিয়ার রাজনৈতিক অবস্থার চেয়ে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থা বেশ ভালো। রাজনীতিতে আরেকটু কম নম্বর পেলে সিরিয়াকে ধরেই ফেলতাম। সেজন্য আমাদের সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। এখানে গত একদশক ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। আমরা কিছু দিন বাদেই সরকারের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার একদশক উদযাপন করবো। এটি আমাদের উন্নয়নেরও এক দশক।

সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও আমরা অনেক অগ্রগামী। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বরাবরের মতোই সরকারের নিয়ন্ত্রণে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানি দেয়া ও গুজব ছড়ানো থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের গুপ্তচরবৃত্তির বিরুদ্ধেও আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সোচ্চার। তাদের কর্মোদ্যগের জন্যই আমরা সিরিয়ার চেয়ে ভালো আছি। সে জন্য তাদের ধন্যবাদ প্রাপ্য।

আমাদের শহরের ভৌত অবকাঠামোর পরিমাণগত ও গুণগত মান নিয়ে এ সূচক প্রশ্ন করেছে। শহরের রাস্তাঘাট, খোলা জায়গা, পার্ক, টেলিফোন, হাঁটাচলার জায়গা, গ্যাস, পয়োনিষ্কাশন ও পানি নিষ্কাশনের নালা-নর্দমা, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ফুটপাথসহ সব ধরনের নাগরিক সেবাই ভৌত অবকাঠামো। নতুন ঢাকার কিছু অংশ বাদে পুরো ঢাকাতে যেভাবে একটি ভবনের গা ঘেষে আরেকটি ভবন দাঁড়িয়ে আছে তাতে পতন হলে পুরো ঢাকার একসাথেই পতন হবে।সে পতন রোধ করার উপায় কি? যেখানে ভবনগুলোই গাদাগাদিতে দম নিতে পারছে না, সেখানে ভবনের ভেতরের মানুষ দম নেবে কীভাবে? রবীন্দ্রনাথের  ‘চয়নিকা’ কবিতার অনেকগুলো পঙ্কতিই এখানে প্রাসঙ্গিক। শুধু দুটি লাইন: ‘ইটের পর ইট, মাঝে মানুষ কীট, নাইকো ভালোবাসা, নাইকো খেলা।’

দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, ঢাকায় বাড়ছে কীট। আজও আমরা ‘বিকেন্দ্রীকরণ’ শুরু করতে পারিনি। ‘বিকেন্দ্রীকরণ’ এখনও ঢাকায় কেন্দ্রীভূত। তাই সব মানুষ ঢাকায় ছুটছে। বিভিন্ন জন বিভিন্ন ধান্দায়। কেই জীবিকা, কেউ উন্নত জীবন। কিন্তু সবাই আসলে স্বপ্নের সওদা করতেই ঢাকায় আসে। স্বপ্নের শহর ঢাকা। কম-বেশি সবার স্বপ্নই পূরণ করছে ঢাকা। কিন্তু ঢাকারওতো স্বপ্ন আছে-একটু বেঁচে থাকার; বুক ভরে একটু শ্বাস নেয়ার।বৃষ্টিতে ভেজার, জ্যোৎস্না দেখার ইচ্ছে তারও হয়। শহরেরও ক্লান্তি আছে, তাই ক্লান্তি আসে। পুনশ্চ- আমরা নাকি ঢাকাকে খুব ভালোবাসি!

আপনার মতামত লিখুন :