ঈদযাত্রা, প্রাণহানি ও ভোগান্তি: দায়ী কে?

শুভ কিবরিয়া
শুভ কিবরিয়া

শুভ কিবরিয়া

  • Font increase
  • Font Decrease

এক.

বছরের পর বছর ধরে আলোচনা হয় ঈদ উপলক্ষ্যে ঘরে ফেরা মানুষের কষ্ট একটু কমানো যায় কি না? কত আলোচনা হয়, মিটিং-সিটিং-ইটিংও চলে, কিন্তু সাত মণ তেলও জুটে না রাধাও নাচে না। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে হঠাৎ করে গোটা দেশের অন্তর কাঁপিয়ে দেওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের স্মৃতি এখনও তাজা। নানরকম ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখালেও সরকারি তরফে বলা হয়েছে এই আন্দোলন নাকি চোখ খুলে দিয়েছে। আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের ব্যর্থতা ও দুর্বলতাগুলো কোথায়। কাজেই এবার অন্তত ভাবা গিয়েছিল ঈদ যাত্রায় মানুষের ভোগান্তি কমবে।

সরকার তার হাঁক-ডাক, টিভি কথনেও সেরকমই ইংগিতও দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার ন্যুনতম প্রতিফলন ঘটেনি। সড়ক, রেল, নৌপথে অব্যবস্থাপনা ও ভোগান্তি কমেনি। প্রাণহানিও কমানো যায়নি। ঈদের দুদিন আগে ২০ আগষ্ট একদিনেই সড়কপথে দুর্ঘটনায় ২৯ জনের প্রাণহানির খবর মিলেছে। সড়কে যানজট, নৌপথে বিশেষ করে ফেরিঘাটে জ্যামের খবরের কোন উন্নতি হয় নাই। রেল, নৌযানে মানুষের উপচে পড়া ভীড় দেখা গেছে। সকল ধরণের পরিবহণে ভাড়া আদায় করা হয়েছে গলাকাটা কায়দায়।

এখন দেখা দরকার ঈদে ঘরমুখো মানুষ কিংবা ঈদ শেষে ঘরফেরত মানুষ আসলে চায় কী? তারা চায় নিরাপদে, নির্বিঘ্নে, স্বস্তিতে, ন্যায্য ও ন্যায়সংগত ভাড়ায়, নিরাপদে যানবাহনে সঠিক সময়ে চলাচল করতে। কিন্তু বাস্তবে তাদের অভিজ্ঞতা কী হয়?
রেল, সড়ক, নৌপথে তারা নিরাপদে চলতে পারে না। বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি তার বড় প্রমাণ। তাদের যাত্রা নির্বিঘ্ন তো হয়ই না বরং এই যাত্রা হয় টেনশনপূর্ণ। স্বস্তির তো নাম গন্ধই থাকে না।

ন্যায়সঙ্গত ভাড়ার বদলে চলে এক তুঘলগি কারবার। যে যার ইচ্ছেমতো , কয়েকগুণ হারে যাত্রীদের জিম্মি করেই ভাড়া আদায় করে। এটা দেখার বা প্রতিকারের কেও থাকে না। যাত্রীরা টেলিভিশনে বড় বড় কর্তাদের নানান প্রতিশ্রুতির কথা শোনে বটে কিন্তু এ বিষয়ে কোনো প্রতিকার কখনই পায় না। বেশি ভাড়া দিয়েই, কষ্ট করেই চলে জনসাধারণ।

পথে-ঘাটে হাল আমলে ছিনতাই কমেছে বটে কিন্তু গণপরিবহন সঠিক সময়ে চলার কোনো বাস্তব পরিস্থিতিই আর থাকে না। ঈদের সময় কয়টার ট্রেন কয়টায় ছাড়ে, কয়টার বাস কয়টায় আসে তার ঠিক থাকে না। এখন আলোচনার বিষয় এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয় কেনো?

প্রথমত, দুই ঈদ উপলক্ষ্যেই একই সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকা থেকে ঘরে ফিরতে চায় এবং ঈদ শেষে ঘরে আসতে চায় বলে একটা বিশাল চাপ পড়ে রেল, নৌ ও সড়ক পথের ওপর।

দ্বিতীয়ত, আমাদের সড়ক পথের যানবাহনের প্রায় শতভাগ ব্যক্তি মালিকানাধীন। সরকারি তরফে এই ক্ষেত্রে কোনো অবস্থান নেই। বিআরটিসি নামে একটা প্রায় ধসে পড়া সরকারি সংস্থা থাকলেও সেটির ব্যবস্থাপনার নীতিকৌশল ও অবস্থা খুবই করুণ। বিআরটিসিও প্রাইভেট লিজিং পদ্ধতিতে অপারেট করে বলে এর অধিকাংশ পরিবহনের চলন পদ্ধতি প্রাইভেট মালিকানাধীন গণপরিবহনের চাইতে ভীন্ন কিছু নয়।

নৌপথের যানবাহনের সিংহভাগই ব্যক্তি মালিকানাধনি। একমাত্র রেল পরিবহণেই সরকার বড় অংশীজন।

গণপরিবহনের ক্ষেত্রে প্রাইভেট মালিকানাধীন পরিবহনের মূলনীতি হচ্ছে যে কোনো উপায়েই মুনাফা। ফলে এক্ষেত্রে যাত্রী স্বার্থ বরাবরই উপেক্ষিত হয়। গণপরিবহনে বিশেষ করে সড়ক ও নৌপথে পাবলিক সেক্টরের অনুপস্থিতি প্রাইভেট সেক্টরকে একক কর্তৃত্ব করার সুযোগ দিয়েছে। উপরন্তু প্রাইভেট ব্যবস্থাপনার তদারকির দায়িত্বে সরকার থাকলেও সেখানে রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি।

বর্তমানে বাস মালিক সমিতির নেতা ও পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশেনের নেতা প্রভাবশালী দুই মন্ত্রী। ফলে সরকারি তরফে জনগণের স্বার্থ দেখার বদলে সড়ক ও নৌপথের পরিবহন মালিকদের স্বার্থ দেখাটাই মন্ত্রীদের কাজ হয়ে ওঠে। এছাড়াও আমলাতন্ত্রের একটা অংশ পরিবহন ব্যবসার সাথে জড়িত। সংসদের প্রভাবশালী সদস্যদের একটা অংশ পরিবহন ব্যবসার অংশীদার ও নিয়ন্ত্রক বলে তারাও অন্যায্যভাবে জনগণের হককে ধংস করে নিজেদের মুনাফা বাড়াতেই সচেষ্ট থাকেন। ফলে নৌ ও সড়ক পথে সাশ্রয়ী মূল্যে, জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ওঠার পথগুলোও দিনকে দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে। তাই ঈদের সময় বড় হাঁকডাক দিলেও সরকারের ব্যর্থতা ছাড়া সফল হবার সুযোগ থাকে না।

তৃতীয়ত, রেলপথের ওপর বড় ভরসা করা হলেও রেল যোগাযোগ বছরের পর বছর ধরে অবহেলিত থেকেছে। রেললাইন, রেল ইঞ্জিন, রেল বগি বাড়ানোর বদলে কমানো হয়েছে। রেলখাতে লোকসান এক কর্কট রোগের আকার ধারণ করেছে।

সড়ক পথের বিস্তারের নামে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণে এই সাশ্রয়ী ব্যয়ের, অধিক সংখ্যক মানুষ ও মালামাল পরিবহনের পরিবেশবান্ধব, যানজটমুক্ত বাহনকে অবহেলা করা হয়েছে। খুশির খবর বর্তমান সরকার রেলখাতের উন্নয়নে বিশেষ ‍ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সরকারি এই উদ্যোগের মূল ফোকাস হচ্ছে বিপুল ব্যয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। সরকার রেলখাতের অবকাঠামো উন্নয়নে হাত দিলেও এর দুর্নীতিগ্রস্থ, ধসে পড়া ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেয়নি। ফলে সকল চেষ্টা সত্বেও রেলখাত অবসাদগ্রস্থ, হতাশাজনক পারফরমেন্স বজায় রেখেছে। এই ঈদেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

দুই.

তাহলে বছরের পর বছর ধরে এই অসহায় ও ব্যর্থতাপ্রবণ ব্যবস্থাই কি টিকে থাকবে? প্রতিবার ঈদ এলেই মানুষ কি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে, গলাগাটা ভাড়া দিয়ে, অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে, যানজটে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেবে? হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে সড়ক পথে, রেলপথে, নৌপথে কিন্তু মানুষ তার সুফল পাবে না, এই ধারাই কি চলতে থাকবে?
না, এই ব্যবস্থা চলতে দিলে বুঝতে হবে বাংলাদেশের সত্যিকার অগ্রগতি শুধু মুখের কথাই।
আমাদের বুঝতে হবে আমাদের একটা ন্যায্য, জনবান্ধব, জনমানুষের গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

প্রথমত, আমাদের নৌ ও রেলপথের বিকাশে মনোনিবেশ করতেই হবে। রেল, সড়ক ও নৌপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সাধারণ মানুষকে ফোকাস করে, জনমানুষের কথা চিন্তা করে একটা সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আইনের শাসন মানতে হবে, মানাতে হবে। এক দেশে ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীন দুই শ্রেণির জন্য দুই আইন বজায় রাখার সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে।

তৃতীয়ত, সব ক্ষেত্রে তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। তদারকি সংস্থাগুলো যেন ধনীদের স্বার্থ দেখার প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তদারকি সংস্থায় জনস্বার্থ দেখার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, অর্থের বিনিময়ে মানুষ সেবা ক্রয় করে যেন প্রতারিত না হয় তা দেখার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। ভোক্তাস্বার্থ লংঘিত হলে, অভিযোগ করার প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। ভোক্তাস্বার্থ অন্যায়ভাবে লঙ্ঘিত হলে তার শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।

পঞ্চমত, জনগণকে আইন মানতে হবে। সেই সচেতনতা বাড়াতে হবে।

ষষ্ঠত, সবার আগে দরকার সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক জনসম্পৃক্ত পরিকল্পনার। মাঠ পর্যায়ের সংকট না জেনে উপরতলায় বসে পরিকল্পনা করার জনবিরোধি সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে।

তিন.

এখন বিবেচনার বিষয় বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধকে কে? বলা বাহুল্য, যারা দেশ চালানোর দায়িত্ব নেবেন এটা তাদেরই কাজ। প্রকৃতই জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত শাসকরাই এই দায়িত্ব পালন করবেন। গণপরিবহনে একটা বড় সংকট সুশাসনের অভাব। এক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে যারা তা করবেন তাদেরও সুশাসনের আওতায় কর্মভার নিতে হবে। প্রকৃতই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

আপনার মতামত লিখুন :