কে হচ্ছেন জাপার পরবর্তী চেয়ারম্যান?

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
জাতীয় পার্টির লোগো, ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় পার্টির লোগো, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মাত্র দু’মাস আগে জিএম কাদেরকে উজাড় করে দিলেন, হঠাৎ করে তাকেই আবার সবকিছু থেকে সরিয়ে দিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। প্রথমে তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, পরে পার্টির ভবিষ্যত কর্ণধার (চেয়ারম্যান) হিসেবেও ঘোষণা দেন। আবার তাকে সংসদীয় দলের উপনেতাও করেন। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে জাপার ঘটনাক্রম ছিল এমন। কিন্তু হঠাৎ সবকিছু থেকে জিএম কাদেরকে কেনো সরিয়ে দেওয়া হলো? তাহলে কে হচ্ছেন দলের পরবর্তী চেয়ারম্যান- এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা কল্পনা।

শনিবার (২৩ মার্চ) দুপুরে এরশাদের বাসায় কথা হয় জিএম কাদেরের সঙ্গে। তিনি তখন এরশাদের সঙ্গে দেখা করে ড্রয়িং রুমে মহাসচিবের সঙ্গে পরামর্শ করছিলেন। কী আলাপ হলো- জানতে চাইলে সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে জিএম কাদের বললেন, ‘উনি (এরশাদ ) বলেছেন, নতুন চিঠি দেওয়া তো দুই মিনিটের বিষয়।’

তবে বিস্ময় প্রকাশ করে খোদ জিএম কাদের বার্তা২৪.কম’কে বলেন, ‘‘দু’দিন আগেই তার (এরশাদ) সঙ্গে আমার অনেকক্ষণ কথা হয়। উনি জানিয়েছিলেন, ‘আমার শরীর বেশি ভালো না, তোকে দলের দায়িত্ব দিয়েছি ভালো করে দেখাশুনা কর। দলকে সংগঠিত কর।’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘এদিকে আমার শরীরও বেশি ভালো না। সিঙ্গাপুর যেতে চাইলাম। তখন তিনি বলেন, ‘যা ভালো করে চেকআপ করে আয়।’ বৃহস্পতিবার (২১ মার্চ) সন্ধ্যায় একটি দাওয়াত সেরে এখানে (এরশাদ বাসায়) এসে দেখা করলে তিনি আমাকে এসব বলেন। শুক্রবার (২২ মার্চ) আর এখানে আসিনি। রাতে হঠাৎ টিভিতে দেখে আমার স্ত্রী এসব জানালো। কী কারণে তিনি এসব করলেন বা কী হলো তার কিছুই বুঝতে পারছি না।’’

এদিকে, জাপার মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘আমিও আগে থেকে কিছু জানতাম না। টিভির খবর দেখে জেনেছি।’

জানা গেছে, সম্প্রতি ৯০তম জন্ম উৎসব করেছেন সাবেক সামরিক শাসক এরশাদ। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি শারীরিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। ফলে একা হাঁটাচলা করতে পারেন না। হুইলচেয়ার অথবা অন্যের সাহায্য নিয়ে চলতে হচ্ছে। অনেকে ভেবেছিলেন এরশাদের অবর্তমানে জিএম কাদের হবেন জাপার কর্ণধার। ১৮ জানুয়ারি তেমন ঘোষণাই দিয়েছিলেন এরশাদ। কিন্তু এরশাদের নতুন অবস্থানের কারণে জাপার পরবর্তী কর্ণধার কে হবেন সেটা নিয়ে চলছে গুঞ্জন।

এরশাদের গুড লিস্টে কে কে আছেন- তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কয়েক বছর ধরে রওশন ও কাদেরের মধ্যে রশি টানাটানি চলছে। কিন্তু বয়সগত কারণে রওশনও এখন খানিকটা ব্যাকফুটে। তাহলে কে? এই প্রশ্নের জবাবে রওশনের ছেলে রাহগির আল মাহি এরশাদ সাদের নাম শোনা যাচ্ছে। আবার ভাতিজা (মামাতো ভাইয়ের ছেলে) একান্ত ব্যক্তিগত সহকারি ও পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর (অব.) খালেদ আক্তারও গোপন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অনেকের দাবি।

তবে কয়েকদিনের ঘটনা প্রবাহের পেছনে সাদের আচরণকে সন্দেহের চোখে দেখছেন অনেকে। সাদ অনেকদিন ধরেই এরশাদকে এড়িয়ে চলতেন। মালয়েশিয়া প্রবাসী সাদ দেশে আসলেও মায়ের (রওশন) বাসাতেই থাকতেন। এরশাদের সাথে দুই একবার দেখা করতে এলেও বেশিক্ষণ থাকতেন না। সেই সাদ কয়েকদিন ধরে এরশাদের বাসায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করছেন। প্রেসিডেন্ট পার্কের (এরশাদের বাসা) স্টাফরা বার্তা২৪.কমকে এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, জিএম কাদেরের অব্যহতি দেওয়ার তিন ঘণ্টা আগে থেকে বাসায় ছিলেন সাদ। এদিন কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট পার্কে হাজির হন সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, সাদ ও খালেদ আক্তার।

জানা গেছে, খালেদ আক্তারকে তেমন পছন্দ করতেন না সাদ। সামনাসামনি দেখা হলেও খুব কমই আলাপ হতো। কিন্তু সেই সাদ শুক্রবার রাতে (জিএম কাদেরকে সরানোর আগে) এরশাদের বাসা থেকে বের হয়ে নিজের গাড়িতে না উঠে খালেদ আক্তারের করোলা প্রিমিও গাড়িতে চেপে রওয়ানা দেন। আর সাদের প্রাডো (মা রওশনের ব্যবহারকৃত ঢাকা মেট্রো-ঘ- ১১-১৬৯৪) গাড়িটি পেছনে পেছনে বনানীর দিকে ছুটে যায়। কিছুক্ষণ পরে কম্পিউটার অপারেটর রিপনকে নিয়ে হাজির হন মেজর খালেদ। শনিবার সকালেও প্রেসিডেন্ট পার্কে হাজির হন সাদ। দুপুরের পর বের হন, তার কিছুক্ষণ পর বিরোধীদলীয় উপনেতার পদ থেকেও সরানো হয় কাদেরকে। কাদেরকে সরানোর পেছনে সাদ, হাওলাদার ও খালেদের হাত থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আর পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছেন রওশন এরশাদ নিজে।

আরো জানা গেছে, কয়েকজন সিনিয়র নেতা নানা কারণে জিএম কাদের ও মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার ওপর ক্ষুব্ধ। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগাতে চান হাওলাদার-খালেদ গং। এখানে কাদেরকে ঠেকাতে রওশন ও তার ছেলেকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। এরশাদের অবর্তমানে দলকে কব্জায় নিতে একটি গ্রুপ মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা কাদেরকে সরিয়ে নিজেদের পথ মসৃণ করতে চান। তবে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সমর্থন জিএম কাদেরের দিকেই ঝুঁকে আছে। অর্থাৎ এরশাদের অবর্তমানে জাপা আবার ভাঙনের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করেন অনেকে।

আপনার মতামত লিখুন :