Alexa

জাপার ৪১ সদস্যের প্রেসিডিয়াম সভার সদস্য ৫৪ জন!

জাপার ৪১ সদস্যের প্রেসিডিয়াম সভার সদস্য ৫৪ জন!

ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় পার্টির (জাপা) ৪১ সদস্যের প্রেসিডিয়ামের সভায় আগে থেকেই রয়েছে ৪৬ জন। বৃহস্পতিবার (৯ মে) নতুন করে আরও আটজনকে পদোন্নতি দেওয়ায় তা ৫৪ -তে গিয়ে ঠেকলো।

যাদেরকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে একজন ছাড়া আর সবার বিষয়ে তৃণমূল কর্মীদের আপত্তি রয়েছে। সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ দিদার বখত (সাতক্ষীরা) ছাড়া অন্যদের প্রমোশন যথাযথ হয়নি বলে মনে করেন অনেকে। সিনিয়র নেতারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, প্রেসিডিয়াম সভার আর কোনো মানইজ্জত থাকলো না। আমার পাশে কাকে দেখব এখন! আলু পটল ব্যবসায়ীকে প্রেসিডিয়াম সদস্য করা হয়েছে। সর্বোচ্চ পরিষদ এখানে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও অভিজ্ঞদের মূল্যায়ন করা উচিৎ ছিল।

এরই মধ্যে এই গণপ্রমোশনের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রমোশনের চিঠি ইস্যুর ঘণ্টা খানেকের মধ্যে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন নারায়নগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা। যদিও তিনি বিষয়টি খোলাশা করেননি।

জাতীয় পার্টির আগে প্রতিষ্ঠিত হয় যুব ও ছাত্র সংগঠন। সেই নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের নারায়নগঞ্জ জেলার সভাপতি ছিলেন লিয়াকত হোসেন খোকা। পরে জাতীয় ছাত্র সমাজের কেন্দ্রীয় কমিটি ও যুব সংহতির শীর্ষপদে দায়িত্ব পালন করেন। তার এই পদত্যাগের বিষয়টি টক অব দ্য পার্টিতে পরিণত হয়েছে।

লিয়াকত হোসেন খোকা বার্তা২৪.কমকে বলেন, ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মুল্যয়ন করা উচিৎ। আরও স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রমোশন দেওয়া উচিৎ ছিল। স্যারের (হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ) এই অসুস্থতার সুযোগ একটি চক্র দলটাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

প্রমোশনের সঙ্গে পদত্যাগ সম্পর্কিত কি-না, জানতে চাইলে জবাবে সরাসরি হ্যাঁ বা না, কোনটাই বলেননি তিনি। বলেছেন, পার্টিতে যা হচ্ছে তাতে অনেকের মতো আমিও হতাশ। এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা প্রভাব পড়বে। ভোটের আগে থেকেই, যেভাবে দলটাকে এগিয়ে নেওয়া উচিৎ ছিল, সেভাবে হয়নি। অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহাজোট থেকে আমাদের ৪০-৪৫টি আসন পাওয়ার কথা। কিন্তু কেন পেলাম না।

দলের যুব বিষয়ক যুগ্ম সম্পাদক আবু সাঈদ স্বপন সন্ধ্যার পর পদত্যাগ করেন। অসম প্রমোশনের কারণে এই পদত্যাগ বলে বার্তা২৪.কমকে জানান তিনি। বলেন, ‘দেখেন কাদের প্রমোশন দেওয়া হয়েছে! আরতো মেনে নেওয়া যায় না। আরও অনেকে পদত্যাগের লাইনে আছে।’

এছাড়া যুব বিষয়ক সম্পাদক বেলাল হোসেনও পদত্যাগ করেছেন।

নেতাকর্মীরা বলেছেন, জাতীয় পার্টির ভেতরে গণতন্ত্র বলতে কিছুই নেই, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কথাই শেষ কথা। তিনি যখন যাকে খুশি শোকজ-বহিষ্কার করেন, যখন যাকে খুশি প্রমোশন দেন।

গঠনতন্ত্রে সেই পদ থাকুক আর নাই থাকুক, তাতেও কিছুই যায় আসে না। একই ব্যক্তিকে এক মাসের ব্যবধানে দু’বার প্রমোশন দিয়েছেন এরশাদ। পার্টিতে যোগদানের আগেই সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী পরিষদ প্রেসিডিয়ামের সদস্য করা হয়েছে, এমন হাস্যকর নজিরও রয়েছে জাপায়।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রেসিডিয়ামের সভায় ৪১ জন সদস্য রাখার বিধান রয়েছে। গত নির্বাচনের আগে পরে পাঁচজনকে প্রমোশন দিয়ে প্রেসিডিয়ামের সদস্য করা হয়। নতুন করে আটজনকে প্রমোশন দেওয়ায় এখন সদস্য সংখ্যা হলো ৫৪ জনে।

অবশ্য পার্টির গঠনতন্ত্রে এরশাদকে অনেকটাই স্বেচ্ছাচারী ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ২০ এর উপধারা (১) বলা হয়েছে, ‘গঠনতন্ত্রের অন্যধারায় যাহাই উল্লেখ থাকুক না কেন-জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত থাকবেন। এ ক্ষমতাবলে তিনি প্রয়োজন বোধে প্রতিটি স্তরের কমিটি গঠন, পুনর্গঠন, বাতিল, বিলোপ করতে পারবেন। তিনি যেকোনো পদ সৃষ্টি বা অবলুপ্ত করতে পারবেন। চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টির যেকোনো পদে যেকোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ, যেকোনো পদ থেকে যেকোনো ব্যক্তিকে অপসারণ ও যেকোনো ব্যক্তিকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে পারবেন।’

জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান করা হয় ২০১৬ সালে জানুয়ারি মাসে। তখন গঠণতন্ত্রে এই পদ ছিলো না। রংপুরের এক জনসভায় ছোট ভাই জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন। এর অল্পদিনের মাথায় রওশন পন্থীদের চাপে রওশনকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করা হয়। সেই পদও কিন্তু গণতন্ত্র মোতাবেক ছিলো না। পরে কাউন্সিলে (১৪ মে, ২০১৬) গঠনতন্ত্রের সংশোধনী এনে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও কো-চেয়ারম্যান পদ সংযোজন করা হয়।

জাপায় কখন কার প্রমোশন হয়, আর কখন কাকে বহিষ্কার করা হয় তারও কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ছোট ভাই জিএম কাদেরও এই শোকজের হাত থেকে রক্ষা পাননি। কাউন্সিলের বাইরে গিয়ে কয়েক বছরে তিন দফায় শুধু মহাসচিব পদেই রদবদল করেছেন।

প্রথমে হাওলাদারকে সরিয়ে জিয়াউদ্দিন বাবলুকে, পরে বাবলুকে সরিয়ে আবার হাওলাদার জাতীয় পার্টির মহাসচিব করেন। সর্বশেষ গত নির্বাচনের কয়েকদিন আগে হাওলাদারকে সরিয়ে মসিউর রহমান রাঙ্গাকে মহাসচিব করেছেন। আবার হাওলাদারকে কয়েকদিনের মাথায় সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী করেছেন।

এরশাদের স্বেচ্ছাচারী এই মনোভাবের কারণে এখন বহুধাভাগে বিভক্ত জাপা। এরশাদের নেতৃত্বে ‍মূলধারা জাপাসহ জাতীয় পার্টি জেপি, বিজেপি ও জাতীয় পার্টি (জাফর) নামে চারটি ধারা সক্রিয়। দু’টি ধারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে, দু’টি ধারা বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটভুক্ত রয়েছে। আবার অনেকে লাঙ্গল ছেড়ে ধানের শীষ ও নৌকার হাল ধরেছেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ শারীরিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। বয়সগত কারণে তার রাজনীতি সক্রিয় হওয়া বেশ কঠিন। এই মুহূর্তে এমন প্রমোশন পার্টিতে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

আপনার মতামত লিখুন :

রাজনীতি এর আরও খবর