সংসদীয় দলের নেতার প্রশ্নে জাপায় মতপার্থক্য

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সংসদীয় দলের নেতা ও রংপুর-৩ (সদর) আসনের উপ-নির্বাচনের প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারছে না জাতীয় পার্টি। রওশন এরশাদ চান, নিজেই সংসদীয় দলের নেতা হতে। আর জিএম কাদের-ই হোক দলটির সংসদীয় তথা বিরোধীদলীয় নেতা এমনটাই চাচ্ছেন তার অনুসারীরা।

কাদের অনুসারীরা এখানে পার্টির গঠনতন্ত্রকেও টেনে আনছেন ঢাল হিসেবে। পার্টির গঠনতন্ত্রে বলা আছে, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানই হবেন সংসদীয় দলের প্রধান। প্রয়াত এরশাদের একচ্ছত্র নির্দেশনায় চলা দলটির গঠনতন্ত্রে এই ধারা যুক্ত করা হয় দলের অষ্টম কাউন্সিলে (২০১৬ সাল)। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসতে রাজি ছিলেন না প্রয়াত এরশাদ। সেই সুযোগে বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছিলেন তখনকার দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ।

প্রথমে বিষয়টি সহজভাবে নিলেও পরে বিষয়টি এরশাদের জন্য নানা রকম বিড়ম্বনার সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানরা এলে প্রটোকল অনুযায়ী রওশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। আর উল্টো ঘটতো এরশাদের ক্ষেত্রে, সাক্ষাৎ চেয়ে উল্টো ধরনা দিতে হয়েছে দু-একটি ক্ষেত্রে।

নানা কারণে বছর খানেক পরে এরশাদ নিজেই বিরোধীদলীয় নেতা হতে চেয়েছিলেন। তখন বেঁকে বসেছিলেন রওশন এরশাদ। সে সময়ে দলের সংসদ সদস্যরাও রওশনের পেছনে একাট্টা ছিলেন। এরশাদ চাইলেও সরাতে পারেননি রওশনকে। দশম সংসদের শেষদিন পর্যন্ত বিরোধীদলীয় নেতার চেয়ারে ছিলেন রওশন।

সেই ক্ষোভ থেকেই ২০১৬ সালের কাউন্সিলে দলের গঠনতন্ত্রে সংশোধনী এনে পার্টির চেয়ারম্যানকে পদাধিকার বলে সংসদীয় দলের নেতা বানানো হয়। এখন সেই সংশোধনীকে সামনে আনা হচ্ছে সংসদীয় দলের নেতা প্রশ্নে।

কিন্তু রওশন এরশাদের কাছে গঠনতন্ত্র কি পাত্তা পাবে? তিনি ইতোমধ্যেই সংসদীয় দলের নেতা হতে চান বলে নিজের আগ্রহের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। এরশাদের মৃত্যুর পর জিএম কাদের তার বাসায় দেখা করতে গেলে খোদ রওশনই এই আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। বলেছেন, 'তুমি পার্টির চেয়ারম্যান হয়ে দলকে সংগঠিত কর। আমি আর কয়দিন বাঁচব। বিরোধীদলীয় নেতা হই। আমি মরে গেলেতো তুমিই সব দেখবে'।

জানা যায়, প্রথমদিকে জিএম কাদেরেরও নাকি এতে তেমন আপত্তি ছিল না। কিন্তু এই নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে উভয় সংকট দেখতে পাচ্ছেন তার অনুসারীরা। রওশন যদি সংসদীয় দলের নেতা হন, তখন সংসদ সদস্যরা হবেন রওশনমুখী। এতে দলের মধ্যে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হতে পারে। এমনিতেই অনেক সিনিয়র নেতা জিএম কাদেরের ডাকে সেভাবে সাড়া দিচ্ছেন না। আবার বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানরা বাংলাদেশ সফরে এলেও প্রটোকল পাবেন না জিএম কাদের।

এ কারণে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন জিএম কাদেরের অনুসারীরা। কিন্তু ভাবলেই কি সব হয়ে যাবে? এমনটি ভাবতে পারছেন না অনেকে। রওশন বেঁকে বসলে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। তাতে সলতে জোগান দেওয়ার জন্য অনেক সিনিয়র নেতাই গোঁফে তা দিচ্ছেন। অনেক সংসদ সদস্যও রয়েছেন এই দলে। আবার কেউ কেউ রওশনের সঙ্গে রয়েছেন ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য করার কৃতজ্ঞতা থেকে।

জোর করে কিছু করতে গেলে হিতের বিপরীত ঘটতে পারে। বিশেষ করে গঠনতন্ত্রের দোহাই দিয়ে জিএম কাদের বিরোধীদলীয় নেতা হতে চাইলে। রওশনের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির নতুন কমিটি ঘোষণার ইঙ্গিত দিয়েছেন তার একাধিক অনুসারী। এ জন্য বিশেষ ব্যক্তিত্বের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় রয়েছেন উভয় শিবির। এরই প্রেক্ষিতে যোগাযোগ রক্ষা করেও চলছেন বলে আভাস পাওয়া গেছে।

একই রকম সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে রংপুর-৩ (সদর) আসনের উপ-নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে। এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হয়ে পড়া এই আসনে রওশন এরশাদ তার ছেলে সা'দ এরশাদকে (রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদ) প্রার্থী করতে চান।

অনেকদিন ধরেই ছেলে সা'দকে রাজনীতিতে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন রওশন। বিগত সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম সদর আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে দাবি তুলেছিলেন। রওশন এরশাদ চান, সা’দই হোক জাতীয় পার্টিতে এরশাদের উত্তরসূরি।

মালয়েশিয়া প্রবাসী সা’দ বিগত নির্বাচনের আগে থেকেই সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। এরশাদ যখন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে অন্তিম শয্যায়, সরব দেখা গেছে তাকে। মা রওশন এরশাদের সঙ্গে প্রায় হাসপাতালে যেতেন। ছবি তুলে তা মিডিয়ায় পাঠানো হতো। বাবা এরশাদের মরদেহের সঙ্গে রংপুর চলে যান। পরদিন সেখানে কবর জিয়ারত করেন। এবার ঈদের নামাজও পড়েছেন রংপুরে।

কিন্তু রওশন এরশাদের এই অভিপ্রায়ে ছাড় দিতে রাজি নন রংপুরের স্থানীয় নেতারা। কাদেরপন্থী বলে পরিচিত রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সেক্রেটারি এসএম ইয়াসির নিজেও প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। এছাড়া আরও হাফ ডজন আগ্রহী প্রার্থী রয়েছেন জাপার দুর্গ খ্যাত এই আসনে।

অসুস্থ এরশাদ যখন কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পদ ও বিরোধীদলীয় উপনেতার পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন তখন প্রকাশ্য আন্দোলনে নেমেছিলেন ইয়াসিররা। আগে যে গ্রুপিং কিছুটা গোপন ছিল ওই আন্দোলনে তা প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। রংপুরের নেতাদের কাঁধে সওয়ার হয়ে জাতীয় পার্টির মসনদে ফেরেন জিএম কাদের। তবে ভাবির মন যোগাতে গিয়ে জিএম কাদের কি পারবেন অন্যদের উপেক্ষা করতে?

রংপুর জাপার নেতারা মনে করেন, এটা করলেও আসনটি হারাতে হতে পারে। কারণ সা'দের বিষয়ে রংপুরের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি রওশনের বিষয়েও অনেকের অ্যালার্জি রয়েছে। ২০০৮ সালের উপ-নির্বাচনে রংপুর থেকে নির্বাচিত হলেও রংপুরবাসী তাকে সেভাবে কাছে পায়নি।

শনিবার (১৭ আগস্ট) জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম ও সংসদ সদস্যের যৌথসভায় বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। বৈঠক শেষে পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, 'রংপুর উপ-নির্বাচনের প্রার্থী প্রশ্নে একটি কমিটি করে দেওয়া হবে। তারাই চূড়ান্ত করবেন প্রার্থী। এর আগে স্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে চার জনের নাম প্রস্তাব চাওয়া হবে। সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন প্রশ্নেও ওই কমিটি সিদ্ধান্ত দেবেন'।

তবে দলের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই বলেও দাবি করেন জাপা মহাসচিব।

আপনার মতামত লিখুন :