রওশনের সিদ্ধান্তই বহাল, জল ঘোলা করলেন কাদের

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, ঢাকা
রওশন এরশাদ ও জি এম কাদের

রওশন এরশাদ ও জি এম কাদের

  • Font increase
  • Font Decrease

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যূর পরে বিরোধী দলীয় নেতার পদ শূন্য হলে অনেক রশি টানাটানি চলে দেবর জিএম কাদের ও ভাবি রওশন এরশাদের মধ্যে। কোন রকম আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছাড়া ৩ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করে স্পিকারকে চিঠি দিয়ে উস্কে দেন জি এম কাদের। ১৫ জন সংসদ সদস্যের সমর্থনকে সংযুক্তি হিসেবে পাঠান চিঠির সঙ্গে।

এ ঘটনায় ফুঁসে ওঠেন রওশন এরশাদও। পর দিন পৃথক চিঠি দিয়ে জি এম কাদেরকে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচন না করার অনুরোধ করেন। ওই চিঠিতে রওশন বলেন, তাকে পার্টির সংসদ সদস্যরা বিরোধী দলীয় নেতার কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য সমর্থন দিয়েছেন।

এতে টালমাটাল হয়ে পড়ে জাতীয় পার্টির রাজনীতি। ৫ সেপ্টেম্বর রওশনপন্থিরা সংবাদ সম্মেলন ডেকে রওশনকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন। একইসঙ্গে ৬ মাসের মধ্যে কাউন্সিল ও জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের আহ্বান করেন। সেইসঙ্গে রংপুর উপ-নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করার জন্য পাল্টা পার্লামেন্টারি বোর্ডও ঘোষণা করেন তারা।

এর প্রতিক্রিয়ায় জি এম কাদের সাংবাদিক সম্মেলন করেন। ৬ সেপ্টেম্বর প্রেসিডিয়াম ও সংসদীয় দলের সভা করে কয়েকজনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেন। একইসঙ্গে রংপুর-৩ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেন।

অনেকেই মনে করেছিলেন নতুন করে ভাঙতে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি। কিন্তু নাটকীয় মোড় নেয় ৭ সেপ্টেম্বর রাতের সমঝোতা বৈঠকে। সেই বৈঠকে তিন বিষয়ে সুরাহা হয়। এর মধ্যে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, পার্টির চেয়ারম্যান হবেন জি এম কাদের আর রংপুর-৩ আসনে উপ-নির্বাচনে প্রার্থী করা হবে রওশনপুত্র সাদ এরশাদকে। সাদের মনোনয়নের চিঠি ইতোমধ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্পিকারের চিঠির মাধ্যমে বিরোধী দলীয় নেতার আসন পেলেন রওশন।

এখন প্রশ্ন উঠেছে সমঝোতার লাভ-লোকসান নিয়ে। রওশন কতুটুকু চেয়েছিলেন আর কতটুকু পেলেন? কাদেরপন্থিরা মনে করেন পুরো বিজয় রওশন এরশাদের হয়েছে। রওশন চেয়েছিলেনই দুটি বিষয়। দুটিই যদি তাকে দেওয়া হবে তাহলে এত জল ঘোলা করার কোনো কারণ দেখছেন না নেতাকর্মীরা।

কাদেরপন্থি নেতাকর্মীরা আক্ষেপ করে বলেছেন, সবই ছেড়ে দিয়ে সমঝোতা করতে হলো কেন? এমন প্রশ্নে নেতাকর্মীদের মধ্যে নানান মত রয়েছে। কেউ মনে করছেন জি এম কাদেরের পরামর্শকরা তাকে ডুবিয়েছে। আবার কেউ মনে করছেন আসল চাল খেলেছে সরকার। যাই হোক জি এম কাদেরের ভাবমূর্তি হোঁচট খেলো বলে মনে করছেন তারা। এখন সুবিধাভোগীরা বোল পাল্টে ফেলতে পারেন। যা জি এম কাদেরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এর আগে ২০১৪ সালে বিরোধী দলীয় নেতার প্রশ্নে টানাটানি শুরু হয়েছিল। তখন রওশনের সঙ্গে টানাটানিতে নেমেছিলেন খোদ এরশাদ। তিনিও তখন ফেল মেরেছিলেন রওশনের চালের কাছে। নির্বাচনের পরে প্রথমে এরশাদের সম্মতিতেই বিরোধী দলীয় নেতা হয়েছিলেন রওশন। কিন্তু পরে অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় এরশাদকে।

বিদেশি রাষ্ট্রনায়করা বাংলাদেশ সফরে এলে প্রটোকল অনুযায়ী রওশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। আর এরশাদকে সাক্ষাৎ চেয়ে ধর্না দিতে হয়। তখন সংসদ সদস্যদের হুমকি-ধামকি দিয়েও বাগে আনতে পারেননি এরশাদ। অনেক প্রেসিডিয়াম সদস্যও এরশাদের ডাকে সাড়া দিতেন না। আবার রওশনের দরবারে সদলবলে হাজির হতেন তারা। এবার পার্টির মধ্যে বড় চিড় স্পষ্ট। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় সেটাই দেখার বিষয়।

তবে এই সমঝোতায় কাদেরপন্থিরা চরম হতাশ। তারা মনে করছেন সবকিছু অনুকূলে থাকলেও লজ্জাজনকভাবে পরাজয় মেনে নিয়েছেন কাদের। তার আশপাশের লোকজনই তাকে ডুবিয়েছে। এক নেতা ফেসবুকে লিখেছেন, ফলাফল হওয়ার কথা ছিল তিন-শূন্য। এখন ফলাফল হলো ১-২।

আবার রংপুরেও সংকটে পড়তে পারেন কাদের। যারা আন্দোলন করে তাকে পার্টিতে পুনর্বহাল করেছিলেন, তাদের মতামত তোয়াক্কা না করে সাদকে মনোনয়ন দিয়েছেন। এতে করে মিত্র সংকটে পড়তে হতে পারে কাদেরকে।

সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জি এম কাদের বলেছেন, পার্টিতে কোন বিভেদ নেই। ঐক্যমতের মাধ্যমে রংপুরে সাদ এরশাদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :