রংপুর-৩ আসনের উপ-নির্বাচনে কৌশলী চালে এগিয়ে জাপা

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, ঢাকা
জাপার লোগো, ছবি: সংগৃহীত

জাপার লোগো, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

রংপুর-৩ আসনের উপ-নির্বাচনে কৌশলী চালে একধাপ এগিয়ে গেল জাতীয় পার্টির প্রার্থী রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদ। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সরে যাওয়ায় তার বিজয় অনেক সহজ হবে বলে মনে করছেন পার্টির নেতাকর্মীরা।

যদিও পথের কাটা হিসেবে থেকে গেছেন বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক এমপি আসিফ শাহরিয়ার। এরশাদের এই ভাতিজাকে সাদের পথের কাঁটা মনে করা হচ্ছে। পচা শামুকও যেমন বিড়ম্বনা ডেকে আনতে পারে, তেমনি আসিফের কারণে বিড়ম্বনার শঙ্কা দেখছেন কেউ কেউ। আবার আরেক পক্ষ মনে করছেন, জাতীয় পার্টির বিপুল সমর্থকের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যক সমর্থক যুক্ত হওয়ায় সাদ এখন বিপদমুক্ত। ভোটার ও সমর্থকের পাশাপাশি সরকারি দলের সমর্থন থাকায় বাড়তি সুবিধা পাবেন সাদ। এখানে আসিফ কোনো সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন না।

তবে আসিফের সমর্থকরা মনে করছেন, এখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সরে যাওয়া, বিএনপির হায়ার করা প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া এবং স্থানীয় প্রার্থী না দিয়ে সাদকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিশেষ সুবিধা ভোগ করবেন আসিফ। জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ক্ষুব্ধ সমর্থকরা আসিফের বাটনেই চাপ দেবেন। এরশাদ হলে ভিন্ন কথা ছিল। এরশাদের ছেলের জন্য ততোটা আবেগ কাজ করবে না।

রংপুরের এই আসনে বিএনপির প্রার্থী কখনোই ভালো সুবিধা করতে পারেননি। বলা চলে লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হয়েছেন প্রত্যেক নির্বাচনেই। সবচেয়ে বেশি হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন ২০০১ সালের নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে রংপুরে হেভিওয়েট নেতা হাবিব উন নবী খান সোহেলকে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি।

নির্বাচনের আগেও বেশ জোয়ার উঠেছিল বিএনপির পক্ষে। সারা দেশে বিএনপির সেই জোয়ারের বছরে এরশাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ধানের শীষ পেয়েছিলেন মাত্র ২২ হাজার ৭৫৬ ভোট। এটাই ছিল এই আসনে বিএনপির সর্বোচ্চ ভোটের রেকর্ড।

এর আগে ১৯৯৬ ও ১৯৯১ সালের নির্বাচনে যথাক্রমে বিএনপির প্রার্থীদের ভোটের সংখ্যা ছিল ৬০১০ ও ৬০৪৯টি। বিএনপি কখনোই এই আসনে বিজয়ী হতে পারেনি। সর্বশেষ নির্বাচনে জোটকে এই আসনটি ছেড়ে দেয় বিএনপি। ওই নির্বাচনে জোটের প্রার্থী রিটা রহমান পেয়েছিলেন ৫৩ হাজার ৮৯ ভোট। ওই ভোটে অসুস্থতার কারণে নির্বাচনী ক্যাম্পেইন তো দূরের কথা, ভোট দিতেও যেতে পারেননি এরশাদ।

বিএনপির পাশাপাশি এই আসনে আওয়ামী লীগের রেকর্ডও সুখকর নয়। ১৯৭৩ সালের নির্বাচন ছাড়া আর কখনোই এই আসনে জয়ের মুখ দেখতে পায়নি আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালের নির্বাচন এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ওই নির্বাচনে সাবেক সেনাপ্রধান এরশাদের বিপক্ষে আওয়ামী লীগ মাঠে নামিয়েছিল আরেক সাবেক সেনাপ্রধানকে।

চার তারকা লেফটেনেন্ট জেনারেল অব এরশাদের বিপক্ষে পাঁচ তারকা পূর্ণ জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমানকে প্রার্থী করেছিল আওয়ামী লীগ। প্রার্থী চমকে ফলাফলও কিছুটা বদলে যায়। ওই নির্বাচনে নৌকা মার্কা পেয়েছিল ৫৩ হাজার ৭৪৮ ভোট। এটাই ছিল আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সর্বোচ্চ ভোটের রেকর্ড।

এই আসনে জামায়াতের অবস্থা কখনোই উল্লেখ করার মতো ছিল না। তারা এককভাবে সর্বশেষ নির্বাচন করেছে ১৯৯৬ সালে। ওই নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবর রহমান বেলাল পেয়েছিলেন ৭৮৯০ ভোট। ধারণা করা হয়, এখানে জাতীয় পার্টির পরেই রয়েছে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক। সে হিসেবে এক ও দুই নম্বর অবস্থানে থাকা দু’টি দল সমর্থিত প্রার্থী মানসিকভাবেও অনেকটা এগিয়ে থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতীয় পার্টি এই আসনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে অনেক জটিলতার মধ্য দিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত রওশনপুত্র রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদের হাতে লাঙ্গল তুলে দেওয়া হয়েছে। রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাসহ বড় একটি অংশ এই নির্বাচনে সাদকে বর্জনের ডাক দিয়েছেন। অন্যদিকে এরশাদের ছোটো ভাইয়ের ছেলে সাবেক এমপি আসিফ শাহরিয়ার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা দাবি করেছেন, তাদের প্রার্থী লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবেন। বিদ্রোহী প্রার্থী প্রসঙ্গে রাঙ্গা বলেছেন, আসিফ শাহরিয়ার জাতীয় পার্টির কেউ নন। এরশাদ জীবিত থাকাকালেই তাকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করে গেছেন। বিগত রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। তাতে কোনোই প্রভাব পড়েনি। এবারের নির্বাচনেও কোনো প্রভাব পড়বে না।

১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যুতে আসনটি শূন্য ঘোষিত হয়। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ৫ অক্টোবর ভোট অনুষ্ঠিত হবে। মনোনয়ন দাখিলের শেষ তারিখ ছিল ৯ সেপ্টেম্বর। যাচাই-বাছাই ১১ সেপ্টেম্বর ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় ছিল ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

রংপুর সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার রয়েছেন চার লাখ ৪২ হাজার ৭২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ২১ হাজার ৩১০ জন এবং নারী ভোটারের সংখ্যা দুই লাখ ২০ হাজার ৭৬২। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেই ভোটে এক লাখ ৪২ হাজার ৯২৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এবারও ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :