loader
Foto

ফরাসি সৌরভের সাতকাহন

নিঝুম 'সেন্ট হেলেনা' দ্বীপে বন্দি ফরাসি বীর-সেনাপতি নেপোলিয়ন প্রাণের শহর প্যারিসের ঘ্রাণ নিতেন নিজের ঘরে তাঁর প্রিয় ‘উবিগঁ’ সুগন্ধির ধূপ জ্বালিয়ে। ফরাসি সৌরভের প্রেম এমনই মায়াময় আগ্রাসী, যা জীবনেও ত্যাগ করা যায় না।
 
লেখক-গবেষক ভিক্তর মাসঁ ‘সেন্ট হেলেনার স্মৃতি’ নামক গ্রন্থে এ কথাও নথিবদ্ধ করে গেছেন যে, ‘নেপোলিয়ন যখন মারা যাচ্ছিলেন, তখনও ‘উবিগঁ’-এর দুটি সুগন্ধি বড়ি জ্বলছিল তাঁর বন্দিদশার সেই নির্জন ঘরটিতে।’
 
বস্তুতপক্ষে, শিল্প ও সৌরভের রাজধানী প্যারিস সহসা কিছু মুছে দেয় না প্যারিসের এটাই মহৎ গুণ। ছবি, সাহিত্য, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, ইতিহাস, পানীয়, পোশাক কিংবা সুগন্ধ, কিছুই নিজের হাতছাড়া করে না প্যারিস। 
 
শুধু মূর্ত বস্তুই নয়, বিমূর্ত-নান্দনিকতাকেও প্যারিস সঞ্চয় করে রাখে নিজের করতলে। সুঘ্রাণের মতো অধরা অনুভূতিকেও বাস্তবতা দেয় প্যারিস নামের রমণীয় নগরী। ফরাসি সৌরভের মাদকতায় মাতাল করে বিশ্বভুবনকেও।
           
যদিও ফরাসি বীর নেপোলিয়ন আর নেই। কিন্তু নেপোলিয়নের জীবন ও ব্যক্তিত্বের সৌরভ ছেয়ে আছে ফরাসি সৌরভের মতোই। এখন ফরাসি সৌরভের মতো নেপোলিয়ন শুধু ফ্রান্সে নন, সারা বিশ্বের পরিচিত। একদার শত্রুদেশ ইংল্যান্ডে এখনও প্রচুর গবেষণা আর বই লেখা হয় নেপোলিয়নকে নিয়ে। ইংরেজরা দলবদ্ধ হয়ে নেপোলিয়নের সমাধি দেখতে আসে প্যারিসের অ্যাঁভালিদ স্মৃতিক্ষেত্রে। 
 
পাশাপাশি, ১৭৭৫ সালে স্থাপিত নেপোলিয়নের প্রিয় সুগন্ধি সংস্থা ‘উবিগঁ’ দিব্যি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে প্যারিসের বুকে; স্যেন নদীর পাড়ে। বিশ্বময় ছড়াচ্ছে ফরাসি সৌরভের মাদকতা।
 
নেপোলিয়ন কর্তৃক ব্যবহৃত ও প্রশংসিত ‘উবিগঁ’র মতো আরেক খানদানি ফরাসি সৌরভ ‘গেরল্যাঁ’। ছয় পুরুষ ধরে বয়ে আসা এই সুরভীর পত্তন করেন এক ডাক্তার ও রসায়নবিদ পিয়ের ফ্রঁসোয়া পাস্কাল গেরল্যাঁ। ফ্রান্সের পিকার্দি গ্রাম ছেড়ে ১৮২৮ সালে রাজধানী প্যারিসের রু দ্য রিভোলিতে এসে ভদ্রলোক সুগন্ধির দোকান দেন। 
 
তখনও কিন্তু প্যারিসের বাজারে সুগন্ধির অভাব ছিল না। কিন্তু গেরল্যাঁ চাইলেন সৌরভের বিশেষত্ব সৃষ্টি করতে। তিনি চাইলেন, একেকটি ঘটনা, একেকটি ঋতু, একেকটি উৎসব ও পর্ব, একেকটি জায়গা, একেকটি মানুষের মন ও মেজাজের জন্য একেক ধরনের সুগন্ধি সৃষ্টি করতে। সুগন্ধি যেহেতু শরীরে ব্যবহারের, তাই তাকে একান্ত ব্যক্তিগত করে তোলায় উদ্যোগী হলেন তিনি। চাইলেন সুগন্ধিকে ব্যক্তিত্বের অংশে পরিণত করতে।
 
গেরল্যাঁর’র প্রথম দিকের খদ্দের হলেন বিশ্ববিখ্যাত একজন সাহিত্যিক বালজাক। বালজাক তাঁর ‘সেজার বিরত্তো’ গ্রন্থ লেখার সময় নিজের মনের মতো ‘ওদ তোয়ালেৎ’ নামক এক বিশিষ্ট সুগন্ধি বানিয়ে নিলেন গেরল্যাঁর’কে দিয়ে। বালজাক সুগন্ধির মাধ্যমে কাহিনীর পটভূমি ও অনুভূতি ফিরে পেতে চাইলেন।
 
১৮৫৩ সালে গেরল্যাঁর সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের স্ত্রী সম্রাজ্ঞী ইউজেনি’র জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করলেন ‘ওদ কোলন ইম্পেরিয়াল’ নামের মহার্ঘ্য সুরভী, যা আজও মহামূল্যবান সৌরভের একটি। সে আমলের ফরাসি সাম্রাজ্যের প্রতীক ‘সোনার মৌমাছি’ আঠারো ক্যারেট স্বর্ণে আজও ট্রেডমার্ক হিসাবে ভর করে আছে কোলনের বোতলটাকে।
 
এখানেই গেরল্যাঁ-পরম্পরার শেষ নয়। ১৯৩৩ সালে ফরাসি লেখক আঁতোয়ান দ্য স্যান্তেক্সুপেরি তাঁর বৈমানিকের মৃত্যু নিয়ে রচিত করুণ উপন্যাস ‘ভল দ্য নুই’ বা ‘রাতের ওড়া’ প্রকাশ করতেই গেরল্যাঁ তাঁকে সম্মান জানালেন একটি নতুন সুগন্ধি উৎসর্গ করে। যার নামও  রাখা হয় ‘ভল দ্য নুই’। এই কোম্পানি থেকে পর পর আরও এসেছে জগৎ কাঁপানো নানা সৌরভ: ১৯২২ সালে ‘শালিমার’, ১৯০৪ সালে ‘শঁজেলিজে’, ১৯৮৯ সালে ‘সামসারা’। 
 
ফরাসি বিপ্লবের দ্বিশতবার্ষিকীতে সৃষ্ট ‘সামসারা’ নাকি অনাগত ২০৮৯ সালেও, বিপ্লবের তিনশ বার্ষিকীতেও নতুন থাকার জন্য তৈরি করেছে নির্মাতারা! আবার এই উচ্চাভিলাসী সৌরভের সাথে মিশে আছে একটি মিথ বা পুরাণের স্পর্শ। কারণ সুগন্ধিটি ভারতীয় দর্শন ‍ও নির্যাসের ভিত্তিতে প্রস্ততকৃত। সংস্কৃত শব্দ ‘সামসারা’, যাকে বাংলায় ভাষান্তরিত করলে বলতে হয় ‘সংসার’, সেটি হল গেরল্যাঁ কোম্পানির ভাষায় চিরায়ত ‘ইন্ডিয়া সঙ’ বা ‘ভারতীয় সঙ্গীত’-এর রূপক। 
                         
দীর্ঘ বছরের গবেষণার ফসল ফরাসি সুগন্ধি ‘সামসারা’য় প্রাচীন ভারতীয় ধ্রুপদী-দর্শনের নস্টালজিক-গন্ধময় আবহ রচনা করা হয়েছে। সুগন্ধিটির গবেষণা ও সৃষ্টির সুদীর্ঘ কাহিনী নিয়ে একটি আস্ত বই পর্যন্ত প্রকাশ করেছে গেরল্যাঁর সংস্থা, যার নাম ‘ ল্য লিভ্র দ্য সামসারা’ বা ‘সংসার গ্রন্থ’। 
 
বইটিতে আরেক বিখ্যাত লেখক আর্নো দেজারদ্যাঁ’র লেখা ‘ লে শেম্যাঁ দ্য লা সাজ্যাস’ বা ‘জ্ঞানের পথ’ থেকে নানা উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে: ‘একবিংশ শতাব্দীতে আপন তাগিদেই হতে হবে আধ্যাত্মিক।’
 
একদা নেপোলিয়ন এবং পরবর্তীতে আরও অনেক সেনাপতি ও রাজা-রানিদের প্রিয় ফরাসি সৌরভ বিশ্বায়নের এই উন্মাতাল যুগে ব্যবসায়িক নাকি নান্দনিকতার প্রয়োজনে আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠেছে, কে জানে!
 
Author: ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম

barta24.com is a digital news outlet

© 2018, Copyrights Barta24.com

Emails:

[email protected]

[email protected]

Editor in Chief: Alamgir Hossain

Email: [email protected]

+880 173 0717 025

+880 173 0717 026

8/1 New Eskaton Road, Gausnagar, Dhaka-1000, Bangladesh