Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

বাঙলার কিছু বিলুপ্ত বই পুস্তক

বাঙলার কিছু বিলুপ্ত বই পুস্তক
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
তানিয়া চক্রবর্তী


  • Font increase
  • Font Decrease

বহু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েও কালের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে, কখনোবা লেখকরা সমসাময়িক সময়ে গুরুত্ব পেয়েও পরে হারিয়ে গেছেন। কোথাও চর্চার আড়ালে, কোথাও বা পুস্তকের দুর্লভ হওয়ার কারণে কোথাওবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে বইপত্র অনেকসময় ধ্বংস হয়ে স্মৃতির ধুলোতে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে।
এখন যে বইয়ের কথা বলছি যথা ‘ছেলেদের মহাভারত’, ‘মসূয়ার ইতিহাস’, ‘ধ্রুব’, ‘বিক্রমাদিত্য’ ও ‘প্রতাপাদিত্য’, এই সকল বইয়ের রচয়িতা শ্রদ্ধেয় শ্রী পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্য—সম্পর্কে আমার মায়ের ঠাকুরদা হন। আমার মা শ্রীপূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রী প্রতাপ ভট্টাচার্য্যের সন্তান। পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্যের স্ত্রী শ্রীমতী সুনীতি দেবীকে আমি দেখেছি ও তার মুখে ছেলেবেলায় কিছু গল্পও শুনেছি, তাঁকে সম্বোধনে বম্মা (বড়মা থেকে) বলে ডাকতাম। এই পাঁচটি বইয়ের প্রতিটিই রচনার দিক থেকে ভিন্ন। হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের কারণে ১৩৫৪ সনের ১২ই চৈত্র মসূয়ার (বর্তমান বাংলাদেশের ময়মসিংহ জেলার মসূয়া গ্রাম) বাড়ি (ভারতী কুটীর) ত্যাগ করে স্ত্রী, দুই পুত্র ও দুই কন্যা নিয়ে তাকে ভারতবর্ষে আসতে হয়। সেইসময়  স্বভাবতই তাঁকে বেশ অর্থকষ্টে পড়তে হয় কিন্তু এসবের মধ্যেও ক্রমাগত নিজের সাহিত্যসৃষ্টি অব্যাহত রেখেছিলেন।

প্রথমে গৌরীপুর, কালীপুরে কিছুদিন কাটিয়ে মালদার চাঁচলে বাস করেছিলেন। ভারতবর্ষে ফিরে তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন শারীরীকভাবেও খুব সুস্থ ছিলেন বলে জানা যায় না। ১২৯০ বঙ্গাব্দে ময়মনসিংহ জেলার মসূয়া নামক বর্ধিষ্ণু গ্রামে শ্রী পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্য জন্মগ্রহণ করেন। এই মসূয়া গ্রামেই শ্রদ্ধেয় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জন্ম হয়। বম্মার মুখে শুনেছি বড়দাদু তথা শ্রী পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্যের বিশেষ সুহৃদ ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সাহিত্যের বিভিন্ন কর্ম নিয়ে তাঁরা আলোচনা করতেন। তাঁর যেসকল বই বিশেষ জনপ্রিয় ছিল তার মধ্যে ‘ছেলেদের মহাভারত’, ‘প্রতাপাদিত্য’, ‘বিক্রমাদিত্য’, ‘কেদার রায়’, ‘ঈশা খাঁ’, ‘ধ্রুব’, ‘মসূয়ার ইতিহাস’ উল্লেখযোগ্য। শিশুসাহিত্যের এই মূলগ্রন্থগুলি ছাড়াও পাখি নিয়ে বিশেষ কিছু কাজ করেছিলেন যথা ‘গায়ক পাখি’, ‘বাংলার পাখি’, ‘পক্ষীতত্ত্ব’। বাংলার পাখি সম্পর্কে শিশুদের সম্যক জ্ঞান হোক এই আশায় এসকল বই তিনি লিখেছিলেন। এই বইগুলো আজ প্রায় দুর্লভ। ১৩৬০ সনের ১লা বৈশাখ তাঁর জীবনাবসান ঘটে। 

আমাদের মহাকাব্যের দিক থেকে “মহাভারত” মানুষের সংবেদনশীলতাকে, জীবনযাপনকে বোঝার সবচেয়ে অপূর্ব সৃষ্টি। সম্ভবত ছোটদের মহাভারতকেই এখানে ‘ছেলেদের মহাভারত’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এখন সময় ও উন্নত ভাবনায় এসে এই নামকরণে আমাদের অসন্তোষ থাকতেই পারে। তবে যেভাবে ছোটবেলাকে ছেলেবেলা বলা হয় এটা তারই সাদৃশ্যযুক্ত প্রয়োগ সমসাময়িক প্রভাব থেকে। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী রচিত ‘ছেলেদের মহাভারত’ প্রকাশের বেশ কয়েকবছর পরে শ্রী পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্যের ‘ছেলেদের মহাভারত’টিও প্রকাশিত হয়। সেইসময়ের বিশিষ্ট প্রকাশক ‘বৃন্দাবন ধর এন্ড সন্স লিমিটেড” থেকে এই বই প্রকাশিত হয়। তিনটি স্থানে এই প্রকাশনার অফিস ছিল যথা ৫, বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা, ৯০, হিউয়েট রোড, এলাহাবাদ এবং ৭৮/৬, লায়েল স্ট্রিট, ঢাকা”। এই প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী ছিল আশুতোষ লাইব্রেরি। এই আশুতোষ লাইব্রেরিই তাঁর বেশীরভাগ বই প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছিল। এই প্রকাশনী সেইসময়ের বিখ্যাত প্রকাশনীদের অন্যতম। ওখান থেকে ছোটদের বই বেশি প্রকাশিত হতো। এই প্রকাশনা থেকেই ‘শিশুসাথী’ পত্রিকা প্রকাশিত হতো। এই পত্রিকায় বহু বিশিষ্টজনেরা লিখেছেন নিয়মিত। এই পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা বিখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার সম্পাদনাও করেছেন। সেই সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। শ্রী পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্য ও রমেশ্চন্দ্র মজুমদার দুজনের পরিবারের মধ্যে বিশেষ ভাবের সম্পর্ক ছিল বলে জানতে পারি। শ্রী পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্য’র অজস্র লেখা প্রকাশিত হয়েছে ‘শিশুসাথী’ পত্রিকায়।

১৩৫৬ সনে ‘ছেলেদের মহাভারত’-এর চতুর্থ সংস্করণটি প্রকাশিত হয়। সেইসময় এই বইটির মূল্য ছিল আড়াইটাকা। এই বইটি মুদ্রিত হয়েছিল ‘নিউ আর্য্যমিশন প্রেস (১১নং রঘুনাথ চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা)’ থেকে। ‘ছেলেদের মহাভারত’ আসলেই শিশুদের সুখপাঠযোগ্য একটি বই। আঠারোটি পর্বে রচিত এই মহাভারত অতি সরল সহজ ভাষায় রচিত। মূলগ্রন্থটিতে ব্লক প্রিন্টের অপূর্ব সব ছবি সাযুজ্য বজায় রাখে। দ্রৌপদীর কেশাকর্ষণ, অভিমন্যুর যুদ্ধ, ভীম ও বকরাক্ষস এইসব ছবি মনের মধ্যে রচনা ও চিত্রের যুগপৎ ব্যবহারে দারুণ কল্পজগৎ সৃষ্ট করে। মহাভারতটি পড়লে বোঝা যায় কিশোর-কিশোরীদের মনের কথা ভেবেই যেন সতর্ক থেকে লেখা হয়েছে। প্রকাশভঙ্গি সাধুভাষায় হলেও তা ভীষণভাবে বোধগম্য। “মাকে বলিও,—বাবাকে বলিও,—জ্যেঠা মহাশয়,—মাতা দ্রৌপোদী আর অপরাপর সকলকে বলিও—অভিমন্যু বীরের মতো মরিয়াছে। আর বলিও অভিমন্যু শত্রুর নিকট একটিবার দয়া ভিক্ষা করে নাই—যুদ্ধে বিন্দুমাত্র ভয় পায় নাই; অভিমন্যু বাপের মান রাখিয়াছে। সূত! তুমি আরো বলিও, আমার জন্য যেন কেউ কাঁদেন না”—যুদ্ধ শেষে বালক যোদ্ধা অভিমন্যুর তাঁর সারথির প্রতি কথাকে তিনি এইপ্রকারের ভাষায় লিখেছেন। যার ফলে “ছেলেদের মহাভারত” পরপর ঘটনার পারম্পর্যে এক সুখপাঠ্য রচনা হয়ে উঠেছে।

১৩৩৬ সনে হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য কতৃক ৭নং বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিট (কলকাতা) থেকে তাঁর লেখা ‘মসূয়ার ইতিহাস’ প্রকাশিত হয়। সেই সময়ে এর মূল্য ছিল ২ টাকা। ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার অধীনে মসূয়া গ্রামের কাশ্যপবংশীয় ব্রাহ্মণ ও মৌদগল্য গোত্রীয় কায়স্থগণের বংশ পত্রিকা, বংশ-বিবরণ, প্রধান ব্যক্তিগণের জীবনী ও অন্যান্য কথা নিয়ে এই বই। এটি মূলগ্রন্থে ‘প্রথম ভাগ, ব্রাহ্মণ কাণ্ড’ নামে অভিহিত। এই গ্রন্থের শেষে শ্রী পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্য খেদোক্তি করেছেন—“এই ইতিহাস সংগ্রহ করিতে গিয়া আমি পদে পদে বিশেষ বাধা পাইয়াছি। গ্রামের প্রায় কাহারও নিকট সহানুভূতি পাই নাই। এমনকি বইখানা লেখা হইলে পরেও সকলকে পুনঃ পুনঃ আহ্বান করিয়াছি। বড় দুঃখ এই যে, এমন একটা গুরুতর বিষয় বুঝিবার বা জানিবার কাহারও একবিন্দু কৌতূহল নাই।”

তিনি এও বলেছেন—“বিভিন্ন অসুবিধের কারণে এর সব অংশ প্রকাশ পায়নি। এটা প্রথম ভাগ। সম্ভব হলে পরে বাকিটা প্রকাশিত হবে।” সেই ভাবনা থেকেই হয়তো এই বই ‘প্রথম ভাগ, ব্রাহ্মণ কাণ্ডের’ নামে নামাঙ্কিত ছিল। মূলত যাঁর মুখনিঃসৃত উপদেশ বাণী শুনে শ্রী পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্য এই বই লিখতে তৎপর হয়েছিলেন তাঁর সেই বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠপুরুষ শ্রী ঈশান চন্দ্র ভট্টাচার্য্যকে এই বই তিনি উৎসর্গ করেছেন। বইটি বাঙালির জীবনচরিত বোঝার এক অপূর্ব ঐতিহাসিক কাজ। সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনীতি, খাওয়া-দাওয়া, বেশভূষা সমস্ত কিছুর সুন্দর বিবরণ এই বইতে পাওয়া যায়।

ব্রহ্মপুত্র যেখানে “আড়ালিয়া খাত” নামে পরিচিত ছিল সেইসময়, সেখানে নদীর ভাঙনে প্রতি মাসে বাসস্থান সরিয়ে নিতে হতো সেই থেকে গ্রামের নাম হলো ‘মাস্যা’—এটাই নাকি মসূয়া নামের উৎপত্তির প্রাথমিক কারণ। কেউ বা বলেন মা অসূয়া থেকেই নাকি মসূয়ার উৎপত্তি। একদিকে ঈশা খাঁ অন্যদিকে সম্রাট আকবর আর এদিকে বারেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় এইসমস্ত প্রভাব ছাড়িয়ে কিম্বা নিয়ে বাঙ্গালি জাতি তার সাধারণ জীবন কিভাবে যাপন করত তারই ঐতিহাসিক নিদর্শন এই বই। মসূয়া ছাড়াও তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ভিটাদিয়া, নওপাড়া, উখড়াশাল, বাণিয়াগ্রাম, আচমিতা এইসব অঞ্চলের কথা এবং বিভিন্ন গোত্রের ব্রাহ্মণদের জীবনযাপনের সম্যক পরিচয় এই বই থেকে পাওয়া যায়। এখানে শ্রী পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্য নিজেদের বংশের বিশিষ্ট পণ্ডিতগণেরও কথা বলেছেন। সেইসময় দাবা, পাশা ছাড়াও ‘বলাই নিয়া পালাই’, ‘কান্দুরে কান্দু’ (গাছে চড়ে), মেয়েদের সব অভিনব খেলা ‘বাঘবন্দী’, ‘চাপিলা চুপিলা’, ‘লল্ট গোঁসাই’ প্রভৃতি খেলাধূলার প্রভাব ছিল।

পোশাকে গরদ, তসর ছাড়াও গিলাপ, বনাত, দোলাই—এইসব বস্ত্রের উল্লেখ আছে। প্রথম কিভাবে চাল ধোয়া জলের ব্যবহারে লেখার কালি প্রস্তুত হতো সেকথাও এখানে লিপিবদ্ধ আছে। স্ত্রীশিক্ষার ব্যাপারেও এই বইতে  নিজের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। সবমিলিয়ে বাঙ্গালির সংস্কৃতির ইতিহাস জানার অনবদ্য এক বই এই ‘মসূয়ার ইতিহাস’। ১৩২৪ সনে সম্ভবত এই বইটি প্রকাশিত হয়। এর সপ্তম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৫৭ সনে। এই বইটির প্রকাশকও ‘বৃন্দাবন ধর অ্যান্ড সন্স লিমিটেড’। এটি মুদ্রিত হয়েছিল ‘শ্রীনারসিংহ প্রেস (৫, বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট,কলকাতা ‘ থেকে। বইটির সেইসময় মূল্য ছিল ‘দশ আনা’। শিশুসাহিত্যের জনপ্রিয় এই বইটি সেইসময়ে ডিরেক্টর বাহাদুর কর্তৃক অবিভক্ত বাংলার সমস্ত স্কুলের পুরস্কার ও লাইব্রেরির পাঠ্যপুস্তক রূপে অনুমোদিত ছিল। বইটির ভূমিকায় লেখক লিখেছেন, এই কাহিনী পড়ে যাতে শিশুরা ভক্তিপরায়ণ হয় এটাই তাঁর একান্ত কামনা। গল্পটি পড়লে বোঝা যায় একটি সদর্থক, ইতিবাচক শিশু চরিত্রের মাধ্যমে তিনি সততাকে সাফল্য ও সুখের উপকরণ হিসেবে দেখিয়েছেন। এধরনের বই নিঃসন্দেহে শিশুমনে সুপ্রভাব আনতে সক্ষম হয়েছিল। ধ্রুব ও ধ্রুবতারার এই যে গাঠনিক মেলবন্ধন তিনি দেখিয়েছেন তাতে কল্পনার প্রভাব থাকলেও তা খুব সহজেই  মনের কাছাকাছি এসে যায়। ঐতিহাসিক গল্প রচনার দিক থেকে এই বইটি অন্যতম। ছয় আনা মূল্যের এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৩২২ সনে। এর প্রকাশক ছিলেন ‘পপুলার লাইব্রেরী, ঢাকা’ এবং এটি  ঢাকার আশুতোষ প্রেস হতে মুদ্রিত হয়েছিল। গোলকপুর, ময়মনসিংহের জমিদার উপেন্দ্রচন্দ্র চৌধুরী বাহাদুরকে তিনি এই বই উৎসর্গ করেছিলেন। মূলত বিক্রমাদিত্যকে কেন্দ্র করে এই কাহিনী আবর্তিত হলেও এখানে বারবার রাজ্যের কথা এবং অবশ্যই মহাকবি কালিদাসের কথা এসেছে। ভূমিকায় অবশ্য তিনি লিখেছেন যেহেতু মহারাজ বিক্রমাদিত্যের কোনো প্রামাণিক ইতিহাস নেই  তাই কিংবদন্তীর ওপর নির্ভর করেই এই বই তাকে লিখতে হয়েছে। সংস্কৃত শ্লোকের প্রাসঙ্গিক প্রয়োগে এবং কাহিনীর সহজবোধ্য ভাষায় এই বইটিও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বই। শিশুদের কাছে কিভাবে দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি গল্পের ছলে সামঞ্জস্য রেখে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা যায় এই বই তার উপযুক্ত নিদর্শন।

তাঁর রচিত ‘প্রতাপাদিত্য’ নামক বইটিও বাঙালির যুদ্ধ ও বীরত্বের ইতিহাসের এক যোগ্য নমুনা বলা যায়। বাঙ্গালির শক্তি মোগলের আধিপত্যেও যে একেবারে হীন হয়ে যায়নি, তারা যে ক্রমাগত সাহস দেখিয়ে বাংলাকে রক্ষা করার প্রয়াস নিয়েছে তা স্পষ্টভাবে এই রচনাতে প্রতিভাত। বিভিন্নরকম বাধা-বিপত্তি থাকলেও সবসময় সাহিত্যের কাজ করার চেষ্টা করেছেন একাগ্রমনে, তাই হয়তো অন্যদিকের স্বচ্ছলতার প্রতি তোয়াক্কাও করেননি। তার সাহিত্যকর্মের কথা সেই সময়ে কারোরই অজানা ছিল না। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, শ্রীনলিনীরঞ্জন সরকার (অর্থ সচিব, পশ্চিমবঙ্গ), সুরেশচন্দ্র সমাজপতি (সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক), রায় বাহাদুর জলধর সেন, অমৃতলাল বসু, ডাঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার (ভাইস চ্যান্সেলার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), ডাঃ সুরেন্দ্রনাথ সেন (ভাইস চ্যান্সেলর, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়), ডাঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মহামহোপাধ্যায় আদিত্যরাম ভট্টাচার্য্য (প্রো-ভাইস চ্যান্সেলার, হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, বেনারস), রায় বাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথ ভদ্র (জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ও ‘ঢাকা রিভিউ ও সম্মেলন’-এর সম্পাদক), রায় বাহাদুর সুরেশচন্দ্র সিংহ (ম্যাজিস্ট্রেট, হাওড়া), পদ্মিণীভূষণ রুদ্র (অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম কলেজ), শশাঙ্কমোহন সেন, সঞ্জীবচন্দ্র চৌধুরী (অধ্যাপক, নেপাল রাজ কলেজ), মৌলভী মহম্মদ ইছরাইল (বি-এল ওয়াকফ কমিশনার), সুরেশচন্দ্র ঘটক, ডাঃ নলিনিকান্ত ভট্টশালী (কিউরেটর, ঢাকা মিউজিয়াম) এঁদের সকলের বন্ধুতা, সম্মতি ও প্রশংসা তার সাহিত্যজীবনের সহায়ক ছিল।

তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়ে অবগত হয়ে স্বয়ং রবিঠাকুর ১৩৩২ সালের ৩০শে ফাল্গুন তাঁর সম্পর্কে কিছু কথা প্রকাশ করেন, তাঁর কিছুটা অংশ এইরকম—“শ্রীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য মহাশয় যে কাজে জীবন নিয়োগ করিয়াছেন তাহার কিছু কিছু পরিচয় পাইয়া আমি বিশেষ আনন্দলাভ করিয়াছি।” শোনা যায় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন নিতান্ত সরল মানুষ, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিশেষ স্নেহ করতেন তাঁকে।  এই মেধাবী ও সরল মনের মানুষটির সঙ্গেও পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্যের একপ্রকার বন্ধুতা ছিল। তিনি শ্রী পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্যকে লিখেছিলেন—“নমস্কার দাদা, আপনার পাখী আর বাঙ্গালির গল্প প্রত্যেক শিক্ষার্থীর আবশ্যক। শিক্ষকেরাও ইহার প্রয়োজনীয়তা গ্রহণ করিবেন।” শ্রদ্ধেয়  উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী তাঁকে লিখছেন—“আপনার ‘গায়কপাখী’ সবগুলিই চেনাজানা অথচ কাহারো জীবনকথা আমাদের জানা নেই। আপনি জানাইলেন, বঙ্গ সাহিত্যের ইহা অভিনব সম্পদ হিসাবে গণ্য হইবে।” দুঃখের কথা এইসব বই এখন পাওয়াই যায় না, বাঙালি এইসকল বই এর কথা বর্তমানে জানেই না।

আপনার মতামত লিখুন :

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে

জমিলার দেশ কিরঘিজস্তানে
ছবি. লেখক

সেই যে কবে সুকুমার রায় লিখেছিলেন না—“পুলিশ এলে ডরাই না আর, পালাই নে আর ভয়ে, আরশোলা কি ফড়িং এলে থাকতে পারি সয়ে।”—আমি কিন্তু তেমন নই। আরশোলা আর ফড়িংকে সয়ে নিলেও, পুলিশকে আমি ষোল আনা ডরাই। তাই কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেক শহরের আব্দুররাহমানিভ স্ট্রিটে চলার সময়ে যখন দুজন পুলিশ দু দিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরে, আতঙ্কিত না হয়ে পারি না। তাদের সাথে আছেন সাদা পোশাকের আরো দুজন পুলিশ। আমাকে তারা এমনভাবে চারদিক থেকে বেষ্টন করে দাঁড়ালেন, চাইলেও সেই চক্রব্যূহ ভেদ করে ভোঁ দৌড় দেবার কোনো উপায় নেই। মুখে তাই সরল একটা অপাপবিদ্ধ অভিব্যক্তি নিয়ে তাদের জেরার অপেক্ষায় সেখানে দাঁড়িয়ে যাই। এ অঞ্চলে শুনেছি পুলিশ খুব একটা সততানিষ্ঠ নয়, তাই আমাকে পাকড়াও করে মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে কোনো পয়সা দাবি করে কিনা, সেরকম একটা সন্দেহও মনে উঁকি দেয়। তো সেই দলে থাকা একমাত্র নারীসদস্য আমার সমস্ত ভুল ভাঙিয়ে আশ্বস্ত করে জানালেন, তারা আসলে ট্যুরিস্ট পুলিশ। কিছুদিন হলো এই বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু কাজ নেই তেমন। ট্যুরিস্ট যেমন কম, তার চেয়েও কম অপরাধের মাত্রা। ফলে ইনাদের একপ্রকার মাছি তাড়াবার অবস্থা। আমাকে দেখে এই দলটির আগ্রহ হয়েছে আমার কাছ থেকে দু চারটি কথা জানবার। এই যেমন কোথা থেকে এসেছি, কদিন থাকব, কেমন লাগছে বিশকেক, কোথায় কোথায় যাবার পরিকল্পনা আছে, এই সব আরকি। সবশেষে তাদের অভিলাষ হলো, আমার সাথে একটি ছবি তুলবেন। বেশ, তুলুন। ভেতরে ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করছি ততক্ষণে। কোথায় ভেবেছিলাম উৎকোচ দাবি করা অসৎ পুলিশ, আর শেষে কিনা আবিষ্কার করলাম সদালাপী বন্ধুভাবাপন্ন ভিন্ন ধরনের পুলিশ, তাই অবাক আর উৎফুল্ল না হয়ে উপায় আছে?

আজ এখানে মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া। ছেড়ে ছেড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকালও এমনই ছিল। তবে বৃষ্টির তেজ ছিল আরো বেশি। তার মাঝেই এয়ারপোর্ট থেকে আসতে হয়েছে। সে-নিয়ে বেশ রকমের ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। বিশকেকের এয়ারপোর্ট মূল শহর থেকে বেশ দূরে, প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের পথ। গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা দু লেনের মন্থর পিচঢালা পথ ধরে সেখানে পৌঁছাতে হয়। আমি এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিইনি। ভূতুড়ে জনমানবহীন সেই এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই দেখা পেয়েছিলাম ‘মারসুতকা’র, যেটি আদতে হলো ভাড়ায় খাটা মাইক্রোবাস। ভাড়া ট্যাক্সির দশ ভাগের এক ভাগ। যদিও যাত্রীবোঝাই হবার জন্যে অপেক্ষা করতে হলো বেশ খানিকটা সময়। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই ঝুমবৃষ্টি। বৃষ্টির ভারি পর্দাকে উপেক্ষা করে জোরসে ওয়াইপার চালিয়ে শম্বুকগতিতে মারসুতকা ছুটে চলে। মিনিট পনের পথ আসার পর দেখি দু পাশটা প্রায়ান্ধকার। ঝুপ করেই যেন নেমে এসেছে বিদায়ীবেলার সন্ধ্যা। আর সামনের রাস্তায় এপাশের মাঠ উপচিয়ে তীব্র গতিতে জল ছুটে যাচ্ছে উল্টো দিকের মাঠের দিকে। এর মাঝ দিয়ে গাড়ি ছোটালে জলের স্রোতে কলার ভেলার মতো ভেসে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। আমাদের ড্রাইভার বিশাল এক সিডার গাছের কোণে গাড়িটিকে দাঁড় করিয়ে পরিস্থিতির ব্যাপকতা কিছুটা বুঝে নেবার চেষ্টা করে। ওখানেই আমরা আটকে থাকি বেশ কিছুক্ষণ। কিছুটা শঙ্কা জাগে, যদি বৃষ্টি আর না থামে? যদি জলের তোড় এসে পৌঁছায় এ গাড়ি অবধি, তাহলে? আশেপাশে গ্রামের কিছু চাষিবাড়ি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছে না। এখানে বিপদে পড়লে সাহায্য করবার কেউ এগিয়ে আসবে কি?

বৃষ্টি থেমেছিল শেষ অবধি, সেই সাথে মন্থর হয়েছিল প্লাবনের তেজ। কিন্তু এতসব ডামাডোলে আমরা যখন আলাতু বাজারের কোণে এসে পৌঁছাই, ততক্ষণে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এখান থেকে আমার হোটেল যে কোন দিকে, কিংবা কত দূরে, কিছুই ধারণা নেই আমার। কিছুটা ক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মাথার উপরের বুড়ো ওক গাছ থেকে টপ টপ করে ঝড়ে পড়ে বিকেলের বৃষ্টির জমে থাকা ফোঁটাগুলো। পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময়ে হঠাৎ এক যুবক দাঁড়িয়ে যায়। আমার অবস্থা আঁচ করতে পেরে নিজ থেকেই বলে, ‘ট্যাক্সি খুঁজে দেব তোমায়?’ আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলি। ছেলেটি পকেট থেকে ফোন বার করে দ্রুত কিছু টেপাটেপি করে জানায়, ‘মিনিট পাঁচেকের ভেতরেই ট্যাক্সি এসে পড়বে। ততক্ষণ আমি তোমার সাথে আছি। আমি এখানকার টিভি স্টেশনে গ্রাফিক্সের কাজ করি। আজ আমার বিকেলের শিফটে কাজ ছিল। ফেরার সময়ে দূর থেকে দেখলাম, তুমি এখানে সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। তাই ভাবলাম, তোমার হয়তো কোনো সাহায্য প্রয়োজন।’ অজানা একটি দেশে এমন একজন অপরিচিত জনের কাছ থেকে বাড়িয়ে দেওয়া সাহায্যের হাত পেয়ে মুহূর্তেই মনটা ভালো হয়ে গেল।

আলাতু স্কয়ারের কোণের দিকটায় টিউলিপের বাগান। সকালের বৃষ্টির ফোঁটা লুকিয়ে আছে আধবোজা টিউলিপের জঠরে। সেই সাথে আশেপাশে ফুটে আছে বেশকিছু ধবধবে সাদা ড্যাফোডিল। টিউলিপের বাগানের পেছনেই আইরিশ পাব। তবে সকালের দিক বিধায় পাবের দরজাটি বন্ধ। আর বাগানের শেষপ্রান্তে গোয়ালঘরের মতো দেখতে টিনের চালের লম্বা বারান্দা। বিশাল সেই চাতালে দুজন মাত্র মানুষ নানা আকারের পেইন্টিং এনে ঝুলিয়ে রাখছেন। বিক্রির উদ্দেশ্যে। অবাক হয়ে খেয়াল করি, সেসব পেইন্টিংয়ের মাঝে লেনিন যেমন আছেন, তেমনি বেঁচে আছেন স্তালিনও। কিরঘিজ রমণীদের বেশ কিছু চিত্রকর্ম আছে। তবে তাদের অনেকটিতে শিল্পী নেত্রদানপর্ব সমাপ্ত করেননি। সেটি কোনো ধর্মীয় কারণে কি? এর আগে তাসখন্দে পরিচয় হওয়া একজন চিত্রশিল্পী তেমন একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে এখানে সেসব আলোচনা সম্ভব নয়। কারণ, যে দু যুবক ছবিগুলো চটের ছালা থেকে বের করে ঝুলিয়ে রাখার কাজ করছে, তাদেরকে মূল চিত্রকর বলে মনে হয় না। আর তাছাড়া ওরা মহাব্যস্ত। এই যে আমি খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখছি, এর মাঝে কিন্তু একবারও তারা জিজ্ঞেস করেনি, আমি কোনো সম্ভাব্য ক্রেতা কিনা। অতঃপর তাদেরকে ছুটোছুটিতে ব্যস্ত রেখে আমি মূল স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যাই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705573218.jpg

কংক্রিটে ঢাকা বিশাল উন্মুক্ত সেই স্কয়ারটিকে অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছে উঁচু বেদিতে ঘোড়া ছুটিয়ে চলা এক বীর। এই বীর পৌরাণিক কাব্যগ্রন্থ ‘মানাস’-এ উল্লিখিত বীর। এই কিরঘিজ দেশটির নানা ক্ষেত্রে মানাস-এর উজ্জ্বল উপস্থিতি। এদের এয়ারপোর্ট, এমনকি জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার নামও মানাস। দূরদেশের রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে কী করে বিজয়ীর বেশে ফিরেছিলেন সেই বীর, সেটি-ই কাব্যের ছন্দে শত শত বছর ধরে পঠিত হয়েছে ধূসর স্তেপের দেশ কিরঘিজস্তানে।

আজ উদ্দাম হাওয়াকে উপেক্ষা করে স্কয়ারের উন্মুক্ত স্থানটিতে বেশ কিছু লোকের সমাগম। তারা মুগ্ধ হয়ে দেখছে সামরিক বাহিনীর কসরত। তাদের দু দিকে ব্যান্ড দলের বাদ্যের তালে তালে নাচছে স্কুলের একদল কিশোর কিশোরী। কিশোরদের মাথায় ঐতিহ্যবাহী কিরঘিজ টুপি—কালপাক। তাদের কয়েক জনার হাতে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র কমুজ। ত্রি-তার বিশিষ্ট কমুজ দেখতে অনেকটা গিটারের মতোই, তবে আকারে অনেক ছোট আর শীর্ণ। সেনা আর সেই স্কুলের কিশোর কিশোরীদের সাজ সাজ রব দেখে বোঝা যাচ্ছে, সামনের কোনো এক দিনে হয়তো উৎসব পালনের ঘটা আছে। তাই প্রস্তুতি হিসেবেই এই মহড়া। আমি নিজেও হাওয়া উপেক্ষা করে কিছুক্ষণ শিশুদের মহড়া দেখি।

এই স্কয়ারটির পেছন দিকে একটি সবুজ উদ্যান। নাম—দুবভি পার্ক। সে উদ্যানের সমুখেই আকাশের দিকে উদ্বাহু হয়ে সপ্রতাপে দাঁড়িয়ে আছেন লেনিন। মধ্য এশিয়ায় টিকে থাকা একমাত্র লেনিন-ভাস্কর্য। বাকিগুলোকে অনেক আগেই ধনতন্ত্রের আগমনের মধুলগ্নে সমূলে উৎপাটন করা হয়েছে। কিন্তু এখানকার এরা সমাজতন্ত্র থেকে মুক্তি নিলেও বোধকরি অতীত স্মৃতিকে এক ঝটকায় ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। এমনকি স্বাধীনতার বেশ কিছুকাল পর অবধি লেনিন ভাস্কর্যটি স্কয়ারের সম্মুখ চত্বরেই ছিল। এই কিছু বছর আগে ওটিকে সরিয়ে এনে স্থান দেওয়া হয় ভবনের পেছন দিকে। লেনিনের প্রতি মানুষের মায়ামোহ এখনো যে কিছুটা টিকে আছে, তার আরেক প্রমাণ হলো—ভাস্কর্যের বেদিতে পড়ে থাকা গোলাপ আর টিউলিপের ম্লান গুচ্ছ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705392582.jpg

লেনিন ভাস্কর্যের উল্টোদিকের সেই পার্কটির একটি বেঞ্চে গিয়ে বসি। বাঁ ধারে কিরঘিজ নারীর প্রমাণ সাইজের ভাস্কর্য। মধ্যবয়েসি এক নারী। মাথায় হেঁসেলের পাতিলের মতো দেখতে প্রথাগত মেয়েলি কিরঘিজ টুপি—এলিশেক। প্রায় দশ হাত দীর্ঘ সূতি কাপড় পাগড়ির মতো করে পেঁচিয়ে তৈরি করা হয় এ টুপি। তবে বিশাল সাইজের এই কেশাচ্ছাদনকারী পরে হাঁটতে এযাবত কোনো নারীকে এ শহরে দেখিনি। হয়তো গাঁ গ্রামে এখনো এর কিছু চল থাকতে পারে। তবে পাথরের বেদির উপর সেই স্মিতহাস্যময়ী নারীর ভাস্কর্যটি দেখে আমার হঠাৎ জমিলার কথা মনে হয়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক চিঙ্গিস আইৎমাতভ সৃষ্ট অমর চরিত্র—জমিলা। বলা চলে, জমিলার গল্পের মাধ্যমেই এই কিরঘিজ দেশটির সাথে আমার পরিচয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জমিলার স্বামী মায়ের কাছে বৌকে রেখে ফ্রন্টে যায়। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে উপনীত জমিলার সঙ্গী হয়ে থাকে বালক বয়সের দেবর। এর মাঝেই গ্রামের সমবায় ফার্মে কাজের জন্যে ডাক পড়ে তার। গ্রামের পুরুষরা যেহেতু সবাই যুদ্ধে, তাই সমর্থ নারীরা শস্যভাণ্ডার না সামলালে ফ্রন্টের সৈনিকদের মুখে খাবার জুটবে কী করে? জমিলা কাজে যোগ দেয়, সাথে বন্ধুর মতো লেগে থাকে সেই দেবরটি। এর মাঝেই সেখানে উদয় হয় জমিলার সমবয়েসী আরেক যুবক। জমিলা আর সেই যুবক দুজনেই একে অপরের প্রতি নৈকট্য অনুভব করে। আর সেভাবেই কাহিনী গড়ায়। ছোট গল্প। কিন্তু কী গভীর তার আকুতি! কিরঘিজ গ্রামীণ সমাজের সেই সময়কার চিত্রকে যেন জমিলার জীবনের কাহিনীর মধ্যদিয়েই আইৎমাতভ উপস্থাপন করেছেন আমাদের সামনে। আমি সেই ভাস্কর্যটির দিকে তাকিয়ে ভাবি—তুমিই কি তবে গিরিপথ পেরিয়ে গ্রাম ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরে দূর দেশে পালিয়ে যাওয়া সেই জমিলা?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705311264.jpg

ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা অব্যাহত থাকায় চায়ের তেষ্টা জেগে ওঠে। আমি রাস্তা পেরিয়ে স্কয়ারের উল্টোদিকে যাই। ওদিকটাতে বেশ কিছু ক্যাফে-বেকারির দোকান আছে। বলা চলে, এ রাস্তাই শহরের সবচেয়ে বনেদি এলাকা। খুব বেশি দূর হাঁটতে হয় না। অল্প দূরেই লোহার দরজা ঘেরা মেট্রো পাব নজরে আসে। সেটির বাইরে চক বোর্ডে লেখা—‘তুমি+আমি+কফি= আনন্দ’। যদিও আমার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আমি আছি, কফিও হয়তো থাকবে, কিন্তু কোনো ‘তুমি’ নেই। তাই আনন্দের সঙ্কুলান হবে কিনা, জানি না। তবুও অনন্যোপায় না থাকায় সেই দশাতেই ভেতরে ঢুকতে হয়। ভেতরটা গুমোট অন্ধকার। বাইরের দরজার সাথে মিল রেখেই চারধারে ছড়ানো লোহার টেবিল চেয়ার। সড়কের দিকে মুখ করা জানালাগুলো ঘোলাটে কাচে ঢাকা। দেয়ালে টানানো নোটিশ বোর্ডে লেখা—টেবিল ছেড়ে উঠে গেলে মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন। কোণের দিকটিতে বার। তবে সেটি বোধ করি জমজমাট হয়ে ওঠে আঁধার নামার পর। এই ভর দুপুরবেলায় কেই-বা এখানে মদ গিলতে আসবে? ওয়াটার এগিয়ে এলে আমি চায়ের অর্ডার করে পাশের টেবিলের দিকে তাকাই। সেখানে মাঝবয়েসী দু মার্কিন ভদ্রলোক আলাপ করছেন। নিচুস্বরে কথা বলায় তাদের আলাপন আমি ডিকোড করতে পারি না। ভাবতে থাকি এরা কি কোনো কনট্রাক্টর? একথা ভাবছি, কারণ, ঠিক এই মুহূর্তে না হলেও কয়েক বছর আগ অবধি এই বিশকেক শহরটিতে আনগোনা ছিল বিপুল সংখ্যক মার্কিনীর। নাইন ইলেভেনের পর আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান শুরু হলে তারা কিরঘিজস্তানের মানাস এয়ারপোর্টে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বানাবার জন্যে জায়গা চেয়ে বসে। চরম অর্থনৈতিক মন্দা চলতে থাকা কিরগিজস্তানের পক্ষে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তারা রাজি হয়ে যায়। সেই থেকে বিমান বাহিনীর লোক, তাদেরকে কেন্দ্র করে সাপ্লায়ার কোম্পানি ইত্যাদি নানা সংস্থার কাজ করা বিপুলসংখ্যক লোকেদের মচমচে পয়সায় গড়ে ওঠে এ এলাকার হোটেল, ডিস্ক, পাব, আর ক্যাফেগুলো। তবে কয়েক বছর আগে ক্ষমতায় আসা নয়া কিরঘিজ সরকারের চাপে মার্কিন বিমান বাহিনী এখানকার ঘাঁটিটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিদেয় নিলে মাথায় হাত পড়ে এ এলাকার ব্যবসায়ীদের। তারা সরকারের কাছে আর্জি জানায়—ফিরিয়ে আনুন আবার সেই মার্কিনীদের। নয়তো আমরা চলব কী করে? তাদের এই উদ্বিগ্নতার হেতুটা আমি বুঝি। এ পর্যন্ত বিশকেক শহরের নানা পথে হেঁটে যতদূর বুঝেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরুবার পর এখানকার নতুন কোনো শ্রীবৃদ্ধি হয়নি। বিদ্যুৎচালিত যে সরকারি বাসগুলো রাস্তায় চলছে সেগুলো রঙচটা, লক্কড়-ঝক্কর মার্কা। রাস্তায় এখানে-ওখানে খানাখন্দ। রাজধানীর পাড়াগুলো শ্রীহীন। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা উষর, চাষাবাদ-অনুপযোগী। খনিজ সম্পদের মধ্যে আছে একটি ছোট সোনার খনি। ভারি শিল্প নেই বললেই চলে। সে কারণেই দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠী কাজের সন্ধানে ছুটে যায় রাশিয়ায়। অর্থনীতির এমন একটি ত্রিশঙ্কু অবস্থায় মার্কিন ঘাঁটির প্রস্থানে তাই স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিচলিত না হয়ে পারেনি। তবে ঘাঁটিটি গুটিয়ে নিলেও সব কর্মকাণ্ড হয়তো পুরোপুরি বিদেয় নেয়নি। কিছু কনট্রাক্টর, কিছু ফড়ে দালাল হয়তো এখনো রয়ে গেছে। অদূরের টেবিলে ভুঁড়ি ঠেকিয়ে বসা সেই দুই মার্কিনী তেমন কেউ কিনা কে জানে!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563704741206.jpg

ওয়েটার চা এনে রেখে যায়। চায়ের প্লেটে দুধবিহীন লিকার চায়ের পাশে রাখা থাকে মুসুম্বির কয়েকটি টুকরো। আমি সেই টুকরো দুটোকে চায়ে ভাসিয়ে দিই। সেই সাথে ভাবতে থাকি—দুপুরের খাবারটা সারা যায় কোথায়? খাবার নিয়ে এ অঞ্চলে বেশ হুজ্জতে পড়েছি। ইংরেজি জানা লোক এখানে নেই বললেই চলে। সবজি চাইলে এনে দেয় মাংস, আর মাংস চাইলে এনে দেয় সবজি। যেটা বুঝলাম, নিজের ইচ্ছেমতো খাবার চাইলে এ দেশে আসবার আগে টুকিটাকি রুশ শিখে আসাটা বাধ্যতামূলক। ও হ্যাঁ, এরা কিন্তু এখনো রুশ ভাষাকেই ধরে রেখেছে। আর এদের বর্ণমালাও সিরিলিক বর্ণমালা।

কফি পান শেষে আমি এগলি-ওগলি হেঁটে হায়াত রিজেন্সি হোটেলটা খুঁজতে থাকি। না, এ গরিব বান্দার সেখানে ওঠবার মতো সামর্থ্য নেই। আমি আসলে ওটি খুঁজছি, কারণ এর ঠিক পেছনেই নাকি কিরঘিজ জাতীয় নাট্যশালা। সেখানে যাবার কারণ আছে। সকালে হোটেলের খাবার ঘরে প্রাতরাশ সারার পর বেরিয়ে আসার সময়ে শুনছিলাম ম্যানেজার মেয়েটি কাকে যেন বলছে—আজ এখানে বিরাট অপেরা কনসার্ট হবার কথা। ভিয়েনা থেকে এদ্রিয়ান আর হাইদেমারিয়া নামক দুজন স্বনামধন্য শিল্পী আসবেন। সাথে থাকবে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রীদের একটি দল। তারা বাজাবেন—পিয়ানো, চেলো, ভায়োলিন আর বাস। অপেরা শিল্পীরা কিন্তু অনেক সময় গানের সুরের সাথে কোনো একটি অভিনয়ও মঞ্চস্থ করেন। অনেকটা আমাদের গীতিনাট্যের মতো। তবে ভিয়েনা থেকে আসা অপেরা শিল্পীরা কেবলই গাইবেন, অভিনয়ে অংশ নেবেন না। এর আগে ভিয়েনায় গিয়ে পথেঘাটে এই অপেরা কনসার্টের টিকিট বিক্রি হতে দেখেছি। সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকে টিকেট বেচা দালালদের মতোই ওখানকার থিয়েটারগুলোর আশেপাশের রাস্তায় আছে বেশ কিছু টিকেটবিক্রেতা। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্তে তাদের অনেকের পরনে পুরনো আমলের ঝলমলে পোশাক। এমন কয়েকজনের কাছে টিকেটের মূল্য শুনে আমার একেবারে অক্কা পাবার দশা হয়েছিল। প্রায় দেড়শ ইউরোর নিচে ভালো কোনো টিকেটই নেই। তাই অপেরা কনসার্টের তীর্থস্থল ভিয়েনায় অবস্থানকালে সেটির সুধা আস্বাদন আর সম্ভব হয়নি। তবে সেখানকার শিল্পীরা এখানে এসে অনুষ্ঠান করায় আমি অনুমান করি—টিকেটের মূল্য হয়তো তেমন একটা আকাশচুম্বী হবে না। ম্যানেজার মেয়েটিকে কোথা থেকে টিকেট কাটা যায়, এ নিয়ে প্রশ্ন করলে সে কিছুটা তাগিদের কণ্ঠে জানায়, “আজ রাতের এই শো যদি ধরতে চাও, তাহলে তোমাকে দুপুরের মধ্যে গিয়ে টিকেট কেটে আসতেই হবে। শোয়ের ঠিক আগে ওখানে টিকেট পাবে না।” মেয়েটির সেই কথাকে আমলে নিয়েই আমার এই নাট্যশালা খুঁজতে পথে নামা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563705117000.jpg

গথিক স্থাপত্যে নির্মিত বিশাল সেই নাট্যশালাটি দু গলি পরেই পেয়ে যাই। চূড়োতে এখনো নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে যাওয়া তারাটি দেখেই বোঝা যায়, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের এই ভবনটি সোভিয়েত সময়ের অবদান। সামনের বারান্দায় উঠে দেখি, সেখানে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে ভেতরের প্যাসেজে জ্বলতে থাকা ঝাড়বাতির আলোকছটা। সেই আলোর রেখা অনুসরণ করে ভেতরে যাবার মুখে কাঠের ভারি দরজাটির হাতলে চাপ দিই। কিন্তু সেটি আমার প্রত্যাশাকে প্রত্যাখ্যান করে। আমি বুঝে যাই, সন্ধ্যের আগে এই দোর খুলবার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাহলে টিকেট পাব কোথায়? নাকি এতটা পথ এসে আশাহত হয়ে ফিরে যেতে হবে? সেই সময়ে খেয়াল করি, বারান্দার একেবারে শেষ প্রান্তে দু পাল্লার জানালা। একটি পাল্লা খোলা, অপরটি বন্ধ। মুখে হাসি ফুটে ওঠে আমার, টিকেটের একটা বন্দোবস্ত হয়তো হয়ে গেল।

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে
হুমায়ূন আহমেদ

 

তিনি বলেছিলেন, তার মৃত্যুতে কেউ যেন না কাঁদে। বিষাদ কণ্ঠে গেয়েছিলেন গান, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে জাদু ধন। মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’

কিন্তু সাত বছর আগে সুদূর আমেরিকায় তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছিল তার জন্য। শুধু সেদিনই নয়, বাংলা সাহিত্যের ভক্ত-অনুরাগীরা প্রতিটি দিনই তাকে স্মরণ করেন। তার কথা ভাবেন। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও কর্মমুখর। জীবনকে উপভোগ করেছেন তিনি সৃজনের বিবিধ উপাচারে।

হাওর-বাওর-গানের দেশ বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একই জেলার কেন্দুয়ার কুতুবপুর তার পিতৃভূমি।

পিতার চাকরির সুবাদে হুমায়ূনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের বহু স্থানে। সিলেটের মীরাবাজার, চট্টগ্রাম শহর, পিরোজপুরের মনকাড়া প্রকৃতিতে। যেসব কথা তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি নেন আমেরিকার থেকে। শুরু করেন অধ্যাপনা।

কিন্তু তার ভাগ্য মিশে ছিল সাহিত্যে। সার্বক্ষণিক লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি বেছে নেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে যে লেখক জীবনের সূচনা ঘটে, তা পরিণত হয় বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয়-জনপ্রিয় লেখক সত্তায়।

গল্প-উপন্যাসের জাদুকরী ক্ষমতায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেন তিনি। মানুষ লাইন ধরে কেনে তার বই। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয় হাজার হাজার কপি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।

আর তিনি ছিলেন মেধা, প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সমকাল তো বটেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি গড়েছিলেন পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী রেকর্ড। যে রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা আদৌ সম্ভব হবে না।

‘অচিনপুর’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’, ‘লীলাবতী’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘অচিনপুর’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘দেয়াল’, এমন তিন শতাধিক পাঠকনন্দিত উপন্যাসের রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে অর্জন করেন নিজস্ব পরিচিতি ও ভূগোল। একা লড়াই করে সাহিত্যের পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি মৃতপ্রায় প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে দেন তিনি।

টিভি নাটকেও জনপ্রিয়তার ইতিহাস গড়েন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘দূরে কোথাও’, এমন হৃদয়ছোঁয়া নাটকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় টেনে আনেন হাজার হাজার দর্শক।

চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও সোনা ফলিয়েছেন হুমায়ূন। সিনেমাহলমুখী করেছেন মানুষকে। তার নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘ঘেটু পুত্র কমলা’র মতো ছবি বাণিজ্য সফল ও পুরস্কৃত হয়েছে।

নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি লোকবাংলার বহু গান চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা বলেছেন। মানব-মানবীর অন্তর্গত হৃদয়ের দাহ ও বিষাদকে তুলে ধরেছেন অনন্য সুষমায়। তাকে ঘিরে শিল্প, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের এক নান্দনিক জগত উন্মোচিত হয়েছিল।

প্রেম ও রহস্যময় বেদনার প্রতীক নগ্নপদে হলুদপাঞ্জাবির ‘হিমু’ তার অনবদ্য সৃষ্টি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষক মিসির আলীর মতো চরিত্রও তিনি সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ূনের এই দুই চরিত্রের কথা বাংলা সাহিত্যের পাঠক সহজে ভুলবে না। ভুলবে না এমন আরো অনেক মানবিক চরিত্র ও কাহিনীর নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকেও।

মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদ, পুলিশ অফিসার বাবার জেষ্ঠ্য সন্তান হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির পুরোটা জুড়েই আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূনের উপন্যাস ‘১৯৭১’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘উতল হাওয়া’ এবং চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী কাহিনীচিত্র। যুদ্ধাপরাধ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লেখার পাশাপাশি আন্দোলনও করেছেন তিনি।

প্রেম ও বিরহ হুমায়ূনের লেখার মূল উপজীব্য হলেও তিনি তার লেখায় অপরূপ দক্ষতায় স্পর্শ করেছেন রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ঘটনাবলি। লেখার মায়াবী টানে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যে। নীল জোছনায় বেদনাহত একটি তরুণ কিংবা নীলপদ্ম হাতে একটি তরুণীর স্মৃতি-সত্তা পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন মানুষের চেতনার গহীন প্রদেশে। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র