আনা বার্ন্স কে?



এনামুল রেজা
আনা বার্ন্স

আনা বার্ন্স

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

..আনা বার্ন্স ম্যান বুকার জিতেছেন। আগেই কিছুটা অনুমান করেছিলাম। বিশ্বসাহিত্যে ফ্যান্টাসি আর ডিস্টোপিয়ার এই রমরমায় রিয়েলিস্ট ঘরাণার কাউকে খুঁজতোই কমিটি। মাস খানেক আগে এক লেখক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল এ নিয়ে।

এবার কে জিতবে?

সবচেয়ে কমবয়সি হিসেবে ডেইজি জনসন?

প্রায় সমবয়সী ওই ব্রিটিশ লেখিকা পেয়ে যেতে পারেন, এরকম অনুমান বহু পশ্চিমা পাঠক-পাঠিকা ও পত্রিকা সম্পাদকদেরও ছিল। তার উপন্যাসের নাম এভরিথিং আন্ডার। কিন্তু, বললাম, হোক না ইডিপাসকে নারী হিসেবে কল্পনা করে পৌরাণিক কাহিনীটির রিটেলিং দারুণ ব্যাপার, আমার বাজি আনা বার্ন্সের ওপর। 

এ কে?

উত্তর আয়ারল্যান্ডের লেখিকা। অন্য জিনিসি। তার লেখা ডিপ, এনগেজিং, সোশাল এওয়ারনেসে ভরপুর, বুদ্ধিদীপ্ত। কিছুটা ট্র্যাডিশনাল, অনুচ্ছেদহীন লং প্রোজে লেখেন।

বন্ধু শুকনো মুখে জবাব দিল, ‘আচ্ছা আচ্ছা।’

আমার অনুমানশক্তি ভালো, এই যে বিকল্প সাহিত্য নোবেল দেওয়া হলো এক বছরের জন্য, মুরাকামি পুরস্কার ঘোষণার আগে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিলেন, এসব কি আর বুঝিনি? মনে করে দেখো, এমন কিছু একটা তোমাকে বলেছিলাম না? এমনকি নমিনিদের শর্টলিস্ট প্রকাশ হবার আগেই ভেবেছিলাম, মুরাকামিকে নিশ্চয় এবার..

বেশ। এবার একটু দম নেওয়া যাক। 

২০১৮ সনের বুকার পুরস্কার ঘোষণার পর উপরের অনুচ্ছেদের মতো কোনো কিছু আপনার পড়ার সুযোগ ঘটেছে বাংলাদেশি পত্র-পত্রিকায়? আমি কিছুটা নিশ্চিত যে ঘটেনি, কারণ আমারও মেলেনি সুযোগ।
আনা বার্ন্স কে? বলা নেই, কওয়া নেই, আনকোরা এক লেখিকাকে বুকার কমিটি মিষ্টি দিয়ে দিল!

২.

সাহিত্যের রাজনীতি নিয়ে অনেক কচকচি করা যেতে পারে এ ধরনের রচনায়। বুকার কারা দেয়, কেন দেয়। বুকার পেলে কী হয়। কী কী হিসেব কষমান থাকে একটা বইকে নির্বাচন করবার আগে। এসব আলাপ প্রতি বছরই পড়ি আমরা দৈনিক পত্রিকা বা ওয়েব ম্যাগাজিনগুলোতে। পড়ি আর ভুলে যাই, পরের বছরের জন্য অপেক্ষা করি। একেবারে প্রতি শীতে দুস্থ লোকজন যেভাবে শীতের কাপড়ের জন্য অপেক্ষা করে, শীত গেলে কাপড়টা আর সংরক্ষণ করে না, নতুন বছরে ফের তো মিলবে।

নিবন্ধ রচয়িতারও শ্রম নেই। একই ফর্মা, খালি বিজয়ীর নাম, বইয়ের সারসংক্ষেপ আর দিন তারিখ বদলে দিলেই হলো।

তো, এ বছর আমি ভেবেছিলাম, একটু ব্যতিক্রম হবে। বুকার কমিটি যাকে নির্বাচন করেছে, একদম আনকোরা ঔপন্যাসিক। আনা বার্ন্স নামটা শুনলেই বারবার জুলিয়ান বার্নসের কথা মনে পড়ে। ২০১২ সালে ওই বার্নসও (জুলিয়ান) বুকার পেয়েছিলেন, তিনি আগে থেকেই ছিলেন বিখ্যাত লেখক।

এই বার্ন্সকে (আনা) প্রথম সাক্ষাতেই আমার অপছন্দ হয়ে গেল।

পুরস্কার পেয়ে বোকা বোকা হাসছেন। ফ্যাকাশে একজন প্রৌঢ়া। গ্ল্যামারহীন। হালের পশ্চিমা লেখিকারা প্রায় নায়িকাদের মতো সুন্দরী, সে তুলনায় এনাকে পছন্দ করার কোনো কারণ দৃশ্যমান নাই। উপরন্তু, আনার পেছনে এক হাতে থাবা দিয়ে স্মারক এওয়ার্ডটা ধরে আছেন তারচেয়ে আধহাত লম্বা ডাচেস অব কর্নওয়াল। ছবিটাও অপছন্দ করার মতো।  

যাই হোক, আমরা জানি যে, সত্যিকার লেখকের পারফর্মেন্স আর্টিস্ট না হলেও চলে, লেখাই আসল, ট্রু লিটারেচার নিজে থেকেই তার পথ করে নেয়—ইত্যাদি ইত্যাদি।
মিল্কম্যান (২০১৮) বা আনা বার্ন্সের নাম আরো অনেক সাহিত্য রসিকের মতো আমিও শুনিনি আগে। পরেও খুঁজে পেতে তার সম্পর্কে বিস্তর কিছু জানা গেল না। জানা গেলেও বা কী। চিনি না জানি না, এরকম একজন লেখককে হুট করে

কোন আগ্রহে খুঁজব? বইয়ের শেষ আছে? বুক শেলফ ভরে আছে অপঠিত বইয়ে। 

এ প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়েই বুকারের গুরুত্ব সামনে চলে আসলো।

উত্থানের পর থেকেই বুকার পুরস্কার এক ধরনের বুস্টার হিসেবে কাজ করে আসছে লেখকদের জন্য। তুলনামূলক তথ্য উপাত্ত বের করলে দেখা যাবে, নোবেল পুরস্কারও কোনো লেখকের বই বিক্রি এতটা বাড়িয়ে দেয় না যতটা বুকার দেয়। কোনো লেখকের বুকার পাওয়া মানেই উত্তর আমেরিকা, ব্রিটেন ও পৃথিবীর প্রায় সবখানে তার উপন্যাসটা হটকেকের মতো বিক্রি হওয়া। লেখক রাতারাতি সেলিব্রেটি বনে যান। বিশেষ করে একবিংশ শতকে এই পরিসংখ্যান দারুণ উর্ধ্বগামী।

একটু গভীর বইপ্রেমিরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, ঢাকার নীলক্ষেতেও কী রকম কয়েক হাজার বিক্রি হয়ে যায় বুকারজয়ী বইয়ের নীলক্ষেত কপি। পড়া হয় কী হয় না, সে আলাপের সঙ্গে বই বিক্রির সম্পর্ক সামান্যই।
মানুষ গ্ল্যামার খায়। বুকার হলো বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে বড় গ্ল্যামারের মুকুট।

সুতরাং, আমি না চিনেও হতাশ হইনি, ভেবেছিলাম, গেলবারের জর্জ সন্ডার্সের মতন এ বছরেও আনা বার্ন্স আনা বার্ন্স করে সকল দেশীয় পত্রিকা, ওয়েব ম্যাগ, আর ফেসবুকের নিউজফিড মশগুল হয়ে উঠবে। তা হলো না। দৈনিকগুলোতে বিদেশি নিউজ থেকে অনুদিত কিছু রিপোর্ট ছাড়া মিল্কম্যান নিয়ে উচ্ছাস কোথাও দেখিনি।

প্রথমত, বার্ন্স প্রসঙ্গে পশ্চিমা পাঠক-সম্পাদক গোষ্ঠীও কিছুটা হতাশা মিশ্রিত বিস্ময়ে ভুগছেন। দ্বিতীয়ত, উপন্যাসটা এখনো প্রকাশিত হয়নি আমেরিকায়। মূল হৈচৈটা তারাই করে থাকে। তৃতীয়ত, আনা বার্ন্স গ্ল্যামারহীন, তার ট্র্যাক রেকর্ড এখনো অস্পষ্ট। যেহেতু আমরা কগনিটিভ বায়াসে (শব্দটা নতুন শিখেছি, ঝেড়ে দিলাম) ভুগি, যাকে অন্যরা ভালো বলছে না বা ভালো কি না ওভাবে শোনা যাচ্ছে না, তার বিষয়ে না বলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

৩.

এই অংশটা, অর্থাৎ মিল্কম্যান কী নিয়ে লেখা গুগল করলেই আগ্রহীরা পেয়ে যাবেন। তবু গুগল করতে যারা চান না, তাদের জন্য এই অনুচ্ছেদ:  
উইকিতে লেখা হয়েছে, উত্তর আয়ারল্যান্ডে ১৯৬০ থেকে ১৯৯৮ সন পর্যন্ত যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাত চলেছিল তাকেই ‘দা ট্রাবল’ (যেন দুনিয়াতে আর কোনো ট্রাবল নাই) বলে, মিল্কমানের সেটাপ তার শেষ দিকে, অর্থাৎ ১৯৯০ সনের এদিকে ওদিকে। উপন্যাসের নায়িকা ‘মিডল সিস্টার’—এ ছাড়া তার আর কোনো নাম পাওয়া যায় না, মূলত কোনো কিছুরই নাম পাওয়া যায় না সেভাবে। ১৮ বছরের এ তরুণী আমার মতোই বই লাভার। সে ক্লাসিক পড়তে ভালোবাসে। বর্তমান তার পছন্দ নয় বলেই ক্লাসিক তাকে টানে। কিন্তু আসলে দেখা যায়, সে এক যুবককেও ভালোবাসে। কিন্তু, সে এমন একটা সমাজে বসবাস করে, যেখানে মেয়েদের পক্ষে উল্লেখযোগ্য বা বিশেষ যে কোনো কাজ করাটা বিপদজনক। কেউ তেমন কিছু করলেই শহরের আর সবার আলাপের বস্তু হয়ে উঠতে হয়। আমাদের নায়িকা এজন্যই তার প্রেমিককে গোপন করে রাখতে খুব সতর্ক। এমনকি নিজের মা’কেও সে কিছু জানায় না। এইসব সতর্ক দিনেই মিল্কম্যানের বদনজরে পড়ে সে। মিল্কম্যান এক প্যারামিলিটারি লিডার। উপন্যাসের অনামা শহরে সে সর্বেসর্বা। সমাজটাও ঘোর মোড়লতান্ত্রিক (একেবারে গ্রামবাংলা টাইপ মনে হয়)। মিল্কম্যান জোর করেই আমাদের নায়িকাকে বিয়ে করে, যে তার চেয়ে বয়সে কয়েক গুণ বড় এবং হুমকি দেয়, টেরিবেরি করলে সে মিডল সিস্টারের প্রেমিককে খুন করে ফেলবে|

সহজ গুগলিং করা অনুচ্ছেদ শেষ হলো। এবার ডিপ গুগলিং ও মনের কথা। এ অনুচ্ছেদ থেকে আমি আবার আগের মতো স্বাধীন:
ধর্মীয় গোঁড়ামিতে পরিপূর্ণ যে কোনো দেশের প্রেক্ষাপটেই হয়তো আনা বার্ন্সের মিল্কম্যানকে ফেলে দেওয়া যাবে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের এমন এক সমাজের গল্প এই উপন্যাসে করা হয়, যেখানে মেয়েরা সমাজের চাপা পড়া অংশ। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নেই। এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার চেয়ে কোনো একক ব্যক্তি আর সকলের ওপর ক্ষমতাশীল। এতে কারো তেমন মাথাব্যথাও নেই। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয়টা হচ্ছে, কেউ যদি বলে সে নির্যাতিত, নির্যাতনের চিহ্ন তাকে দেখাতে হবে। শরীরে ক্ষতের দাগ নেই মানে সব ঠিকঠাক। একজন নারী পরিবার ও সমাজ থেকে যত রকম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়, সেসবের অধিকাংশই তো দৃশ্যমান চিহ্নবিহীন। আমাদের নায়িকা ‘মিডল সিস্টার’ যে শহরে বসবাস করে সেখানে বিশ্বাস করা হয়—চিহ্ন যেহেতু নাই, নির্যাতনও নাই। এবং পুরো শহরটা কানকথায় সরগরম। একে অন্যকে নিয়ে কেচ্ছাকাহিনী ও কুৎসা ছড়ানো ও সেসবে আড্ডা গরম করাটা শহরবাসীগণের অন্যতম কাজ।

এইসবের মধ্য দিয়েই উঠে আসে রহস্যময় মিল্কম্যানের জীবন, ক্ষমতার অপ-ব্যবহার, ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের অসহায় আত্মসমর্পণ আর পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন বুক লাভার মিডল সিস্টারের অন্ধকার থেকে মুক্তির সংগ্রাম। সে সংগ্রাম করে কি না এটাও বলা যায় না, সে আসলে তার গল্পটা বলে যায়। 

এ কাহিনীতে ‘দা ট্রাবলের’ বিশেষ কোনো ধারাবর্ণনা নেই, ঐতিহাসিক ইভেন্ট নিয়ে যেমন নেই মিডল সিস্টারের কোনো আগ্রহ, তার না জানাটা দারুণ কুশলীভাবে পাঠকেরও না জানা হয়ে থাকে।
এই দিকটা আমার কাছে দারুণ লেগেছে।

ঐতিহাসিক উপন্যাস মানেই যে মূল চরিত্রকে এনসাইক্লোপেডিক হবে, তা তো না। মিল্কম্যানের নায়িকা এক নির্যাতিতা যুবতী, তার জ্ঞানের জগত ক্লাসিক উপন্যাসে সীমিত, চলমান পৃথিবী নিয়ে তার ধারণা বা আগ্রহ দুটোই সামান্য। সে জানে একটা সংঘাত চলছে দেশে, এটুকুই আমাদের জানায় যে সেটা “দা ট্রাবল”, সে তাই আমাদের শোনায় মানব জীবনের অদৃশ্যমান, প্রমাণহীন সঙ্ঘাতের গল্প, যা আরো অন্ধকার, অধিক বিধ্বংসী।  

৪.

সময়টা গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকে মনে করছেন, নিজেরা ভুক্তভোগী কিন্তু বলা যায় না এমন গোপন সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারীরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন আজকের পৃথিবীতে। মি টু মুভমেন্টের এই সময়ে বিস্ময়করভাবেই মিল্কম্যান খুব প্রাসঙ্গিক একটা উপন্যাস।

এজন্যই কি বইটা পুরস্কৃত হলো?

এ মুভমেন্ট কত লম্বা হবে, সেটা নিয়ে কারো ধারণা নেই। কিন্তু, বুকার কমিটি বা সমালোচকদের সন্দেহ নেই যে মিল্কম্যান ট্রু লিটারারি পিস। তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবার যোগ্য।

এ বই কোন দিক থেকে বৈশ্বিক? আমি বলেছি আগে। আশা করি, আপনিও বুঝতে পারছেন। পৃথিবীটা এখনো মোড়লতান্ত্রিকই আছে। নারীরা এখনো নির্যাতিত হচ্ছেন পৃথিবীর সকল দেশেই। মিল্কম্যান উপন্যাসটিকে সে অর্থে এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটা শক্ত কণ্ঠ হিসেবে ধরে নেওয়া চলে।

৫.

বিষয়বস্তু গেল, পড়তে কেমন আনা বার্ন্সের গদ্য?

লেখিকার সাক্ষাৎকার থেকে যা জানলাম, মিল্কম্যানে মিশে আছে তার আত্মজৈবনিক উপাদান। তিনি নিজে যে সমাজ থেকে উঠে এসেছেন, তা ছিল অপরাধ, অবিশ্বাস আর বিকৃতিতে সয়লাব। মিল্কম্যানে সেই সমাজে নারীর অস্তিত্বের গল্পই তিনি করতে চেয়েছেন।

যতটা পড়বার সুযোগ হয়েছে, এ উপন্যাস একই সঙ্গে আকর্ষণীয় এর গদ্যের জন্য, আবার অনাকর্ষণীয় সেই সুন্দর গদ্যের বিরামহীনতার কারণেই। দম নেবার ফুরসত নেই। যেন ঔপন্যাসিক চাইছেন মূল চরিত্রের যে অস্থিরতা, জীবনের প্রতি অনাগ্রহ, ভয় ও বিরক্তি—সেসব অভিজ্ঞতা পাঠকও পাক, কাহিনী তো আছেই, গদ্যেও বা ওসব পাইয়ে দেবার প্রচেষ্টা বাদ থাকবে কেন?

সুতরাং, সহজপাঠ্য নয় মিল্কম্যান।

মনোযোগী পাঠের দুর্গম উপকূল পাড়ি দিয়েই পাঠককে নতুন কোনো অনুভূতির মুখোমুখি হতে হবে। সেটাই অনুমান।

৬.

ঔপন্যাসিক হিসেবে আনা বার্ন্সের যাত্রাটা কখনো মসৃণ ছিল না। এর আগে তার দুটি উপন্যাসের (নো বোনস - ২০০১, লিটল কন্সট্রাকশন - ২০০৭) ও একটি নভেলার (মোস্টলি হিরো - ২০১৪) কোনোটাই সেভাবে পাঠকের মনোযোগ পায়নি। তবে প্রথম উপন্যাসটি ক্রিটিকালি সফল হয়েছিল, জিতেছিল উইনিফ্রেড হলবাই মেমোরিয়াল প্রাইজ (নাম শুনেছেন আগে? আমিও শুনিনাই)।

বুকারে শর্টলিস্টেড হবার আগে মিল্কম্যানও সেভাবে কারো মনোযোগ কাড়েনি। সেজন্যেই হয়তো, একদম অপ্রত্যাশিত এই পদক ও অর্থ হাতে ৫৬ বছর বয়সী গ্ল্যামারহীন লেখিকা আপ্লুত হওয়া ছাড়া আর কিছু করবার সুযোগ পাননি।
আর্থিক সঙ্কটে ছিলেন তিনি। ডুবে ছিলেন ঋণে। পুরস্কারের অর্থমূল্য পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশি টাকায় ৫৩ লাখের মতো) তার দারুণ কাজে লাগবে, অকপটে বলেছেন, ঋণদাতারা তার জন্য অপেক্ষা করে আছেন।

কিন্তু, বুকার কমিটির এ ব্যতিক্রমী পছন্দ কি বইয়ের বাজারে অন্যান্য বারের মতোই ঝড় তুলবে? বেস্ট সেলার হবার উপাদান কি আছে মিল্কম্যানে? অবশ্য নেম অব দা রোজের মতো দুষ্পাঠ্য উপন্যাসও বেস্ট সেলার যেহেতু হতে পারে, আনা বার্ন্সের সম্ভাবনা কম ভাবার কারণ নেই। এমন একদল লোক তার মাঝে সাহিত্যের মৌলিক উপাদান আবিষ্কার করেছে, যারা পর্যাপ্ত গ্ল্যামারেরও যোগানদাতা।

এমনটা খুব অল্পই ঘটতে পারে আজকের পৃথিবীতে। প্রায় অজ্ঞাত এক ঔপন্যাসিককে এভাবে আবিষ্কার করতে পারাটা বুকার কমিটির জন্য বড় অর্জন।

হয়তো বিশ্বসাহিত্যে আরো অনেক উপন্যাসের বিখ্যাত সূচনা বাক্যের সঙ্গে যোগ হতে চলেছে মিল্কম্যানের এই অসাধারণ বাক্যটিও:  The day Somebody McSomebody put a gun to my breast and called me a cat and threatened to shoot me was the same day the milkman died.   

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;