আনা বার্ন্স কে?



এনামুল রেজা
আনা বার্ন্স

আনা বার্ন্স

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

..আনা বার্ন্স ম্যান বুকার জিতেছেন। আগেই কিছুটা অনুমান করেছিলাম। বিশ্বসাহিত্যে ফ্যান্টাসি আর ডিস্টোপিয়ার এই রমরমায় রিয়েলিস্ট ঘরাণার কাউকে খুঁজতোই কমিটি। মাস খানেক আগে এক লেখক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল এ নিয়ে।

এবার কে জিতবে?

সবচেয়ে কমবয়সি হিসেবে ডেইজি জনসন?

প্রায় সমবয়সী ওই ব্রিটিশ লেখিকা পেয়ে যেতে পারেন, এরকম অনুমান বহু পশ্চিমা পাঠক-পাঠিকা ও পত্রিকা সম্পাদকদেরও ছিল। তার উপন্যাসের নাম এভরিথিং আন্ডার। কিন্তু, বললাম, হোক না ইডিপাসকে নারী হিসেবে কল্পনা করে পৌরাণিক কাহিনীটির রিটেলিং দারুণ ব্যাপার, আমার বাজি আনা বার্ন্সের ওপর। 

এ কে?

উত্তর আয়ারল্যান্ডের লেখিকা। অন্য জিনিসি। তার লেখা ডিপ, এনগেজিং, সোশাল এওয়ারনেসে ভরপুর, বুদ্ধিদীপ্ত। কিছুটা ট্র্যাডিশনাল, অনুচ্ছেদহীন লং প্রোজে লেখেন।

বন্ধু শুকনো মুখে জবাব দিল, ‘আচ্ছা আচ্ছা।’

আমার অনুমানশক্তি ভালো, এই যে বিকল্প সাহিত্য নোবেল দেওয়া হলো এক বছরের জন্য, মুরাকামি পুরস্কার ঘোষণার আগে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিলেন, এসব কি আর বুঝিনি? মনে করে দেখো, এমন কিছু একটা তোমাকে বলেছিলাম না? এমনকি নমিনিদের শর্টলিস্ট প্রকাশ হবার আগেই ভেবেছিলাম, মুরাকামিকে নিশ্চয় এবার..

বেশ। এবার একটু দম নেওয়া যাক। 

২০১৮ সনের বুকার পুরস্কার ঘোষণার পর উপরের অনুচ্ছেদের মতো কোনো কিছু আপনার পড়ার সুযোগ ঘটেছে বাংলাদেশি পত্র-পত্রিকায়? আমি কিছুটা নিশ্চিত যে ঘটেনি, কারণ আমারও মেলেনি সুযোগ।
আনা বার্ন্স কে? বলা নেই, কওয়া নেই, আনকোরা এক লেখিকাকে বুকার কমিটি মিষ্টি দিয়ে দিল!

২.

সাহিত্যের রাজনীতি নিয়ে অনেক কচকচি করা যেতে পারে এ ধরনের রচনায়। বুকার কারা দেয়, কেন দেয়। বুকার পেলে কী হয়। কী কী হিসেব কষমান থাকে একটা বইকে নির্বাচন করবার আগে। এসব আলাপ প্রতি বছরই পড়ি আমরা দৈনিক পত্রিকা বা ওয়েব ম্যাগাজিনগুলোতে। পড়ি আর ভুলে যাই, পরের বছরের জন্য অপেক্ষা করি। একেবারে প্রতি শীতে দুস্থ লোকজন যেভাবে শীতের কাপড়ের জন্য অপেক্ষা করে, শীত গেলে কাপড়টা আর সংরক্ষণ করে না, নতুন বছরে ফের তো মিলবে।

নিবন্ধ রচয়িতারও শ্রম নেই। একই ফর্মা, খালি বিজয়ীর নাম, বইয়ের সারসংক্ষেপ আর দিন তারিখ বদলে দিলেই হলো।

তো, এ বছর আমি ভেবেছিলাম, একটু ব্যতিক্রম হবে। বুকার কমিটি যাকে নির্বাচন করেছে, একদম আনকোরা ঔপন্যাসিক। আনা বার্ন্স নামটা শুনলেই বারবার জুলিয়ান বার্নসের কথা মনে পড়ে। ২০১২ সালে ওই বার্নসও (জুলিয়ান) বুকার পেয়েছিলেন, তিনি আগে থেকেই ছিলেন বিখ্যাত লেখক।

এই বার্ন্সকে (আনা) প্রথম সাক্ষাতেই আমার অপছন্দ হয়ে গেল।

পুরস্কার পেয়ে বোকা বোকা হাসছেন। ফ্যাকাশে একজন প্রৌঢ়া। গ্ল্যামারহীন। হালের পশ্চিমা লেখিকারা প্রায় নায়িকাদের মতো সুন্দরী, সে তুলনায় এনাকে পছন্দ করার কোনো কারণ দৃশ্যমান নাই। উপরন্তু, আনার পেছনে এক হাতে থাবা দিয়ে স্মারক এওয়ার্ডটা ধরে আছেন তারচেয়ে আধহাত লম্বা ডাচেস অব কর্নওয়াল। ছবিটাও অপছন্দ করার মতো।  

যাই হোক, আমরা জানি যে, সত্যিকার লেখকের পারফর্মেন্স আর্টিস্ট না হলেও চলে, লেখাই আসল, ট্রু লিটারেচার নিজে থেকেই তার পথ করে নেয়—ইত্যাদি ইত্যাদি।
মিল্কম্যান (২০১৮) বা আনা বার্ন্সের নাম আরো অনেক সাহিত্য রসিকের মতো আমিও শুনিনি আগে। পরেও খুঁজে পেতে তার সম্পর্কে বিস্তর কিছু জানা গেল না। জানা গেলেও বা কী। চিনি না জানি না, এরকম একজন লেখককে হুট করে

কোন আগ্রহে খুঁজব? বইয়ের শেষ আছে? বুক শেলফ ভরে আছে অপঠিত বইয়ে। 

এ প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়েই বুকারের গুরুত্ব সামনে চলে আসলো।

উত্থানের পর থেকেই বুকার পুরস্কার এক ধরনের বুস্টার হিসেবে কাজ করে আসছে লেখকদের জন্য। তুলনামূলক তথ্য উপাত্ত বের করলে দেখা যাবে, নোবেল পুরস্কারও কোনো লেখকের বই বিক্রি এতটা বাড়িয়ে দেয় না যতটা বুকার দেয়। কোনো লেখকের বুকার পাওয়া মানেই উত্তর আমেরিকা, ব্রিটেন ও পৃথিবীর প্রায় সবখানে তার উপন্যাসটা হটকেকের মতো বিক্রি হওয়া। লেখক রাতারাতি সেলিব্রেটি বনে যান। বিশেষ করে একবিংশ শতকে এই পরিসংখ্যান দারুণ উর্ধ্বগামী।

একটু গভীর বইপ্রেমিরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, ঢাকার নীলক্ষেতেও কী রকম কয়েক হাজার বিক্রি হয়ে যায় বুকারজয়ী বইয়ের নীলক্ষেত কপি। পড়া হয় কী হয় না, সে আলাপের সঙ্গে বই বিক্রির সম্পর্ক সামান্যই।
মানুষ গ্ল্যামার খায়। বুকার হলো বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে বড় গ্ল্যামারের মুকুট।

সুতরাং, আমি না চিনেও হতাশ হইনি, ভেবেছিলাম, গেলবারের জর্জ সন্ডার্সের মতন এ বছরেও আনা বার্ন্স আনা বার্ন্স করে সকল দেশীয় পত্রিকা, ওয়েব ম্যাগ, আর ফেসবুকের নিউজফিড মশগুল হয়ে উঠবে। তা হলো না। দৈনিকগুলোতে বিদেশি নিউজ থেকে অনুদিত কিছু রিপোর্ট ছাড়া মিল্কম্যান নিয়ে উচ্ছাস কোথাও দেখিনি।

প্রথমত, বার্ন্স প্রসঙ্গে পশ্চিমা পাঠক-সম্পাদক গোষ্ঠীও কিছুটা হতাশা মিশ্রিত বিস্ময়ে ভুগছেন। দ্বিতীয়ত, উপন্যাসটা এখনো প্রকাশিত হয়নি আমেরিকায়। মূল হৈচৈটা তারাই করে থাকে। তৃতীয়ত, আনা বার্ন্স গ্ল্যামারহীন, তার ট্র্যাক রেকর্ড এখনো অস্পষ্ট। যেহেতু আমরা কগনিটিভ বায়াসে (শব্দটা নতুন শিখেছি, ঝেড়ে দিলাম) ভুগি, যাকে অন্যরা ভালো বলছে না বা ভালো কি না ওভাবে শোনা যাচ্ছে না, তার বিষয়ে না বলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

৩.

এই অংশটা, অর্থাৎ মিল্কম্যান কী নিয়ে লেখা গুগল করলেই আগ্রহীরা পেয়ে যাবেন। তবু গুগল করতে যারা চান না, তাদের জন্য এই অনুচ্ছেদ:  
উইকিতে লেখা হয়েছে, উত্তর আয়ারল্যান্ডে ১৯৬০ থেকে ১৯৯৮ সন পর্যন্ত যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাত চলেছিল তাকেই ‘দা ট্রাবল’ (যেন দুনিয়াতে আর কোনো ট্রাবল নাই) বলে, মিল্কমানের সেটাপ তার শেষ দিকে, অর্থাৎ ১৯৯০ সনের এদিকে ওদিকে। উপন্যাসের নায়িকা ‘মিডল সিস্টার’—এ ছাড়া তার আর কোনো নাম পাওয়া যায় না, মূলত কোনো কিছুরই নাম পাওয়া যায় না সেভাবে। ১৮ বছরের এ তরুণী আমার মতোই বই লাভার। সে ক্লাসিক পড়তে ভালোবাসে। বর্তমান তার পছন্দ নয় বলেই ক্লাসিক তাকে টানে। কিন্তু আসলে দেখা যায়, সে এক যুবককেও ভালোবাসে। কিন্তু, সে এমন একটা সমাজে বসবাস করে, যেখানে মেয়েদের পক্ষে উল্লেখযোগ্য বা বিশেষ যে কোনো কাজ করাটা বিপদজনক। কেউ তেমন কিছু করলেই শহরের আর সবার আলাপের বস্তু হয়ে উঠতে হয়। আমাদের নায়িকা এজন্যই তার প্রেমিককে গোপন করে রাখতে খুব সতর্ক। এমনকি নিজের মা’কেও সে কিছু জানায় না। এইসব সতর্ক দিনেই মিল্কম্যানের বদনজরে পড়ে সে। মিল্কম্যান এক প্যারামিলিটারি লিডার। উপন্যাসের অনামা শহরে সে সর্বেসর্বা। সমাজটাও ঘোর মোড়লতান্ত্রিক (একেবারে গ্রামবাংলা টাইপ মনে হয়)। মিল্কম্যান জোর করেই আমাদের নায়িকাকে বিয়ে করে, যে তার চেয়ে বয়সে কয়েক গুণ বড় এবং হুমকি দেয়, টেরিবেরি করলে সে মিডল সিস্টারের প্রেমিককে খুন করে ফেলবে|

সহজ গুগলিং করা অনুচ্ছেদ শেষ হলো। এবার ডিপ গুগলিং ও মনের কথা। এ অনুচ্ছেদ থেকে আমি আবার আগের মতো স্বাধীন:
ধর্মীয় গোঁড়ামিতে পরিপূর্ণ যে কোনো দেশের প্রেক্ষাপটেই হয়তো আনা বার্ন্সের মিল্কম্যানকে ফেলে দেওয়া যাবে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের এমন এক সমাজের গল্প এই উপন্যাসে করা হয়, যেখানে মেয়েরা সমাজের চাপা পড়া অংশ। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নেই। এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার চেয়ে কোনো একক ব্যক্তি আর সকলের ওপর ক্ষমতাশীল। এতে কারো তেমন মাথাব্যথাও নেই। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয়টা হচ্ছে, কেউ যদি বলে সে নির্যাতিত, নির্যাতনের চিহ্ন তাকে দেখাতে হবে। শরীরে ক্ষতের দাগ নেই মানে সব ঠিকঠাক। একজন নারী পরিবার ও সমাজ থেকে যত রকম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়, সেসবের অধিকাংশই তো দৃশ্যমান চিহ্নবিহীন। আমাদের নায়িকা ‘মিডল সিস্টার’ যে শহরে বসবাস করে সেখানে বিশ্বাস করা হয়—চিহ্ন যেহেতু নাই, নির্যাতনও নাই। এবং পুরো শহরটা কানকথায় সরগরম। একে অন্যকে নিয়ে কেচ্ছাকাহিনী ও কুৎসা ছড়ানো ও সেসবে আড্ডা গরম করাটা শহরবাসীগণের অন্যতম কাজ।

এইসবের মধ্য দিয়েই উঠে আসে রহস্যময় মিল্কম্যানের জীবন, ক্ষমতার অপ-ব্যবহার, ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের অসহায় আত্মসমর্পণ আর পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন বুক লাভার মিডল সিস্টারের অন্ধকার থেকে মুক্তির সংগ্রাম। সে সংগ্রাম করে কি না এটাও বলা যায় না, সে আসলে তার গল্পটা বলে যায়। 

এ কাহিনীতে ‘দা ট্রাবলের’ বিশেষ কোনো ধারাবর্ণনা নেই, ঐতিহাসিক ইভেন্ট নিয়ে যেমন নেই মিডল সিস্টারের কোনো আগ্রহ, তার না জানাটা দারুণ কুশলীভাবে পাঠকেরও না জানা হয়ে থাকে।
এই দিকটা আমার কাছে দারুণ লেগেছে।

ঐতিহাসিক উপন্যাস মানেই যে মূল চরিত্রকে এনসাইক্লোপেডিক হবে, তা তো না। মিল্কম্যানের নায়িকা এক নির্যাতিতা যুবতী, তার জ্ঞানের জগত ক্লাসিক উপন্যাসে সীমিত, চলমান পৃথিবী নিয়ে তার ধারণা বা আগ্রহ দুটোই সামান্য। সে জানে একটা সংঘাত চলছে দেশে, এটুকুই আমাদের জানায় যে সেটা “দা ট্রাবল”, সে তাই আমাদের শোনায় মানব জীবনের অদৃশ্যমান, প্রমাণহীন সঙ্ঘাতের গল্প, যা আরো অন্ধকার, অধিক বিধ্বংসী।  

৪.

সময়টা গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকে মনে করছেন, নিজেরা ভুক্তভোগী কিন্তু বলা যায় না এমন গোপন সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারীরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন আজকের পৃথিবীতে। মি টু মুভমেন্টের এই সময়ে বিস্ময়করভাবেই মিল্কম্যান খুব প্রাসঙ্গিক একটা উপন্যাস।

এজন্যই কি বইটা পুরস্কৃত হলো?

এ মুভমেন্ট কত লম্বা হবে, সেটা নিয়ে কারো ধারণা নেই। কিন্তু, বুকার কমিটি বা সমালোচকদের সন্দেহ নেই যে মিল্কম্যান ট্রু লিটারারি পিস। তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবার যোগ্য।

এ বই কোন দিক থেকে বৈশ্বিক? আমি বলেছি আগে। আশা করি, আপনিও বুঝতে পারছেন। পৃথিবীটা এখনো মোড়লতান্ত্রিকই আছে। নারীরা এখনো নির্যাতিত হচ্ছেন পৃথিবীর সকল দেশেই। মিল্কম্যান উপন্যাসটিকে সে অর্থে এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটা শক্ত কণ্ঠ হিসেবে ধরে নেওয়া চলে।

৫.

বিষয়বস্তু গেল, পড়তে কেমন আনা বার্ন্সের গদ্য?

লেখিকার সাক্ষাৎকার থেকে যা জানলাম, মিল্কম্যানে মিশে আছে তার আত্মজৈবনিক উপাদান। তিনি নিজে যে সমাজ থেকে উঠে এসেছেন, তা ছিল অপরাধ, অবিশ্বাস আর বিকৃতিতে সয়লাব। মিল্কম্যানে সেই সমাজে নারীর অস্তিত্বের গল্পই তিনি করতে চেয়েছেন।

যতটা পড়বার সুযোগ হয়েছে, এ উপন্যাস একই সঙ্গে আকর্ষণীয় এর গদ্যের জন্য, আবার অনাকর্ষণীয় সেই সুন্দর গদ্যের বিরামহীনতার কারণেই। দম নেবার ফুরসত নেই। যেন ঔপন্যাসিক চাইছেন মূল চরিত্রের যে অস্থিরতা, জীবনের প্রতি অনাগ্রহ, ভয় ও বিরক্তি—সেসব অভিজ্ঞতা পাঠকও পাক, কাহিনী তো আছেই, গদ্যেও বা ওসব পাইয়ে দেবার প্রচেষ্টা বাদ থাকবে কেন?

সুতরাং, সহজপাঠ্য নয় মিল্কম্যান।

মনোযোগী পাঠের দুর্গম উপকূল পাড়ি দিয়েই পাঠককে নতুন কোনো অনুভূতির মুখোমুখি হতে হবে। সেটাই অনুমান।

৬.

ঔপন্যাসিক হিসেবে আনা বার্ন্সের যাত্রাটা কখনো মসৃণ ছিল না। এর আগে তার দুটি উপন্যাসের (নো বোনস - ২০০১, লিটল কন্সট্রাকশন - ২০০৭) ও একটি নভেলার (মোস্টলি হিরো - ২০১৪) কোনোটাই সেভাবে পাঠকের মনোযোগ পায়নি। তবে প্রথম উপন্যাসটি ক্রিটিকালি সফল হয়েছিল, জিতেছিল উইনিফ্রেড হলবাই মেমোরিয়াল প্রাইজ (নাম শুনেছেন আগে? আমিও শুনিনাই)।

বুকারে শর্টলিস্টেড হবার আগে মিল্কম্যানও সেভাবে কারো মনোযোগ কাড়েনি। সেজন্যেই হয়তো, একদম অপ্রত্যাশিত এই পদক ও অর্থ হাতে ৫৬ বছর বয়সী গ্ল্যামারহীন লেখিকা আপ্লুত হওয়া ছাড়া আর কিছু করবার সুযোগ পাননি।
আর্থিক সঙ্কটে ছিলেন তিনি। ডুবে ছিলেন ঋণে। পুরস্কারের অর্থমূল্য পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশি টাকায় ৫৩ লাখের মতো) তার দারুণ কাজে লাগবে, অকপটে বলেছেন, ঋণদাতারা তার জন্য অপেক্ষা করে আছেন।

কিন্তু, বুকার কমিটির এ ব্যতিক্রমী পছন্দ কি বইয়ের বাজারে অন্যান্য বারের মতোই ঝড় তুলবে? বেস্ট সেলার হবার উপাদান কি আছে মিল্কম্যানে? অবশ্য নেম অব দা রোজের মতো দুষ্পাঠ্য উপন্যাসও বেস্ট সেলার যেহেতু হতে পারে, আনা বার্ন্সের সম্ভাবনা কম ভাবার কারণ নেই। এমন একদল লোক তার মাঝে সাহিত্যের মৌলিক উপাদান আবিষ্কার করেছে, যারা পর্যাপ্ত গ্ল্যামারেরও যোগানদাতা।

এমনটা খুব অল্পই ঘটতে পারে আজকের পৃথিবীতে। প্রায় অজ্ঞাত এক ঔপন্যাসিককে এভাবে আবিষ্কার করতে পারাটা বুকার কমিটির জন্য বড় অর্জন।

হয়তো বিশ্বসাহিত্যে আরো অনেক উপন্যাসের বিখ্যাত সূচনা বাক্যের সঙ্গে যোগ হতে চলেছে মিল্কম্যানের এই অসাধারণ বাক্যটিও:  The day Somebody McSomebody put a gun to my breast and called me a cat and threatened to shoot me was the same day the milkman died.   

পার্বত্য চট্টগ্রাম 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ' গ্রন্থের প্রিঅর্ডার রকমারি'তে



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

  • Font increase
  • Font Decrease

 

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের। এক বছরের মাঠ পর্যায়ের নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে গ্রন্থটি, যার প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে রকমারি.কম-এ। গ্রন্থটির লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বার্তা২৪.কম-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর ড. মাহফুজ পারভেজ।

গ্রন্থ সম্পর্কে লেখক ড. মাহফুজ পারভেজ জানান, বাঙালিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আবাসস্থল পার্বত্য চট্টগ্রাম আয়তনে বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ হলেও এমন বৈচিত্র্যময় অঞ্চল পৃথিবীতে খুব কমই আছে, যেখানে এতোগুলো জনজাতি জড়াজড়ি করে একসঙ্গে রয়েছে অনেক বছর ধরে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিঃসন্দেহে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহ্যগত অঞ্চল।

চিরায়তভাবে শান্তিপূর্ণ অঞ্চলটি একসময় অশান্ত হয়ে উঠেছিল। অনেক রক্তপাত ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পর অবশেষে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের উদার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। সশস্ত্র বিদ্রোহী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে অস্ত্র সমর্পণ করেছেন। বাস্তুচ্যুৎ ও শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অশান্ত পার্বত্যাঞ্চলে নিশ্চিত হয়েছে জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন, জনঅংশগ্রহণ ও স্থিতিশীলতা, যা দুইযুগ স্পর্শ করেছে ২০২১ সালে।

ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, শান্তিচুক্তির দুইযুগের অভিজ্ঞতায় শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের গতিবেগে সমগ্র পার্বত্য জনপদ ও বাসিন্দারা মুখরিত হলেও সেখানে নানা কারণে সঙ্কটের আগুন ধূমায়িত হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস, নাশকতা, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজি, অপহরণ প্রভৃতি সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জনজীবনের শান্তি বিঘ্নিত করার মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো ঘটনা ঘটছে মহল বিশেষের উস্কানি ও অপতৎপরতায়। ফলে মাঝে মধ্যেই উত্তপ্ত ও অস্থির পার্বত্যাঞ্চলে কখনো কখনো শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ইতিবাচক অর্জনসমূহ বিনষ্টের অপচেষ্টা চলছে।

তাই নিবিড় গবেষণার আওতায় এনে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে চলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্জনসমূহ পর্যালোচনা এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো শনাক্তকরণ ও সমাধানের রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ।

১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি প্রণীত হওয়ার পর প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি’ (১৯৯৯) প্রকাশ করেন বর্তমান লেখক-গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ। ২০০০ সালে লেখকের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানবাধিকার’ বিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড এন্থ্রোপলজি। ২০০৩ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) উন্নয়ন পরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে সামাজিক বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত থাকেন লেখক। তিনি ২০০৬ সালে সফল ভাবে সম্পন্ন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত ও শান্তি বিষয়ক পিএইচডি গবেষণা। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরেকটি গবেষণা পরিচালনা করেন তিনি। দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতায় ‘শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রামÑবিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা’ শীর্ষক অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ উত্তরণ ও অর্জনের পথে বিদ্যমান সমস্যাগুলো ও এর সমাধান তুলে ধরা হয়েছে, যা সমাজ, রাজনীতি, জাতিগত চর্চা, শান্তি ও সংঘাত বিষয়ক অধ্যয়ন এবং নীতিপ্রণেতাদের কাজে লাগার পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের আগ্রহ মিটাবে বলে গবেষক মনে করেন।

গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ (জন্ম: ৮ মার্চ ১৯৬৬, কিশোরগঞ্জ শহর)-এর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: গবেষণা-প্রবন্ধ: বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি; দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো; দ্বিশত জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর; প্রকাশনা শিল্প, স্টুডেন্ট ওয়েজ, মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ। উপন্যাস: পার্টিশনস; নীল উড়াল। ভ্রমণ: রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে। গল্প: ইতিহাসবিদ; ন্যানো ভালোবাসা ও অন্যান্য গল্প; বুড়ো ব্রহ্মপুত্র। কবিতা: মানব বংশের অলংকার; আমার সামনে নেই মহুয়ার বন; গন্ধর্বের অভিশাপ। অগ্রসর ও জনপ্রিয় মাল্টিমিডিয়া নিউজ পোর্টাল বার্তা২৪.কম-এর প্রকাশিত হচ্ছে তার নতুন উপন্যাস 'রংধনু', যা অচিরেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ রচিত 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' গ্রন্থ প্রিঅর্ডার করা যাবে রকমারি.কম-এর লিংকে

;

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১



মাহফুজ পারভেজ
ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

আমেরিকার নামজাদা এই ক্যাম্পাস সিটিতে ভর্তি হয়ে যারা পড়তে এসেছে, তারা কেউ জীবনে নিজের চোখে রংধনু দেখে নি। এক উইকঅ্যান্ডে হাউস টিচার ম্যারি মার্গারেট নিকটবর্তী এক ঝর্ণার পাশে উপত্যকায় শিক্ষার্থী দলটিকে নিয়ে ঘুরতে গিয়ে তথ্যটি জানতে পারেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সবাই একটু বিষণ্ণভাবে অসম্মতিতে মাথা নাড়ায়। শিক্ষার্থীদের কেউ নবাগত ফরাসি, কেউ অভিবাসী ইহুদি, কয়েকজন মধ্যপ্রাচ্যের রিফিউজি। সবাই বড় হয়েছে নাগরিক ঘেরাটোপে ও জাগতিক কোলাহলে। সবার উত্তরের মর্মার্থ হলো, “সত্যি রংধনু তো দেখিনি কখনও! স্টিল ছবি দেখেছি। আর কখনো কখনো ইউটিউবে ক্লিপ।”

ম্যারি বাচ্চাদের দোষ দেন না। কত কষ্ট করে প্রতিযোগিতায় টিকে ওরা পড়তে এসেছে বিশ্বের লিডিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। অভিভাবকদের জীবন-সংগ্রামের সমান্তরালের কঠিন পরিস্থিতিতে বইপত্র নিয়ে পড়াশুনার সময় পেয়েছে ছেলেমেয়েগুলো। বাইরের প্রকৃতি ও পরিবেশের দিকে তাকানোর ফুসরত পেয়েছে কমই। তাছাড়া প্রকৃতির নানা দিক ওরা দেখবেই-বা কী করে? এই পোড়া পৃথিবীতে কি আর আকাশ আছে? সবুজ আছে? রক্ষা পাচ্ছে প্রাণ ও জীববৈচিত্র্য? নিজের মনে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করে ম্যারি রাচ্চাদের দোষ দিতে পারেন না।  

ম্যারি খেয়াল করেন, রংধনু দেখতে না পারার জন্য কেউই বিশেষ দুঃখিত নয়। তবু তিনি রেইনবো ইস্যুটি তাদের মগজের ভাঁজে রাখতে চান। তিনি জানেন, প্রকৃতি ও নিসর্গের নানা প্রপঞ্চ দেখার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের ইমাজিনেশন ও ভিজ্যুয়াল পাওয়ার বাড়াবে। তিনি সবাইকে কাছে ডেকে আনেন। কথা দেন একদিন রংধনু দেখাবেন। “একটা মজার বিষয় জেনো রাখো। রংধনুর শুরু আর শেষ দেখা যায় না, সেগুলো থাকে বাড়ি কিংবা গাছের আড়ালে। মনে থাকবে?” ম্যারির প্রশ্নে সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। 

শেষ বিকেলে ফিরে আসার পর নিজের ঘরের জানালা দিয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকেন ম্যারি। এই সামারে দিন অনেক বড়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও আকাশ স্বচ্ছ। তিনি জানেন, বর্ষা না এলে রংধনু দেখা অসম্ভব। তবু তিনি যেন আনমনে দিগন্তের কোণে কোণে রংধনু খোঁজেন।

রংধনুর সঙ্গে ম্যারি সম্পর্কটাই বেশ অদ্ভুত। কিছুটা নস্টালজিক আর কিছুটা সুপারন্যাচারাল। নিজের দেশের চেয়ে অনেক বেশি রংধনু তিনি দেখতে পেয়েছেন বিদেশের নানা স্থানে। একবারও প্ল্যান করে রংধনু দেখেন নি তিনি। রংধনু নিজেই নিজের খেয়ালে এসে ধরা দিয়েছে তার চোখে। ম্যারি নিজের ঘরের সীমানা পেরিয়ে চরাচরের আলো-অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে তন্ময় হয়ে থাকেন রংধনুর সাত রঙে।

“খেতে এসো।”

ডাইনিং টেবিল সাজাতে সাজাতে মৃদ্যু কণ্ঠে ডাক দেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা। ধ্যান-ভেঙে ম্যারি জানলার পাশ থেকে ডাইনিং স্পেসে চলে আসেন। মা ছাড়া আর কেউ নেই তার দুনিয়ায়। দিন শেষে মায়ের আশ্রয়ে ম্যারি পুনর্জন্ম লাভ করেন। মায়ের হাত চেপে তিনি একটি চেয়ারে বসেন দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল জীবন পেরিয়ে আসা ষাটের কাছাকাছি বয়সের দ্বারপ্রান্তের এক ক্লান্ত রমণীর মতো। বিবাহ বিচ্ছেদের পর অনেকগুলো বছর একা থাকতে থাকতে যখন অস্থির ও দিশাহীন অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছিলেন ম্যারি, তখনই মা এসে তার পাশে পাহাড়ের মতো অটল আস্থায় দাঁড়ান। সারাদিন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রী আর বাকীটা সময় মা তার জীবনের চৌহদ্দী ও সাহস। অথচ একসময় তারও জীবন ছিল রংধনু রঙে রাঙা, যখন ক্যাভিন ছিল পাশে আর টমাস কোলে। এখন সবাই যার যার জীবনের বিবরে আবদ্ধ। সবাই সবার মতো নিজের কাজে ব্যস্ত। বিশাল আকাশের গভীরে রংধনুর রঙগুলোর মতো লুকিয়ে রয়েছে সবাই। কেউ কারো পাশাপাশি আসতে পারছে না। বৃষ্টি শেষে রংধনুর মতো খানিকক্ষণের জন্যেও দেখা হয় না ম্যারি আর তার জীবনের একদা রঙিন মানুষগুলোর সঙ্গে।    

অন্যমনস্ক ম্যারিকে দেখতে দেখতে মেয়ের মনের মধ্যে চাপা বেদনা টের পান মিসেস অ্যানি গিলবার্ট। চেষ্টা করেন কথা বলে সান্তনা দিতে।

“ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে?”

“না।”

“হবে কেমন করে? যেমন বাপ তেমনই ছেলে। কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।”

মায়ের ক্ষোভ সঙ্গত। তবু সায় দিতে মন মানে না ম্যারির। ক্যাভিন তো এমনই। চরম বোহেমিয়ান। কখন কোথায় থাকবে, সে নিজেও জানে না। বাতাসের ঝাপ্টায় বেসামাল একখণ্ড ভাসমান মেঘের মতো আকাশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোই যেন তার স্বভাব। নিয়তিও তাকে তেমনই ভানিয়ে বেড়াচ্ছে। তবুও ভেসে ভেসেই জীবন তাদেরকে নিয়ে যৌথতায় বেশ চলছিল। ক্যাভিন একদিন বললো, “তুসি স্থিত হও। আমার মতো ঠিকানাবিহীন হলে তোমার চলবে না।” ততদিনে টমান এসে গেছে। ম্যারির মাতৃত্ব ও নারীত্ব একটি স্থায়ী ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রত্যাশা করছিল মনে মনে। ক্যাভিন তার ইচ্ছের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হয়ে বলে, “কিন্তু আমি তো এক জায়গায় স্থির থাকতে পারবো না। তুমি বরং নিজের মতো শুরু করো। আমার শুভেচ্ছা থাকেবে।”

পরদিন ঘুম থেকে উঠে ক্যাভিনের দেখা নেই। নেই মানে নেই। ঘরে নেই, আশেপাশে কোথাও নেই। রাতে বিছানা ঠিক করতে গিয়ে বালিশে চাপা ক্যাভিনের চিঠিটি হাতে আসে ম্যারির। চিঠির ভাষ্য অতি সংক্ষিপ্ত। “প্রকৃত অর্থে সঙ্গে না থেকে তোমাকে আটকে রাখা অনৈতিক। সেপারেশন ইউলে সাইন করে দিলাম। আর ব্যাঙ্কের নমিনি। আশা করি মাঝে মাঝে দেখা ও কথা হবে।”

ম্যারি জানতেন ক্যাভিনের পক্ষে কোনো কিছু করাই অসম্ভব নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজ্জনক সেতুতে ঝুঁলে থাকা, মাঝরাতের অন্ধকারে প্যাসিফিকে সুইমিং করা, হিমালয়ের কোনো গুহায় একাকী কয়েকদিন ধ্যানমগ্ন হওয়া তার কাছে নস্যি। এতো কমিটেড প্রেম, যৌথজীবন, এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে দিব্যি হাওয়া হয়ে গিয়েছে ক্যাভিন। সদ্যজাত পুত্র টমাসের জন্যেও বিন্দুমাত্র পিছুটান অনুভব করে নি লোকটি। রাগে, ক্ষোভে, প্রত্যাখ্যানের অপমানে সারা রাত ঘুমাতে পারে নি ম্যারি। যদিও জানে কোনো ফল হবে না, তবু ছোট্ট ক্যাম্পাস টাউনের আনাচেকানাচে দিনভর ক্যাভিনের খোঁজ করেন ম্যারি। না, তার কোনো খোঁজ নেই। তার গতিবিধির সন্ধানও কেউ জানে না। যদি মন চায়, হয়ত ক্যাভিন নিজেই জানাবে তার হদিস। শত চেষ্টা করেও ম্যারি আর তার কোনো খোঁজ পাবে না। নিজের প্রতিক্রিয়াগুলোও জানাতে পারবে না। ক্যাখিনের খোঁজে ব্যর্থ হয়ে ম্যারি দিন শেষে ঘরে ফিরে আসে চরম হতাশায়। এসেই মনে হয়, পুরো বাড়িটা বড্ড হাহাকার করছে। ঘরগুলো খুবই ফাঁকা আর দমবন্ধ মনে হয় তার। টমাসকে কোলে নিয়ে তিনি চলে আসেন বাড়ির লনে। সাজানো বাগানের মধ্যে একটা লম্বা পাইন ম্যারির খুব প্রিয়। ক্যাভিনকে নিয়ে রাতের পর রাত গল্প করে কাটিয়েছেন তিনি নিঃসঙ্গ পাইনের কাছে। বিচ্ছেদ বেদনা নিয়ে তিনি রাতের অন্ধকারে পাইনের নিচে বসে থাকেন।

রাতের আকাশে রংধনু থাকার কথা নয়। তবু মাঝরাতের দিকে ম্যারির মনে হয় তিনি যেন আবছা আলোয় একটি অস্পষ্ট রংধুন দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তিনি রঙিন আলোর জগতকে ছুঁতে পারছেন না। যন্ত্রণার বুক-চাপা কষ্টে আস্ত একটি রাত নির্ঘুম কেটে যায় তার জীবন থেকে। তিনি অনুভব করেন, প্রিয় মানুষের অভাবে এমন অনেক ঘুমহীন রাত তার জীবনের শূন্যতা পূর্ণ করবে। তার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ ছিন্ন হয়ে যাবে। তিনি বেঁচে থাকবেন ঘুম ও জাগরণের মাঝখানে নিঃসঙ্গ ও একেলা। ঠিক যেন বাগানের সঙ্গীবিহীন পাইন গাছের মতো।   

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস



মো. তাহমিদ হাসান
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস

  • Font increase
  • Font Decrease

 

 বইয়ের নাম: রাইফেল, রোটি, আওরাত

লেখক: আনোয়ার পাশা

প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ

ধরণ: মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস

পৃষ্ঠা: ১৮০ পেজ

পারসোনাল রেটিং কোনো বইয়ের ক্ষেত্রে কখনো দেই না। কলমের কালি যেমন পবিত্র তেমনি বইয়ের অক্ষরও আমার কাছে পবিত্র৷ বইটি পড়ে কারো একঘেয়েমি লাগবে এইটুকু নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি। কিন্তু ইতিহাস-অন্বেষী সিরিয়াস পাঠক অবশ্যই প্রীত হবেন।

শহীদ অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ১৯২৮ সালের ১৫ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি ও কথাসাহিত্যিক। লেখক একাত্তরের কালোরাত্রি ২৫শে মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রক্তাক্ত ছোবল থেকে বেঁচে বের হতে পারলেও একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরে বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী আল বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন।

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রথম উপন্যাস রাইফেল, রোটি, আওরাত। ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে যখন পাকিস্তানের বাহিনী বাংলার ঘুমন্ত মানুষের উপর গুলিবর্ষণ করে, সেই সময়ের জীবন্ত চিত্র লেখক তাঁর বইয়ে তুলে ধরছেন।

সেই কালো রাতের ভয়ানক বর্ণনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে  ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সুদীপ্ত শাহীনের চরিত্রে লেখক নিজকে তুলে ধরছে। "বাংলাদেশে নামল ভোর"- এই উক্তি দিয়ে লেখক উপন্যাসটি শুরু করে। ভয়ানক কালোরাত পেরিয়ে যখন ভোর নামল তখন জানালায় বাইরের অগণিত লাশ দেখে নিজের বেঁচে থাকার অস্তিত্ব দেখে নিজেই বিস্মিত হয়ে যান। আর পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশের স্বাধীন ও লড়াকু আত্মপ্রকাশকে প্রত্যক্ষ করেন অরুণালোকিত ভোরের প্রতীকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল, রোকেয়া হল, শিক্ষকদের বাসভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে নরযজ্ঞ হত্যার বর্ণনা তুলে ধরছেন তিনি মর্মস্পর্শী ভাষায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালিয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ডা. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুর, ডা. ফজলুর রহমান, ডা. মুকতাদিরসহ অসংখ্য শিক্ষকে সেই কালোরাত্রে হত্যার ঘটনাও লেখক তুলে ধরেন।

নরহত্যার পাশাপাশি দোকান, ঘরবাড়ি লুটপাট সহ ঘুমন্ত মানুষের বসতবাড়িতে আগুন লাগানোর ঘটনাও সেই কালোরাত্রির চিত্রে ফুটে উঠে লেখকের কুশলী কলমে। এক স্থানের মানুষ অন্য জায়গাকে নিরাপদ মনে করে অন্যত্র চলে যেতো, কিন্তু পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের উপরই পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ বহমান ছিল। সেই সময়ে কোনো স্থানেই নিরাপদ ছিল না।

ফিরোজ চরিত্রের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তাৎকালীন ভূমিকাগুলো উল্লেখ করছেন তিনি। পঁচিশে মার্চ হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর বাংলার সমগ্র মানুষ নিজের চিন্তার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বেঁচে থাকা নিয়েও শঙ্কায় ছিলেন। লেখক এই উপন্যাসে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তার হওয়ার কারণটিও সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে ধরছেন।

পাকিস্তানি বাহিনীর পাশাপাশি জামায়তে ইসলামী এই বাংলাদেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দিয়েছে। তারা বাঙ্গালী নামক জাতিসত্তার অস্তিত্বকে মিটিয়ে দেওয়ার জন্য যে ছোবল হেনেছিল, তার আখ্যানও উপন্যাসে লেখক সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বের ইতিহাস যদি আজকের প্রজন্ম না জানে তাহলে একসময় নতুন প্রজন্মের কাছে রক্ত দিয়ে কেনা এই দেশ মূল্যহীন হয়ে যাবে৷ ইতিহাসের পাঠক আমাদের নতুন প্রজন্মে অনেকটাই কম, তাই উপন্যাস বা গল্পের মাধ্যমে যখন ইতিহাস ফুটিয়ে তোলা হয়, তখন সেটি পাঠক খুব স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে পাঠ ও আত্মস্থ করে। লেখক আনোয়ার পাশা নিজের সাথে ঘটে যাওয়া কাহিনীগুলোই সুদীপ্ত শাহীন চরিত্র তথা রাইফেল, রোটি, আওরাত বইয়ে তুলে ধরছেন, যা মহান মুক্তিযুদ্ধের এক দীপ্তিময় দলিল।

[ মো. তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ]

;

গ্রন্থ সমালোচনা: ‘আমাদের অর্থে আমাদের পদ্মা সেতু’



প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

এ পর্যন্ত পদ্মা সেতুকে নিয়ে যতগুলো গ্রন্থ বের হয়েছে, তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হচ্ছে: ‘আমাদের অর্থে আমাদের পদ্মা সেতু’। সুসম্পাদিত এ গ্রন্থখানি সম্পাদনা করেছেন বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। গ্রন্থটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুটো ভাষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের ৫১টি প্রবন্ধ রয়েছে। ছড়া-কবিতা রয়েছে দশটি ও গান রয়েছে দুটি। একটি প্রামাণ্য ঘটনাপ্রবাহ রয়েছে। পাশাপাশি চারটি সাক্ষাৎকার রয়েছে এবং অ্যালবামে বেশকিছু দুর্লভ চিত্র রয়েছে।

গ্রন্থখানি ব্যতিক্রমধর্মী হিসেবে পাঠকদের কাছে হৃদয়গ্রাহী হয়ে ধরা দেয়। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে বাঙালি জাতির সৃজনশীল ও ধীশক্তিসম্পন্ন জননেত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অসামান্য নেত্রী। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি পদ্মা সেতু নির্মাণের কারিগর ও স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি বলেছেন যে, ‘বাঙালি জাতি বীরের জাতি। বাঙালি ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে রঞ্জিত হয়েছে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, অনেক রক্তধারায়’ (পৃ: ২৮)।

একটি কথা না বললেই নয়, বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানের সংস্কার প্রয়োজন। যেমন- অভিধান অনুসারে আজকাল উপলক্ষকে লেখা হয় উপলক্ষ্য। জোর দাবি জানাব, বাংলা একাডেমি বাংলা অভিধানের সংস্কার সাধন করা হোক। এ জন্য নতুন করে সংশোধনী কমিটি তৈরি করা উচিত।

এস এ মালেকের প্রবন্ধ ‘ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে স্বপ্নজয়ের পদ্মা সেতু’ অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে। তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে লিখেছেন যে, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্র পরাভূত হয়’ (পৃ: ৪৪)। প্রফেসর আব্দুল খালেকের সময়োপযোগী উচ্চারণ, ‘আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বাঙালির গর্বের আরেকটা নতুন সংযোজন পদ্মা সেতু’ (পৃ: ৫৪)।

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ মন্তব্য করেছেন যে, ‘বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ এবং বাংলার মানুষের মর্যাদা উত্তরোত্তর আরও সমুন্নত হোক’ (পৃ: ৬৮)। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উল্লেখ করেছেন যে, ‘এ দেশ নিজের অর্থায়নে এত বিশাল সেতু নির্মাণ করতে পারলে ধীরে ধীরে আরও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিজ অর্থেই সম্পন্ন করতে পারবে’ (পৃ: ৯২)।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন যথার্থ অর্থে মন্তব্য করেছেন যে, ‘শেখ হাসিনা পুরো বিশ্বকে প্রমাণিত করে দিয়েছেন যে, আমরা জাতি হিসেবে কতটা শক্তিশালী’ (পৃ: ৯৯)। সৈয়দ আবুল হোসেন তার কর্মকাণ্ড এবং তার প্রতি অন্যায় ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, ‘দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে তা ৯ বছর পিছিয়ে গেল’ (পৃ: ১২৮-১২৯)।

ড. শরীফ এনামুল যথার্থ অর্থে উচ্চারণ করেছেন যে, ‘কাজেই এটা প্রমাণিত, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় শেখ হাসিনার বিকল্প নেতৃত্ব মেলা ভার’ (পৃ: ১৭২)। মোশারফ হোসেন ভুইয়ার প্রতি মিথ্যা অভিযোগের কারণে যে হেনস্তা হয়েছে সেটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। ষড়যন্ত্রকারীরা কখনো থেমে থাকে না। তাই তো দেখা যায় যে, সুভাষ সিংহ রায় তার প্রবন্ধে যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, ‘দেশের মানুষ দেখেছে, পদ্মা সেতু নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হয়েছে, বাধা এসেছে; শেষ পর্যন্ত সত্যেরই জয় হয়েছে’ (পৃ: ২৬৪)।

নিজের প্রবন্ধটি সম্পর্কে কোনো মন্তব্যে যাচ্ছি না। কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার কবিতাখানি হৃদয় ছুঁয়েছে- যার থেকে চারটি পঙক্তি পাঠকের উদ্দেশে তুলে ধরি। সোনার দেশে সোনার মানুষ উড়াল সেতু ধরি/ আসা যাওয়ার পথে কুড়ায় সোনার কড়ি/ আলোর দেশে আলোর সেতু হাসছে আঁধার চিরে/ও নদী রে, পদ্মা নদী রে/ (পৃ:৩৪৯)।

সৈয়দ আবুল হোসেনের সাক্ষাৎকারখানি তথ্যবহুল। অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানের একটি সাক্ষাৎকার থাকলে ভালো হতো। অ্যালবামের চিত্রগুলো অত্যন্ত চমৎকার। আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমানের লেখাটিও সুন্দর হয়েছে। জাতি গ্রন্থের সুসম্পাদনার জন্য এ কে আব্দুল মোমেনের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। এ গ্রন্থটির একটি ইংরেজি অনুবাদসহ বিভিন্ন ভাষায় হওয়া উচিত।

পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানের সংস্কার সাধন করা উচিত। কেবল ব্যাকরণনির্ভর অভিধান নয়। নতুন বাংলার নীতিমালা অনেক ক্ষেত্রেই বেমানান। এ বানান বর্তমানে সাধারণ মানুষের কাছে গলার ফাঁস হচ্ছে। অথচ বাংলা একাডেমির বোধোদয় হচ্ছে না।

অভিনন্দন জানাচ্ছি এ পর্যন্ত প্রকাশিত পদ্মা সেতু নিয়ে রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ এ কে আব্দুল মোমেন কর্তৃক রচনা করার জন্য। সাথে সাথে সহযোগী সম্পাদকদ্বয় দেবাশীষ দেব ও ইমদাদুল হককে ধন্যবাদ জানাই। পাশাপাশি সময়োপযোগী গ্রন্থ প্রকাশনার জন্য চন্দ্রাবতী একডেমীকে ধন্যবাদ এবং প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষকে ধন্যবাদ।

আলোচনায় দুটো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা স্মরণ করছি: ঢাকা স্কুল অব ইকোনোমিক্স থেকে ‍উদ্যোক্তা অর্থনীতির ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষিকাদের নিয়ে গত বছরে ফিল্ড ট্রিপে যাই। সেখানে আমরা দেখেছি চমৎকারভাবে পদ্মা সেতুর নির্মাণ প্রক্রিয়া এগিয়ে চলা এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। পরবর্তী সময়ে সরকারের প্রয়াসের একটি গবেষণাপত্র তৈরি করা হয় এবং ঢাকা স্কুল অব ইকোনোমিক্স হাইব্রিড পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়।

আবার চলতি বছরের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে শরীয়তপুরে প্রোগ্রাম থাকায় যেতে গেলে সাড়ে তেরো ঘণ্টা মাওয়া ঘাটে কতিপয় ফেরিঘাট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত লোকদের কারণে আটকে থাকি। এমনকি রাত একটার দিকে ফেরিতে যাওয়ার সিগন্যাল দিলে পার্শ্ববর্তী গাড়িতে এসে ঠিক সন্ত্রাসীর মতো একটি কাভার্ডে এক লোক ঝাঁপিয়ে আমার ভাড়া করা গাড়িতেও থাপ্পড় মারে। আজ পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ায় সেই দুর্নীতিবাজরা তাদের ক্ষমতা দেখাতে পারবে না- যা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইতে হুঁশিয়ার করেছেন। সম্প্রতি আমার প্রিয় নেত্রীও সরকারি চাকুরেদের জনগণের পাশে দাঁড়াতে বলেছেন।

অথচ ১৭ মার্চ ২০২২-এর সকালটি কী অপূর্ব কেটেছিল। এটিএন বাংলায় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে আমার লেখা গানটি প্রচারিত হয়েছিল এবং গ্লোবাল নিউজের প্রথম পাতায় বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে যখন জানালাম হার্টের অসুখের কথা- ভাবলেশহীন হলো, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার একই উক্তি। ধরণী দ্বিধা হও।

আসলে আমাদের উন্নয়নের রূপরেখার মালিক হচ্ছেন শেখ হাসিনা- যিনি সূর্যের আলোর মতো আলোকিত করে চলেছেন। ধন্যবাদ গ্রন্থের সম্পাদক এ কে আব্দুল মোমেনকে। গ্রন্থটি এতই চমৎকার হয়েছে যে, বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়া উচিত। বাংলা একাডেমি কি পারবে এ ধরনের অনুবাদের কাজ করতে? ভুল ও সাধারণ মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধান। জাতীয় প্রতিষ্ঠানের উচিত দেশের মৌখিক ভাষাকে অভিধানে অন্তর্ভুক্ত করা।

একটি সুন্দর গ্রন্থ সম্পাদনা আমাদের মুগ্ধ করেছে। পাঠক হিসাবে হৃদয়কে সমৃদ্ধ করেছে। অভিনন্দন গ্রন্থের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। এটি একটি জাতীয় ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত হবে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয়তু শেখ হাসিনা।

‘আমাদের অর্থে আমাদের পদ্মা সেতু’ গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। প্রকাশক: চন্দ্রাবতী একাডেমী, প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ, প্রকাশকাল: জুলাই, ২০২২, মূল্য: ২০০০ টাকা, পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪০০।

লেখক: সমালোচক: প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী, অর্থনীতিবিদ, কথাশিল্পী, ছড়াকার ও আইটি বিশেষজ্ঞ।

;