মঈনুস সুলতানের গুচ্ছকবিতা

মঈনুস সুলতান
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

হীরক চূর্ণের নীল দ্রবণ

জানি তোমার এ ঘুম ভাঙ্গিবে না—
                        ভাঙ্গিবে না আর কোনো দিন।

শিলালিপির মতো স্থবির তোমার স্মৃতি
দ্যাখো কেমন সবুজ সজীব আজও
মানুষ মুখর ঊর্মির মতো বিস্মৃতি ভালোবাসে বড়ো বেশি,
অথচ তুমি ভোলোনি
মনে হয় ভুলিবে না কোনো দিন
           সেই বৃষ্টিভেজা কাঠের বাড়ি
           টালির ছাদে গিরেবাজ কবুতরের গল্প;
সে কার জড়োয়া কাঁকন রিম ঝিম শব্দে চন্দ্রাহত বিধুর,
প্রত্যাশার আবলুস আন্ধারে আরশিতে আরতির দীপ জ্বালে!

তোমার পদ যুগল পর্যটনে ব্যস্ত
ধমনীতে লাফাচ্ছে রক্তিম উচ্ছ্বাস—
গতি এবং উষ্ণতা যদি জীবনের মর্মকথা হয়
তথাপি হতাহত মৃত তোমার হৃদয়;
তুমি পান করেছো চন্দ্রাহত হীরক চূর্ণের নীল দ্রবণ
মর্মান্তিক গোধূলির অন্তিম আবেগে স্তব্ধ তোমার ভ্রমণ!

জোনাকি, শিশির, শঙ্খে চিত্রিত পৃথিবী অনেক.. ..অনেক দূর
স্নায়ুতে শুক্লপক্ষের প্রগাঢ় তিমির
করতলে পতঙ্গের হরিৎ পাপড়ি, গোলাপের বিষণ্ণ ডানা
তুমি কোথায় যাবে?
কারা আলেয়ার মতো ডাকছে তোমাকে গভীর নিশীথে!
তুমি পান করেছো চন্দ্রাহত হীরকচূর্ণের নীল দ্রবণ.. ..

তোমার করোটিতে কষ্টের হিম স্পর্শ
ঝাউবনের মতো নেশায় গভীর নিসর্গ
মেঘালোকে ডোবা সবুজ পত্ররাজি—
যেন কার দীর্ঘশ্বাস হয়ে বয়ে যায় করুণ বাতাস!

মর্মর পাথরের চোখে নক্ষত্র অগ্নিতে জ্বলে অশ্রুর লাবণ্য
মনে হয় বুঝিবা পাষাণেরও প্রাণ আছে হর্ষ-বিধুর.. ..
তুমি শ্মশাণচারীর মতো নিদ্রাবিমুখ..ঘোর অমানিশায়
জানি তোমার এ ঘুম ভাঙ্গিবে না
                       ভাঙ্গিবে না আর কোনো দিন!

আবহাওয়ার রোজনামচা

সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে—ভেবে চিন্তে তৈরি করা
কাঠের লোহিত বরণে বার্নিশ সেতুটির মতো
রূপালি সলিলে ভাসা নির্ঝর সঙ্গীত,
যার শ্রবণে জোৎস্নার জাফরি গলে আমরা
ফিরে দেখতে পারি—ঐতিহ্যে মোড়া আমাদের অতীত,
মহাশূন্যের প্রতিফলনে ঋদ্ধ বর্ণের সমাহারে
সৃজিত কিছু চিত্র,
অগ্নিকুণ্ড ঘিরে বসার বৈঠকি পরিবেশ
গুল্পগুজব করার মতো কতিপয় মিত্র;

জাহাজ সমুদ্রে নাও ভাসতে পারে
ঝলসাবে না হয়তো সোনালি-নীলাভ আলো বাতিঘরে,
জরুরি হচ্ছে—
আবহাওয়ার রোজনামচা লেখা হররোজ বিশুদ্ধ অক্ষরে।

আগামীর ময়নাতদন্তে উঠে আসবে
সাতটি আগুন পাহাড়ে যুগপৎ বিষ্ফোরণের সংবাদ
ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা গড়বে রাজ্য—বিস্তৃত হবে জ্বালানীর বিবাদ,
কৃষ্ণপক্ষের কৃষ্ণাভ নীলিমায় উৎক্ষিপ্ত হবে
তপ্ত লাভার কমলালেবু রঙের ফানুস,
জরুরি হচ্ছে—জনপদে খোঁজা
রঙধনুর আবিরে সিক্ত মানুষ।

অপরাজিতার নীল রোদে রাগ ভূপালি

আমার পৃথিবী জুড়ে ফুটেছিল একদিন
অজস্র অপরাজিতা—থোকা থোকা নিখাদ নীল,
শিরদাড়া সোজা করে বেরিকেড দিয়েছিলাম
বেঈনসাফের পথ পরিক্রমায়
অসহিষ্ণু শদ্দাদের হুকুম করিনি তামিল।

ছেড়েছি ঘর একদিন, খুঁজেছি নীলিমা
স্নোরক্যাল পরে করোটিতে—
জলতলে ছুঁয়েছি সমুদ্রের প্রবাল,
আমাজনের বহতা তীর বিছারি খুঁড়েছি মাটি
বেরিয়ে এসেছে পুর্তগীজ পাইরেটদের গড়া কাথিড্রাল।

পরিযায়ী হওয়া হরিণের পিছু পিছু গিয়েছি হেঁটে
মুস প্রজাতির বিপুল শিংগাল মুখ ডুবিয়েছে ঝিলে,
পিঁপড়ার সামনে রেখেছি শর্করা মেশানো ককোর প্রলোভন
সৃজন করেছি সহমর্মী রহম এ দগ্ধদিলে।

বসেছি রেলগাড়ির জানালায়
জলমগ্ন ধানের ক্ষেত—আলে শাদা বক
ব্যাঙাচির সাঁতারে কেঁপেছে তালগাছের স্থির ছায়া,
ভেবেছি একদিন তর্জমা করতে শিখব
নিসর্গের মরমি তসবির ধরে রাখে কী যে মায়া।

মন্দিরের আঙিনায় শিশির ভেজা শিউলি কুড়িয়ে
উঠে দাঁড়িয়েছে কিশোরী—হাতে তার নৈবদ্যের থালি,
আমার হৃদয় সায়রে মেঘনা কুলকার্নি একদিন
গেয়ে উঠেছিল বিদুর তানপুরায় রাগ ভূপালি।

আবির মাখা কবুতর

পৈঠায় পা রেখে..খুব ধীরে..উঠে বসো
জাফরানি রঙের পানসিতে—
খুঁজেছো যা .. ..অনন্তের নক্ষত্রবীথি
আকুল হয়ে সারা দিনমান
বুনেছি বস্ত্র সুইসুতাহীন নিরস্ত্র.. ..
পারিনি দিতে;

পাটাতনে বনঘুঘুর ডিম—
বাগিচায় খুঁড়ে পাওয়া কাঠবিড়ালীর জীবাষ্ম,
ভালোবাসায় নিরংকুশ
            সন্ন্যাসীর জটাজুটের মুখোশ...
তন্দুলে মাখানো ছাইভষ্ম;

হালে হাত রেখে তাকাও..
দূরে—দেখতে কি পাও
হৃদয়ে নীলাভ হয়ে আসা সংযত দিগন্ত,
হাঁস ছানা ধান ..
কুয়াশায় অধীর
         হারিয়ে যাচ্ছে দস্তা-মদির অনন্ত..

কথা বলার কিছু নেই
চুপচাপ থাকাটাই ভালো,
গলুই ছুঁয়ে পানকৌড়ির পাখায় ওড়ে
রূপার আলো,
এ সময় আমাদের অতল নির্জন
বলা চলে তুমুল নির্বাক,
কান পেতে শোনো—
মাস্তুলের ওপর গুঞ্জন করে পোষা মৌচাক;

ভাসছে না—
চলছে দনকলস সর্ষের শুভ্রহরিৎ মাড়িয়ে
তালকুঞ্জের ওপর দিয়ে আশ্চর্য এ জলযান,
এ যাত্রায় বাহন আমাদের এমফিবিয়ান;

এসে তো পড়েছি—
সোনাঝরা সবুজ সায়র..ঘাসের গাঢ় রীজে
সুপারির স্মৃতিময় সারি,
ভবের হাটে মননের মন্দ্র মনসিজে—

নাও..এগিয়ে দিচ্ছি পানদান.. হাত বাড়াও
দেখতে কি পাও—
তবকে মোড়া রূপালি
সৌরভ ছড়ানো জোড়া সরোবর,
জলে ভাসে আবির মাখা দুটি কাজলা কবুতর।

চার্চে সান্দ্রা মরালেস

হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটে গেরিলা—ঘাসবনে গিরগিটি
গ্রাসহপারের ওড়াউড়িতে ছড়ায় বর্ণ অশেষ,
বাহারি দিনযাপনে আসে কাকো পানের বার্তা
গির্জায় সলো গাইবে আজ সান্দ্রা মরালেস;
গথিক কেতার শাদা দালানে জমবে কনসার্ট
আফ্রো ক্যারিবিয়ান সুরবাহার,
লিমোজিন হাঁকিয়ে চলে আসি চার্চে
বজায় রেখে কূটনৈতিক শিষ্টাচার;
বাটিকের কাফতান পরে দাঁড়িয়ে ছিল
অনমনা সে—বেদির সিঁড়িতে,
জ্বলে মোমবাতি কাচ ঝলসানো জানালায়
ক্রুশবৃক্ষের তলায় বৃদ্ধ যাজক বসে মেহগিনির পিড়িতে,

জননী মরিয়মের শরীরে জড়িয়ে মাকড়শার জাল,
লিম্বা গোত্রের তিন কাফ্রি ঢোলকে তোলে তাল;
সুরস্থাপত্যের মরমরঙীন দোলাচলে আমি নাজেহাল;

গাইছে সান্দ্রা আজ মন্দ্র স্বরে জ্যাজ ও ব্লুজ
তার পরে কান্ট্রি মিউজিক,
সমজদারি মন আমার উন্নাসিক,
জড়োয়ার রূপালি নীল স্ফটিকে ঠোকর খায়
আলোর জাফরানি সংঘাত,
গথিক গুম্ভুজে মনের মর্মান্তিক মুজরায়
বাজে প্রতিধ্বনির অভিঘাত।

আপনার মতামত লিখুন :