Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

চির বিদায় শাহরিয়ার শহীদ

চির বিদায় শাহরিয়ার শহীদ
ছবি: সংগৃহীত
সৈকত রুশদী  


  • Font increase
  • Font Decrease

চলে গেল শাহরিয়ার।  আমার অনুজপ্রতীম, অত্যন্ত সজ্জন একজন মানুষ ও  সাংবাদিক। 

খানিকটা হঠাৎ করেই। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। শনিবার, ১৭ নভেম্বর দুপুরে।  ঢাকায়। প্রায় তিনদিন জ্ঞানহীন থাকার পর। টরন্টোয় শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে প্রথম যে পোস্টটি দেখলাম, সেটিই শাহরিয়ারের প্রয়াণ সংবাদ।  মনটা ব্যথায় ভরে গেল।

একেবারে অকালপ্রয়াণ বলা যায়না। বয়স হয়েছিল পঞ্চান্ন বছর। শুভ্র দাড়ি গোঁফ ও চুলে ঢাকা তার শান্ত, স্থিতধী অবয়ব দেখে বয়স আরও বেশি মনে হতো। তিন দশকের বেশি সাংবাদিকতা জীবনের এই পর্যায়ে দেশের সবচেয়ে বড় ও সরকারী বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা' (বাসস)-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে তার এই প্রয়াণ।

অবশ্য খানিকটা জানান দিয়েছিলো ঠিক দুই বছর আগে। একসাথে লিভার, ফুসফুস ও কিডনীর কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যমে মানুষে লড়াই করে ফিরে এসেছিলো শাহরিয়ার সেবার। নবায়ন করা নতুন জীবন পেয়ে নতুন উদ্যমে কাজ করে যাচ্ছিল সকলের প্রিয় শাহরিয়ার। মৃদুভাষী, অন্তরালের মানুষ।

শাহরিয়ারের সাথে পরিচয়ের দিনক্ষণ আমার মনে নেই।  সালটা সম্ভবত: ১৯৮৭।  আমি বাংলা সংবাদপত্র 'দৈনিক খবর' ছেড়ে সদ্য ইংরেজি দৈনিক 'দ্য বাংলাদেশ টাইমস'-এ যোগ দিয়েছি। রিপোর্টার হিসেবে।  এক দুপুরে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে পরিচয় ও আড্ডা। পরে দেখা হয়েছে বহু এসাইনমেন্টে সংবাদ সংগ্রহকালে। শাহরিয়ার তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণসংযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে বাসস-তে যোগ দিয়েছে নবীন রিপোর্টার হিসেবে। বয়সের ফারাক খুব বেশি না হলেও সাংবাদিকতায় ততোদিনে আমার আট বছর পার হয়েছে। পেশায় অগ্রজ হিসেবে শাহরিয়ার আমাকে খুবই সম্মান করতো সবসময়। কথায় ও আচরণে। 

এর আগেই সরকারের মালিকানাধীন ট্রাস্ট পরিচালিত 'দ্য বাংলাদেশ টাইমস' পত্রিকায় সম্পাদক পদে যোগ দিয়েছেন প্রথিতযশা সাংবাদিক শহীদুল হক। দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনে 'মিনিস্টার প্রেস' পদে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনশেষে দেশে ফেরার পর। তাঁকে নিয়োগ দিয়েছেন সেই সময়ের রাষ্ট্রপতি লে. জে. (অব:) হো. মো. এরশাদ।

ছোটোখাটো গড়নের, উজ্জ্বল বর্ণের, সদা হাসিমুখ ও স্নেহপ্রবণ শহীদুল হক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই তাঁর পেশাদারিত্বের ছাপ রাখতে শুরু করেছেন।  আর্থিক সংকটে ভুগতে থাকা পত্রিকাটিকে নতুন করে গড়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। নিয়মিত বৈঠক করছেন সকল বিভাগের সাথে। রিপোর্টারদের সাথে নিয়মিত বৈঠকে তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও রসবোধের পাশাপাশি  সংবাদ জ্ঞানের প্রখরতার পরিচয় পেতে শুরু করেছি। সদ্য নিয়োগ পাওয়া তিনজন (বর্তমানে হল্যান্ড প্রবাসী ও 'বাসুগ' নামের উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী প্রধান বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া, কাজী জাহাঙ্গীর আলম ও আমি) এবং আগে থেকেই রিপোর্টারের দায়িত্ব পালনকারী দুইজন (আবদুর রহমান খান ও বর্তমানে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফিরোজ আহমেদ) তরুণ রিপোর্টার তাঁকে অফিসের প্রধান কর্তাব্যক্তির পরিবর্তে মেন্টর বা অগ্রজতুল্য অভিভাবক হিসেবে দেখতে শুরু করেছি। আমরাও নতুন উদ্যমে কাজ করতে শুরু করেছি।  জ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের মতো তরুণ রিপোর্টাররাও তাঁকে শহীদ ভাই বলেই ডাকতাম। তাঁরই দুই পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শাহরিয়ার শহীদ।

এক দুপুরে অফিসে গিয়েই শুনি শহীদ ভাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। শেরে বাংলা নগরের জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে  চিকিৎসাধীন। কয়েকজন সহকর্মী সহ ছুটে গেলাম হাসপাতালে। দেখলাম, করোনারী কেয়ার ইউনিটে নাকে ও মুখে নানা ধরণের নল লাগানো অবস্থায় অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছেন শহীদ ভাই। মনটা বিষন্ন হয়ে গেল।

অফিসে কাজের চাপ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি দাম্পত্য জীবনে অশান্তি শহীদ ভাইয়ের উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল। তিন দিনের মাথায় চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন শহীদুল হক। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে, সাংবাদিকতার মানের উৎকর্ষ সাধনে, বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষায় সাংবাদিকতায় আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার প্রচেষ্টার পিছনে যাঁর অবদান অপরিসীম, সেই সম্পাদক শহীদুল হক চিরবিদায় নিলেন।  মাত্র তিপান্ন বছর বয়সে।

শহীদুল হকের অকালপ্রয়াণের পর 'বাংলাদেশ টাইমস'-এ স্বল্পকালের জন্য সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলাম তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র চারুশিল্পী ও ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে খ্যাত শাহরুখ শহীদকে। তিনিও অকালপ্রয়াত। 

সম্পাদক শহীদুল হকের দাফনের পর নরসিংদীর এক নিভৃত গ্রামে তাঁর শেষ শয্যা নিয়ে আমি যে প্রতিবেদনটি লিখেছিলাম, সেই প্রতিবেদনটি নিজের, মায়ের ও পরিবারের সকল সদস্যের ভালো লেগেছে বলে জানাতে ফোন করেছিল শাহরিয়ার। কৃতজ্ঞতা প্রকাশকালে প্রতিবেদনের একটি বাক্যে তাদের পূর্বপুরুষের গ্রামের উল্লেখ করতে গিয়ে আমার ব্যবহার করা 'এন অবসকিউর ভিলেজ' (an obscure village) শব্দবন্ধের কথা স্মরণ করেছিল শাহরিয়ার।  বলেছিল, এটিই সঠিক বর্ণনা।  তার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল 'বাংলাদেশ টাইমস'-এর প্রথম পাতায়। 

তখন আমি 'সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ' সাময়িকীতে 'যাও পাখি' নামে একটি কলাম লিখতাম নিয়মিত।  বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল কলামটি।  সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে শোনা একটি ভাষ্য উল্লেখ করেছিলাম। কোনো সাংবাদিকের নাম কখন সংবাদ হিসেবে সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় স্থান পেতে পারে সেই বিষয়ে  শহীদুল হক কী বলেছিলেন সেকথা।  তিনি আমার সম্পাদক জেনে সেই তরুণ শিক্ষার্থী বলেছিল কথাগুলো।

"শহীদ ভাই আমাদের প্রথম ক্লাসে এসে কী বলেছিলেন শুনবে? সংবাদ কাকে বলে জানো তোমরা? আমরা চুপ। তিনি বললেন, আমার নামতো টাইমস-এর শেষ পাতায়, নিচে প্রিন্টার্স লাইনে দেখো, তাই না? যেদিন প্রথম পাতায়, উপরের দিকে দেখবে আমার নাম, অর্থাৎ আমার মৃত্যু সংবাদ দেখবে, সেটাই হবে সংবাদ।  বুঝলে?

নিরহংকারী মানুষটি সংবাদ হয়েছেন। তাই, দৌকার চরে, আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শয্যা পেতেছেন, আদরের মোরশেদ।"

(সৈকত রুশদী, অচিন পাখি, পৃষ্ঠা ১৪৫, ঢাকা: প্রোব প্রোডাকশন, ২০০২)।

আজ বাসসের অন্যতম শীর্ষ সংবাদ হয়েছে শাহরিয়ার শহীদ।  ঢাকার কোনো পত্রিকার প্রথম পাতায় হয়তো স্থান পেয়েছে দেশের জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিকের নাম, মৃত্যুসংবাদের শিরোনামে।

তবে দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের হাজারো সাংবাদিকের হৃদয়ের মণিকোঠায় জ্বলজ্বলে হয়ে থাকবে তার নাম।  কর্মনিষ্ঠ সাংবাদিক এবং বিনয়ী, নিরহংকারী ও পরোপকারী মানুষের এইতো পুরস্কার!

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Nov/21/1542777709308.jpg লেখক পরিচিতি:  সৈকত রুশদী/ BIOGRAPHY: Shaikat Rushdee

সৈকত রুশদী, পেশাগতভাবে একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক, সম্পাদক, এবং বেতার ও টেলিভিশন ভাষ্যকার। পুরস্কারে ভূষিত এই লেখক ও কবি, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের লন্ডনস্থ সদর দফতরে সম্প্রচারক হিসেবে কাজ করেছেন বছর দুয়েক (১৯৮৩-১৯৮৬)।

জন্ম মেহেরপুরে, ৫ নভেম্বর ১৯৫৯ সালে। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের পর ঢাকার ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ থেকে ১৯৭৪ সালে এসএসসি এবং আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে ১৯৭৬ সালে এইচএসসি পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৮০ সালে সমাজবিজ্ঞানে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯৮১ সালে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

সাংবাদিক হিসেবে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু হয় ১৯৭৮ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা'য় প্রদায়ক হিসেবে। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি তিনটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা (দৈনিক দেশ, দৈনিক খবরদ্য বাংলাদেশ টাইমস) এবং তিনটি সাপ্তাহিকীতে (বিচিত্রা, মতামত ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত দেশ) কাজ করেন।  বাংলাদেশে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেনের দূতাবাসে তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জনবিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেছেন (১৯৯২-২০০৩) ।

বর্তমানে তিনি কানাডায় সিশন  নামের একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানে মূল্যায়ন সম্পাদক ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

তিনি ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের নির্বাচিত যুগ্ম সম্পাদক (১৯৯১-১৯৯২) ছিলেন।  বিবিসি ছাড়াও বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ভয়েস অব আমেরিকা, চ্যানেল আই, এটিএন কানাডা ও এক্সএম স্যাটেলাইট রেডিওসহ অসংখ্য গণমাধ্যমে সাংবাদিক ও সম্প্রচারক হিসেবে অবদান রেখেছেন।

তাঁর প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে: 'অমর একুশে', বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের উপরে সংকলন (লন্ডন, ১৯৮৪, সম্পাদক); 'হল্ট গ্রিনহাউজ', পরিবেশ বিষয়ক সংকলন (ঢাকা, ১৯৯১, সম্পাদক, বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া সহ); ও 'অচিন পাখি', উপন্যাস (ঢাকা, ২০০২)। কাঠের কাজ: শহীদ মিনার, বাংলাদেশ সেন্টার (লন্ডন, ১৯৮৪)।

তিনি স্ত্রী গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও কবি শিউলী জাহান রুশদী হক এবং একমাত্র সন্তান টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী উপল রুশদী হক সহ কানাডায় বসবাস করেন।

SHAIKAT RUSHDEE, an award-winning author and poet, is a political analyst, editor, journalist and broadcaster. He has worked with BBC World Service in London, UK, as a broadcaster for two years (1983-1986).

He was born on 5 November 1959 in Meherpur. He completed his SSC in 1974 from Intermediate Technical College and HSC from Adamjee Cantonment College in 1976. He obtained his Bachelor’s degree with honours in sociology in 1980 and Master’s degree in sociology in 1981 from the University of Dhaka.

His career in journalism started with weekly Bichitra in 1978 as a contributor. He has worked with three national dailies (Dainik Desh, Dainik Khabar and The Bangladesh Times) and three weeklies (Bichitra and Motamot, and Desh in Kolkata) until 1992. He also worked with diplomatic missions of Canada, Australia and Britain in Bangladesh as a political analyst and public affairs officer (1992-2003). He is now working as an Analyst and Evaluation Editor at Cision, a global media intelligence company, in Canada.

He was an elected Joint Secretary of the Jatiya Press Club (1991-1992) in Dhaka. He has contributed to a number of media networks, including Bangladesh Betar, Bangladesh television, Voice of America, Channel i, ATN Canada and XM Satellite Radio.

His publications include: ‘Amar Ekushey’, an anthology on the Language Movement of 1952 (London, 1984, editor); ‘Halt Greenhouse’, an anthology on environment (Dhaka, 1991, with Barua, B. C., editor); ‘Achin Pakhi’ (Unknown Bird), a novel (Dhaka, 2002). Wood work: Shaheed Minar at Bangladesh Centre (London, 1984).

He lives in Canada with his wife Sheuli, a poet and media analyst, and daughter Upal, a student at the University of Toronto.

Toronto

18 November 2018

 

আপনার মতামত লিখুন :

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে
হুমায়ূন আহমেদ

 

তিনি বলেছিলেন, তার মৃত্যুতে কেউ যেন না কাঁদে। বিষাদ কণ্ঠে গেয়েছিলেন গান, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে জাদু ধন। মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’

কিন্তু সাত বছর আগে সুদূর আমেরিকায় তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছিল তার জন্য। শুধু সেদিনই নয়, বাংলা সাহিত্যের ভক্ত-অনুরাগীরা প্রতিটি দিনই তাকে স্মরণ করেন। তার কথা ভাবেন। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও কর্মমুখর। জীবনকে উপভোগ করেছেন তিনি সৃজনের বিবিধ উপাচারে।

হাওর-বাওর-গানের দেশ বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একই জেলার কেন্দুয়ার কুতুবপুর তার পিতৃভূমি।

পিতার চাকরির সুবাদে হুমায়ূনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের বহু স্থানে। সিলেটের মীরাবাজার, চট্টগ্রাম শহর, পিরোজপুরের মনকাড়া প্রকৃতিতে। যেসব কথা তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি নেন আমেরিকার থেকে। শুরু করেন অধ্যাপনা।

কিন্তু তার ভাগ্য মিশে ছিল সাহিত্যে। সার্বক্ষণিক লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি বেছে নেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে যে লেখক জীবনের সূচনা ঘটে, তা পরিণত হয় বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয়-জনপ্রিয় লেখক সত্তায়।

গল্প-উপন্যাসের জাদুকরী ক্ষমতায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেন তিনি। মানুষ লাইন ধরে কেনে তার বই। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয় হাজার হাজার কপি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।

আর তিনি ছিলেন মেধা, প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সমকাল তো বটেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি গড়েছিলেন পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী রেকর্ড। যে রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা আদৌ সম্ভব হবে না।

‘অচিনপুর’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’, ‘লীলাবতী’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘অচিনপুর’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘দেয়াল’, এমন তিন শতাধিক পাঠকনন্দিত উপন্যাসের রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে অর্জন করেন নিজস্ব পরিচিতি ও ভূগোল। একা লড়াই করে সাহিত্যের পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি মৃতপ্রায় প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে দেন তিনি।

টিভি নাটকেও জনপ্রিয়তার ইতিহাস গড়েন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘দূরে কোথাও’, এমন হৃদয়ছোঁয়া নাটকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় টেনে আনেন হাজার হাজার দর্শক।

চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও সোনা ফলিয়েছেন হুমায়ূন। সিনেমাহলমুখী করেছেন মানুষকে। তার নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘ঘেটু পুত্র কমলা’র মতো ছবি বাণিজ্য সফল ও পুরস্কৃত হয়েছে।

নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি লোকবাংলার বহু গান চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা বলেছেন। মানব-মানবীর অন্তর্গত হৃদয়ের দাহ ও বিষাদকে তুলে ধরেছেন অনন্য সুষমায়। তাকে ঘিরে শিল্প, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের এক নান্দনিক জগত উন্মোচিত হয়েছিল।

প্রেম ও রহস্যময় বেদনার প্রতীক নগ্নপদে হলুদপাঞ্জাবির ‘হিমু’ তার অনবদ্য সৃষ্টি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষক মিসির আলীর মতো চরিত্রও তিনি সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ূনের এই দুই চরিত্রের কথা বাংলা সাহিত্যের পাঠক সহজে ভুলবে না। ভুলবে না এমন আরো অনেক মানবিক চরিত্র ও কাহিনীর নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকেও।

মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদ, পুলিশ অফিসার বাবার জেষ্ঠ্য সন্তান হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির পুরোটা জুড়েই আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূনের উপন্যাস ‘১৯৭১’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘উতল হাওয়া’ এবং চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী কাহিনীচিত্র। যুদ্ধাপরাধ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লেখার পাশাপাশি আন্দোলনও করেছেন তিনি।

প্রেম ও বিরহ হুমায়ূনের লেখার মূল উপজীব্য হলেও তিনি তার লেখায় অপরূপ দক্ষতায় স্পর্শ করেছেন রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ঘটনাবলি। লেখার মায়াবী টানে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যে। নীল জোছনায় বেদনাহত একটি তরুণ কিংবা নীলপদ্ম হাতে একটি তরুণীর স্মৃতি-সত্তা পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন মানুষের চেতনার গহীন প্রদেশে। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

কাঙ্গাল হরিনাথের ১৮৬তম জন্মবার্ষিকী

কাঙ্গাল হরিনাথের ১৮৬তম জন্মবার্ষিকী
ছবি: সংগৃহীত

সাংবাদিকতার পথিকৃৎ, সাহিত্যিক, সমাজসেবক ও নারী জাগরণের অন্যতম দিকপাল কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের ১৮৬তম জন্মদিন আজ শনিবার (২০ জুলাই)। 

কালজয়ী এই সাংবাদিক ১২৪০ সালের ৫ই শ্রাবণ (ইংরেজি ১৮৩৩) কুষ্টিয়া জেলার (তদানীন্তন নদীয়া) কুমারখালী শহরের কুন্ডুপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হলধর মজুমদার ও মায়ের নাম  কমলিনী দেবী।

হরিনাথ মজুমদার ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শৈশবেই মাতৃ ও পিতৃহারা হয়ে চরম দারিদ্র্যতার মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠেন তিনি। তিনি অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন।

তৎকালীন সময়ে তিনি (১৮৫৭ সাল) প্রাচীন জনপদ কুমারখালীর নিভৃত গ্রাম থেকে হাতে লেখা পত্রিকা 'মাসিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা' প্রকাশ করেন। গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় তিনি ইংরেজ নীলকর, জমিদার ও শোষক শ্রেণির অত্যাচার, জুলুম, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও সামাজিক কু-প্রথার বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ করেন। হাজারো বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি পত্রিকাটি প্রায় একযুগ প্রকাশ করেছিলেন।পরবর্তীতে মাসিক থেকে পাক্ষিক এবং ১৮৬৩ সালে সাপ্তাহিক আকারে কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রেস থেকে নিয়মিত প্রকাশ করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602039922.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথের লেখা পত্রিকা 'মাসিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা' 

 

১৮৭৩ সালে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার তঁর সুহৃদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়’র বাবা মথুরনাথ মৈত্রয়’র আর্থিক সহায়তায় কুমারখালীতে এম, এন প্রেস স্থাপন করে, গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন।

কুষ্টিয়ার প্রবীণ সাংবাদিক আবদুর রশীদ চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার ৬৩ বছরে জীবনকালে তিনি সাংবাদিকতা, আধ্যাত্ম সাধন, সাহিত্যচর্চা সহ নানাধরণের সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। মূলত তিনি ছিলেন সাংবাদিকতা পেশার একজন সংগ্রামী মানুষ।

কালজয়ী এই সাংবাদিক জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শনিবার (২০ জুলাই) কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602126966.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তন

 

কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর য়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ।

বিশেষ অতিথি থাকবেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সচিব (যুগ্ম সচিব) মোঃ আবদুল মজিদ, কুমারখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল মান্নান খান, পৌর সভার মেয়র মোঃ সামছুজ্জামান অরুণ। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসাবে থাকবেন, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড.আবুল আহসান চৌধুরী।

সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার প্রায় ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তবে বেশিরভাগ অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিজয় বসন্ত একটি সফল উপন্যাস। গবেষকদের মতে, কাঙ্গাল হরিনাথ রচিত বিজয় বসন্ত উপন্যাসটিই বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম উপন্যাস। 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563602157692.jpg
কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনের সামনের চিত্র 

 

গ্রামীণ সাংবাদিকতার এবং দরিদ্র কৃষক ও অসহায় সাধারণ মানুষের সুখ-দু:খের একমাত্র অবলম্বন কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতি রক্ষার্থে সরকারি উদ্যোগে কুমারখালীতে সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা হলেও এখনো অবহেলিত রয়েছে এই কালজয়ী সাংবাদিকের জন্মভিটা (বাস্তুভিটা)।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীসহ কবি-সাহিত্যিকদের ভাষ্যমতে, কাঙ্গাল হরিনাথ ব্যবহৃত ও গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র সেই মুদ্রণ যন্ত্রটি এখনো অযত্ন অবহেলায় অন্ধকার একটি ভাঙা ঘরে পড়ে রয়েছে। তাই অনতিবিলম্বে ঐতিহ্যবাহী এই মুদ্রণ যন্ত্রটি কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে স্থানান্তর এবং কাঙ্গালের সমাধিসহ জন্মভিটা (বাস্তুভিটা) সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।  

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার বাংলা ১৩০৩ সালের ৫ বৈশাখ (ইংরেজি ১৮৯৬ সাল, ১৬ এপ্রিল) নিজ বাড়িতে দেহত্যাগ করেন। 

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র